October 21, 2020 11:24 am
Home / Home / মক্কেল ধরতেন আশেক, শায়েস্তা করতেন আকবর

মক্কেল ধরতেন আশেক, শায়েস্তা করতেন আকবর

নিউজ ডেস্ক :: সম্প্রতি সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতোয়ালী থানার বন্দরবাজার ফাঁড়িতে পুলিশের নির্যাতনে যুবক মৃত্যুর ঘটনায় তোলপাড় দেশ। চলছে প্রতিবাদের ঝড়। এ ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে বন্দরবাজার ফাঁড়ির সদ্য বহিষ্কৃত ইনচার্জ এসআই আকবরের নাম এখন আলোচনার বিষয়। সময়ে সময়ে বেরিয়ে আসছে আকবরের দুর্নীতির নানা তথ্য। কিন্তু এবার সিলেট ভয়েসের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ওই ফাঁড়ির এএসআই আশেক এলাহীর ভয়ঙ্কর সব চিত্র। সেদিন রায়হানকেও ধরে এনেছিলেন এই আশেক এলাহী।

এতদিন তাদের নির্যাতন সহ্য করলেও এবার অনেকেই মুখ খুলতে শুরু করেছেন। সিলেট ভয়েসের কাছে নির্যাতিত ও প্রত্যক্ষদর্শী অনেকেই অনেকেই জানিয়েছেন তাদের নির্মম নির্যাতনের কথা।

ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, রাতের আঁধারে বন্দরবাজার ফাঁড়ির বিভিন্ন জায়গা থেকে নিরীহ মানুষকে ধরে আনতেন এএসআই আশেক এলাহী। প্রথমে ফাঁড়িতে নিয়ে যাওয়ার আগে সিএনজিতে তুলে কৌশলে টাকা আদায়ের চেষ্টা করতেন তিনি। এভাবে টাকা আদায় সম্ভব না হলে নিয়ে যেতেন ফাঁড়িতে। এরপরই শায়েস্তা করার দায়িত্ব পালন করতেন ইনচার্জ আকবর। প্রথমে চড়-থাপ্পড় দিয়ে শুরু হত আকবরের অ্যাকশন। চলত টাকা আদায় না হওয়া পর্যন্ত। শায়েস্তা করার প্রথম কাজটি করতেন আকবর নিজে। এর পরের দায়িত্ব পড়ত কনস্টেবল তৌহিদের কাছে।

সম্প্রতি তেমনই হয়রানি আর নির্যাতনের স্বীকার হয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান নুরুল ইসলাম। তাঁর বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলায়। থাকতেন সিলেট নগরীর মিতালি ম্যানশনে খালার সাথে। তিনি পেশায় রাজমিস্ত্রি। সম্প্রতি এক রাতে খালার বাসার জন্য সস্তায় মাছ কেনার জন্য রাত প্রায় সাড়ে ১১টায় বন্দর গেলে তাকে ধরে নিয়ে যান এএসআই আশেক এলাহী। এসময় তার কাছাকাছি থেকে আরও দুইজনকে ধরে নিয়ে যান বন্দর ফাঁড়িতে। এরপর সকলকে হস্তান্তর করা হয় বন্দর ফাঁড়ির সদ্য বহিষ্কৃত ইনচার্জ এসআই আকবরের কাছে। প্রথমেই কয়েকটি চড়-থাপ্পড় মারেন আকবর। পরে ডাকা হয় কনস্টেবল তৌহিদকে। বলেন ‘লাঠি নিয়ে আয়’। হুকুম পেতেই লাঠি নিয়ে হাজির তৌহিদ। লাঠি দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সন্তান দিনমজুর নুরুল ইসলামকে কয়েকটি আঘাত করেন তৌহিদ। এরপর একটি বিশেষ ধরণের চাকু নিয়ে আসলেন আরও এক কনস্টেবল। ধরিয়ে দিলেন নুরুল এর হাতে। তাতেই গল্প শুরু। ‘১০ হাজার দে, না হয় কোর্টে চালান করে দেয়া হবে’ বলে জানান তৌহিদ। পরে নুরুল ফোন দেন তার খালার কাছে। অসহায় খালা ধার দেনা করে কোনরকম ৭ হাজার টাকা জোগাড় করে মানুষ পাঠিয়ে নুরুল ইসলামকে ছাড়িয়ে আনেন বলে সিলেট ভয়েসকে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী নুরুল ইসলাম নিজেই।

কেবল নুরুল ইসলাম না, বাদ পড়েননি সরকারি চাকরিজীবী, পর্যটক কেউই। রাতে তাদের এক কৌশল হলেও ভোর হবার সাথে সাথেই সুরমা মার্কেট পয়েন্ট, চৌহাট্টা পয়েন্ট, কোর্ট পয়েন্টে বসত বন্দরবাজার ফাঁড়ির চৌকস অভিযান। টার্গেট থাকত এক সাথে থাকা তরুণ-তরুণী। সুযোগ বুঝেই তাদের আটক করে চলত ভয়ভীতি প্রদর্শন। কাউকে আবার ফাঁড়িতেও নিয়ে আসা হত। চলত খারাপ ভাষায় কথা বলা। সব মিলে টাকা আদায়ের সূক্ষ্ম এ কৌশলটি পালন করতেন মূলত আশেক এলাহী।

বিশেষ করে শাহজালাল (র.) মাজারে আসা ও পর্যটকদেরকেই বেশি টার্গেট করতেন তারা। অবশ্য বেশ কিছুদিন আগে সিলেটের চৌহাট্টা এলাকায় স্বামীসহ পুলিশের হয়রানির শিকার হয়ে ফেরার পথে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন এক নারী। সে সময় গণমাধ্যমসহ সকল মহলেই বেশ সমালোচিত হয়েছিল বিষয়টি। এভাবে নিরীহ মানুষদের ধরে নিয়ে গেলে কারো স্বজনরা সরাসরি টাকা নিয়ে আসতেন। আবার কখনো বিকাশ নাম্বারে আসত টাকা। সুরমা মার্কেটের ক্বীন ব্রিজ লাগোয়া একটি কম্পিউটার প্রিন্ট এন্ড কম্পোজের দোকান মালিকের পার্সোনাল নম্বরেই আসত সেই টাকা।

এভাবেই বন্দর ফাঁড়িতে চলত দিনের পর দিন মানুষকে হয়রানি আর নির্যাতন। বন্দর ফাঁড়ির মাঝখানের একটি কক্ষকেই ‘টরচার সেল’ হিসেবে ব্যবহার করতেন আকবর। এমন অসংখ্য ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী বন্দর ফাঁড়ি লাগোয়া কুদরত উল্লাহ মসজিদের কোয়ার্টারের বাসিন্দা হাসান খান নামের এক ব্যক্তি। গত প্রায় সাড়ে ৩ বছর থেকেই তিনি এখানে থাকছেন।

তিনি সিলেট ভয়েসকে বলেন, ‘সাড়ে ৩ বছরে অনেক মানুষের চিৎকার শুনেছি। নানা মানুষের নানাভাবে আকুতি শুনেছি। মানুষের নির্যাতনের এমন শব্দ শোনে মানুষ হিসেবে ব্যথিত হতাম। কিন্তু কিছুই করার ছিলো না। অনেক কিছু শুনলেও কাউকেই বলতাম না। আমার মনে হত ঝামেলায় জড়ানোর দরকার কি।’

তিনি আরও বলেন, ‘যেদিন রায়হানকে ধরে আনে, সেদিন রাতে আমি কদমতলিতে আমার কয়েকজন মেহমানকে গাড়িতে তুলে দিয়ে গভীর রাতে রুমে ফিরে চিৎকার চেঁচামেচি শুনেছি। কিছুক্ষণ পরপর শোনা গেছে। প্রায় ৪টা বা তার কিছু সময় পর পর্যন্ত চিৎকার শোনা গিয়েছিলো।’

হাসান খান আরও বলেন, ‘গত কয়েক মাস আগে ঠিক একইরকমভাবে ১২ বা ১৩ বছরের একটি ছেলেকে তারা খুব মেরেছে। কান্না আর কথা শুনে বুঝাই গিয়েছিলো এটি খুব কম বয়সের একটি ছেলে। পরে আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ধমক দেই। বলি, এটা মানুষকে মারা হচ্ছে নাকি অন্য কিছু। তখন আর কিছুক্ষণ পর ছেলেটির কোন শব্দ পাইনি।’

হাসান খান আরও বলেন, আমার এক আত্মীয়ের স্বামী সিলেট সাবরেজিস্ট্রারি অফিসে চাকরি করেন। উনার নাম খোকন। গত প্রায় ৩ মাস আগে তাকেও নাকি ফাঁড়িতে নিয়েছিল এএসআই আশেক এলাহী। তিনি রাত করে বন্দর ফাঁড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন আশেক এলাহী তাকে ডাক দিয়ে ফাঁড়িতে নিয়ে যান। ভিতরে নিয়ে যাওয়ার পর আশিক আকবরকে বলেন, লোকটাকে আমার সন্দেহ হয়েছে স্যার। তখন আকবর শুরু করেন মানসিক নির্যাতন। এরপর তৌহিদকে ডাকা হয়। তৌহিদ এসে শরীর তল্লাশি করার জন্য খোকনকে অন্য একটি কক্ষে নিয়ে যান। সেখানে গিয়ে তৌহিদ ও আরও এক কনস্টেবল মিলে প্রস্তাব করেন টাকা ১০ হাজার আনানোর। না-হলে গাঁজার পুটলি দিয়ে চালান করা হবে। পরে খোকন তার বাড়িতে ফোন করলে হেতিমগঞ্জ এলাকার নিমাদল থেকে খোকনের স্ত্রী পান্না বেগম ১০ হাজার টাকা নিয়ে এসে তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যান। বিষয়টি রায়হানের মৃত্যুর পর আমার ওই বোন আমাকে ফোন করে জানাল।’

কেবল তাই না, হাসান খান বলেন, সকালে ফজরের পর শুরু হত আরেক কাণ্ড। নামাজ পড়ে রাস্তায় বের হই প্রতিদিন হাঁটতে। তখন দেখা যায় ছেলে-মেয়ে এক সাথে দেখলেই তারা ধরে ফাঁড়ির ভিতরে নিয়ে আসেন। ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী কোন বাচ-বিচার নেই তাদের। বেশিরভাগ এই কাজগুলো করে আশেক নামের একজন অফিসার।

হাসান খানের সাথে কথা বলার সময় যুক্ত হলেন কুদরত উল্লাহ মসজিদের মুয়াজ্জিন। তিনিও জানালেন তাদের এমন কাণ্ডের কথা। দুইজনেই বলেন, বাইরের ডিস্ট্রিক থেকে লোকজন সিলেটে আসে। কিন্তু তারা ভাই-বোন এক সাথে হলেও ফাঁড়িতে ধরে নিয়ে আসতেন তারা।

এদিকে রায়হান হত্যার পর পর সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে এরপর বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াসহ চার পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বরখাস্তকৃত অন্য তিনজন হলেন, কনস্টেবল হারুনুর রশীদ, কনস্টেবল তৌহিদ মিয়া, কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাস।

একই সাথে তিন পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। প্রত্যাহারকৃত পুলিশ সদস্যরা হল, যিনি রায়হানকে ধরে এনেছিলেন এএসআই আশিক এলাহী, এএসআই কুতুব আলী, কনস্টেবল সজিব হোসেন।

কিন্তু এ ঘটনায় এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ। বরং মূল অভিযুক্ত আকবরকে খোঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ।

এ ঘটনায় সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সচেতনমহল। এমনকি সাময়িক বরখাস্ত আর প্রত্যাহার এটি ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার একটি কৌশল বলে মন্তব্য করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, আশেক বলেন আর আকবর বলেন সবাইকে গ্রেপ্তার করা উচিৎ ছিলো। কিন্তু এসমপির পক্ষ থেকে তা না করে কাউকে সাময়িক বরখাস্ত নাহয় প্রত্যাহার করা হচ্ছে। এরপর বলা হচ্ছে আকবরকে পাওয়া যাচ্ছে না। মানলাম আকবরকে পাওয়া যাচ্ছে না, কিন্তু অন্যরা কোথায়। যে ধরে এনেছিলো আশেক সে কোথায়। সুতরাং ৭ জনকেই গ্রেপ্তার করা উচিৎ ছিলো। কিন্তু পুলিশ তা করছে না।

তিনি আরও বলেন, এসএমপি কমিশনারের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। কোন অবস্থায় উনি দায় এড়াতে পারেন না। তাই আমি বলব আকবরকে উনারাই সরে যাওয়ার পথ তৈরি করে দিয়েছেন। তা না হলে আশেকসহ অন্য যারা আছে তাদের প্রত্যেককে গ্রেপ্তার করা হোক।

এমন বিশদ অভিযোগ শোনে মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (গণমাধ্যম) বিএম আশরাফ উল্যাহ তাহের বলেন, আকবর ছাড়া বাকি সবাইকে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে। প্রত্যেকেই নজরদারিতে আছেন। আর আশেক এর ক্ষেত্রে যেসব তথ্য জানালেন তা ক্ষতিয়ে দেখা হবে। মূলত সামগ্রিক বিষয় বিবেচনায় আছে। তাছাড়া মামলা যেহেতু পিবিআই তদন্ত করছে সেক্ষেত্রে তারাই তদন্ত করে পদক্ষেপ নিবে।

About sylhet24express

Check Also

মালিক-শ্রমিক মুখোমুখি, সারা দেশে লাগাতার ধর্মঘট

নিউজ ডেস্ক :: দাবি-দাওয়া নিয়ে দেশের নৌযান মালিক ও শ্রমিকরা (পণ্যবাহী যান) মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছেন। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *