September 29, 2020 3:41 pm
Breaking News
Home / সমগ্র বাংলাদেশ / তালিকাভুক্ত প্রতারক এত ক্ষমতাবান!
প্রতারণার জগতে মো. সাহেদ

তালিকাভুক্ত প্রতারক এত ক্ষমতাবান!

সিলেট টুয়েন্টিফোর এক্সপ্রেস ডেস্ক : প্রতারণার জগতে মো. সাহেদ এক পুরোনো নাম। নানা সময় নানাভাবে প্রতারণার ফাঁদে তিনি মানুষকে ফেলেছিলেন। জেলও খেটেছেন। শুধু লোকমুখের স্বীকৃতি নয়, রাষ্ট্রীয় সংস্থার তকমাভুক্ত প্রতারক সাহেদ। ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব নায়েব আলী স্বাক্ষরিত একটি চিঠি তৎকালীন পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে পাঠানো হয়। সেখানে বলা হয়, জনৈক ‘মোহাম্মদ সাহেদ’ কখনও নিজেকে সেনাবাহিনীর মেজর, কখনও লে. কর্নেল আবার মাঝে মাঝে ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের সাবেক ছাত্র এবং ১৪তম বিএমএ লং কোর্সের অফিসার হিসেবে পরিচয় দিয়ে নানা অপকর্ম করছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি একজন ভয়ংকর প্রকৃতির লোক। প্রতারণার দায়ে তার বিরুদ্ধে ৪২০ ধারায় ঢাকার বিভিন্ন থানায় ৩১টিসহ মোট ৩২ মামলা রয়েছে। চিঠিতে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়।

তবে ব্যবস্থা নেওয়া তো দূরের কথা, বরং পুলিশ প্রশাসনসহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের ‘আপনজন’ হয়ে ওঠেন সাহেদ। প্রতিদিন ভিআইপি মর্যাদায় বড় অফিসারদের কক্ষে বসে আড্ডা মারতেন। পরে তাদের মাধ্যমে তদবির বাণিজ্যও করতেন সাহেদ। ঢাকার বাইরে গেলে অনেক সময়ই গাড়ির সামনে-পেছনে পুলিশ প্রটোকল নিয়ে যাতায়াত করতেন। অনেকের চোখে তিনি ছিলেন মস্ত বড় ‘প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব’। প্রভাবশালীদের সঙ্গে চলাফেরা আর ছবি তুলে তা ফেসবুকে শেয়ার করে নিজেকে ধীরে ধীরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত প্রতারক থেকে ক্ষমতাবান ব্যক্তিত্বে পরিণত হন রিজেন্ট হাসপাতালের কর্ণধার সাহেদ। তিনি প্রভাবশালীদের নাকের ডগায় চলাফেরা করতেন বীরদর্পে। মাথায় ৩২ মামলা নিয়েও নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়াতেন বহুরূপী এই প্রতারক।

‘লজ্জিত’ স্ত্রী যা বললেন : রাজধানীর বনানী ডিওএইচএসের ৪ নম্বর রোডের ৯ নম্বর বাসার নিচতলায় স্ত্রী সাদিয়া আরাবি রিম্মি ও দুই সন্তান নিয়ে বসবাস করেন প্রতারক সাহেদ। ৩ হাজার ৬০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাটের মাসিক ভাড়া ৯০ হাজার টাকা। গতকাল স্বামীর কর্মকাণ্ড ও বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সমকালের সঙ্গে কথা বলেন সাদিয়া। তিনি জানান, সর্বশেষ ৪ দিন আগে তার স্বামী ফোন করে বলেন যে, তিনি একটি জায়গায় রয়েছেন। ভালো আছেন। পরিবারের সদস্যদের সাবধানে থাকতে বলেন তিনি। এরপর আর কথা হয়নি। পেশায় ফিজিওথেরাপিস্ট সাদিয়া বলেন, অনেক দিন ধরেই তার কিছু কর্মকাণ্ড নিয়ে পরিবারের লোকজন নাখোশ ছিল। এ নিয়ে ২০০৮ সালের দিকে ঝামেলা হয়। এরপর ২ বছর বাপের বাড়ি ছিলেন সাদিয়া। ২০১০ সালে আবার স্বামীর সংসারে ফেরেন।

সাদিয়া আরও বলেন, পরিবারের সবার বিশ্বাস ছিল সাহেদ বদলে গেছে। সর্বশেষ ৩-৪ বছর ধরে বাইরে থেকে দেখে সবাই সেটাই ধারণা করেন। তবে রিজেন্টে চিকিৎসার নামে যা সামনে এলো তাতে স্পষ্ট সে বদলায়নি। শত চেষ্টা করেও তাকে বদলানো গেল না। স্বামীর এমন অপকর্মের জন্য ‘লজ্জিত ও দুঃখিত’ বলে জানান সাদিয়া। তিনি বলেন, করোনার চিকিৎসার নামে সাহেদ যা করেছে তা পীড়াদায়ক। আইন অনুযায়ী তার বিচার হবে। এসব প্রতারণা তার নেশায় পরিণত হয়ে গেছে।

সাদিয়া আরও বলেন, বাইরের বিষয় সাহেদ বাসায় আলাপ করত না। তার বিশ্বস্ত কর্মচারীদের এ ব্যাপারে ট্রেনিং দেওয়া ছিল। সাহেদের যেসব প্রতিষ্ঠান ছিল তার উদ্বোধনে হয়তো কখনও কখনও গিয়েছি। রিজেন্টে আমার কোনো পদ নেই। তবে সবাই সবসময় মুখে মুখে ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিত।

সাদিয়া স্বীকার করেন যে, সুবিধা নেওয়ার জন্যই হয়তো নানা সময় নানা পরিচয় দিত তার স্বামী। মানুষকে দ্রুত প্রভাবিত করতে পারত তার স্বামী। মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ, রিজেন্ট হাসপাতাল, সেন্ট্রাল স্কুলসহ তার স্বামীর বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

সাদিয়া আরও বলেন, তিনি তাকে বদলে ‘বদলে যাও’। যে জায়গায় এসেছ এটা ধরে রাখ। শেষ পর্যন্ত তার অপকর্ম আবার সামনে আসায় পরিবারের সবাই অপ্রস্তুত। সাহেদের বাবা ঢাকার একটি হাসপাতালে অনেক দিন ধরেই আইসিইউতে রয়েছে। সেখানে দু’জন কর্মচারী ছিল। রিজেন্টের ঘটনা সামনে আসার পর ভয়ে তারা পালিয়েছে। এখন আইসিইউতে একাই রয়েছেন তিনি। ভালো পরিবারের ছেলে হলেও বিপথগামী ছিল তার স্বামী।

সিনেমা স্টাইলে নেন বাসা ভাড়া : বনানীর যে বাসায় প্রতারক সাহেদ ভাড়া থাকেন সেই বাসাটির মালিক একজন প্রবাসী চিকিৎসক। বাড়িটির ভাড়া তোলাসহ বাসার সার্বিক বিষয় দেখভাল করেন বাড়ির মালিকের বোন লিনিয়া দেওয়ান। লিনিয়া গতকাল সমকালকে বলেন, দুই বছর আগে বাসা ভাড়া নিতে আসে সাহেদ। তার সঙ্গে অনেক অস্ত্রধারী দেহরক্ষী ছিল। এ অবস্থা দেখে তাকে বাসা ভাড়া না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। যাতে তাকে ভাড়া দেওয়া না লাগে তাই তার কাছে তিন মাসের অগ্রিম ভাড়া চান লিনিয়া। এরপর সাহেদ যা করেছেন তাতে বিস্মিত হন লিনিয়া। সাহেদ লিনিয়াকে বলতে থাকেন- ‘জানেন আমি কে? এভাবে উঁচু গলায় কখনও কথা বলবেন না।’ এরপর একজনকে হাতে ইশারা করেন তিনি। ইশারার পর একটি ব্রিফকেস বাসায় নিয়ে ঢোকেন ওই ব্যক্তি। ব্রিফকেস খুলেই তিন মাসের ভাড়ার টাকা অগ্রিম দেন সাহেদ। ওই ব্রিফকেসে আরও অনেক টাকা ছিল। এমন দৃশ্য দেখে লিনিয়া ভাবেন, এসব টাকা নকল। তখন তিনি সাহেদকে বলেন, বাসার ম্যানেজার ব্যাংকে গিয়ে নিশ্চিত হবে টাকা আসল কিনা। সে অনুযায়ী ব্যাংকে গিয়ে নিশ্চিত হওয়া যায় টাকা সত্যি আসল। এভাবেই দু’বছর আগে বাসা ভাড়া নেন সাহেদ। তিনি আরও বলেন, ভাড়াটিয়া হিসেবে এরপর আর তার সঙ্গে খুব একটা কথা হতো না। সেও ঝামেলা করেনি। বাড়ির আশপাশের কারও সঙ্গে খুব একটা মিশত না সাহেদ। ডিওএইচএসের কোনো অনুষ্ঠানে যেত না। আশপাশের কেউ তার প্রতারণা সম্পর্কে কিছু জানতেন না। খবরের কাগজ আর টিভিতে দেখে বাড়ির ভাড়াটিয়ার এত ‘গুণ’ সম্পর্কে জানতে পারেন লিনিয়া।

তিনি এও জানান, প্রথমে তার সঙ্গে এক বছরের চুক্তি ছিল। পরে সন্তান ছোট জানিয়ে ভাড়ার মেয়াদ আরও ৬ মাস বাড়িয়ে নেন। এরপর কয়েকবার তাকে বাসা ছাড়ার নোটিশ দেওয়া হলেও আমলে নিত না সাহেদ।

তটস্থ থাকতেন পুলিশ কর্মকর্তারাও : সাহেদ সম্পর্কে একটি অদ্ভুত ঘটনা জানালেন এক পুলিশ কর্মকর্তা। বছর পাঁচেক আগে সাহেদ ধানমন্ডির ২৭ নম্বর এলাকায় একটি গাড়ি থেকে নামেন। রাস্তার মধ্যে গাড়ি পার্কিং করে ফল কিনছিলেন। রাস্তায় গাড়ি দেখে ট্রাফিক সার্জেন্ট দৌড়ে গিয়ে তা সরাতে বলেন। এটা বলার পরপরই অশ্রাব্য ভাষায় ট্রাফিক পুলিশের সদস্যকে গালমন্দ করেন তিনি। পাশের সিভিল ড্রেসে ফল কিনছিলেন ওই পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি দেখেন গালমন্দ শুনেও ট্রাফিকের ওই সদস্য সরে পড়েন। পরে ওই কর্মকর্তা ট্রাফিক পুলিশ সদস্যকে ডেকে এনে প্রতিবাদ করতে বলেন। পরে ওই পুলিশ সদস্য সাহেদকে গালমন্দ করার কারণ জিজ্ঞেস করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি পুলিশ সদস্যদের গায়ে হাত তোলেন। এর প্রতিবাদে পুলিশ সদস্যরা তাকে বেদম প্রহার করে। পরে অনেক পুলিশ কর্মকর্তা সাহেদের পক্ষ নিয়ে ওই পুলিশ সদস্যদের শাসিয়েছেন। কেউ কেউ চাকরি খেয়ে ফেলার হুমকিও দেন।

পুলিশসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দপ্তরে সাহেদের অবাধ যাতায়াত দেখে কেউ কেউ তাকে ম্যানেজ করেই পদোন্নতি ও পদায়নের চেষ্টা করতেন। সাহেদের অল্প সময়ে টাকা আয়ের একটি অন্যতম পথ ছিল তদবির বাণিজ্য।

পুলিশের আরেক কর্মকর্তা জানান, কয়েক মাস আগে মানি লন্ডারিং মামলার এক আসামিকে বাঁচাতে তদবির করেছিলেন সাহেদ। তবে তার সেই তদবির রক্ষা করা হয়নি। পরে তাকে একজন বড় কর্মকর্তার রুমে যাতায়াত করতে দেখেন তিনি। এরপর তদবির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা পুলিশ কর্মকর্তা কিছুটা ভয় পান। তার শঙ্কা ছিল, সাহেদ ওই কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে তার কোনো ক্ষতি করতে পারেন।

চলতেন প্রটোকল নিয়ে : একটি ভিডিওতে দেখা যায় ২০১৭ সালে রাঙামাটির সাজেক ভ্রমণের সময় সাহেদকে বহনকারী পতাকাবাহী গাড়ির সামনে-পেছনে পুলিশের প্রটোকল গাড়ি। ঢাকার বাইরে গেলে যেভাবে পুলিশ ভিআইপিকে প্রটোকল দেয়, সেভাবেই তাকেও দেওয়া হয়। সাইরেন বাজিয়ে চলছিল তার গাড়ি। ওয়াকিটকিতেও কথা বলছিলেন সাহেদ। গন্তব্যে পৌঁছার পর প্রটোকলে থাকা সদস্যদের সঙ্গে ছবিও তোলেন তিনি। ডিওএইচএসের বাসার গ্যারেজে আরেকটি গাড়ি রয়েছে সাহেদের। সেই গাড়িতে ছিল ফ্ল্যাগ স্ট্যান্ড ও ভিআইপি প্রটোকলের লোগো।

সূত্র, সমকাল

About sylhet24express

Check Also

রাজশাহীতে লাশের পেটে মিললো ৩১ প্যাকেট ইয়াবা

নিউজ ডেস্ক ::রাজশাহীতে মৃত আবদুস শুকুরের পেটে ৩১ প্যাকেট ইয়াবা পাওয়া গেছে। সোমবার দুপুরে ম্যাজিস্ট্রেটের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *