January 18, 2021 3:35 am
Breaking News
Home / Home / জ্যেষ্ঠতা ভেঙে স্ত্রীকে পদোন্নতি দিলেন বিমান এমডি

জ্যেষ্ঠতা ভেঙে স্ত্রীকে পদোন্নতি দিলেন বিমান এমডি

অনলাইন ডেস্ক : টানাটানির মধ্যে চলছে বিমান। মহামারীতে টিকে থাকতে নানা চেষ্টা করা হচ্ছে। কারও বেতন কমানো হয়েছে। কাঁচি চালানো হয়েছে কর্মীদের ভাতায়। ‘শুভ দিনের’ অপেক্ষায় একটু সবুর করার অনুরোধ করা হচ্ছে পাওনাদারদের। টিকে থাকতে সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কূলে তরী ভেড়ার শেষ ঝড়টি সামলাতে পারলেন না বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মো. মোকাব্বির হোসেন। সচিব পদে পদোন্নতি পেয়ে বিমান ছাড়ার আগে প্রাক্তন স্ত্রীকেসহ ৩০ জনকে পদোন্নতি দিয়েছেন। এ পদোন্নতিতে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের অভিযোগ করেছেন পদোন্নতিবঞ্চিতরা। গত ৪ জানুয়ারি বিমানের অ্যাপয়েন্টমেন্ট প্রমোশন পোস্টিং (এপিপি) শাখা ৩০ জন সহকারী ব্যবস্থাপক বাণিজ্যিককে উপব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতির আদেশ জারি করে। এর আগে জ্যেষ্ঠতার তালিকা তৈরিসহ আনুষঙ্গিক কাজ হয়। সংশ্লিষ্টদের ১৫ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। মৌখিক পরীক্ষার বোর্ডে বিমানের এমডি উপস্থিত ছিলেন। জ্যেষ্ঠতার তালিকায় মোট ৬৬ জন ছিলেন। তাদের মধ্যে ৩০ জনকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। জ্যেষ্ঠতার তালিকায় প্রথম ছিলেন এসএম কবীর হোসেন। তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। দ্বিতীয় গোলাম সারোয়ারকেও পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। পদোন্নতিপ্রাপ্ত ৩০ জনের মধ্যে সর্বশেষ নামটি হচ্ছে কামরুন্নাহারের। জ্যেষ্ঠতার তালিকায় তার নাম ছিল ৬৫তম। কামরুন্নাহার মোকাব্বিরের প্রাক্তন স্ত্রী। তাদের দুজনের একটি মেয়েও রয়েছে। জ্যেষ্ঠতার তালিকার প্রথম ও দ্বিতীয় কর্মী ছাড়া আরও যাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়নি তারা হলেন তালিকার ষষ্ঠ নম্বরে থাকা এএফএম আনিসুর রহমান, অষ্টম লুৎফর রহমান, ১২তম মুস্তফা ই কামাল, ১৪তম মো. আবদুর রহমান, ১৫তম রবিউল ইসলাম, ১৯তম মো. মোস্তাফিজুর রহমান, ২০তম মনোয়ারুল ইসলাম, ২২তম মো. শফিকুল ইসলাম, ২৩তম আর এন চক্রবর্তী, ২৫তম মো. হাবিবুর রহমান চৌধুরী, ২৬তম হুর ই জান্নাত, ২৭তম সঞ্জয় কুমার কুন্ডু, ৩২তম শহীদুল ইসলাম, ৩৩তম নাজমুস সাদাত, ৩৪তম তোফায়েল আহমদ, ৩৭তম মো. আনোয়ার হোসাইন সরদার, ৩৯তম মো. আবদুল জব্বার, ৪০তম হাফিজ আহমেদ, ৪২তম নূর নবি পাটোয়ারী, ৪৫তম আবদুল মজিদ, ৪৬তম সমীর চন্দ্র শীল, ৪৭তম সৈয়দ নাঈম আলী, ৪৮তম জাহিদুল ইসলাম বিশ্বাস, ৪৯তম গোলাম রহমান, ৫০তম দীপক কুমার মন্ডল, ৫২তম সুব্রত কুমার, ৫৩তম মো. আসাদুজ্জামান গাজী, ৫৪তম সোলাইমান, ৫৫তম সামসুল আলম, ৫৭তম মো. মনসুর আহমেদ ভূঁইয়া, ৬১তম জায়েদ তারিক খান, ৬২তম এম এনামুল আমীন, ৬৩তম মো. মাহফুজুল করীম সিদ্দকী এবং ৬৬তম আখতার হোসেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পদোন্নতি না পাওয়া কয়েকজন কর্মকর্তা  বলেন, পদোন্নতির নামে খামখেয়ালি করা হয়েছে। জ্যেষ্ঠতা চরমভাবে লঙ্ঘন করা হয়েছে। পোস্ট ফাঁকা থাকার পরও তাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। বেশিরভাগ পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে মুখ দেখে। তাদের কোন ক্রাইটেরিয়ায় পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে তা তারা বুঝতে পারছেন না। এ পদোন্নতি হয়েছে গ্রুপ সিক্স থেকে গ্রুপ সেভেনে। কিছু কর্মকর্তা দুই আড়াই বছর গ্রুপ সিক্সে থেকে পদোন্নতি পেয়েছেন। অথচ এক যুগ ধরে গ্রুপ সিক্সে থেকেও পদোন্নতি মেলেনি। জ্যেষ্ঠতার তালিকায় থাকা ৬৬ জনকেই ভাইভায় ডাকা হয়েছে। যারা কাছাকাছি যোগ্যতাসম্পন্ন তারাই ভাইভায় ডাক পেয়েছেন। তালিকার ১, ২, ৬ নম্বর সিরিয়ালের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। দেওয়া হয়েছে ৬৫ নম্বরকে। এতটা অস্বাভাবিক হয় কী করে। পদোন্নতিবঞ্চিতদের অনেকেই ১৯৮৮ সালে যোগ দিয়ে একই পে গ্রুপে ১২ থেকে ১৩ বছর ধরে চাকরি করছেন। আর ১৯৯৮ সালে যোগ দিয়ে ১০ বছরের জুনিয়ররা পদোন্নতি পেয়েছেন। একজন সহকারী ব্যবস্থাপক বলেন, ‘এখন জুনিয়রদের অধীনে আমরা কী করে কাজ করব। যারা সবসময় আমাদের স্যার বলেছে তাদের কী করে আমরা স্যার সম্বোধন করি। কী কারণে আমাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়নি তাও জানানো হয়নি। পদোন্নতির জন্য ১০০ নম্বরের ক্রাইটেরিয়া ঠিক করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ নম্বর রয়েছে ভাইভায়। এ ভাইভার নম্বর দিয়েই আমাদের বঞ্চিত করা হয়েছে। এ পদোন্নতির সর্বময় ক্ষমতা এমডির হাতে। তার যাকে ভালো লেগেছে তাকে পদোন্নতি দিয়েছেন। আমাদের তো কিছু বলার নেই। আমরা ২৫ থেকে ৩০ বছর ধরে বিমানে চাকরি করি। বাণিজ্যিক শাখায় এমন কোনো বিষয় নেই যা আমরা জানি না বা বুঝি না। তারপরও আমাদের আনফিট করে দিল। রহমান, রবিন এরা তো খুবই দক্ষ কর্মী। এরা বিমানের অ্যাসেট। তাদের বঞ্চিত করা হয়েছে। ইন্টারভিউ বোর্ড তাদের মনের মতো লোকদের পদোন্নতি দিয়ে দিয়েছে। আমাদের অনেক মানুষের সামনে এনে জুতাপেটা করা হয়েছে। এখানে আর চাকরি করা সম্ভব নয়। অনেকেই আর্লি রিটায়ারমেন্টে চলে যাবেন। এ পদোন্নতি বঞ্চনার কারণে আমরা সামাজিকভাবে হেয় হয়েছি। আত্মীয়স্বজনের সামনে ছোট করা হয়েছে। ’ পদোন্নতি বঞ্চনার বিষয়টি জানার জন্য বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সদর দপ্তর বলাকায় গেলে করোনাভাইরাসের কারণে সেখানে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার কথা জানানো হয়। বিমানের এমডি ও সিইও মো. মোকাব্বির হোসেনকে ফোন করা হলে তিনি সাড়া দেননি। একপর্যায়ে তার ফোনে মেসেজ পাঠানো হলেও তিনি উত্তর দেননি। এমডির কাছে পাঠানো মেসেজে জানতে চাওয়া হয়েছিল, ‘বিমানের ৩০ জন সহকারী ব্যবস্থাপককে (বাণিজ্যিক) উপব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। আর্থিক সংকটে থাকা বিমানে এ পদোন্নতির কারণ কী। গত ৪ জানুয়ারি দেওয়া এ পদোন্নতির আদেশে ৩০ নম্বরে রয়েছেন কামরুন্নাহার (পি ৩৪৮১৮)। তিনি কি আপনার প্রাক্তন স্ত্রী? অভিযোগ উঠেছে পি ৩৪৮১৮-এর জন্যই এ পদোন্নতি। বিষয়টি জানতে ফোন করেছিলাম। ’ ২০১৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর অতিরিক্ত সচিব মো. মোকাব্বির হোসেনকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। এর আগে মোকাব্বির হোসেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত সচিব ছিলেন। এ সময় তিনি বিমানের বিষয়গুলো দেখতেন। মন্ত্রণালয় থাকতেই তার কিছু সিদ্ধান্তে বিমান লাভের ধারায় ফিরে আসে। বিশেষ করে বিমানের লন্ডন শাখার দুর্নীতি উদঘাটন, পাইলটসহ কিছু নিয়োগে অনিয়ম, ফ্লাইট ফাঁকা কিন্তু টিকিট না থাকার মতো কিছু বিষয়ে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তিনি। এ কারণেই পরিচালনা পর্ষদ তাকে সিইও বা এমডি নিয়োগের সুপারিশ করে। তিনি বিমানে যোগদান করার পরও তার সেই কাজের ধারা অব্যাহত রাখেন। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা বাদ দিয়ে তার নেতৃত্বে কিছু সংস্কার করার পর বিমান ঘুরে দাঁড়ায় এবং লাভের মুখ দেখে। কিন্তু করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে সারাবিশ্বের এভিয়েশন সেক্টরের মতো বিমানও মুখ থুবড়ে পড়ে। আর্থিক মন্দা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই বিমান থেকে চলে যাচ্ছেন এমডি। গত ২৪ ডিসেম্বর সরকার তাকে সচিব পদে পদোন্নতি দেয়। তাকে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে নিয়োগও দেওয়া হয়। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পদোন্নতির তালিকা থেকে তার নাম বাদ পড়ে। বর্তমানে বিমান চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে। আয় নেই, ব্যয় আছে ঠিকই। গত জুলাই থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ক্যাপাসিটি লস হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার কারণে এখনো বিমানের অত্যাধুনিক এয়ারক্রাফটগুলো ডানা মেলতে পারছে না। সরকারের কাছ থেকে যে ঋণ নেওয়া হয়েছে তাও শেষের পথে। টিকে থাকতে বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনভাতা কর্তন করা হয়েছে। যাতায়াতব্যবস্থা থেকে কিছু গাড়ি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অসন্তোষ দিন দিন বাড়ছে। বিমানের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল বিমানের আর্থিক সংকট কেমন। জবাবে তিনি জানিয়েছেন, প্রতি মাসেই বিমানে সব পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক, উপমহাব্যবস্থাপক, ব্যবস্থাপক, কান্ট্রি ম্যানেজার, জেলা ব্যবস্থাপক ও স্টেশন ব্যবস্থাপকদের নিয়ে বৈঠক হয়। সিইওর নেতৃত্বে সেই সভায় সব বিষয় পর্যালোচনা করা হয়। গত ৯ ডিসেম্বর এ ধরনের সবশেষ বৈঠক হয়। সেখানে বিমানের এমডি ও সিইও মো. মোকাব্বির হোসেন যে বক্তব্য রেখেছিলেন তাতেই বিমানের সার্বিক চিত্র ফুটে উঠেছে। বৈঠকে তিনি বলেছেন, ‘সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ হিসেবে প্রাপ্ত ১ হাজার কোটি টাকা দিয়ে আগামী ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে। আগামী জুন পর্যন্ত আরও প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ঋণ প্রয়োজন। উড়োজাহাজ ক্রয়ের লোনের কিস্তি, উড়োজাহাজের লিজের টাকা পরিশোধ, প্রকৌশল বিভাগের রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য খরচ বাবদ মাসে প্রায় ২২০ কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। অনেক বকেয়া নেগোসিয়েশন করে কমানো হয়েছে। বিশেষ অনুমতি নিয়ে শুধু সৌদি আরবের বিভিন্ন গন্তব্যে পুরো ক্যাপাসিটির যাত্রী পরিবহন হচ্ছে। কুয়ালালামপুর, সিঙ্গাপুর রুটে একদিক ফাঁকা যাচ্ছে। অপারেটিং লস হচ্ছে। ’ বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রায় সমান বয়স বিমানের। কিন্তু রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এ সংস্থাটি এক বছর লাভের মুখ দেখে তো পরের কয়েক বছর লোকসান দেয়। বিমান পরিচালনা করে পর্ষদ। অবসরপ্রাপ্ত এবং চাকরিরত আমলাদের সমন্বয়ে এ বোর্ড গঠন করা হয়। বিমানের বিভিন্ন কাজে স্বচ্ছতার অভাব থাকায় সংস্থাটির বিরুদ্ধে প্রায় প্রতি মাসেই মামলা হয়। বাণিজ্যিক এ সংস্থাটির বিরুদ্ধে বর্তমানে ২৮৮টি মামলা চলমান। গত নভেম্বর মাসে পাঁচটি মামলা হয়েছে। এসব মামলার মধ্যে পদোন্নতিসংক্রান্ত মামলাও রয়েছে। আদালতে মামলার পাশাপাশি বিভাগীয় মামলাও কম নয়। গত নভেম্বর মাসেই নতুন বিভাগীয় মামলা হয়েছে ১২টি।

About sylhet24express

Check Also

সিলেটস্থ গৌরারং ইউনিয়ন পেশাজীবী সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক এস আই রিয়াজ আলম সংবর্ধিত

নূরুদ্দীন রাসেল(সিলেট)::সিলেটস্থ সুনামগঞ্জ জেলার গৌরারং ইউনিয়ন পেশাজীবী সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক এস আই রিয়াজ আলম এর …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *