September 30, 2020 11:36 pm
Home / Home / যাদুকাটায় ভেসে আসা কয়লায় জীবিকার সন্ধান

যাদুকাটায় ভেসে আসা কয়লায় জীবিকার সন্ধান

নিউজ ডেস্ক :: ধু-ধু বালুচর কিংবা পানিতে টইটুম্বুর। বর্ষা আর শুষ্ক মৌসুমে যাদুকাটা নদীর চিরাচরিত দুই রূপ। মেঘালয় পাহাড়ের কোল ঘেঁসে বয়ে চলা স্বচ্ছ জলের যাদুকাটা নদী মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম উৎস। এর সাথে যোগ হয়েছে উপজেলার তিন শুল্ক স্টেশন। এসব জায়গায় শ্রমিকের কাজ করেই আহার যোগান উপজেলার বেশিরভাগ মানুষ।

তবে দীর্ঘদিন থেকেই তাহিরপুর উপজেলার তিনটি শুল্ক স্টেশন দিয়ে কয়লা ও চুনাপাথর আমদানি রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। বন্ধ রয়েছে যাদুকাটায় বালু উত্তোলন। পরিবেশ রক্ষায় এ নদী থেকে বালু উত্তোলনে সরকার নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। আর এ নিষেধাজ্ঞায় উপার্জনের জায়গা হারিয়ে অসহায়-মানবেতর জীবন-যাপন করছেন শ্রমিকরা।

 

করোনাভাইরাস আর বন্যায় বিপর্যস্ত হাওরাঞ্চলের কারো ঘরে চুলা জ্বলছে তো কারো ঘরে আহারের কষ্ট। এমন অবস্থায় শ্রমিকদের কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলার জায়গা এনে দিয়েছে সেই যাদুকাটাই। সীমান্তের ওপার থেকে যাদুকাটা নদীতে ভেসে আসছে কয়লা। আর এসব কয়লা খুঁজে-খুঁজে সংগ্রহ করে দিনশেষে বিক্রি করছেন শ্রমিকরা। এতে মিলছে সামান্য টাকা। জ্বলছে ঘরের চুলা, নিবৃত হচ্ছে আহারের কষ্ট।

 

তবে হাওরাঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নির্ভর না করে বিকল্প কর্মসংস্থানের উপর জোর দেয়ার তাগিদ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধুই এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নির্ভর না করে শ্রমিকদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। বিকল্প কর্মসংস্থান হিসেবে এ অঞ্চলে কাঁচবালি শিল্প, মিনারেল ওয়াটার প্লান্ট বা পর্যটন শিল্পের রয়েছে অপার সম্ভাবনা।

 

সরেজমিনে যাদুকাটা নদী ও শুল্ক বন্দর ঘুরে দেখা যায়, কোথাও শ্রমিকদের জটলা নেই। নেই হাঁকডাকও। বাড়ি ফেরার তাড়া নেই, নেই চিরচেনা রূপ। কর্মমূখর শুল্ক স্টেশন এখন নীরব, নিস্তব্ধ। উপার্জনের এই উৎসের নীরবতায় কান পাতলে শুনা যায় শ্রমিকদের কান্না। অনুভব করা যায় জীবন-জীবিকার সংগ্রামের গল্প।

 

আর যাদুকাটা নদী ঘুরে দেখা যায়, ভারত থেকে প্রবাহিত স্রোতে বালির সঙ্গে মিশে থাকা কয়লা শ্রমজীবী লোকজন ছোট ছোট ঠেলা জাল দিয়ে পানিতে ছেঁকে বালি থেকে আলাদা করে বস্তায় ভরে রাখছেন। পরে প্রতি বস্তা কয়লা সাড়ে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় স্থানীয় মহাজনদের নিকট বিক্রি করে তা দিয়েই কোনরকম সংসারের অভাব অনটন দূর করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।যাদুকাটা নদী তীরবর্তী গড়কাটি গ্রামের বাসিন্দা সাবিবুর মিয়া বলেন, যাদুকাটা নদীতে অনেক দিন ধরে কাজ বন্ধ থাকায় শতশত নারী-পুরুষ শ্রমিকরা অভাব অনটনে দিন পার করছে। এখন বালির সঙ্গে মিশে থাকা কয়লায়-ই জীবিকা নির্বাহের একমাত্র উপায়। করোনার সময়ে সরকারি সাহায্য সহযোগিতাও আমরা ঠিকমতো পাইনি। কাজের সন্ধানে কোথাও যেতে পারছি না। এ অবস্থা বেশিদিন চলতে থাকলে না খেয়ে মরতে হবে।

 

মানিগাঁও গ্রামের হাবিবুর মিয়া বলেন, নদীতে কাজ বন্ধ থাকার কারণে আমাদের রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে। ২-৩ দিন ধরে ঘরে চাউল নিতে পারিনি এমনও সময় যাচ্ছে। পরে সুধে দেনা করে টাকা আনছি। আর এখন বালির সাথে মিশে থাকা কয়লা বিক্রি করে কোনরকম খেয়ে না খেয়ে চলছি।

 

দীর্ঘদিন শুল্ক বন্দর ও যাদুকাট নদীতে কাজ বন্ধ থাকায় এর প্রভাব পড়েছে বাণিজ্যিক কেন্দ্র বাদাঘাট বাজারসহ উপজেলার অন্যান্য বাজারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও। এ বিষয়ে বাদাঘাট বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, নদীতে কাজ না থাকায় এবং শুল্ক স্টেশন বন্ধ হওয়ায় এলাকার শ্রমজীবী লোকজন মানবেতর অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। আর শ্রমিকদের কাজকাম বন্ধ থাকলে বাজারগুলোতেও এর প্রভাব পড়ে ব্যাপকভাবে। বেচা-কেনা কম থাকায় দিনের বেশিরভাগ সময় ব্যবসায়ীরা এখন অলস সময় পার করছেন। এ অবস্থা চলতে থাকলে অনেক ব্যবসায়ী বড় আকারে অর্থনৈতিক সংকটে পরবেন। আর এ সংকট থেকে উত্তরণ কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

 

পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাশমির রেজা বলেন, ‘করোনা কালে শুল্ক স্টেশন ও নদী থেকে বালু পাথর উত্তোলন বন্ধ থাকায় অনেক শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে। এরা মানবেতর জীবন-যাপন করছে। পরিবেশ সম্মত উপায়ে এদের কাজের সুযোগ করে দেওয়া জরুরি। দীর্ঘস্থায়ী ভাবে এই সমস্যার সমাধানের জন্য এসব শ্রমিকদের শুধু প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নির্ভরশীল না রেখে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে। কাঁচবালি শিল্প, মিনারেল ওয়াটার প্লান্ট বা পর্যটন শিল্পে এখানে সম্ভাবনা রয়েছে। এসব সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করলে এই সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধান হবে না। তাই এসব শ্রমিকদের কথা এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা বিবেচনা করে তাহিরপুরের সীমান্তবর্তী এলাকায় নতুন নতুন শিল্প গড়তে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগে উৎসাহিত করা জরুরি।’

 

যাদুকাট ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি ও বাদাঘাট উ. ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘যাদুকাটা নদীতে কাজ বন্ধ থাকায় শ্রমিকরা পরিবার-পরিজন নিয়ে অভাব অনটনে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। কাজের সন্ধানে নানান দিকে ছুটাছুটি করছে এসকল নিম্নআয়ের লোকজন। এ অবস্থা চলতে থাকলে এলাকায় চুরি, ছিনতাই বেড়ে যেতে পারে। তাই জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি পরিবেশ সম্মত উপায়ে যাদুকাটা নদীতে শ্রমিকদের কর্মের ব্যবস্থা করার মাধ্যমে হাওরাঞ্চলে যেন স্বস্তি ফিরিয়ে নিয়ে আসা হয়। আর সর্বোপরি এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য পরিকল্পনা মোতাবেক স্থায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টির উপায় বের করাও এখন সময়ের দাবি।’

 

সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, ‘গত শনিবার সরেজমিনে আমি যাদুকাটা নদী এবং টেকেরঘাটে গিয়েছি এবং শ্রমিকদের সাথে কথা বলেছি। আমরা হাওরাঞ্চলে বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির নানামুখী উদ্যোগ নিচ্ছি। যাদুকাটা নদীতে বালু পাথর উত্তোলনে সরকারি নিষেধাজ্ঞা বলবত রয়েছে। তবে নদী থেকে হাত বা ঠেলা জাল দিয়ে শ্রমিকরা যে কয়লা, লাকড়ি সংগ্রহ করছে তাতে কোন নিষেধাজ্ঞা নেই কিন্তু নদীর পাড় কেটে, পরিবেশ বিপর্যয় ঘটিয়ে, ইঞ্জিন চালিত মেশিন চালিয়ে কোন কাজ করা যাবে না।’

About sylhet24express

Check Also

এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে সিদ্ধান্ত সোম-মঙ্গলবারের মধ্যে

নিউজ ডেস্ক :: আগামী সোম-মঙ্গলবারের মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষার বিষয়ে ঘোষণা দেওয়া হবে। বিষয়টি নিশ্চিত করে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *