September 30, 2020 2:26 pm
Home / Home / বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দ্রুত সমাধান প্রয়োজন
বর্জ্য

বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দ্রুত সমাধান প্রয়োজন

শানু মোস্তাফিজ : ঢাকার মনিপুরী পাড়ার একটি স্কুলের পাশেই রাস্তার ধারে কয়েক দিন ধরে বাসাবাড়ির বর্জ্য স্তুপ করে রাখা হয়েছে। সেখানে মাছি-মশার উপদ্রবও বেড়েছে। পথ চলতে স্কুলের শিক্ষার্থী এবং পথচারী সকলেই নাক চিপে নিশ্বাস বন্ধ করে রাখেন। বৃষ্টি হলে ঐ বর্জ্যরে স্তুপ থেকে বিষাক্ত পানি বের হয়ে দুর্গন্ধ ছড়ায়। এভাবে যেখানে সেখানে বর্জ্য রাখা কতটা যুক্তিসঙ্গত? স্কুল থেকে ফেরার পথে মায়ের কাছে জানতে চায় কিশোর আরাফাত। তার মা নিলুফার জামান বলেন, এটা মোটেও ঠিক নয়। কয়েক বছর আগে এ ধরনের বর্জ্যরে পাহাড় ঢাকা শহরের রাস্তাগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে থাকতো। দুর্গন্ধে ঐসব রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে খুবই কষ্ট হতো মানুষের। ইদানিং তা কমে গেলেও মাঝে মধ্যে তা চোখে পড়ে। যা আজকাল মানুষ আর সহ্য করতে পারেন না।

আজকের ডিজিটাল বাংলাদেশের রাজধানী শহরে বর্জ্যরে এরকম অব্যবস্থাপনা পরিবেশের জন্য কতটা হুমকি স্বরুপ এবং এ থেকে কি ধরণের রোগব্যাধি সৃষ্টি হতে পারে জানতে চাইলে শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইন্সটিটিউড এন্ড হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার বলেন, “গৃহস্থলী বর্জ্যগুলোতে মূলত পচনশীল খাবার বা ধূলা-ময়লা ও আবর্জনা বেশি থাকে। সেখানে প্রচুর ব্যাকটেরিয়ার জন্ম হয়। মাছি-মশাও থাকে সেখানে। এসব মাছি-মশা নানা ধরনের রোগ ছড়ায়। এসব বর্জ্য থেকে মাটি, পানি এবং বায়ু দূষণ হয়। এ ধরণের বর্জ্য থেকে পানি বা মল বাহিত রোগ যেমন টাইফয়েড, ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া, চর্মরোগ ইত্যাদি হয়ে থাকে। এলার্জিসহ, শ্বাসকষ্ট বা অ্যাজমাও হতে পারে।” তিনি আরো বলেন, “ঢাকার বাইরে বিশেষ করে গ্রামগুলোতে অনেকে যে কোনো বর্জ্য রাস্তার ধার, পুকুর বা নদী নালার আশেপাশে ফেলেন। এতেও এ ধরনের রোগ ছড়ায় এবং মাটি ও পানি দূষিত হয়ে মাছসহ পরিবেশের অন্যান্য ক্ষতি হয়ে থাকে।”

বিভিন্ন পরিসংখ্যানে জানা যায়, বাংলাদেশ পৃথিবীর অষ্টম জনবহুল রাষ্ট্র এবং দশম ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশ। এই বর্ধিত জনসংখ্যার সাথে বর্জ্যর পরিমাণও বেড়ে চলেছে। ঢাকা পৃথিবীর একটি দূষিত নগরী। এর সাথে এখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি বড়ো সমস্যা। বাংলাদেশে যে হারে বর্জ্য উৎপাদন বেড়ে চলেছে তাতে ২০২৫ সালে দৈনিক প্রায় ৪৭০৬৪ টন বর্জ্য উৎপন্ন হবে। তখন বর্জ্য উৎপাদনের হার বেড়ে বছরে মাথাপিছু ২২০ কিলোগ্রাম হবে বলে বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

যে কোনো শহরের পরিচ্ছন্নতা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করার দায়িত্ব সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার। ঢাকা শহরের বাসাবাড়ি, হোটেল-রেস্তোরা এবং রাস্তাঘাটের বর্জ্য সিটি করপোরেশন সংগ্রহ করে আমিনবাজার এবং মাতুয়াইলের ল্যান্ডফিলে রাখে। সেখানে বর্জ্যগুলো কি অবস্থায় রয়েছে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমোডর এম. মঞ্জুর হোসেন বলেন, “এ বিষয়ে আমাদের বাজেট ও লোকবল কম। আমিনবাজারে ৬২ একর জমির উপর ল্যান্ডফিলে ঢাকা উত্তরের বর্জ্য ডাম্পিং করে রাখা হয়। প্রত্যেক দিন ঢাকা উত্তর থেকেই প্রায় ৩০০০ টন বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়। এখন পর্যন্ত তা অশোধিত অবস্থায় রয়েছে। তবে ঐ বর্জ্য থেকে সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা ভাবছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি কম্পোস্ট এবং বায়োগ্যাস উৎপাদনের চিন্তাও রয়েছে সরকারের। বিষয়টি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ”

আসলে ল্যান্ডফিল কি জানতে চাইলে ‘ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট’-এর কো ফাউন্ডার ও এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর এ. এইচ মাকসুদ সিনহা বলেন, “যেখানে বর্জ্য রাখা হয় সেই জায়গাটিকে ল্যান্ডফিল বলে। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কোনো স্বাস্থ্যসন্মত ল্যান্ডফিল নেই। একটি স্বাস্থ্যসন্মত ল্যান্ডফিল হওয়ার কিছু শর্ত রয়েছে। এ ধরনের ল্যান্ডফিলে একটি লাইনার থাকবে। যা মাটির নিচে কভার দিয়ে তৈরি করতে হবে। বর্জ্যর বিষাক্ত পানি যাতে আশেপাশের মাটি ও খাবার পানির সাথে মিশে না যায় সেজন্য কভার দিয়ে লাইনার দিতে হয়। এছাড়া বর্জ্যর বিষাক্ত পানিকেও টেকনোলজির মাধ্যমে কয়েক স্তরে কট্রোল ট্রিটমেন্ট করতে হয়। যাতে দূষণ ছড়াতে না পারে। ল্যান্ডফিলের উপরেও কভারের ব্যবস্থা থাকবে। যাতে বর্জ্যর উপর কাঁক বা পাখি বসতে না পারে। বাতাসে যাতে দূষণ ছড়াতে না পারে সেজন্যও ব্যবস্থা নিতে হবে। মোটকথা খোলা জায়গায় বর্জ্য রাখা যাবে না। আমাদের ল্যান্ডফিলগুলো কোনো শর্তই পূরণ করেনি এবং কোথাও টেকনোলজির মাধ্যমে বর্জ্য শোধনও করা হয় না। কয়েক মাস আগে একমাত্র যশোরে বর্জ্যকে শোধন কার্যক্রম শুরু হয়েছে।”

আমাদের গৃহস্থলী বর্জ্যর বিষয়েও সচেতন হতে হবে। বাসাবাড়িতেও সব ধরনের বর্জ্য এক সাথে রাখা যাবে না। যেমন প্লাস্টিক, পলিথিন, ব্যাটারি, মেটাল, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ইত্যাদি আলাদাভাবে রাখতে হবে। এসব বিষয়ে প্রত্যেককে সচেতন করা প্রয়োজন। ইলেকট্রনিক বা ই-বর্জ্যর বিষয়েও কিছু নিয়ম মানতে হবে। যেমন বাতিল হয়ে যাওয়া বাল্ব, মোবাইল, চার্জার, তার, কম্পিউটারের যন্ত্রাংশ ইত্যাদি আলাদাভাবে রাখতে হবে। সবকিছু এক সাথে রাখলে বর্জ্যর শোধন

প্রক্রিয়া কার্যকর হবে না। প্লাস্টিকের জিনিসপত্র যাতে পরিবেশ বান্ধব হয় এবং ব্যবহারের পর সহজেই মাটির সাথে মিশে যায় কিংবা টেকনোলজির মাধ্যমে কীভাবে রিইউজ করা যায় তা ভাবতে হবে। এমনকি যেসব কোম্পানি এসব প্লাস্টিক জিনিস উৎপাদন করছেন তাদেরও এ বিষয়ে কিছু নিয়ম ও নীতিমালা মানতে হবে। এজন্য আইন প্রয়োজন। ‘অরগান ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট হ্যান্ডেলিং রুল ২০২০’ নামে একটি আইন এ বছরই পাস হওয়ার কথা। এটা হলে কাজ অনেক সহজ হবে। অনেক জিনিস একটি নীতিমালার মধ্যে আসবে। তখন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া কিংবা সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট মহলকে চাপ দেওয়া যাবে। সকলেই দায়বদ্ধ থাকবে। সরকারকে এসব বিষয় মনিটরিং করতে হবে।

ঢাকার আশেপাশে কিছু কলকারখানা আছে। সেখানকার বর্জ্য জমা হচ্ছে আশেপাশের নদীতে। বর্জ্যরে ভারে বুড়িগঙ্গা দূষিত। পরিবেশ বিজ্ঞান বলছে, মেডিকেল বর্জ্য আরো ভয়াবহ। প্রিজম বাংলাদেশ-২০০৫ সাল থেকে মেডিকেল বর্জ্য নিয়ে কাজ করছে। ঢাকা শহরের প্রত্যেকটি মেডিকেল থেকে তারা দিনে ১১-১২ টন বর্জ্য সংগ্রহ করে। ঢাকা মেডিকেল থেকে কোনো প্লাস্টিক বর্জ্য পাওয়া যায় না। এক শ্রেণির মানুষ এগুলো সংগ্রহ করে বাইরে বিক্রি করে দেয়। পুরান ঢাকায় এ ধরনের জিনিসিগুলো কোনো ধরনের স্বাস্থ্যবিধি না মেনে নারী ও শিশুরা তা বাছাই করার কাজ করে। কিছু জিনিস পুনরায় প্যাকিং করে তা ব্যবহার করা হয়। যা মোটেই স্বাস্থ্যসন্মত নয়।

মাতুয়াইলে ঢাকা দক্ষিণের ল্যান্ডফিলের পাশে আলাদাভাবে মেডিকেল বর্জ্যরে ল্যান্ডফিল করা হয়েছে। সেখানে বিজ্ঞানসন্মত উপায়ে মেডিকেল বর্জ্যরে কিছু জিনিস জীবানুমুক্ত করি এবং কিছু জিনিস পুড়িয়ে ফেলা হয়। মানুষের শরীরের কাটা অংশগুলো বারিয়াল পিট (মাটির গর্তে রাখি) করা হয়।”

ল্যান্ডফিলগুলো পরিবেশ বান্ধব কিনা কিংবা কলকারখানার বর্জ্যগুলো যেভাবে পরিবেশের ক্ষতি করছে এ বিষয়ে পরিবেশ অধিপপ্তরের করণীয় কি জানতে চাইলে পরিবেশ অধিপপ্তরের পরিচালক বলেন, “আমরা অধিপ্তরের পক্ষ থেকে কারখানাগুলোকে নির্দিষ্ট নিয়ম-নীতির মাধ্যমে পরিবেশ ছাড়পত্র দেই। এ বিষয়ে আমরা ‘ন্যাশনাল থ্রি আর (রিডিইউজ, রিইউজ এবং রিসাইকেল) স্ট্র্যাটেজি’-কে গুরুত্ব দিয়ে আইন তৈরির কাজ করছি। এর আগে ‘চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ বিধিমালা ২০০৮’ করেছি এবং এটা মোটামুটি মানা হচ্ছে। সম্প্রতি ‘ই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০২০’ করেছি এবং ‘কঠিণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০২০’ করেছি। এ দুটি বিধিমালা শীঘ্রই গেজেড হবে। আশাকরি এগুলো কার্যকর হতে বেশি সময় লাগবে না।” তিনি আরো বলেন, “সম্প্রতি আমরা বর্জ্য শোধনের বিষয়ে সিটি করপোরেশনের সাথে দাতাগোষ্ঠীর সহায়তায় একটি বড়ো প্রকল্প নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে কাজ করছি। আশা করছি প্রকল্পটি আমরা কার্যকর করতে পারবো। তাহলে যেমন একদিকে বর্জ্য শোধন হয়ে পরিবেশ দূষণ কমাবে তেমনি অন্যদিকে তা থেকে বিদ্যুৎ ও বায়োগ্যাস উৎপাদন সম্ভব হবে।”

আর দেরি নয়, দ্রুত এর স্থায়ী সমাধান হওয়া উচিত- এমনই দাবি সুশীল সমাজের। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব পরিবেশ নিয়ে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। তিনি তার অভিজ্ঞতার আলোকে বলেন, “এর স্থায়ী সমাধানের জন্য এখনই আমাদের ব্যবস্থা নিতে হবে। আমরা যেভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করছি তা মোটেই বিজ্ঞানসন্মত নয়। সঠিকভাবে বর্জ্য সংগ্রহ করে সেগুলোকে বাছাই করে স্বাস্থ্যসন্মতভাবে স্তুপ করে তা টেকনোলজির মাধ্যমে শোধন করতে হবে। ধরা যাক, এই করনাকালে আমরা যেসব মাস্ক, গ্লাভস ইত্যাদি ব্যবহার করছি তা কি সঠিক উপায়ে সংগ্রহ এবং শোধন করা হচ্ছে? অবশ্যই না। তাহলে বোঝা যাচ্ছে, আমরা একটা সমস্যা থেকে আরেকটা সমস্যায় ঢুকে যাচ্ছি। আমিনবাজার কিংবা মাতুয়াইলে যেভাবে বর্জ্য স্তুপ করে রাখা হয়েছে তাতে আশেপাশের মাটি, পানি, জলজ জীবন, স্থানীয় বাসিন্দা এবং পরিবেশ দারুণভাবে দূষিত হচ্ছে। এখানে সিটি করপোরেশনের দুর্বলতা রয়েছে। বিষয়গুলো আমাদের জানা না থাকলে উন্নত বিশ্বের কাছ থেকে তা শিখতে পারি।”

তিনি আরো বলেন, “এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের একটা দায়িত্ব আছে। প্রত্যেক সেক্টর ভাগ করে কাজ করতে পারে। এক্ষেত্রে বাজেট বাড়াতে হবে। সর্বোপরি এ বিষয়ে ভালো আইন থাকা প্রয়োজন। আইন হলে কাজ সহজ হবে।

পিআইডি নিবন্ধ

About sylhet24express

Check Also

বাবরি মসজিদ ভাঙার মামলার সব আসামি খালাস

নিউজ ডেস্ক ::২৮ বছর আগে ১৯৯২ সালে ভারতের উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যায় অবস্থিত বাবরি মসজিদে হামলা চালিয়ে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *