ঈদ সাবলীলভাবেই সার্বজনীন উৎসব

প্রকাশিত: ৭:০৫ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৫, ২০২৪

ঈদ সাবলীলভাবেই সার্বজনীন উৎসব

অনিল সেন : ঈদুল ফিতর এখন ধর্মীয় রীতিনীতি পেরিয়ে সার্বজনীন উৎসবে রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে রোজা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মধ্যেও এক ধরনের প্রভাব পরে। বাসাবাড়ি, অফিস আদালত, ক্লাব সংগঠন-সবখানে একটা খুশির আবহ তৈরি হয়।

 

মাহে রমজান এবং ঈদুল ফিতর এলে আমার কয়েকটি ঘটনার কথা খুব মনে পড়ে।

 

ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, আমাদের বাড়িতে মুসলমানদের অবাধ চলাচল। খাওয়া দাওয়া এক সঙ্গে করা হয়। আমি তখন প্রাইমারি স্কুলের ছাত্র। আমার পরিস্কার মনে আছে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো আধাপাকা লম্বা দাড়ি চুল, সাদা মার্কিনকাপড় পড়া সুঠামদেহি এক সুফি সাধক আমাদের বাড়িতে প্রায়দিন ইফতার করতেন। ইফতারের ঠিক তিন-চার মিনিট আগে বাড়িতে হাজির হতেন। তাকে ইফতার করানোর জন্য বাবা খুব ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। আমার মা বড় কাঁসার ক্লাসে জলসহ চিড়া, মুড়ি, দই, কলা এবং ফলের মৌসুমে রমজান হলে নানা রকম ফলমূল দিতেন। আমি তাকে সাধু মনে করে প্রণাম করতাম। তিনিও আগ্রহ ভরে আমাকে আশীর্বাদ করতেন। বলতেন ,’খোদা তোমার মঙ্গল করুক’। আমি তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতাম। কোনোদিন না আসলে আমার ভীষণ খারাপ লাগতো।

 

 বাবাকে বলতাম, সাধু লোকটা আজকে এলো না কেন? বাবা বলতেন,’সুফি মানুষ তো  কখন কোথায় যায় বলা মুশকিল। তবে তিনি আবার আসবেন’। পরে জেনেছি তিনি বারো মাস রোজা করতেন।

 

সুফিমানুষ বা সুফিসাধক কে সেদিন বুঝতে পারিনি। বড় হয়ে মহিউদ্দীন ইবনুল আরাবি, শামসে তাব্রিজ, মওলানা জালালুদ্দীন রুমি, খাজা আজমেরি, উমর খৈয়াম, মনসুর হাল্লাজ ইত্যাদি ব্যক্তিদের জীবনী পড়ে সুফিবাদ বা সুফিদর্শন সম্পর্কে অনেকটা বুঝতে পেরেছি।

খুব মনে পড়ে মুন্সি কাকার কথা। তিনি আমাদের প্রাইভেট মাস্টার ছিলেন। সবাই ডাকতেন মশদমুন্সি বলে। কী অসাধারণ ভালো মানুষ ছিলেন। রমজানে তিনিও আমাদের বাড়িতে ইফতারী করতেন। আমার আপনজন বাল্যবন্ধু নূর ইসলাম। গ্রামের লোকজন বলতেন আমরা হরিহর আত্মা। তবে একদিনের জন্য দেখা না হলে অস্থির হতাম। দুর্গোৎসবের মতো ঈদুল ফিতরেও একসঙ্গে খাওয়া দাওয়া, ঘুরা ফেরা করতাম। ঈদের দিন তার বাড়িতে সেমাই না খেলে চলতই না। নূর ইসলামের বাবা মনসুর আলী কাকা ঈদের আগের দিন  দাওয়াত দিতেন। নূর ইসলাম নামাজ পড়েই  আমাদের বাড়িতে চলে আসতো। খাওয়া দাওয়া করে একসঙ্গে ঘুরতে বেরিয়ে পরতাম। টুকরো টুকরো এই স্মৃতিগলো আমাকে অসাম্প্রদায়িক গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। তথাকথিত ধর্মীয়গন্ডি ভেদ করে মানবিক মনন সৃষ্টিতে ওই স্মৃতি টুকরোগুলোর সামনে এখনো আমাকে দাঁড়াতে হয়। যতবার রমজান আসে। যতবার ঈদ আসে।

 

ঈদ এখন শুধু মুসলিম সম্প্রদায়ের থাকছে না। সবার হয়ে উঠেছে। ঈদুল ফিতর ধর্মীয় গন্ডি ছেড়ে সার্বজনীন মঞ্চে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান -সবাই ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়।

 

উৎসব ছাড়া কোনো ধর্ম কিংবা ধর্মমত একক ভাবে হাজার হাজার বছর টিকে থাকতে পারে- এমন নজির পৃথিবীতে নেই। মানুষ পরকালে যেমন ভালো থাকতে চায়, তেমনি ইহকাল বা এ জগতেও খুশি বা আনন্দে থাকতে চায়। এজন্য কেবল ধর্মীয় অনুশাসন থাকলেই চলে না দরকার পরে নানান পার্বন, উৎসব এবং সংস্কৃতির। ইসলাম পৃথিবীর দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ট ধর্ম। ঈদুল ফিতর মুসলমানদের সর্বোবৃহৎ ধর্মীয় অনুষ্ঠান, ধর্মীয় উৎসব।

 

ঈদ মানেই আনন্দ এবং খুশির উৎসব। ‘ঈদ’ শব্দটি আরবি, শব্দমূল ‘আউদ’, এর অর্থ এমন উৎসব, যা ফিরে ফিরে আসে বা পুনরায় অনুষ্ঠিত হয়। এটাকে রীতি হিসেবেও ধরা হয়। এক মাস সিয়াম সাধনার মাধ্যমে নানা নিয়মকানুন পালনের পর উদ্যাপিত হয় ঈদুল ফিতর। অনেকেই এই ঈদকে রোজার ঈদও বলে থাকেন। ‘ফিতর’ শব্দের অর্থ ভেঙে দেওয়া। আরেক অর্থে বিজয়। দীর্ঘ এক মাস রোজা রাখার পর যে উৎসব উদ্যাপন করা হয়, তা-ই ঈদুল ফিতর। প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে সত্যনিষ্ঠ জীবনযাপনের তাগিদ এবং মানবতার বিজয়বার্তা। আনন্দ-উৎসবের মাধ্যমে দিনটিকে স্মরণীয় করার নাম ঈদ উৎসব।  ঈদুল ফিতর পরিচ্ছন্ন এক আনন্দ অনুভূতি জাগিয়ে তোলে, যা মানবিক মূল্যবোধ সমুন্নত করে। নবীজী ঘোষণা করেছেন, ‘প্রত্যেক জাতিরই নিজস্ব আনন্দ-উৎসব রয়েছে, আমাদের আনন্দ-উৎসব হচ্ছে এই ঈদ।’ বাহ্যিক ভাবে দেখলেও ঈদ ধনী-গরিব সব মানুষের মহামিলনের বার্তা বহন করে। ঈদের দিন ধনী-গরিব, বাদশা-ফকির, মালিক-শ্রমিক নির্বিশেষে সব মুসলমানকে এক কাতারে নিয়ে আসে। নাড়ির টানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মা-বাবা আত্মীয় স্বজন, গ্রামবাসীর সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামের ছুটে যান। ঈদের নামাজ শেষে কোলাকুলি করে সাম্যের জয়ধ্বনি জয়গান করে।

 

বাঙালি ঈদকে কেবল ধর্মীয় উৎসব হিসেবে দেখা হয় না । ঈদ আনন্দ এখন সার্বজনীন আনন্দের নাম। সামাজিক উৎসবগুলোয় আমরা যেমন আনন্দে মাতি, তেমনি প্রত্যেক ধর্মেই রয়েছে বিশেষ কিছু উৎসবমুখর দিন। সেই উৎসবগুলোও আমাদের আনন্দে ভাসায়। ব্যবধান ঘুচিয়ে একাকার করে।

 

এ দেশে নানা ধর্ম, গোত্রের মানুষ বাস করে। ঈদ, পূজা, বড়দিন, বুদ্ধপূর্ণিমা, বৈসাবি, রাস পূর্ণিমায় সবাই আনন্দে মেতে ওঠে। এসব ধর্মীয় উৎসব এখন সামাজিক জীবনাচারেরই অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। আমাদের মনে রাখা দরকার, উৎসব আমাদের একতা, ঐক্য এবং মহৎ হতে শেখায়। সংস্কৃতি একটা জাতির আত্মপরিচয়। এ জাতিকে ঐতিহাসিক এবং মানসিক কারণে বাঙালি মুসলিমরা ঈদকে জাতীয় উৎসব এবং সার্বজনীন উৎসব হিসাবে পালন করে থাকে। তবে এটা  কেউ চাপিয়ে দেয়নি এটা হয়েছে সহজ, সরল এবং সাবলীল ভাবেই। ঈদুল ফিতরের আনন্দ দলমত নির্বিশেষে সব শ্রেণীর মানুষের জন্য সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ বয়ে নিয়ে আসুক।

 

অনিল সেন, বার্তা সম্পাদক,  দৈনিক রুপালী বাংলাদেশ