September 25, 2020 12:52 am
Breaking News
Home / মুক্তমত / নারী ও শিশু সংক্রান্ত সেবা
তাম্মানা

নারী ও শিশু সংক্রান্ত সেবা

ফাতিমা নাছরিন : বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই রয়েছে নারী নির্যাতনের ঘটনা। আমরা যাদি একটু সচেতন হই এবং আমাদের সমাজিক যেসব দায়িত্ববোধ আছে তা যদি আমরা সবাই পালন করি এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনকে যদি কঠোরভাবে প্রয়োগ করি, তাহলেই আমরা এই সমাজ থেকে নারী ও শিশু নির্যাতন দূর করতে সক্ষম হব।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনাল :

অনেক দেশের মতো আমাদের দেশেও বেড়েছে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা। বেড়েছে যৌন হয়রানি, ধর্ষণসহ, অপহরণের ঘটনা। এগুলোর মধ্য কিছু ঘটনা প্রকাশিত হলেও তা আবার বেশিরভাগ লোকলজ্জার ভয়ে তা আবার ধামাচাপা পরে যায়। এইসব ঘটনার জন্য নির্যাতিতদের আইনি সুবিধা দেবার জন্য ২০০০ সালে সরকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন তৈরী করেন। সে আইনকে আবার ২০০৩ সালে সংশোধন করে আরো কঠর করা হয়।আইনের সহায়তা চাইলে বিচারপ্রাথীদের কোথায় যেতে হবে, কার কাছে যেতে হবে এব্যাপারে কিছুই জানেন না। তাই কিভাবে আইনের সহায়তা পাবেন তা আলোচনা করা হলঃ

যেসব অপরাধ নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের অন্তর্ভুক্ত :

বাংলাদেশ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ অনুযায়ী যেসব অপরাধ এই আইনের অন্তর্ভুক্ত তা হল- দহনকারী বা ক্ষয়কারী, নারী পাচার, শিশু পাচার, নারী ও শিশু অপহরণ, ধর্ষণ ও ধর্ষণের কারনে মৃত্যু, মুক্তিপন আদায়, নারীর আত্মহত্যায় প্ররোচনা করা, যৌন নিপীড়ন ইত্যাদি।

থানায় মামলা দায়ের :

উল্লিখিত যেকোন ঘটনায় শিকার হলে আপনার এড়িয়ায় থানায় গিয়ে বিষয়টি জানান। বিষয়টি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এজাহার হিসাবে গণ্য করলে তিনি ঘটনাটি প্রাথমিক তথ্য বিবরণী ফরমে লিপিবদ্ধ করবেন। পরে বিষয়টি আদালতে প্রেরন করবেন। আদালত বিষয়টি গ্রহন করলে তা প্রতিবেদনের জন্য একটি দিন ধার্য করবেন এবং পরবর্তী সময় মামলাটি পুলিশ প্রতিবেদন প্রাপ্তি সাপেেক্ষ উপযুক্ত আদালত অর্থাৎ নারী ও শিশু নির্যাতন অপরাধ দমন ট্রাইবুনালে মামলাটি পাঠাবেন। এভাবেই মামলাটির কাযক্রম চলতে থাকবে।

আদালতে মামলা কীভাবে চলবে :

কোন কারণে থানার ভারপ্রাপ্ত ওসি যদি অভিযোগটি গ্রহন না করে তাহলে থানার কারন উল্লেখ করে একটি আবেদনপত্র সাথে নিয়ে সরাসরি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করা যাবে। এ েক্ষত্রে আবেদনকারী ব্যাক্তি প্রথমে নারী ও শিশু পাবলিক প্রসিকিউটরের কাছে প্রতয়ন ও সত্যায়িত করে মামলা করতে পারবে। এভাবে মামলাটি তার পরবর্তী কাযক্রম চলতে থাকবে।

সরকারী আইনজীবী :

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় বাদী নিজের কোন আইনজীবি নিয়োগের প্রোয়োজন নেই। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯২ ধারা অনুযায়ী তিনি সরকারের পক্ষ থেকে একজন আইনজীবী পাবেন। তিনি মামলাটি পরিচালনা করবেন। তারপরেও যদি বাদী চান তাহলে তিনি তখন তারজন্য একজন আইনজীবী নিয়োগ করতে পারবেন, সেই আইনজীবী সরকারী আইনজিবিকে মামলা পরিচালনার জন্য সহায়তা করবেন। সরকারি আইনজীবিকে মামলা পরিচালনার জন্য কোন রকম খরচ দিতে হবে না।

বিচার প্রকিয়া :

দেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল রয়েছে অথবা এখতিয়ার সম্পন্ন বিচারক থাকে যার মাধ্যমে নারী ও শিশু নির্যাতন দমনের কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। কোন ব্যাক্তির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বা স্বীয় বিবেচনায় উপযুক্ত মনে করলে বিচারক শুধু মামলার দুই পক্ষকে এবং তাদের নিয়োজিত আইনজীবীদের নিয়ে বিচার পরিচালনা করতে পারেন। আর যদি তা না হয় তবে যে নরমাল বিধান আছে সেই মোতাবেক বিচার চলবে।

বিচার মেয়াদ :

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন স্ংশোধিত আইন ২০০৩ আনুযায়ী ট্রাইব্যুনাল ১৮০ দিনের মধ্যে বিচারকাজ শেষ করবেন। ট্রাইব্যুনাল যদি ১৮০ দিনের মধ্যে মামলা শেষ করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তার নির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করে একটি প্রতিবেদন ৩০ দিনের মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট বরাবর দাখিল করবেন। যার একটি কপি সরকারকেও দিতে হবে। এ ছাড়া এখানে পাবলিক প্রসিকিউটর ও অন্যান্য পুলিশ কর্মকর্তা ৩০ দিনের মধ্যে সরকারের নিকট কারণ উল্লেখ করে একটি প্রতিবাদন দাখিল করবেন। এ রকম দাখিলকৃত প্রতিবাদনগুলো যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বিবেচিত হবার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ার জন্য দায়ী ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের পদক্ষেপ নিতে হবে ।

নিরাপত্তামূলক হেফাযত :

এই আইনের অধিনে বিচারকার্য চলার সময় যদি বিচারক মনে করেন কোন নারী বা শিশুকে নিরাপদ রাখার প্রয়োজন তাহলে বিচারক নারী ও শিশু কারাগারের বাহিরেও সরকার কর্তৃক নির্ধারিত স্থানে বা যথাযথ অন্য কন ব্যক্তি বা সংস্থার রাখার জন্য নির্দেশ দিতে পারেন। তবে এক্ষেত্রে নির্যাতিত নারী আও শিশুর মতামত গ্রহন করবেন।

কিভাবে তদন্ত হবে :

অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি পুলিশের হাতে ধরা পরে তবে আটক হবার ১৫ দিনের মধ্যে পুলিশ কর্মকর্তা তার তদন্ত শেষ করে রিপোর্ট দিবেন। আর যদি অভিযুক্ত ব্যক্তি ধরা না পরে তবে তদন্ত নির্দেশ পাবার ৩০ দিনের মধ্যে তার তদন্ত শেষ কিরে রিপোর্ট দিভেন। যাদি কোন কারনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্তের রিপোর্ট দিতে দেরি হয় তবে তার কারন ব্যাখা করে ট্রাইব্যুনালকে জানাতে হবে। ট্রাইব্যুনাল যদি মনে করেন তাহলে তার ইচ্ছামত কর্মকর্তার উপর তদন্ত করার দায়িত্ত দিতে পারেন। তবে এই তদন্ত শেষ করতে হবে আদেশ পাবার ৭ দিনের মধ্যে।

জামিন হবে কি হবে না :

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনটি একটি বিশেষ আইন, যার কারনে এক্ষেত্রে আগামজামিন এর জন্য কোন এখতিয়ার দেওয়া দেওয়া হয় নাই। বিশেষ আইনে জামিনের ক্ষেত্রে সাধারণ ফৌজদারি কার্যবিধির বিধানগুলো প্রযোজ্য হবে না। তবে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ১৯(২)(৩) ও (৪) উপধারায় জমিনের বিশেষ ট্রাইব্যুনালের কথা বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির কোন বিধান ১৯ ধারায় প্রযোজ্য হয় নাই। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আদালত যদি মনে করেন আসামী যদি একটি নির্ধারিত সময় পর্যন্ত কারাবাসে থাকেন তাহলে জামিন পাবেন এবং সামাজিক বাস্তবতার বিষয় চিন্তা করেও আদালত জামিন দিয়ে থাকেন।

এই আইনে কি শাস্তির বিধান রয়েছে :

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত আইন ২০০৩) অনুযায়ী যদি এসব অপরাধ প্রমাণিত হয়ে থাকে তবে অপরাধীর সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ড থেকে মৃত্যুদণ্ড হতে পারে সাথে অর্থদণ্ড ও হতে পারে।

প্রতিকার ও প্রতিরোধ কার্যক্রম :

কখনো কখনো বাদী মামলা করতে পারেন না অথবা নানাকারনে যদি হুমকি বা হয়রানির শিকার হন, তাহলে সরকার থেকে আইনি সহায়তা করা হয়ে থাকে।সে ক্ষেত্রে প্রতিটি জেলায় রয়েছে লিগ্যাল এইড অফিস। তাছাড়া রয়েছে কিছু মানবধিকার সংগঠন, বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতি, আইন ও সালিস কেন্দ্র, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড নামে আরো অনেক সংস্থা, যারা সবসময় সমাজে নির্যাতিত নারী ও শিশুদের সহায়তা করে থাকেন।
নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে আমাদের প্রথমে সচেতন হতে হবে এবং কিছু কার্যক্রমে

পদক্ষেপ নিতে হবে। যথা :

• নারী ও শিশু পাচার সংক্রান্ত তথ্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রাণালে প্রেরণ;
• নারী ও শিশু নির্যাতন দমন সংক্রান্ত আইন ও বিধি প্রণয়ন সংক্রান্ত কার্যক্রম;
• নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ সংক্রান্ত অভিযোগ/তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থা গ্রহন;
• দুঃস্থ মহিলা ও শিশু সহায়তা তহবিল, নির্যাতিত দঃস্থ মহিলা ও শিশু কল্যাণ তহবিল হতে অনুদান সংক্রান্ত কার্যক্রম;
• অন্যান্য মন্ত্রণালয় থেকে নারী উন্নয়ন নীতিমালার প্রয়োগে মতামত ও তার তথ্যাদি রাখা;
• Child Marriage Action Plan প্রণায়ন ও বাস্তবায়ন কার্যক্রম;
• South Asia Initiative to End Violence Against Children( SAIEVAC) সংক্রান্ত কার্যক্রম কাজ;
• ডিএনএ ল্যাবরেটরী ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর সংক্রান্ত কাজ

 

লেখক,

ফাতিমা নাছরিন
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।
fatimanasrin191@gmail.com

 

About sylhet24express

Check Also

আজমিরীগঞ্জে বিয়ের প্রলোভনে কিশোরীকে ধর্ষণ, যুবক আটক

নিউজ ডেস্ক ::হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে সুজন আহমেদ (২১) নামে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *