October 21, 2020 11:08 am
Home / আরও / বাঙলাছন্দের গঠনকৌশল ও বৈশ্বিক ছন্দ কালাচাঁদ মৃত্যু

বাঙলাছন্দের গঠনকৌশল ও বৈশ্বিক ছন্দ কালাচাঁদ মৃত্যু

অন্বেষণ পর্ব: প্রথমপর্ব

ব্যক্তিগতভাবে যে কোন তত্ত্বান্বেষণে আজীবনই আমি কৌতূহলপ্রবণ। যার বশবর্তী হয়ে নানা বিষয়ের মধ্য থেকে এ পর্যায়ে আমার নির্ধারণকৃত গবেষণার বিষয়বস্তুর নাম “ছন্দ”। ছন্দ নিয়ে গবেষণা আজকের দিনে নতুন কিছু নয়— তবুও প্রচলিত বৈশ্বিকছন্দসহ বাঙলাছন্দের গঠনকৌশল নতুনভাবে খতিয়ে দেখার আগ্রহ আমার দীর্ঘকালের। সে কারণেই পুরাতন ছন্দকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে ভাঙিয়ে নেয়ার তাগিদে নানা আঙ্গিকের এ পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নিযুক্ত না হয়ে পারলাম না।

বাঙলা কবি-ভাষায় শব্দগঠনের কৌশলস্বরূপ অক্ষর সম্পর্কে প্রচলিত রয়েছে ইংরেজি ধারার Syllable গণনার ধারণা-গৃহীত শব্দাংশভিত্তিক পদ্ধতি। যে Syllabic ধ্বনির উচ্চারণের শেষাংশে (Vowel) স্বরধ্বনি এসে যুক্ত হয়ে ধ্বনিটিকে শ্বাসকাল পর্যন্ত দীর্ঘ করে তোলে, তাকে বাঙলায় “মুক্তাক্ষর” এবং যার শেষাংশে (Consonant) ব্যঞ্জন/হস্-বর্ণের বাধা এসে ধ্বনিটির গতিকে থামিয়ে দেয়, তাকে “বদ্ধাক্ষর” নামে ডাকা হয়। প্রচলিত ছন্দের গঠনমন্ত্র এ দুই অক্ষরেই সীমাবদ্ধ। একটি প্রশ্ন আর কারো চিন্তায় ঘুরপাক খায় কি না জানি না— এ সীমাকে লঙ্ঘনের উপায় কি নেই? আমার ধারণা— অবশ্যই আছে। সে পথের প্রান্তে পৌঁছতে বাঙলাভাষার নিজস্ব বর্ণকাঠামো নিয়ে নতুন সঙ্গ্রাম ও দীর্ঘ অভিযাত্রার প্রয়োজন। সেই অভিযাত্রার শুরুতে অক্ষর সম্পর্কে নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণও আবশ্যক। তার পূর্বে পুরাতন ধারার সাথে নতুন ধারাকে মিলাতে কী কী বাধা— পূর্ণাক্ষরে তার অনুসন্ধান চাই।
প্রচলিত বাঙলাছন্দের প্রত্নতাত্ত্বিক গঠনকৌশল ও তার নামের সাথে নামকরণের অর্থ-সঙ্গতি সম্পর্কে রহস্য উদ্ঘাটন করতে গিয়ে যে অভিজ্ঞান অর্জিত হয়েছে: প্রচলিত একটি ছন্দের নামকরণও তার গঠন-বৈশিষ্ট্যের সাথে একাত্ম নয় বরং সাঙ্ঘর্ষিক। ছন্দের নামকরণ বিষয়ে সময়োপযোগী আলোচনা হবে অন্যত্র। এ পর্যায়ে প্রতিটি ছন্দের গঠনকৌশল সঙ্ক্ষেপে তুলে ধরছি—
ক. প্রচলিত স্বরবৃত্ত ছন্দে উল্লিখিত প্রতিটি Syllable বা প্রচলিত অক্ষরকে ১ মাত্রা গণনার রীতিই প্রধান কৌশল। সেই সাথে সংযুক্ত রয়েছে কিছু ব্যতিক্রম ও ত্রুটি— এ বিষয়ে অন্যত্র আলোকপাত করা যাবে।
খ. প্রচলিত মাত্রাবৃত্ত ছন্দে প্রতিটি Syllabic অক্ষর-ধারণা থেকে প্রাপ্ত মুক্তাক্ষর সর্বত্র ১ মাত্রা এবং বিশ্লিষ্ট-ভঙ্গিতে প্রতিটি বদ্ধাক্ষর ২ মাত্রা গণ্য— এ গঠনকৌশল সর্বজন বিদিত। অথচ প্রচলিত গণনকৌশলের মধ্যে স্থিত কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘ বদ্ধাক্ষরের ধ্বনিসীমা ও মাত্রার কালজ্ঞাপক বিস্তার-সম্পর্কিত স্বচ্ছ মীমাংসা আদৌ সম্ভব হয়নি। এ বিষয়েও অন্যত্র বিস্তারিত আলোচনা আবশ্যক।
গ. প্রচলিত অক্ষরবৃত্ত ছন্দের গঠনকৌশল ব্যতিক্রম-যন্ত্রণায় ঠাসা! রীতি ছিল— মুক্তাক্ষর সর্বত্র ১ মাত্রা; শব্দের আদ্য-মধ্য বদ্ধাক্ষর ১ মাত্রা এবং শব্দান্ত্য-বদ্ধাক্ষর ও একটি বদ্ধাক্ষরে গঠিত শব্দ ২ মাত্রা গণ্য হবে। অথচ ব্যতিক্রমের অজুহাতে এ গঠনকৌশলভুক্ত আদ্য-মধ্য বদ্ধাক্ষরের সূত্রটি লঙ্ঘিত হয়েছে আদিকাল থেকেই! কেন, কীসের দোহাই দিয়ে একটি শব্দের মাত্রাসঙ্খ্যা একেক কবি অথবা একই কবি ভিন্নসঙ্খ্যক গুনে, ছন্দটিকে করেছেন স্বেচ্ছাচারিতায় পরিপূর্ণ? মাত্রা গণনায় নিজেও বিভ্রান্তির শিকার হয়ে কেন বিভ্রান্ত করেছেন প্রজন্মকেও? এ সম্পর্কেও ভাবনার অবকাশ রয়েছে। আবার একবর্ণে সৃষ্ট বদ্ধাক্ষরের মাত্রামূল্য সম্পর্কিত কোন স্পষ্ট আলোচনাই কোন কবি বা ছান্দসিক করে যাননি। এরও মীমাংসায় অন্যত্র কথা হবে।
ঘ. বিদেশি ছন্দের ভাব ও গঠনরূপ গ্রহণপূর্বক হ্রস্ব-দীর্ঘতার অবস্থানে Syllabic মুক্তাক্ষর, বদ্ধাক্ষরের ক্রমবিন্যাসে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত বাঙলাছন্দ-জগতে ৪র্থ ছন্দ হিসেবে সংযুক্ত করলেন “বিমানবিহার” ছন্দ। (“ছন্দঃ সরস্বতী” গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা আছে) ছান্দসিক আবদুল কাদির এ ছন্দের গঠনকৌশল নিরীক্ষণ করে নামকরণ করেন প্রস্বরমাত্রিক বা প্রাস্বরিক ছন্দ। শ্রী দিলীপকুমার রায় বলেন “প্রস্বনী”। আমার পরিভাষায় “প্রস্বরবৃত্ত ছন্দ”। অথচ শ্রীপ্রবোধচন্দ্র সেন এ ছন্দটির গঠনকৌশল সম্পর্কে নিজেই বিভ্রান্ত ছিলেন— যার প্রেক্ষাপটে তিনি তাঁর “ছন্দোগুরু রবীন্দ্রনাথ” গ্রন্থে “রাজা” শিরোনামা নৃত্যসঙ্গীতটিকে প্রচলিত স্বরবৃত্ত ছন্দের আলোচনায় রাখলেন। এ বিতর্ক আপাতত থাক।

মূল অন্বেষণ:
চার ছন্দের গঠনকৌশল পর্যবেক্ষণে একটিই প্রধান বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট যে, ধ্বনিভিত্তিক গঠনসূত্র হিসেবে ইংরেজিরীতির Syllable-কেই সর্বত্র অক্ষর-মূল্যায়নের প্রচেষ্টা অব্যহত রাখার চেষ্টা চালানো হয়েছে, আসলে যা ব্যর্থ। এখানেই স্পষ্ট— ছন্দভেদে ধ্বনিবিন্যাস ও মাত্রার একক নির্ধারণের পার্থক্যটুকুই কেবল মূখ্য বিষয় নয়, এর নামকরণও যথেষ্ট সাঙ্ঘর্ষিক। এ অনুসন্ধানে আমার কাছে বাঙলাভাষার গঠনকৌশল ও বর্ণতত্ত্বের প্রতি পূর্ববর্তীদের একধরনের চিন্তার ঘাটতিই ছিল বলে প্রতীয়মান হয়েছে। সেই মূল ঘাটতি কোথায়— তার অনুসন্ধানে মগজে হাজির হলো এক বিস্ময়কর চিন্তা ও দৃশ্যাক্ষর পরিকল্পনা।
এখানেই নতুন করে প্রশ্ন জাগে, অক্ষর কাকে বলে?
শ্রুতিগ্রাহ্য ধ্বনি ও ধ্বনির দৃষ্টিগ্রাহ্য সঙ্কেতকে অক্ষর বলে। ধ্বনি ও বর্ণের মিশ্র-অবস্থানসৃষ্ট ধ্বনির বিশ্লিষ্ট রূপকে একত্রে ছন্দ-নির্ভর বর্ণাক্ষর বলে— “বর্ণাক্ষর” মৌলিক অক্ষর নয়।
সংজ্ঞার আলোকে মৌলিক অক্ষর নিম্নোক্ত দুই প্রকার: শ্রুত্যাক্ষর ও দৃশ্যাক্ষর।
শ্রুতি বা শ্রবণশক্তি দ্বারা নির্ধারিত শব্দ বা শব্দাংশভিত্তিক (Syllable) ধ্বনির একককে শ্রুত্যাক্ষর বলে। দৃষ্টিগ্রাহ্য বর্ণকে বলে দৃশ্যাক্ষর।
মানুষ ভাষা শেখার কালে কেবল শ্রুতির উপরেই স্থির থাকে না— ধ্বনির প্রতিলিপি অঙ্কনে দৃষ্টিশক্তিরও প্রয়োগ ঘটায়। অথচ ছন্দের গঠনকৌশল হিসেবে কেবল শ্রুতিকেই মূল্যায়নের ব্যর্থচেষ্টা চালানো হয়েছে সর্বত্র— যার দরুণ প্রচলিত অক্ষরবৃত্ত ছন্দে অভাবনীয় ব্যতিক্রমের আবির্ভাব ঘটেছে। উক্ত ছন্দের গঠনকৌশল হিসেবে বর্তমানে Syllable ভিত্তিক গণনা সম্পূর্ণই অনুপযোগী ও ভ্রান্তিকর বলে প্রমাণিত হয়েছে।

সর্বাত্মক সমীক্ষায় পাই— প্রচলিত সমস্ত ছন্দের মূল উপাদান এখন পর্যন্ত Syllableকেই ভেবে রাখা হয়েছে। কিন্তু কোন ভাষার বর্ণমালার নিজস্বরীতি অনুযায়ী প্রতিটি Syllable-এর প্রতিলিপি দৃশ্যত-বর্ণ উপাদানেই সৃষ্ট। আমার মনে উদয় হলো, সেই দৃষ্টিগ্রাহ্য বর্ণ বা অক্ষর প্রয়োগেও হয় তো বা ছন্দচর্চা সম্ভব— অথচ এই সম্ভাব্যতা সবার দৃষ্টির অগোচরেই থেকে গেছে চিরকাল। চিন্তার এ অগোচর অবস্থান থেকেই পঞ্চম ছন্দ হিসেবে “বর্ণক্রমবৃত্ত” ছন্দের গঠনকৌশল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা গৃহীত হয়।
একটি আত্মজিজ্ঞাসামূলক প্রশ্ন—যদি প্রচলিত ছন্দে কেবল Syllable ব্যবহার করে, এমন কি মুক্তাক্ষর-বদ্ধাক্ষরের ক্রমবিন্যাসে প্রস্বরবৃত্ত ছন্দের ন্যায় ধ্বনিমাধুর্যপূর্ণ বাকধ্বনি সৃষ্টি হতে পারে— তবে ধ্বনি-গঠনের মূল উপাদান বর্ণ বা দৃশ্যাক্ষরের ক্রমবিন্যাসে “বর্ণক্রম” পদ্ধতিতে ছন্দস্পন্দপূর্ণ পদ গড়ে তোলা সম্ভব নয় কেন? সম্ভব হতেও তো পারে?
উক্ত জিজ্ঞাসার মীমাংসায় “বর্ণক্রম” ভাবনাকে বাস্তবে প্রয়োগ করে পরীক্ষণের প্রয়োজনবোধ করি। যার প্রেক্ষাপটে দৃশ্যত বাঙলা বর্ণমালাকে বর্ণক্রমবৃত্ত ছন্দে উপস্থাপনের স্বার্থেই নিম্নোক্ত দৃশ্যাক্ষর বিভাগে চিন্তা করি:
দৃশ্যাক্ষর/দৃশ্যবর্ণ ৩ প্রকার
ক) মুক্তবর্ণ
খ) যুক্তবর্ণ
গ) অধীন বর্ণ
(ক) মুক্তবর্ণ: ২ প্রকার
★ স্বরযুক্ত বর্ণ— সঙ্কেত “স্ব/v”
★ স্বরমুক্ত হস্-বর্ণ— সঙ্কেত “হ/c”
খ) যুক্তবর্ণ: ৬ প্রকার
★ সাধারণ যুক্তবর্ণ— সঙ্কেত “যু/u”
★ একক যুক্তবর্ণ— সঙ্কেত “~”
★ স্পর্শ যুক্তবর্ণ (ং+অবর্গীয়বর্ণ); ঃ+ যে কোন বর্ণ (যদি প্রভাব বিস্তার করে)—সঙ্কেত “যু/u” হবে।
★ শিস-যুক্তবর্ণ— সঙ্কেত “স/s”
★ ফলাযুক্তবর্ণ
★ শ্রুতিসন্ধি যুক্তবর্ণ (এর ব্যবহার গৌণ)
ফলাযুক্তবর্ণ ২ প্রকার
★ ফলাযুক্তবর্ণ (নিযুক্ত)— সঙ্কেত “যু/u”
★ ফলাযুক্তবর্ণ (নির্লিপ্ত)— সঙ্কেত “স্ব/v”
গ) অধীন বর্ণ (ঙ, ঞ, ড়, ঢ়, য়, ৎ,ং, ঃ, ঁ)
★ সুপ্তবর্ণ (ঁ) মাত্রাহীন
[সঙ্ক্ষিপ্ত সার: ধ্বনির সীমাবদ্ধতার প্রশ্নে যে কোন বর্ণই হস্ বর্ণে পরিণত হতে সক্ষম। বিসর্গ (ঃ) যদি শব্দোচ্চারণে প্রভাবকের ভূমিকায় আসে— তবে তা তার পরের বর্ণের সাথে মিলে যুক্তবর্ণের মর্যাদা পায়। ফলাযুক্তবর্ণ ভাষায় দ্বৈত আচরণ করে— অর্থাৎ শব্দাদ্যে “নির্লিপ্ত” এবং শব্দের মধ্য-অন্ত্যে প্রভাব বিস্তারে “নিযুক্ত” থাকে। অথচ কখনো শব্দমধ্যেও ফলাযুক্তবর্ণ নির্লিপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। সেহেতু, নির্লিপ্ত ফলাযুক্ত বর্ণকে স্বরযুক্তবর্ণ (স্ব/v) ও নিযুক্ত ফলাযুক্ত বর্ণকে (যু/u) যুক্তবর্ণের আওতায় রাখা হয়েছে।]

পরীক্ষণপর্ব: যেমন চিন্তা তেমন কাজ!
বর্ণক্রম কী?
প্রতিপর্ব বা চরণে সমহারে মুক্তবর্ণ ও যুক্তবর্ণকে নির্দিষ্টক্রমে বিন্যাস অর্থাৎ প্রতি পর্ব বা চরণে সমবৈশিষ্ট্যের বর্ণকে ক্রমান্বয়ে সাজালেই হবে “বর্ণক্রমবৃত্ত”। এ পর্যায়ে পরীক্ষণের নিমিত্তে উদাহরণস্বরূপ প্রতি পর্বে ৫টি বর্ণ নিম্ন-নির্ধারিত ক্রমে নিচ্ছি: যথা— “স্ব/যু/হ/স্ব/যু অথবা v/u/c/v/u” ক্রমে।
ব্যবহৃত বর্ণ-সঙ্কেতের সাথে আগেই পরিচয় করানো হয়েছে— এখানে তার প্রয়োগে কী হয়, দেখা যাক…

“মিথ্যার গন্ধ বিশ্বাস-ভঙ্গে,
সুন্দর সৃষ্টি মুক্তির রঙ্গে।
শক্তির যুদ্ধে রক্তের নিন্দা,
হত্যায় মগ্ন বিশ্বের জিন্দা!”
বর্ণক্রমবৃত্ত ছন্দগঠন: vucvu//vucvu (১ম পদ্ধতি: দৃশ্যাক্ষর)
মি/থ্যা/র্ / গ/ন্ধ ।। বি/শ্বা/স্-/ভ/ঙ্গে
সু/ন্দ/র্ / সৃ/ষ্টি ।। মু/ক্তি/র্ / র/ঙ্গে
শ/ক্তি/র্ /যু/দ্ধে ।। র/ক্তে/র্ /নি/ন্দা
হ/ত্যা/য়্ /ম/গ্ন ।। বি/শ্বে/র্ /জি/ন্দা
এখানে নির্দিষ্ট ক্রমে প্রতিপর্বে ১ম ও ৪র্থ বর্ণ স্বরযুক্ত (v), ৩য় বর্ণ স্বরমুক্ত (c) এবং ২য় ও ৫ম বর্ণ যুক্তবর্ণ (u); সেই সাথে দৃশ্যাক্ষর রয়েছে প্রতিপর্বে ৫টি।
বর্ণক্রমে সাজানো কথাগুলোর পাঠ দারুণ ধ্বনি-ঝঙ্কারে, ছন্দস্পন্দে উপভোগ্য— যা সর্বাগ্রে নিজের কানের কাছেই বিস্ময়কর লাগলো!
এভাবেই সৃষ্টি হয়েছে বর্ণক্রমবৃত্ত ছন্দের প্রথম সূত্র।

দ্বিতীয় ধাপে আরো কৌতুহল বেড়ে গেল। নতুন চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম— ভাবলাম, “বর্ণক্রমবৃত্ত” তো হলো: প্রচলিত Syllable ধারায় একবার মিলিয়ে দেখি— কেমন দাঁড়ায় বর্ণক্রমবৃত্তের প্রচলিত-নব্যরূপ!
“মিত্/থার্/গন্/ধ ।। বিশ্/শাস্ /ভঙ্/গে
সুন্/দর্/ সৃষ্/টি ।। মুক্/তির্/ রঙ্/গে
শক্/তির্/ যুদ্/ধে ।। রক্/তের্/ নিন্/দা
হত্/তায়্/ মগ্/ন ।। বিশ্/শের্/ জিন্/দা”

★ প্রচলিত স্বরবৃত্তে প্রতিপর্বে রয়েছে ৩ বদ্ধাক্ষর + ১ মুক্তাক্ষর : ৩+১=৪ মাত্রা।
[৩ বদ্ধাক্ষর কালক্ষেপণ-ব্যতিক্রমে ৪ হয়।] ★ প্রচলিত মাত্রাবৃত্তে প্রতিপর্বে রয়েছে ৩ বদ্ধাক্ষর— ৬ মাত্রা + ১ মুক্তাক্ষর ১ মাত্রা: ৭ মাত্রা
★ প্রচলিত অক্ষরবৃত্ত ছন্দে রয়েছে প্রতিপর্বে দুটি আদ্য-বদ্ধাক্ষর ২, একটি অন্ত্য-বদ্ধাক্ষর ২, একটি মুক্তাক্ষর ১: মোট ৫ মাত্রা
★ প্রচলিত প্রাস্বরিক বা প্রস্বরবৃত্তে প্রতিপর্বে রয়েছে ৩ বদ্ধাক্ষর ও ১ মুক্তাক্ষরের নির্দিষ্ট ক্রমবিন্যাসে “বববমু/(———v)”

আশ্চর্য! বর্ণক্রমবৃত্তের একটি কবিতায় প্রচলিত সব ছন্দই মিতিপ্রধান ভঙ্গিতে, গণনায় থাকতে পারে! এই দেখে নিজেই আবার বিস্মিত হলাম!
অবশেষে ভাবলাম, আমার ভাবনাসৃষ্ট “বর্ণক্রমবৃত্ত” ছন্দ যেহেতু প্রচলিত ছন্দ ও প্রস্বরবৃত্ত ছন্দের গণনায়ও সিদ্ধ, সেহেতু এ ছন্দের নতুন নাম রাখি— “পঞ্চবৃত্তীয় বর্ণক্রম-প্রাস্বরিক ছন্দ” বা “বর্ণক্রম-প্রস্বরবৃত্ত ছন্দ”। যা কোন ছন্দের অনুকরণ থেকে সৃষ্ট নয়— বাঙলাভাষার বর্ণকে ক্রমবিন্যাসগত নতুন ধারণা থেকেই উদ্ভূত। তবুও এখানে একটি বিষয়ে মীমাংসার প্রয়োজন বোধ করছি— অন্যথা ছন্দবোদ্ধাগণ বিভ্রান্ত হতেই পারেন— এমন কি, বর্ণক্রম-প্রস্বরবৃত্তকে নিছক প্রস্বরবৃত্তের সাথে গুলিয়েও ফেলতে পারেন। ভাবুন, কোনো ছন্দগবেষক আজ পর্যন্ত বর্ণক্রমভিত্তিক কোন ছন্দের গঠন-বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বিন্দুবৎ আলোকপাত করে গেছেন কি না? —করেননি। বর্ণক্রমে যে ছন্দচর্চার সম্ভবনা বিদ্যমান— এমন ভাবনাও কখনো তাঁদের জাগেনি— এটাই সত্য। তারপরেও প্রশ্ন থেকে যায়: বর্ণ-শাসনের কড়া নিরাপত্তা গ্রহণ না করেও প্রস্বরবৃত্ত ছন্দে লেখা কিছু কবিতা বর্ণক্রমবৃত্তের সাথে অভিন্নরূপ কেন? এ সাদৃশ্যের কারণ কী? প্রথমত, কবির অবচেতন মনের নৃত্যঝঙ্কারেই এমনটি হয়ে উঠেছে বলতে হবে— না হলে, নামজাদা ছন্দগবেষকের মধ্যে কেউ না কেউ অথবা কবি নিজেই বিষয়টি সর্বসম্মুখে উত্থাপন করতেন। নতুন আঙ্গিকে এর চর্চাও হতো। অথচ তা হয়নি।
উপরের সাদৃশ্য সঙ্ক্রান্ত আলোচনা কোন গঠনমূলক মীমাংসা নয়—সাদৃশ্যের কারণ অনুসন্ধানোত্তর গঠনমূলক কিছু তথ্য এ পর্যায়ে উত্থাপন করছি:
প্রথম কারণ: প্রতিপর্ব বা চরণে ব্যবহৃত সব বর্ণই স্বরযুক্ত বর্ণ বা প্রচলিত মুক্তাক্ষর হলে— লেখাটি বর্ণক্রম-প্রস্বরবৃত্তের সাথে পুরোপুরি মিলে যাবে।
দ্বিতীয় কারণ: প্রতিপর্বের বা চরণের কেবল শেষ অক্ষরটি বদ্ধাক্ষর বা স্বরযুক্ত+স্বরমুক্ত বর্ণ হলে, বর্ণক্রম-প্রস্বরবৃত্তের সাথে পুরোপুরি মিলে যাবে।
তৃতীয় কারণ: প্রতিপর্বের বা চরণের কেবল প্রথম বা শেষ দুটি অক্ষরের ক্রম “বদ্ধাক্ষর+মুক্তাক্ষর” বা (স্বরযুক্ত+স্বরমুক্ত+স্বরযুক্ত) হলে— বর্ণক্রম-প্রস্বরবৃত্তের সাথে কবির অজান্তেই নৃত্যঝঙ্কারে মেলার সম্ভাবনা থাকে।
চতুর্থ কারণ: প্রতিপর্বে বা চরণে ব্যবহৃত সব অক্ষরই বদ্ধাক্ষর হলে— বর্ণক্রম- প্রস্বরবৃত্তের সাথে মেলার সম্ভাবনা থাকে।

উদাহরণ: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “মম চিত্তে নিতি নৃত্যে” নৃত্যসঙ্গীতটির মূল পর্ব দুটির গঠন (মুমুবমু/মুমু মুমু) সংস্কৃত ছন্দে নয়— ইংরেজি ছন্দ Third Paeon (তৃতীয় স্বর Closed: vv—v) এবং Pyrrhic (যার প্রতিটি অক্ষরই মুক্তাক্ষর: vv vv) এ দুটির সমন্বয়ে গঠিত। সেই সাথে প্রতি স্তবকের শেষাংশে রয়েছে তবলা-নৃত্যের তাল জ্ঞাপক ধ্বনি: তা তা থৈ থৈ। আবার এর তিনটি স্তবকই অসমান— যা পূর্ণাঙ্গ বর্ণক্রম-প্রস্বরবৃত্ত ছন্দের রীতিবিরুদ্ধ!
লেখাটি উল্লিখিত প্রথম ও তৃতীয় কারণে বর্ণক্রম-প্রস্বরবৃত্তের সাথে কেবল খণ্ডিত স্তবক গণনায়ই কাকতালীয় ভাবে মিলে গেছে। প্রতি স্তবক ভিন্নসঙ্খক মাত্রার হওয়ায় লেখাটি একসূত্রে গাঁথা বর্ণক্রম-প্রস্বরবৃত্ত ছন্দের মূল বৈশিষ্ট্যে নেই।

আশা করি, কেউ বিভ্রান্ত হবেন না এবং এ পর্যন্তই প্রথম পর্বের বর্ণক্রম-প্রস্বরবৃত্ত ছন্দের সৃষ্টিলগ্ন-গঠনকৌশল-উপস্থাপন সম্পন্ন হলো।

দ্বিতীয়পর্ব:
প্রচলিতি অভিযোজন-কৌশল অন্বেষণ
প্রচলিত Syllable বা শ্রুত্যাক্ষর গণনা ও বর্ণক্রম-প্রস্বরবৃত্তের নব্যরূপ বর্ণভিত্তিক গণনার অভিযোজন-সহাবস্থান নিয়ে চিন্তা আরো প্রখর হয়ে উঠলো এই পর্বে। সমীক্ষায় দেখা, বর্ণক্রমে সাজানো কবিতায় আশ্চর্যস্বরূপ প্রচলিত সব ছন্দের জন্যই গাণিতিক মাত্রাগণনা নির্ভুল থাকে। যদিও এ নতুন ছন্দের গণনবিধি ও গঠনরীতি প্রচলিত ধারায় করা হয়নি। সেটাও ভাববার বিষয়। আবার অপ্রচলিত গণনা হঠাৎ করেই কারো পক্ষে বুঝে ওঠা সহজ হবে না। যদি তা প্রচলিত ধারায় আনা সম্ভব হয়, তবে সবার পক্ষেই সহজে বুঝে, চর্চায় সুবিধা হবে— এমন চিন্তা থেকেই পুনরায় শুরু হয় “বর্ণক্রম-প্রস্বরবৃত্ত” ছন্দকে প্রচলিত গণনায় নিয়ে আসার নতুন গবেষণা।
নতুনভাবে সাজাতে চাইলে প্রয়োজন হবে নির্ভরযোগ্য ধ্বনি-সঙ্কেতের। এ যাবৎ কবি ও ছান্দসিকগণের ব্যবহৃত দুটি সঙ্কেত দেখতে পাই: প্রচলিত মুক্তাক্ষর (v) ও বদ্ধাক্ষর (—)। কিন্তু এ সঙ্কেত দুটি ব্যবহার করে বর্ণক্রম-প্রস্বরবৃত্ত ছন্দের ধারা রক্ষা করা কতটা সম্ভব— এর প্রমাণস্বরূপ প্রথমপর্বে ব্যবহৃত “বববমু /(———v)” Syllable-ক্রমে প্রচলিত প্রস্বরবৃত্ত ছন্দের একটি উদাহরণ দেয়া যাক—
“একদিন ডুববে প্রাণ সূর্যাস্তে
আন্ধার ঢাকবে তোর রূপ আস্তে
ক্ষুদ্রের যুদ্ধে রক্তের দাম কী!
সৈকত শুকনো, তোর সঞ্চয় কী?
হৈ হৈ রৈ! কে জ্যোৎস্নায় হাসছে
ঐ কার পালকি বন্যায় ভাসছে!
স্পর্শের মন্ত্রে ঐ তোর ধ্বংস,
ছাড়্ তোর গৌণ নিন্দুক বংশ…”

প্রস্বরবৃত্ত ছন্দে উল্লিখিত উপরের কবিতাংশ নির্ভুল। সহাবস্থান সূত্রমতে লেখাটি প্রচলিত স্বরবৃত্তে এবং প্রচলিত মাত্রাবৃত্তেও গাণিতিক গণনায় নির্ভুল। লক্ষণীয় যে, শুধু বর্ণক্রমধারা ঠিক নেই বিধায় প্রচলিত অক্ষরবৃত্ত ছন্দও এতে অনুপস্থিত। তবে সাধারণ প্রস্বরবৃত্ত ছন্দে লেখা যে কোন কবিতাই উল্লিখিত ত্রিবৃত্তের হয়ে থাকে।
কবিতাংশের গঠনকৌশল ও বর্ণবিন্যাস ঘেটে প্রতীয়মান হলো, মুক্তাক্ষর-বদ্ধাক্ষরের প্রচলিত দুটি সঙ্কেত ব্যবহার করে প্রস্বরবৃত্ত পর্যন্ত সম্ভব কিন্তু “বর্ণক্রম-প্রস্বরবৃত্ত” ছন্দের জন্য তা পুরোটাই অযোগ্য। প্রস্বরবৃত্তে মুক্তাক্ষর-বদ্ধাক্ষর নিয়ে কোন অবস্থান-দ্বন্দ্ব নেই। প্রচলিত এই ধারার (v,—) চিহ্নে বর্ণক্রম-প্রস্বরবৃত্ত ছন্দে পর্ব বা চরণ গঠনের প্রধান সমস্যা একটাই— অবস্থানানুপাতে বর্ণের সমতা-অসমতার ক্ষেত্রে। এখান থেকেই অক্ষরের অবস্থান-সঙ্ক্রান্ত সমস্যা আগে বোঝা দরকার অক্ষরের অবস্থান সঙ্ক্রান্ত ধারণা নিম্নরূপ:
অক্ষরভেদে শব্দগঠনে মুক্তাক্ষরের অবস্থান দুটি— শব্দের যে কোন অবস্থানে স্বাধীনভাবে থাকে সাধারণ মুক্তাক্ষর। “ডুববে” শব্দে “বে” একটি স্বাধীন ও সাধারণ মুক্তাক্ষর।
যুক্তবর্ণের শেষাংশ রূপে সংযুক্ত অবস্থায় থাকে সংযুক্ত মুক্তাক্ষর। “সূর্যাস্তে” শব্দে “স্তে/স্+তে” যুক্তবর্ণের শেষাংশে সংযুক্ত অবস্থায় “তে” একটি সংযুক্ত মুক্তাক্ষর। যার প্রেক্ষিতে “বর্ণক্রম-প্রস্বরবৃত্ত” ছন্দের জন্য মুক্তাক্ষরের প্রতিটি অাবস্থানিক সঙ্কেত প্রয়োজন।
বদ্ধাক্ষর-ক্ষেত্রটি আরো ঘোলাটে। শব্দগঠনে চারটি অবস্থানে ভিন্নরূপে বদ্ধাক্ষর থাকে—
শব্দের যে কোন অবস্থানে স্বাধীনভাবে থাকে সাধারণ বদ্ধাক্ষর। “ডুববে” শব্দে “ডুব্” একটি স্বাধীন ও সাধারণ বদ্ধাক্ষর।
একটি যুক্তবর্ণের পূর্ববর্ণ অথবা পরের বর্ণের সাথে যুক্ত হয়ে শব্দে সংযুক্ত বদ্ধাক্ষর থাকে। অর্থাৎ “আন্ধার” শব্দে “ন্ধ” যুক্তবর্ণের সাথে সংযুক্ত অবস্থায় “আন্/ধার্” পরস্পর দুটি সংযুক্ত বদ্ধাক্ষর রয়েছে।
ঐ/ঐ-কার এবং ঔ/ঔ-কার সংশ্লিষ্ট শব্দে একবর্ণে সৃষ্ট একক বদ্ধাক্ষর থাকে। “সৈকত” শব্দের “সৈ” একটি একক বদ্ধাক্ষর।
একটি স্বরের আশ্রয়ে দুইয়ের অধিক বর্ণ গুচ্ছাকারে দীর্ঘ-বদ্ধাক্ষররূপ গুচ্ছাক্ষর গঠন করে। এ ধরনের অক্ষর বিদেশি শব্দের জন্যই বেশি প্রযোজ্য। বাঙলায় এর প্রাচুর্য কম। “জ্যোৎস্নায়” শব্দে “জ্যোৎস্” একটি দীর্ঘ বদ্ধাক্ষর। এ ধরনের শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতিটি ছন্দেই মাত্রা গণনায় ব্যক্তিভেদে অমীমাংসিত বিতর্ক রয়েছে।
শিস-শ্রুতি বর্ণ নিয়েও ছন্দে অবস্থানগত ও মাত্রাগত বিতর্ক দীর্ঘকালের। স্ক, স্খ, স্ট, স্ত, স্থ, স্প, স্ফ— এ সাতটি কালক্ষেপণজাত (ইস্/এস্) শিস-শ্রুতি যুক্তবর্ণ। বর্ণক্রম-প্রস্বরবৃত্ত ছন্দে এ বর্ণগুলোর মূল্য অন্য যুক্তবর্ণ অপেক্ষা আলাদা। যা প্রস্বরবৃত্তসহ অন্য ছন্দে অনুপস্থিত এবং বিতর্কিত।

শব্দ-সংস্থাপনবিধি মতে দুটি শব্দের সন্ধিস্থলে শ্রুতিসন্ধি বর্ণগ্রাস মুক্তাক্ষরের সৃষ্টি হয়। যেমন: “জানার আছে: জানা(র্+আ)ছে: জানা(রা)ছে: জানারাছে” পাশাপাশি দুটি শব্দের উচ্চারণে একধরনের শ্রুতিসন্ধি ঘটেছে। যার ফলে “র্+আ=রা” উচ্চারিত হয়েছে। দুটি শব্দের সন্ধিস্থলে কারচিহ্ন+সমস্বরবর্ণ এলে দুটি স্বর মিলে একটি শ্রুতিদীর্ঘ সন্ধিস্বর উচ্চারিত হয়। “এখানে এলাম” সন্ধিস্থলে (এ-কার+এ) দুটি “এ” ধ্বনি মিলে “দীর্ঘ-এ” এর অস্তিত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
আবার দুটি শব্দের সন্ধিস্থলে শ্রুতিসন্ধি যুক্তবর্ণসহ শ্রুতিসন্ধি সংযুক্ত বদ্ধাক্ষর সৃষ্টি হয়। যেমন: “নবীন দলের মাঝি” শ্রুতিতে “নবীন্দলের (ন্দ)/দলের্মাঝি (র্মা)” কানে শোনার কারণে পাশাপাশি শব্দদ্বয় যুক্তবর্ণে বা ফলাযুক্তবর্ণে ও সংযুক্ত বদ্ধাক্ষরে পরিণত হয়েছে। এ সন্ধিতাত্ত্বিক অক্ষরের সর্বাত্মক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে কবিতায় একধরনের স্বাতন্ত্রিক ছন্দস্পন্দ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে। শ্রুতিসন্ধি-ধারণাটি ছন্দশাস্ত্রের জন্য এক নতুন সংযোজন বলে আশা করছি।
উপরিউক্ত সমীক্ষার সূত্র ধরে বলতে পারি— প্রচলিত ছন্দে (অক্ষরবৃত্ত বাদে) উপরিউক্ত যে কোন মুক্তাক্ষর ও বদ্ধাক্ষরের ধ্বনিমূল্য অভিন্ন হলেও বর্ণক্রম-প্রস্বরবৃত্ত ছন্দে এদের স্বাতন্ত্রিক বৈশিষ্ট্য, অবস্থানভেদে বর্ণ ও ধ্বনিমূল্য আলাদা। অবশেষে বর্ণক্রম-প্রস্বরবৃত্তের নিমিত্তে উল্লিখিত শ্রুত্যাক্ষরভিত্তিক ধ্বনিগুলোর নিম্নরূপ বিভাগ ও স্বতন্ত্র-সঙ্কেত সৃষ্টির প্রতি অগ্রসর হতে বাধ্য হয়েছি।
শ্রুত্যাক্ষর ২ প্রকার
১। ধ্বনিতাত্ত্বিক শ্রুত্যাক্ষর
২। শ্রুতিসন্ধি শ্রুত্যাক্ষর

ধ্বনিতাত্ত্বিক শ্রুত্যাক্ষর ৩ প্রকার
ক) মুক্তাক্ষর
খ) বদ্ধাক্ষর
গ) শিস-শ্রুতি অর্ধাক্ষর (^)

#ক. মুক্তাক্ষর ২ প্রকার:
১. সাধারণ মুক্তাক্ষর (v)
২. সংযুক্ত মুক্তাক্ষর (u)

#খ) বদ্ধাক্ষর ৪ প্রকার:
১. সাধারণ বদ্ধাক্ষর (—)
২. সংযুক্ত বদ্ধাক্ষর (÷)
৩. একক বদ্ধাক্ষর (~)
৪. দীর্ঘাক্ষর/গুচ্ছাক্ষর (π)
#ঘ) সন্ধিতাত্ত্বিক শ্রুতিসন্ধি শ্রুত্যাক্ষর ৩ প্রকার
১। বর্ণগ্রাস মুক্তাক্ষর (√)
২। শ্রুতিসন্ধি সংযুক্ত বদ্ধাক্ষর (%)
৩। সমস্বর দীর্ঘাক্ষর (#)

[সন্ধিতাত্ত্বিক শ্রুত্যাক্ষরের ব্যবহার অত্যন্ত গৌণ] প্রথমপর্বের কবিতাংশকে এবার দ্বিতীয় পর্বের নতুন শ্রুত্যাক্ষরভিত্তিক চিহ্নের প্রয়োগে বর্ণক্রম-প্রস্বরবৃত্ত ছন্দে মিলিয়ে দেখা যাক: কেমন দাঁড়ায় এর নব্যগঠনরূপ!
“মিত্/থার্/গন্/ধ ।। বিশ্/শাস্ /ভঙ্/গে
সুন্/দর্/ সৃষ্/টি ।। মুক্/তির্/ রঙ্/গে
শক্/তির্/ যুদ্/ধে ।। রক্/তের্/ নিন্/দা
হত্/তায়্/ মগ্/ন ।। বিশ্/শের্/ জিন্/দা”

নতুন সঙ্কেতে বর্ণক্রম-প্রস্বরবৃত্ত ছন্দগঠন: ÷÷÷u (২য় পদ্ধতি: শ্রুত্যাক্ষর)
ব্যাখ্যা: প্রতিপর্বে চার শ্রুত্যাক্ষরের ১ম তিনটি সংযুক্ত বদ্ধাক্ষর (÷÷÷) এবং ৪র্থ শ্রুত্যাক্ষরটি সংযুক্ত মুক্তাক্ষর (u) রয়েছে।
আনন্দের বিষয় এই যে, দৃশ্যাক্ষর ও শ্রুত্যাক্ষর ধারায় উদ্ভাবিত বর্ণক্রমের দুটি পদ্ধতিতেই নির্ভুল পঞ্চবৃত্তীয় বর্ণক্রম-প্রস্বরবৃত্ত ছন্দের চর্চা করা যায়। বিশ্বের প্রচলিত প্রায় ছন্দেরই গঠনকৌশল বর্তমানে বর্ণক্রম-প্রস্বরবৃত্ত ছন্দে সংযুক্ত হয়েছে।
[পরিবর্ধনযোগ্য]

_________কপি: আজাদ ইবনে ছানাওর ______

About sylhet24express

Check Also

লণ্ডনে ৩য় গোল্ডকাপ ক্যারাম টুর্নামেন্টের ফাইন্যাল ও পুরুস্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত

নিউজ ডেস্ক :: লণ্ডন, ১৩ অক্টোবর – সাউণ্ডটেক ক্যারাম ক্লাব ইউকে’র উদ্যোগে লণ্ডনে ৩য় গোল্ডকাপ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *