সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে’র ক্যান্টিন ও এ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস নিয়ে সীমাহীন অনিয়মের অভিযোগ

প্রকাশিত: ১০:৪২ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২২

সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে’র ক্যান্টিন ও এ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস নিয়ে সীমাহীন অনিয়মের অভিযোগ

জনি শর্মা :: সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে’র ক্যান্টিন ও এ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস নিয়ে সীমাহীন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।হাসপাতাল ক্যান্টিনে প্রকাশ্যে সিগারেট বিক্রি,ধূমপান ও এ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস থাকার পরও জরুরি সময়ে ভুক্তভোগী রোগী ও স্বজনরা এ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস সেবা থেকে দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত রয়েছেন।

জানা যায়,দক্ষিণ সুরমা ইউএনও অফিসের স্টাফ হেলাল অসুস্থ হলে গত ৫ সেপ্টেম্বর সোমবার রাত এগারোটার দিকে দক্ষিণ সুরমা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসা হয়।এখানের কর্তব্যরত ডাক্তার পর্যালোচনা করে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন।এই সময়ে অনেক খোঁজাখোজির পরও কোনো গাড়ী না পাওয়ায় হাসপাতালে থাকা এ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস পাওয়ার জন্য অনেক চেষ্টা করা হয় কিন্তু হাসপাতালের এ্যাম্বুলেন্স এর ড্রাইভার মুজাহিদ হাসপাতালে অবস্থান না করায় সেবা পাওয়া সম্ভব হয়নি।উপজেলা নির্বাহী অফিসার নুসরাত লায়লা নীরা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরেজমিন উপস্থিত হয়ে রোগীর খোঁজ খবর নেন এবং তাঁর অফিসের সহকারী কমিশনার (ভূমি) এর গাড়ী দারা ওসমানী হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়।তখন উপস্থিত জনতা চিৎকার দিয়ে বলাবলি করেন যে,”এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে’র এ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস দিনের বেলা পাওয়াও মুসকিল হয়ে পড়ে,ড্রাইভার মুজাহিদ এর খামখেয়ালির কারণে রাতের বেলা দূরুহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।এই এলাকার ও আগত রোগী ও স্বজনরা শত চেস্টা করেও এ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস সেবা থেকে বঞ্চিত থাকেন এতে কস্ট ও দূর্ভোগের সীমা থাকেনা”।

এই সময়ে ইউএনওকে সুব্রত তালুকদার নামের একজন ভুক্তভোগী বলেন-“এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভিতরের ক্যান্টিনে প্রকাশ্যে সিগারেট বিক্রি হয়,ধূমপানের ফলে হাসপাতালের পরিবেশ নস্ট হয় এবং স্বাস্থ্যহানি ঘটে।সিগারেট বিক্রি করে ক্যান্টিনের চালক নাইটগার্ড রুবেল সহ তার সঙ্গীরা।আমরা এসকল যন্ত্রণা থেকে মুক্তি চাই” বলে কথাগুলো বলেন।

নৈখাই এলাকার সাকিব আহমদ নামের একজন যুবক দক্ষিণ সুরমা উপজেলা পরিষদের নির্বাহী অফিসার বরাবরে হাসপাতালের অনিয়ম ও অ-ব্যবস্হাপনার কারণে গত ৬ সেপ্টেম্বর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন,তিনি গত মাসে তার বড় ভাই এর স্ত্রীকে ডেলিভারির জন্য অত্র স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসেন,এখানে ডেলিভারি না করে বরং ওসমানী হাসপাতালে রেফার করেন কর্তব্যরত চিকিৎসক।উপস্থিত সময় অনেক খোঁজাখোজির পর গাড়ী না পাওয়াতে হাসপাতালের এ্যাম্বুলেন্স সেবা পাওয়ার জন্য চেষ্টা করেন কিন্তু ড্রাইভার মুজাহিদ হাসপাতালে অবস্থান না করায় তারা রোগী নিয়ে চরম বিপাকে পড়েন ও হতাশাগ্রস্ত হন!ইউএনও অফিসের স্টাফ হেলাল এর জন্য-ও এম্বুলেন্স পাওয়া যায়নি ড্রাইভার মুজাহিদ এর অনুপস্থিতির কারণে।স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে’র ক্যান্টিনে সিগারেট বিক্রি এবং ধূমপান ইত্যাদি অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী সাকিব।

সজল নামের একজন সচেতন নাগরিক বলেন-এই হাসপাতালের নাইটগার্ড রুবেল বেপরোয়া চলাফেরা সহ বিভিন্ন রকম অনিয়মের সাথে জড়িত রয়েছে।গভীর রাতে হাসপাতালের ভেতরের কেসি গেইট বন্ধ করে রেখে দিয়ে সে ঘুমিয়ে পড়ে অথবা খামখেয়ালিপনায় বাহিরে চলাফেরায় মগ্ন থাকে।জরুরি চিকিৎসা সেবা নিতে আসা ভুক্তভোগীরা অনেক চিৎকার-চেচামেচি করলে দীর্ঘক্ষণ পর এসে গেইট খুলে এবং রুগি ও স্বজনদের সাথে খারাপ আচরণ করে।কিছুদিন পূর্বে নাইটগার্ড রুবেল একজন রুগীর স্বজনকে মারধরও করেছে।

জাহেদ নামের একজন ভূক্তভোগী জানান,”আমি একবার আমার স্ত্রীকে নিয়ে অত্র হাসপাতালে যাই,ইমার্জেন্সি ডেলিভারি সংক্রান্ত বিষয় হলে আমি যোগাযোগ করে এ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার মুজাহিদ এর নিকট স্মরণাপন্ন হই।সে আমার নিকট ২ হাজার টাকা দাবি করে নয়তো সে আমাকে ওসমানীতে নিয়ে যেতে অস্বীকার করে।আমি সহজ সরল গ্রামের মানুষ তাকে বলি,সরকারি যে রেইট আছে আমি তা দিব আমাকে প্লিজ একটু সাহায্য করেন!তখন সে আমাকে পাত্তা না দিয়ে খুবই খারাপ আচরণ করে।তারপর আমরা অনেক কস্টে ওসমানীতে চলে যাই।

প্রত্যক্ষদর্শী ও এলাকার জনসাধারণের সাথে আলাপকালে জানা যায়,নাইটগার্ড রুবেল ইতিপূর্বে বালাগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকেও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা করে এখানে বদলী হয়ে আসে।নাইটগার্ড রুবেল হাসপাতাল কোয়ার্টারে থাকে ও তার ডিউটিকালিন সময়ে খামখেয়ালি চলাফেরা সহ হাসপাতাল ক্যান্টিনে সিগারেট বিক্রিরও অভিযোগের সত্যতা মিলে।

এ্যাম্বুলেন্স চালক মুজাহিদের বাসা সিলেট নগরীর ঘাসিটুলায়,সে তার ডিউটিকালিন সময়ে প্রায়শ: তার বাসায় অবস্থান করে।জরুরি কিছু হলে অফিস থেকে চাপ গেলে তখন হাসপাতালে আসে।এম্বুলেন্স চালক হাসপাতাল কোয়ার্টারে অবস্থান করার নিয়ম থাকলেও সে তার নেতাগিরি ভাব দেখিয়ে দাপিয়ে চলে ও হাসপাতাল কর্তা ব্যক্তিদের তোয়াক্কা না করেই মনগড়া চলাফেরায় ব্যস্ত থাকে।

বিগত কিছুদিন পূর্বে হাসপাতালে একজন ডেলিভারি রোগি আসলে রোগীর স্বজনের কাছ থেকে নার্স রাছনা ও মিডওয়াইফ রিমা ডেলিভারি চার্জ বাবদ ৫ হাজার টাকা দাবি করেন।রোগির স্বজন কাকুতি মিনতি করে নগদ ১ হাজার টাকা ও বিকাশে ৮ শত টাকা প্রদান করেন তাদেরকে।পুরো টাকা না দেওয়ায় রিমা ও রাছনা রোগীর স্বজনের সাথে খারাপ আচরণ করে গালিগালাজ করতে থাকেন।বিষয়টি কর্তব্যরত ডাক্তার তাপস বাবুকে জানানো হলে তিনি টিএইচও বরাবরে জানানোর জন্য বলেন।স্হানীয় কিছু জনসাধারণের উপস্থিতিতে তাৎক্ষণিক অফিসে টিএইচও ডাক্তার মঈনুল আহসান কে জানানো হলে তিনি লিখিত আকারে জমা দেওয়ার জন্য বলেন।লিখিত জমা দেওয়া হলে তদন্ত কমিটি গঠন করে সত্যতা পাওয়া গেলে অভিযুক্ত রাছনা ও রিমাকে ডেপুটেশনে অন্যত্র বদলি করা হয়।

দক্ষিণ সুরমা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এর স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার মঈনুল আহসান বলেন-নার্স রাছনা ও মিডওয়াইফ রিমা’র বিরুদ্ধে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত সাপেক্ষে সত্যতা পাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিয়েছি।এম্বুলেন্স ড্রাইভার ও নাইটগার্ড এর বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে।যেকোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিব।

দক্ষিণ সুরমা উপজেলা পরিষদের নির্বাহী অফিসার নুসরাত লায়লা নীরা বলেন-স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এর বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগ শুনেছি,ভুক্তভোগী একজন লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তদন্ত পূর্বক ব্যবস্থা নিচ্ছি।নাইটগার্ড ও এম্বুলেন্স ড্রাইভার এর বিষয়ে গুরুতর অভিযোগ পেয়েছি,বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আমরা দেখছি।

দক্ষিণ সুরমা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবু জাহিদ বলেন-অভিযোগগুলো আমার জানা নেই।শুনলাম,বিষয়টি আমি গুরুত্বের সাথে সাথে দেখবো।

সিলেটের সিভিল সার্জন শাহরিয়ার জানান,অভিযোগগুলো শুনেছি,লিখিত অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিব,হাসপাতালের ক্যান্টিন আমরা অনুমোদন দেইনি।

সিলেটের বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডাক্তার হিমাংশু রায় বলেন-অভিযোগ গুলোর পরিপ্রেক্ষিতে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।হাসপাতালে ক্যান্টিন হবে কেন?এম্বুলেন্স ড্রাইভার সব সময় হাসপাতাল কোয়ার্টারে অবস্থান করার কথা।তদন্ত কমিটি গঠন হবে এবং অ-ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।