September 25, 2020 10:18 pm
Breaking News
Home / Home / করোনা মহামারিতেও থেমে নেই হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতন
তামান্না আফরিন

করোনা মহামারিতেও থেমে নেই হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতন

তামান্না আফরিন : অতীতেও আমরা দেখেছি যে, মহামারি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অর্থনৈতিক মন্দার সময় নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়ে যায়। UNDP এর রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৫ সালে আফ্রিকায়

ইবোলা এবং ২০০৭ সালে হংকং-এ সার্স ও সোয়ান ফ্লু সংক্রমণের সময় নারী হত্যা, ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতন বেড়ে গিয়েছিল। করোনা ভাইরাস বিস্তারের এই সময়েও বিশ্বে নারীর প্রতি পারিবারিক নির্যাতন বাড়ছে বলে সর্তক করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষণা বলছে ঘর-বন্দী জীবন নির্যাতনের শিকার নারীদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। বলা হচ্ছে নারী এবং নির্যাতক পুরুষ ঘরে এক সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটাচ্ছেন বলে পারিবারিক নির্যাতনের ঘটনা বেশি ঘটছে। করোনা ভাইরাসের মতো অদৃশ্য শত্রুর সঙ্গে লড়াইয়ের এই কঠিন সময়েও পুরুষ নারীর রক্ষক বা অভয়াশ্রম নয় বরং হিংস্র ভক্ষক। করোনা ভাইরাসের বিস্তারে বিশ্বেও অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশও যখন থমকে গেছে। সরকার সাধারন ছুটি ঘোষণা করে মানুষকে ঘরে থাকার আহবান জানাচ্ছে তখনও দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে নারীর লাশ উদ্ধারের ঘটনা থেমে নেই। থেমে নেই যৌন হয়রানি ও ধর্ষণ ।

করোনা কালীন বন্ধের মধ্যেও গত ২৬ মার্চ থেকে ৩ জুন ঢাকা মহানগরে নারী ও শিশু নির্যাতনের প্রায় ২০০ টি মামলা থানায় হয়েছে। যদিও বেসরকারী হিসাব মতে এ পর্যন্ত প্রায় ৪ হাজার ৫৫০ টি পরিবারে নারী ও শিশু নানা ভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছে। সাধারণত পুলিশের কাছে অপরাধের যে রির্পোট আসে তার বাইরেও অনেক ঘটনা থাকে। এদেশে নারী নির্যাতনের ঘটনাগুলো পুলিশে রিপোর্ট না করার সংস্কৃতি আছে। এখানে প্রায় ৮০% নারী কোন না কোন সহিংসতার শিকার হয়। এদের ৭২ % সেটি প্রকাশ করে না । অপরাধ বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে ” ডার্ক ফিগার অব ক্রাইম”। স্বাভাবিক সময়েই নারীরা তাদের নির্যাতনের ঘটনাগুলো রির্পোট করতে চায় না । আর এই মহামারির সময় সামাজিক দূরত্বে থাকার কারণে , আদালতগুলো বন্ধ থাকার করণে,গণমাধ্যমের মনোযোগ মহামারিতে , হাসপাতালে করোনা রোগী আতঙ্ক থাকার কারণে তাদের ঘটনাগুলো প্রকাশ করতে পারছে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী , সারা বিশ্বে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত কাজে নিয়োজিত লোকবলের মধ্যে ৭০ শতাংশই নারী । কিন্তু দুঃখের বিষয় নারী যেমন এক দিকে করোনা ভাইরাস আক্রান্ত মানুষের সেবায় নিজেদের বিলিয়ে দিচ্ছে অপর দিকে উদ্বেগজনকভাবে নিজেরা শিকার হচ্ছে ”নির্যাতন নামক ভাইরাসের”। করোনার এই সময়েও নির্যাতনের হাত থেকে রেহাই পাননি নারী পুলিশ সদস্য ( অনিমা বাড়ৈ, মাদারীপুর), সহকারী কমিশনার ( ভ’মি) (সাইয়েমা হাসান, যশোর), বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের অ্যাডভোকেট শিরিন সুলতানা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকাসহ চিকিৎসাধীন করোনা আক্রান্ত গৃহবধূ (খুলনা হসপিটাল) । এছাড়াও ঘরে খাবার নেই ,তাই ত্রাণ আনতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হয় ৪ বছরের শিশু ( কেরানীগজ্ঞ) ।

করোনা কালীন নারী হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের অন্যতম কারণগুলো হলোঃ
# অর্থনৈতিক দুরাবস্থা ও কোয়ারিন্টানে থাকার ফলে সামাজিক দূরত্ব।
# পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। লক ডাউনের সময় পুরুষের বাইরে পেশা ও অন্য কাজে ব্যস্ত থাকার সুযোগ কম থাকায় গৃহে নারীদের প্রতি কর্তৃত্ব স্থাপন বেড়ে গেছে।

# বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থা । পরিবার ও সন্তানের কথা ভেবে নির্যাতনের শিকার অনেক নারী চাইলেও আইনের আশ্রয় নিতে পারেন না।

# নারীকে দুর্বল হিসাবে দেখার প্রবণতা। এই প্রবণতা উচু-নীচু, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, সব শ্রেণীর মধ্যেই দেখা যায়। তাই মহামারি কালেও নারী নির্যাতন কমে নি।

# অপরাধবোধ না থাকা । নারী হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনকারীদের মধ্যে অপরাধবোধ না থাকার কারণে নির্দ্বিধায় এসব অপরাধ করতে উদ্যোগী হচ্ছে।

# আইনের শাসন না থাকা। যে সমাজে আইনের শাসন শক্তিশালীভাবে প্রয়োগ হয় না সে সমাজের লোকেরা নারী নির্যাতনের উপযোগী পরিবেশ পায় এবং হত্যা, ধর্ষণ করে থাকে।

# তথ্য প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহার । বর্তমানে ইন্টারনেটসহ তথ্য- প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রেমের ফাদেঁ ফেলে কিংবা বিয়ে করার কথা বলে, আনন্দ-ফুর্তি করার জন্যও অনেকে নারীদের ধর্ষণ ও হত্যা করছে।
তবে যে কারণে বা যেভাবেই নারী হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতন হোক না কেন , এগুলো গুরুতর ফৌজদারী অপরাধ।

২০০০ সালে প্রণীত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন (সংশোধিত-২০০৩) এর ৯ ধারা মোতাবেক ধর্ষণ ও ধর্ষণ করে হত্যা এবং ১১(গ) ধারায় যৌতুকের জন্য নির্যাতনের অপরাধে যে সব শাস্তির বিধান রয়েছে তা হচ্ছে :

ক্স ধর্ষণের ফলে কোনো নারী বা শিশুর মৃত্যু হলে ধর্ষণকারীর মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ড এবং এর অতিরিক্ত কমপক্ষে এক লাখ টাকা অর্থদন্ড।

ক্স একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোনো নারী বা শিশুকে ধষৃন করলে ধর্ষণকালে বা ধর্ষণের পর যদি তার মৃত্যু ঘটে, তবে ওই দলের সবার জন্যই মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ড এবং এর অতিরিক্ত কমপক্ষে এক লাখ টাকা অর্থদন্ড প্রযোজ্য হবে।

ক্স ধর্ষণের চেষ্টা করলে ধর্ষণকারীর সর্বোচ্চ ১০ বছর ও সর্বনি¤œ ৫ বছরের সশ্রম কারাদন্ড এবং এর অতিরিক্ত অর্থদন্ডেরও বিধান রয়েছে।

ক্স কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে আহত বা হত্যার চেষ্টা করলে ধর্ষণকারী যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডিত হবে এবং এর অতিরিক্ত অর্থদন্ডেও দন্ডিত হবে।

ক্স পুলিশ হেফাজতে থাকাকালে কোন নারী ধর্ষিতা হলে হেফাজতের ব্যর্থতার জন্য সেই ব্যক্তি বা ব্যক্তিগণ সরাসরিভাবে দায়ী হবেন এবং এর জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছর ও সর্বনিম্ন ৫ বছরের সশ্রম কারাদন্ড এবং এর অতিরিক্ত দশ হাজার টাকা অর্থদন্ডেরও বিধান রয়েছে।

২০০০ সালে কঠোর অনেক বিধান রেখে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন (সংশোধিত-২০০৩) করা হয়েছে। কিন্তু ১৩০ বছরের পুরনো ব্রিটিশ আইনে ধর্ষণের যে সংজ্ঞা ছিল , এখনও সেটাকেই ভিত্তি করে বিচার করা হয়। আবার আইন অনুযায়ী ১৮০ দিনের মধ্যে মামলা শেষ করার কথা থাকলেও তা গড়ায় বছরের পর বছর, কখনো দশক। তাই নারী ধর্ষণ, হত্যা, নির্যাতন বিষয়ে মামলা করে বিচার পাওয়ার চেয়ে সমাজে যেন এ ধরণের ঘটনা কোনোভাবেই না ঘটে সে ব্যবস্থা নেওয়া অধিকতর মঙ্গলজনক। করোনার সময় ও পরবর্তী সময়ে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধের জন্য আইন ছাড়াও আমাদের প্রয়োজন ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরী করা। নারীর বিরুদ্ধে অন্যায় প্রতিরোধে নারীদেরও সোচ্চার হতে হবে। আইন শৃঙখলা বাহিনীর উচিত হবে উন্নত অনেক দেশের মত এ দেশে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে জরুরি হট লাইন সেবা প্রদান করা এবং গণমাধ্যমে এ বিষয়ে বেশি বেশি প্রচার করা ।

 

 

তামান্না আফরিন
অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।

About admin

Check Also

নগরীতে ২৫ জুয়ারি আটক

ডেস্ক নিউজ : সিলেট নগরীর ঘাসিটুলা মোকাম বাড়ি থেকে ২৫ জন জুয়াড়িকে দুটি সিএনজি,একটি মটরসাইকেলসহ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *