Home / মুক্তমত

মুক্তমত

১৬ বছরের ব্যর্থতার চক্করে চামড়াশিল্প

১৬ বছরের ব্যর্থতার চক্করে চামড়াশিল্প

অনলাইন ডেস্ক : ২০০ একর জমিতে একটি চামড়াশিল্প নগর করতে ১৬ বছর পার করেছে সরকার। প্রকল্প নেওয়া হয় ২০০৩ সালে। এখনো কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) পুরোপুরি প্রস্তুত হয়নি। কঠিন বর্জ্য ফেলার জায়গা বা ডাম্পিং ইয়ার্ডের কাজ শুরুই হয়নি। জমির দাম ঠিক হয়েছে মাত্র তিন মাস আগে। কোনো ট্যানারিমালিক ইজারা দলিলও বুঝে পাননি।

চামড়াশিল্পে রপ্তানি আয় কমে যাওয়া এবং কাঁচা চামড়ার দামে ধস এই ব্যর্থতারই মাশুল। চামড়াপণ্য উৎপাদনকারী, ট্যানারিমালিক ও আড়তমালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তিন বছর ধরেই দেশে চামড়ার দাম কম। এ বছর যা তলানিতে ঠেকেছে। রেওয়াজ অনুযায়ী, প্রতিবছর ঈদুল আজহায় ট্যানারিমালিকেরা আড়তমালিকদের পুরোনো বকেয়া শোধ করেন, যা দিয়ে চামড়া কিনে আবার ট্যানারিমালিকদের দেন আড়তদারেরা।

ট্যানারিমালিকেরা বলছেন, রপ্তানি আয় কমে যাওয়া এবং ব্যাংক থেকে পর্যাপ্ত ঋণ না পাওয়ায় এবার তাঁরা চামড়া কিনতে আড়তমালিক ও ফড়িয়াদের টাকা দিতে পারেননি।

রপ্তানি আয় কমে যাওয়াসহ ব্যাংকঋণ না পাওয়ার সঙ্গে অবশ্য চামড়াশিল্প নগর প্রস্তুত না হওয়া এবং জমির ইজারা দলিল বুঝে না পাওয়ার সম্পর্ক রয়েছে।

দাম না পেয়ে দেশের মানুষ চামড়া ফেলে দিচ্ছে। বিপরীতে দেশে ২০১৮–১৯ অর্থবছরে আমদানি হয়েছে প্রায় ৯৪৫ কোটি টাকার বিদেশি চামড়া। কেন এই আমদানি? কারণ, চামড়াশিল্প নগর পরিবেশবান্ধব না হওয়ায় বিদেশি বড় ব্র্যান্ড বাংলাদেশি চামড়ার তৈরি পণ্য কেনে না। এ কারণে অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের মতো বড় প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে চামড়া এনে তা দিয়ে পণ্য তৈরি করে রপ্তানি করে।

এবার চামড়ার দামে ধসের সঙ্গে শিল্পনগরের কাজ শেষ না হওয়ার যোগ কী, জানতে চাইলে অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল মোমেন ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘চামড়াশিল্প নগর যদি পরিবেশবান্ধব হতো, তাহলে আমরা দেশি চামড়ার পণ্য ইউরোপ–আমেরিকায় রপ্তানি করতে পারতাম। আমাদের কারখানায়ও দেশি চামড়া ব্যবহার করতে পারতাম। সেটা পারছি না।’ তিনি জানান, তিন বছর আগেও বড় কারখানাগুলো দেশি চামড়ায় তৈরি পণ্য ইউরোপে রপ্তানি করত। কিন্তু একটি বিদেশি বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) পরিবেশদূষণের অভিযোগ করে ক্রেতাদের চিঠি লেখে। এতে দেশি চামড়ার ব্যবহার বন্ধ হয়ে যায়।

পরিবেশদূষণের অভিযোগের মধ্যেই চামড়ার রপ্তানি আয় বাড়ছিল। হঠাৎ করে গত কয়েক বছরে কেন কমছে, তার ব্যাখ্যাও দেন মোমেন ভূঁইয়া। বলেন, বাংলাদেশি চামড়ার মূল ক্রেতা চীন। চীনাদের ওপর যুক্তরাষ্ট্র বাড়তি শুল্ক আরোপের কারণে দেশটিতে চামড়ার চাহিদা কমেছে। এ কারণে তারা বাংলাদেশি চামড়া নেওয়া কমিয়েছে। তিনি মনে করেন, এখন শিল্পনগর প্রস্তুত থাকলে ইউরোপ ও আমেরিকায় সরাসরি চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করা যেত। কিন্তু সেই সুযোগ নেওয়া যাচ্ছে না।

রপ্তানিতে ধস
চামড়া দেশের দ্বিতীয় প্রধান রপ্তানি আয়ের খাত। ২০২১ সাল নাগাদ এ খাতে ৫০০ কোটি ডলার আয়ের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। কিন্তু চামড়া রপ্তানি কমছে। ২০১৮–১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে ১০২ কোটি ডলার আয় করে, যা আগের বছরের চেয়ে ৬ শতাংশ কম। ২০১৬–১৭ অর্থবছরে চামড়া খাতে রপ্তানি আয় ছিল ১২৩ কোটি ডলারের বেশি।

ট্যানারিমালিকেরা জানান, ২০১৭ সালের এপ্রিলে হঠাৎ হাজারীবাগের ট্যানারিগুলো বন্ধ করে দেওয়ার পর সাভারে উৎপাদনে যেতে অনেক সময় লেগে যায়। অনেক ট্যানারি এখনো উৎপাদনে যেতে পারেনি। এ কারণে ভারত ও জাপানের অনেক ক্রেতা বাংলাদেশ থেকে চলে গেছে।

মাইজদী ট্যানারির পরিচালক শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘এখন চীনারাই আমাদের একমাত্র ক্রেতা। তারাও সুযোগ নিয়ে দাম এত কম বলছে যে তাতে উৎপাদন খরচও ওঠে না। রপ্তানি না হওয়ায় কারখানায় চামড়ার স্তূপ জমে আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘গত ঈদুল আজহার পর আমি ৪৫ হাজার চামড়া কিনেছিলাম, যার অর্ধেক এখনো রয়ে গেছে।’

শিল্পনগরের চিত্র
১৯৫১ সালের ৩ অক্টোবর এক গেজেটের মাধ্যমে ভূমি অধিগ্রহণ করে সরকার নারায়ণগঞ্জ থেকে চামড়াশিল্পকে হাজারীবাগে আনে। কিন্তু পরে সেখানে বর্জ্য শোধনের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে প্রতিদিন প্রায় ২৪ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য নালা দিয়ে বুড়িগঙ্গা নদীতে গিয়ে পড়ত। রাস্তার পাশে, ডোবায় ফেলা হতো কঠিন বর্জ্য।

পরিবেশদূষণ রোধে ২০০৩ সাভারে চামড়াশিল্প নগর প্রকল্প নেওয়া হয়। ব্যয় ধরা হয় ১৭৬ কোটি টাকা। পরে কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগারসহ নানা খাতে ব্যয় ধরে মোট প্রকল্প ব্যয় দাঁড়ায় ১ হাজার ৭৯ কোটি টাকা। বর্জ্য পরিশোধনাগার নির্মাণের কার্যাদেশ দেওয়া হয় ২০১২ সালের ১১ মার্চ। ট্যানারিমালিকদের হাজারীবাগ থেকে সাভারে নেওয়ার কাজটি সরকার করতে পারেনি, হয়েছে উচ্চ আদালতের নির্দেশে।

চামড়াশিল্প নগরে জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৫৪টি ট্যানারিকে। এর মধ্যে ১২৪টি কার্যক্রম শুরু করেছে। সাভারের হেমায়েতপুরের চামড়াশিল্প নগর গতকাল ঘুরে দেখা যায়, সিইটিপির ক্রোম রিকভারি ইউনিট চালু হয়নি। কঠিন বর্জ্য সিইটিপির পাশের পুকুরে ফেলা হচ্ছে। ফলে আগের মতোই পরিবেশ দূষণ হচ্ছে। অন্যদিকে ড্রেনের সংস্কারকাজ শেষ না হওয়ায় ট্যানারিগুলো পুরোদমে উৎপাদন শুরু করলে আশপাশের সড়ক বর্জ্যে সয়লাব হওয়ার আশঙ্কা আছে। গত এক বছরে চামড়াশিল্প নগরের বড় উন্নতি বলতে সড়কের উন্নতি।

জমির জটিলতায় পুঁজি সংকট?
দীর্ঘ সময় ধরে উদ্যোক্তারা জমির মালিকানা বুঝিয়ে দেওয়ার দাবি করলেও সরকার দাম ঠিক করতেই বহু বছর লাগিয়েছে। অবশেষে গত মে মাসে প্রতি বর্গফুট জমির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৭১ টাকা।

এদিকে ট্যানারি নির্মাণ করে উৎপাদন শুরু করলেও কোনো উদ্যোক্তাই জমি ইজারার দলিল পাননি। কয়েকজন ট্যানারিমালিক আক্ষেপ করে বলেন, কারখানা ভবন নির্মাণ করতে গিয়ে তাঁদের পুঁজি শেষ। জমি ইজারার দলিল না পাওয়ায় তাঁরা ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারেননি। সে জন্য তাঁরা আড়তদারদের বকেয়া পরিশোধ করতে পারছেন না।

ইকবাল ব্রাদার্স ট্যানারির স্বত্বাধিকারী মো. শামসুদ্দিন বলেন, ‘চার কোটি টাকা খরচ করে ভবন নির্মাণ করেছি। আমি জমির মূল্যের সব কিস্তি সময়মতো পরিশোধ করেছি। কিন্তু ইজারা দলিল দিচ্ছে না বিসিক। সে জন্য ব্যাংক থেকেও ঋণ নিতে পারছি না। ফলে কারখানার খরচ মেটাতে কম দামে চীনা ক্রেতাদের কাছে লোকসানে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি।’

দায় আছে, বললেন বিসিক চেয়ারম্যান
চামড়াশিল্প নগর নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত হয়েছে গত ছয় মাসে। এ সময়েই জমির দাম ঠিক করার পাশাপাশি সিইটিপি পরিচালনার জন্য কোম্পানি গঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সাধারণ সম্পাদক মো. সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, চামড়াশিল্প নগর নিয়ে গত ছয় মাসে যে অগ্রগতি হয়েছে, সেটা আগে হলে আজকের দুর্দশা হতো না।

১৬ বছরে চামড়াশিল্প নগরের কাজ শেষ করতে না পারার জন্য বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) দায় আছে কি না, জানতে চাইলে সংস্থাটির চেয়ারম্যান মো. মোশতাক হাসান বলেন, অবশ্যই বিসিকের দায় ছিল। বিসিকসহ অনেকের গাফিলতি ছিল। ২০০৩ সালে প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও জমি অধিগ্রহণে অনেক সময় লাগে।

বিসিক চেয়ারম্যান বলেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সিইটিপি পুরোদমে চালু হবে। ট্যানারিমালিকেরা সার্ভিস চার্জসহ জমির দাম পরিশোধ করলেই দলিল দেওয়া হবে।

সার্বিক বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষক আবু ইউসুফ বলেন, চামড়াশিল্প নগর নিয়ে দূরদর্শিতার অভাব ছিল। বিসিকের মতো ক্ষুদ্র একটি সংস্থার হয়তো বড় শিল্পনগর করার সক্ষমতা নেই। আবার সিইটিপি নির্মাণের ক্ষেত্রেও ভবিষ্যৎ ভাবা হয়নি। এটির সক্ষমতা ২৫ হাজার ঘনমিটার। কিন্তু পুরোদমে উৎপাদন চলার সময় ৩৮ হাজার ঘনমিটার পর্যন্ত বর্জ্য তৈরি হয়।

রক্তাক্ত একুশে আগস্টে শিশু সুমাইয়ার রক্ত ক্ষরণ হচ্ছে : মোঃ মঞ্জুর হোসেন ঈসা

 

মোঃ মঞ্জুর হোসেন ঈসা

: রক্তাক্ত একুশে আগস্ট সবার দৃষ্টি যখন ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউ প্রত্যেকেই শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় প্রিয় নেতাদের স্মরণ করছেন ঠিক সেই মুহুর্তেই বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক সৈনিক কুষ্টিয়া জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক কুষ্টিয়া চেম্বার অব কমার্সের সিনিয়র সহ-সভাপতি শেখ সাজ্জাদ হোসেন ওরফে সবুজের মেয়ে ৮ বছরের শিশু সুমাইয়া অঝড়ে কাঁদছে। ৩ দিন পরেই ২৪ শে আগস্ট সুমাইয়া ৮ বছরে পা রাখবে। গত ৪ বছর ওর জন্মদিন যেন ওর কাছে অন্ধকার দিনে পরিণত হয়েছে। সবাই কাছে এসে কেঁদেছে আর বলেছে সুমাইয়ার বাবা একদিন ফিরে আসবেই।

দেখতে দেখতে আজ ৪ বছরে পা রাখল। ২০১৫ সালে ১৫ই আগস্ট গাজীপুর জেলা মওনা এলাকার ড্রিম স্কয়ার রিসোট থেকে স্বেচ্ছাসেবক লীগ কুষ্টিয়া জেলার সভাপতি আকতারুজ্জামান লাবু এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ সাজ্জাদ হোসেন সবুজকে র‌্যাব পরিচয় দিয়ে গ্রেফতার করলেও লাবু ফিরে আসলেও আজও সবুজ ফিরে আসেনি এই দাবি করেছে তার পরিবার। ইতিমধ্যেই সবুজের স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস জিনিয়া কুষ্টিয়া প্রেস ক্লাবে ৭ বার সাংবাদিক সম্মেলন করে তার প্রিয় সন্তানের কাছে বাবাকে ফিরিয়ে দেওয়ার আকুতি জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সর্বশেষ ঢাকার প্রেস ক্লাবে একই দাবি তুলেছেন ৩ বছর ৪ মাস যখন অতিবাহিত হয়েছিল ঠিক সে সময়। শুরু থেকেই র‌্যাব, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সবুজকে আটক বা গ্রেফতারের বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে। কিন্তু পরিবারের বিশ্বাস সবুজকে র‌্যাব তুলে নিয়ে গেছে। পরিবার এখনও জানে না সে কোথায় আছে। সে জীবিত না মৃত? সবুজের প্রতিক্ষায় দিন কাটছে তার স্বজনদের। পুত্র শোকে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তার বৃদ্ধ পিতা- মাতা। স্বামীর সন্ধান না পেয়ে স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস জিনিয়া পাগল প্রায়। ছেলে শেখ সাহেদ হোসেন প্রেম এবার এইচ এস সি পরিক্ষায় ঢাকার মাইলস্টন কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়েছে।

তার পরেও তার মনে কোন আনন্দ নেই। কোথায় ভর্তি হবে সেই চিন্তাও নেই। একমাত্র চিন্তা তার বাবা কবে ফিরে আসবে। কুষ্টিয়া জেলার রাজনীতিতে শেখ সাজ্জাদ হোসেন সবুজ সকলের অত্যন্ত পরিচিত মুখ ছিল। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শের ঝান্ডা নিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে একের পর এক কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল সবুজ। ২০১৫ সালের ১৫ই আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর শাহাদাৎ বার্ষিকীতে এক অনুষ্ঠান ঘিরে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীন কোনদলে ঝালুপাড়ার সবুজ নামে এক যুবক নিহত হন এবং বেশ কয়েকজন আহত হন। এ ঘটনায় শেখ সাজ্জাদ হোসেন সবুজকে প্রধান আসামী করে কুষ্টিয়া মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়।

এই ঘটনার পর থেকেই স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক ও কুষ্টিয়ার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী শেখ সাজ্জাদ হোসেন সবুজের আর কোন খবর পাওয়া যাচ্ছে না। পরিবারের পক্ষ থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুল আবেদন জানান তার স্ত্রী। তিনি বলেন, আমার স্বামী যদি কোন অপরাধ করে থাকে তাকে প্রচালিত আইনে সাজা দেয়া হোক, কিন্তু আমাদের জানামতে সে কোন অপরাধ করে নেই। তার একমাত্র অপরাধ সে নিঃস্বার্থভাবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক হিসেবে নিজের জীবন বাজি রেখে একের পর এক কর্মসূচি পালন করে গেছেন। আওয়ামী লীগ যখন বিরোধী দলের রাজনীতিতে ছিল তখন কুষ্টিয়ার রাজনীতিতে সকল কর্মকান্ডে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন আমার স্বামী সবুজ। এটি যদি অপরাধ হয় আমি তার কাছে এই অপরাধের বিচার চাইব?

দেশরতœ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি তো মানবতার মা, স্বেচ্ছাসেবক লীগেরও সাংগঠনিক নেতা আপনি। আপনার একজন কর্মী বছরের পর বছর নিখোঁজ থাকবে আর তার বৃদ্ধ মা-বাবা কাঁদতে কাঁদতে অন্ধ প্রায় হয়ে যাবে আর তার শিশু সন্তান বাবা বাবা বলে বিলাপ করবে আপনি তখনও কি নিরব থাকবেন। আপনি ছাড়া এই দুঃসময় আমাদের পাশে আর কেউ নেই। এভাবেই তিনি তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছিলেন। সবুজের মতো ঢাকার রামপুরা ছাত্রলীগের সভাপতি তপুকেও গুম করা হয়েছে।

তার বৃদ্ধ মা ও পরিবার প্রতি মুহুর্ত তপুর খোঁজে দিনরাত এক করে ফেলছে। তার পরেও আজও তপু ফিরে আসেনি। যখন দেখি প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে কর্মরত আইটি সেক্টরের শাহীন নিখোঁজ হওয়ার ২ মাস পর তার পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে মোহনা টেলিভিশনের একজন সিনিয়র সাংবাদিক নিখোঁজ হওয়ার কয়েকদিন পরেই তাকে খুজে পাওয়া গেছে, সাবেক রাষ্ট্রদুত জামান সাহেবও নিখোঁজ হওয়ার অনেক দিন পর পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে তখন সেই খবরে গুম হওয়া পরিবারের সদস্যরা আশায় আশান্বিত হয়ে ভাবে এই বুঝি তাদের খোকা ফিরে এলো। রাতের গভীরে দরজার কড়া নেড়ে মা মা চিৎকারে মায়ের কোলে লুটে পড়ল। গুম হওয়া সাজেদুল ইসলাম সুমনের মা হাজেরা খাতুন আজও অপেক্ষা করে এই বুঝি তার প্রিয় সন্তান তার কাছে ফিরে আসবে। কাঁদতে কাঁদতে এখন সে আগের মতো চোখে দেখতে পায় না। খুব একটা শুনতেও পায় না। তার পরেও কারো কণ্ঠ শুনলে ব্যস্ত হয়ে উঠে আর বলে কিরে সুমনের কোন খবর নিয়ে এলি নাকি।

মুহুর্তেই যে আসে তার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে যায়। বলতেই পারে না চাচি আপনাকেই দেখতে এসেছি। শিশু সুমাইয়ার জন্মদিনে সেরা উপহার হবে যদি তার পিতা তার কাছে ফিরে আসে। সে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছেন হাসিনা নানু আমি আর কিছুই চাইনা আমার বাবাকে আমার সামনে দেখতে চাই। আমি আমার বাবাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না। ৮ বছরের শিশু সুমাইয়া এই কথাগুলো বলেছে আর কেঁদেছে। আগামী ৩০ শে আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। প্রতি বছর এ দিবসটি নানা আয়োজনের মধ্যে দিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো পালন করে। কিন্তু বছরের পর বছর চলে যাচ্ছে তাদের পরিবারের কেউ ফিরে আসে না। কি করলে এই গুম প্রতিরোধ দিবস সফলভাবে পালন হবে সারা পৃথিবীতে চিৎকার করে বলবে না আমার কেউ গুম হয়েছে। মৃত্যুতেও অনেক ভাল। প্রত্যেকটি মানুষকে মৃত্যুর সাধ গ্রহণ করতে হবে। প্রিয়জন মৃত্যুবরণ করলে আমরা সবাই মিলে তাকে তাঁর ধর্ম অনুযায়ী সমাধি করি এবং তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করি। বছর শেষে তার জন্য মৃত্যুবার্ষিকী পালন করি।

কিন্তু যে মানুষটি গুম হয়ে যায় তার জন্মদিন থাকলেও মৃত্যুদিন বলে কোন দিন থাকে না। নিষ্ঠুর নিয়তির কাছে সেই পরিবার যুগের পর যুগ পরিহাসের পাত্র হয়ে যায়। প্রিয়জন হারিয়ে নানা রকম সমস্যার মধ্যে আবর্তিত হতে হয় তার জীবন। মৃত্যু সার্টিফিকেট আছে মৃত্যুর পর এই সার্টিফিকেট প্রদর্শন করলে তার ওয়ারিশগণ তার সকল সম্পত্তি ও সম্পদের মালিকানা পায়। ব্যাংকে গচ্ছিত টাকা গুলোও উত্তোলন করতে পারে। কিন্তু গুম ব্যাক্তির পরিবার সব কিছু থেকেই বঞ্চিত হয়। কারণ দেশে এমন কোন প্রচালিত আইন নেই গুম হওয়া ব্যক্তি ব্যাংকের গচ্ছিত টাকা তার পরিবারের কেউ তুলতে পারবে। এই নিষ্ঠুর নিয়ম আর কতদিন চলবে। সবুজ ফিরে আসুক, তপু ফিরে আসুক, সুমন ফিরে আসুক, পারভেজ ফিরে আসুক গুম হওয়া সব মানুষ ফিরে আসুক তার প্রিয় মানুষদের কাছে।

 

 

লেখক
মোঃ মঞ্জুর হোসেন ঈসা
চেয়ারম্যান
জাতীয় মানবাধিকার সমিতি

সুদহার কমানোর পরামর্শ: সিঙ্গেল ডিজিট বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিন

বাংলাদেশ ব্যাং

সম্পাদকীয় : ঋণ ও আমানতের সুদহার কমানোর পরামর্শ দিয়ে সম্প্রতি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে আবারও চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রশ্ন হল, ব্যাংকগুলো আদৌ এ পরামর্শে কর্ণপাত করবে কি?

কারণ এর আগে আরও কয়েকবার এ ধরনের পরামর্শ, নির্দেশনা দিয়ে চিঠি দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংক মালিকদের সঙ্গে বৈঠককালে ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন অর্থমন্ত্রী। এমনকি এ ব্যাপারে খোদ প্রধানমন্ত্রীও নির্দেশনা দিয়েছিলেন।

শিল্পে প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং অর্থনীতির গতিশীলতা অব্যাহত রাখতে গত বছর ১৪ মে ব্যাংক ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। এর পর সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে আনার ঘোষণা দেন ব্যাংক মালিকরা।

এজন্য অবশ্য তারা সরকারের কাছ থেকে কয়েক দফা সুবিধা আদায় করে নেন। শুধু তাই নয়, বাজেটে ব্যাংক মালিকদের বেশি মুনাফার জন্য এ খাতের কর্পোরেট কর আড়াই শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত হয়।

স্বল্প সুদে সরকারি আমানতের নিশ্চয়তাও পেয়েছে বেসরকারি ব্যাংকগুলো। কিন্তু নানা সুবিধা নিয়েও কথা রাখেননি ব্যাংক মালিকরা। সিদ্ধান্তটির বাস্তবায়ন এড়াতে নানা কৌশল ও শুভঙ্করের ফাঁকির আশ্রয় নিচ্ছেন তারা।

ঋণের উচ্চ সুদহার দেশে বিনিয়োগ ও উৎপাদনের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে প্রকৃত উদ্যোক্তাদের পড়তে হচ্ছে বিপাকে। গ্যাস সংকট, বিদ্যুতের ঘাটতি এবং ডলারের উচ্চমূল্যসহ নানা কারণে ব্যবসা পরিচালনা করা এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নেমে এলে এ পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটবে সন্দেহ নেই। বিনিয়োগ বাড়লে এবং নতুন নতুন শিল্প গড়ে উঠলে বাড়বে কর্মসংস্থানের সুযোগ। অর্থাৎ এর সঙ্গে সামগ্রিক অর্থনীতির প্রশ্ন জড়িত। তাই ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনা জরুরি।

ঋণের সুদহার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ খেলাপি ঋণ ও অনিয়ম। যথাযথ নিয়ম না মেনে ঋণ দেয়ার কারণে ব্যাংকগুলোকে সংকটে পড়তে হয়েছে। অনিয়ম-দুর্নীতি রোধ করা গেলে খেলাপি ঋণও কমে আসবে। এর ফলে ঋণের সুদহারে সিঙ্গেল ডিজিট বজায় রাখা সহজ হবে।

সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত এ জায়গাটিতে দৃষ্টি দেয়া। আমরা মনে করি, ব্যাংকগুলোকে যেহেতু বিভিন্ন সুবিধা দেয়ার পরও কাজ হচ্ছে না, সেহেতু ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিট বাস্তবায়নে কঠোর হওয়ার সময় এসেছে। শুধু পরামর্শ বা চিঠি দিয়ে ‘চিড়ে ভিজবে না’।

বিনামূল্যের পাঠ্যবই এবং …

বিনামূল্যের পাঠ্যবই

অনলাইন ডেস্ক : সম্প্রতি ঢাকার সনি্নকটে একটি বিদ্যালয়ের এক সিনিয়র শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ ঘটেছিল। বিদ্যালয়টির নামের সঙ্গে অবশ্য কলেজ যুক্ত হয়েছে। মোট শিক্ষার্থী প্রায় পাঁচ হাজার। শিক্ষকের বাসায় দেখলাম প্রচুর গাইড বই। যেন এক ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার। পঞ্চম থেকে নবম-দশম, সব শ্রেণির প্রায় সব বিষয়ের গাইড বই তার সংগ্রহে। জানতে চাই_ এসব কি কিনেছেন? উত্তর পাই_ বিভিন্ন গাইড বই প্রকাশক দিয়ে যায় বিনামূল্যে। কেন বিনামূল্যে দেয়_ উত্তর মেলে এভাবে, ‘শিক্ষকরা যাতে ছাত্রছাত্রীদের সংশ্লিষ্ট প্রকাশনা সংস্থার গাইড বই কিনতে উদ্বুদ্ধ করে_ সে জন্য এটা এক ধরনের উপঢৌকন।’ ফের প্রশ্ন করি_ উপঢৌকন কেবলই কি কয়েক কপি বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ? উত্তর_ মোটেই সেটা নয়। বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদের ম্যানেজ করে এবং এ জন্য সম্ভাব্য সব কিছু করে। তিনি গভীর হতাশার সুরে বলেন, ‘গাইড বইয়ের বাজার যে প্রকৃতই অনেক বড়!’

কত বড় এ বাজার? সমকালে গত বছরের ১৬ মার্চ ‘পাঠ্যবইয়ের তাহলে কী দরকার?’ শিরোনামে লিখেছিলাম, সরকার বিনামূল্যের বই প্রকাশের জন্য ব্যয় করছে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের গাইড বই কিনতে হচ্ছে অন্তত ১৪শ’ কোটি টাকার। বইয়ের ব্যবসায়ীরা এক হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হারিয়ে ১৪শ’ কোটি টাকার ব্যবসার সুযোগ তৈরি করেছেন।

গত বছর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে বিনামূল্যে বিতরণের জন্য ৩৬ কোটি ২০ লাখ বই ছাপা হয়েছিল। এর মধ্যে এক কোটি বই ছিল টিচার্স গাইড। এবার এই গাইডের দরকার নেই। বইয়ের অর্ডার দেওয়া হয়েছে ৩৬ কোটির কিছু বেশি। আর তা পাবে ৪ কোটি ৩৬ লাখ ১৮ হাজার ছাত্রছাত্রী। এ জন্য ব্যয় পড়বে ১২শ’ কোটি টাকা। সরকারের আরও একটি ভালো পদক্ষেপ_ ইন্টারনেটে স্কুলের সব বই তুলে দেওয়া। যে কোনো ছাত্রছাত্রী সেখান থেকে তার প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠা প্রিন্ট করে নিতে পারে। কিন্তু কেউ সামান্য চেষ্টাতেই জানতে পারবেন, গাইড বই প্রকাশকরা ইতিমধ্যেই তৎপর হয়ে উঠেছেন। তারা ২০১৮ সালের জন্য বই ছাপার কাজ শুরু করেছেন। তাহলে আবারও প্রশ্ন করা যায়_ পাঠ্যবই প্রকাশের জন্য সরকারের ১২শ’ কোটি টাকা ব্যয় কেন করা হচ্ছে? ছাত্রছাত্রীদের যদি বাধ্যতামূলকভাবেই গাইড বই কিনতে হয়, স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সদস্য ও শিক্ষকরা যদি তাদের এটা করতে বাধ্যই করে থাকেন এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় সেটা প্রতিরোধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে না পারে_ তাহলে এই অপচয়ের কোনো অর্থ হয় না। স্কুলের পাঠ্যবই এবং গাইড বই যারা খুঁটিয়ে দেখেন তাদের এটা জানা যে, যা আছে পাঠ্যবইয়ে তার সবটাই আছে গাইড বইয়ে। আর গাইড বইয়ে বাড়তি আছে অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর। তাহলে কেন পাঠ্যবই দরকার পড়বে?

কথায় বলে বুদ্ধি থাকলে নদীর ঢেউ গুনেও টাকা কামানো যায়। এ নিয়ে একটি গল্প আছে এভাবে_ এক রাজার বাড়ির দুধওয়ালা দুধে প্রচুর পানি মেশাত। একদিন সেটা রাজার কানে গেল এবং দুধওয়ালাকে তলব করা হলো। দুধওয়ালা অভয় পেয়ে জানাল_ রাজবাড়ির দারোয়ানকে ঘুষ দিতে হয় প্রতিদিন এবং সেটা পুষিয়ে নিতেই দুধে পানি মেশাতে হয়। রাজা ত্রুক্রদ্ধ হয়ে দারোয়ানকে বরখাস্ত করেন। তবে হাতেপায়ে ধরে কান্নাকাটি করায় হুকুম হয়, নদীর তীরে রাতদিন বসে থাকবি। তোর কাজ কেবল ঢেউ গোনা। নতুন চাকরিতে যোগ দেওয়ার পরও দেখা গেল ওই দারোয়ানের আয়ে কমতি নেই। কারণ সে যে রাজার লোক! নদী দিয়ে যত নৌকা যেত, সে প্রতিটি থেকে জোর করে টাকা নিত।
আমাদের বই ব্যবসায়ীরাও হাল ছাড়েননি। তারা পাঠ্যবইয়ের ব্যবসা হাতছাড়া হওয়ার পর কিছুদিন হৈচৈ করেছেন। কিন্তু দ্রুতই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছেন নিজেদের। একদল সরকারের কাছ থেকে পাঠ্যবই ছাপার জন্য কাগজ সরবরাহের কাজ নিয়েছে। আরেক দল প্রিন্টিং ব্যবসা নিয়েছে। কেউবা যুক্ত হয়েছে বাঁধাই কিংবা অন্য কোনো কাজে। আরেক দল লেগে পড়েছে গাইড বইয়ের ব্যবসায়।

সরকারের কাজ পেলে অনেক ব্যবসা। শনিবার সমকালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল :’সরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্রয় : ফটোকপি মেশিনের দাম ১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা!’ প্রতিবেদনে বলা হয়, বাজারে এ মানের একটি ফটোকপি মেশিন ৬০-৬৫ লাখ টাকাতেই পাওয়া যায়। এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের সহজ উত্তর_ উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে মেশিনটি কেনা হয়েছে। কোনো অনিয়ম হয়নি। সবচেয়ে কম দরদাতাই মেশিনটি সরবরাহ করেছে। তার এ বক্তব্যে এক বর্ণও মিথ্যা নেই। তবে যদি এমন হয়, যিনি সরবরাহের অর্ডার পেয়েছেন তিনিই অন্য কাউকে দরপত্র জমা না দিতে প্রয়োজনীয় কলকাঠি নাড়েন। এ প্রশ্নে কেউ বলবেন, এখন তো অনলাইনেও দরপত্র দেওয়া যায়। এর উত্তরে বলা যায়, যারা সরকারি কাজের ঠিকাদারি বাগিয়ে নেয় তারা ইতিমধ্যেই কৌশল বের করেছে, কীভাবে প্রতিপক্ষকে নিবৃত্ত করা যায়। অনলাইনে টেন্ডার জমা দেওয়ার নিয়ম অনেক প্রতিষ্ঠানে চালু হওয়ায় প্রকাশ্যে খুন-জখম কমেছে। টেন্ডার বাক্সের সামনে আর পাহারা বসাতে হয় না। কিন্তু কে কোন কাজ পাবে সেটা যদি আগেভাগেই ঠিক হয়ে থাকে এবং অন্যদের সাফ জানিয়ে দেওয়া হয় যে, এ ব্যবসা কে পাবে সেটা ঠিক হয়ে গেছে। এ অবস্থায় কে সাহস করে বলবে যে আমি ৬০-৬৫ লাখ টাকাতেই ফটোকপি মেশিন সরবরাহ করব এবং তাতেও আমার ভালো লাভ থাকবে?

পাঠ্যবইও কিন্তু এভাবেই প্রকাশ হয়। তার বখরা যায় নানা ঘাটে।

ঢাকার অদূরে যে শিক্ষকের সঙ্গে কথা হয়, তিনি আরও চমকপ্রদ তথ্য দিলেন স্কুলশিক্ষা সম্পর্কে। তার সঙ্গে আলোচনার সময় আরও দুটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন। তাদের কাছ থেকে জানা গেল, বিদ্যালয়গুলোতে কতজন শিক্ষক নিয়োগ হবে সেটা শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঠিক করে দেয়। দেশের শহর ও গ্রামের সর্বত্র শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার শিক্ষাবান্ধব। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন পাঁচ কোটিরও বেশি ছাত্রছাত্রী। দেশের লোকসংখ্যার প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ শিক্ষার্থী। একটু ভালো স্কুল বা কলেজ হলেই ভর্তির জন্য প্রচণ্ড চাপ। ছাত্র ভর্তি হলে চাই শিক্ষক। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলে দিয়েছে- কতজন শিক্ষক নিয়োগ করা যাবে। এর বাইরে শিক্ষক নিয়োগ করতে হলে তার ব্যয় বহন করতে হবে নিজস্ব তহবিল থেকে। এই অর্থ তো আর ম্যানেজিং কমিটি বা শিক্ষকরা বহন করবেন না। সেটা আদায় করা হয় ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকেই। বিদ্যালয়ের জন্য ধরা হয় উন্নয়ন ফি। ওই শিক্ষকরা বলেন, সরকার ছাত্রীদের বেতন মওকুফ করে দিয়েছে। নারী শিক্ষার জন্য এটা যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তবে ছাত্রীদের যে বেতন মওকুফ করা হয় তার সমপরিমাণ অর্থ সরকার বিদ্যালয়গুলোকে অনুদান দেয়। এই অনুদানের অর্থ পাওয়া যেহেতু নিশ্চিত থাকে, তাই এক সময়ে কেবল ছাত্রদের জন্য নির্দিষ্ট অনেক বিদ্যালয়কে কো-এডুকেশনে পরিণত করা হয়েছে। সরকারের এই অনুদান যেন সোনার ডিমপাড়া হাঁস। বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের জন্য চালু করা উপবৃত্তিও একই ধরনের আকর্ষণ। সরকার এখন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছাত্রকেও বৃত্তি দিয়ে থাকে। এই বৃত্তি, ছাত্রীদের বেতন বাবদ অনুদান, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো নির্মাণ ও মেরামত- এসব এখন অনেক বিদ্যালয়ে পরিচালনার সঙ্গে যুক্তদের জন্য যথেষ্ট আকর্ষণের বিষয়। পাঠ্যবই ছাত্রদের কাছে যায় বিনামূল্যে। এটা নিয়েও ব্যবসার সুযোগ তৈরি হচ্ছে- নানা খাতে খরচা দেখিয়ে ছাত্রপিছু ৫০ বা ১০০ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। উন্নয়ন তহবিলের নামেও অর্থ আদায় করা হয়। একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক বলেছেন, আমরা যে ছাত্রীর বছরে ২৪০০ টাকা বেতন মওকুফ করে দিয়েছি, তার কাছ থেকে উন্নয়ন ফি হিসেবে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা আদায় করে নিয়েছি। যে ছাত্রকে বিনামূল্যে সরকারের দেওয়া বই দিচ্ছি, তাকেই উৎসাহিত এবং এমনকি বাধ্য করছি দুই থেকে তিন হাজার টাকা ব্যয়ে গাইড বই কিনতে। তিনি দুঃখের সঙ্গে বলেন, প্রায় প্রতিটি বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে এমন একটি চক্র গড়ে উঠেছে, যাদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে মাধ্যমিক এবং অষ্টম ও পঞ্চম শ্রেণির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকানো অসম্ভব। বোর্ড থেকে সিলগালা করে যে প্রশ্ন পরীক্ষা শুরুর আগে পাঠানো হয়, তা খুলে দেখে কপি করে ফেসবুকে দেওয়া কিংবা ফটোকপি করে বিলানো মোটেই কঠিন কাজ নয়। এই প্রশ্নপত্র ফাঁসও এখন কিছু লোকের ভালো উপার্জনের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষায় ভালো নম্বর প্রদানের বিষয়টিও তাদের কার্যকর হাতিয়ার। সরকারের অনুমোদনের বাইরে যে বাড়তি শিক্ষক নিয়োগ, সেখানেও চলে টাকার খেলা। অনেক প্রতিষ্ঠানে বাড়তি শিক্ষক পদ পূরণের জন্য নেওয়া হয় প্রচুর অর্থ।

গত বছর ২৪ জানুয়ারি যুগান্তর পত্রিকা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল- ‘সৃজনশীল বোঝে না ৫৪ ভাগ শিক্ষক’ শিরোনামে। এতে বলা হয়, তারা নতুন পদ্ধতিতে প্রশ্ন তৈরি করতে পারেন

না। এ প্রতিবেদন তৈরি করেছিল সরকার। নতুন পদ্ধতি সম্পর্কে শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য দায়িত্ব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। তবে শিক্ষকদের নিজেদেরও তাগিদ থাকা চাই। অন্যথায় ছাত্রছাত্রীরা যথাযথ শিক্ষা পাবে না, কর্মজীবনের জন্য যোগ্য হয়ে উঠতে পারবে না। তবে এ ধরনের শিক্ষকদের জন্য গাইড বই খুব উপকারী। তারা রেডিমেড সবকিছু পাচ্ছেন এবং ছাত্রছাত্রীদের উপদেশ দিচ্ছেন কিংবা এমনকি বাধ্য করছেন তা কিনতে (এমনকি ছাইপাঁশ হলেও) তবে তারও কিন্তু বিনিময় আছে এবং তার ভাগ জুটছে অনেকের ভাগ্যে।

কবে এ চিত্র বদলাবে? শিক্ষার প্রসারে অভাবনীয় অগ্রগতি যে দেশে ঘটে চলেছে, তার সঙ্গে এসব যে বড়ই বেমানান।

ajoydg@gmail.com

বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে আজ কী ভাবতেন!

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

এ কে এম শামসুদ্দিন : ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা-উত্তর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেয়া ভাষণ আমি ফেসবুকে শুনছিলাম। জাতীয় শোক দিবস ঘনিয়ে এলে ইউটিউবে এসব ভাষণ বেশ শোনা যায়। এছাড়া পাড়া-মহল্লায়ও শোক দিবস উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচারের ব্যবস্থা থাকে।

অবশ্য অধিকাংশ মহল্লায়ই বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটি বাজাতে শোনা যায়। সন্দেহ নেই, ৭ মার্চের ভাষণটি একটি যুগান্তকারী ভাষণ। ৭ মার্চের ভাষণ ছাড়াও বঙ্গবন্ধুর এমন অনেক দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ আছে, যা সচরাচর বাজাতে শুনি না।

এবার সম্ভবত জাতীয় দিবসকে সামনে রেখে বঙ্গবন্ধুর এমনই একটি ভাষণ ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু রেজাউলের ফেসবুকের ওয়ালে দেখে আমি বঙ্গবন্ধুর এ ভাষণটি আগ্রহ নিয়ে শুনলাম। ভাইরাল হওয়া এ ভাষণটি আমার কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। আমার বন্ধু বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের মধ্যম সারির একজন নিবেদিত নেতা। তিনি অবশ্য নিজেকে নেতা ভাবেন না, বরং নিজেকে সবসময় তার দলের একজন কর্মী হিসেবে পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

আমিও বরাবরই তাকে একজন একনিষ্ঠ কর্মীর মতোই দলের জন্য কাজ করতে দেখেছি। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান, তার অর্থ উপার্জনের পথটি বেশ সরল এবং উপার্জনের চাকাটি আট-দশ বছর আগের মতোই এখনও একই গতিতে চলমান।

বঙ্গবন্ধুর ভাষণের বক্তব্য সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু যে কী রকম ভিশনারি নেতা ছিলেন অর্থাৎ দূরদর্শী বক্তা ছিলেন তার এ ভাষণটি শুনলে তা বোঝা যায়।’ আমি পাল্টা প্রশ্ন করি, বঙ্গবন্ধু তো এরকম আরও অনেক ভাষণ দিয়েছেন, এ ভাষণটিই কেন তার কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে? উত্তরে বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর এ ভাষণটি খুবই প্রাসঙ্গিক ও জরুরি বলে তার মনে হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর অনেক বক্তৃতা আমরা শুনেছি। স্বাধীনতা-উত্তর বিভিন্ন বক্তৃতা, বিবৃতিতে কিংবা দেশ-বিদেশের সংবাদমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু সব সময় বাংলাদেশকে নিয়ে তার চিন্তা-চেতনা এবং ভবিষ্যৎ স্বপ্নের কথা বলতেন। তিনি তার বক্তব্যে রাজনৈতিক নেতাকর্মী, আমলা, কৃষক-শ্রমিক এবং অন্যান্য আরও প্রসঙ্গ নিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে গেছেন। তার সেদিনের সেসব কথা, সতর্কবার্তা এবং নির্দেশনা বাংলাদেশের জন্য আজও সমভাবে প্রযোজ্য।

সেদিক দিয়ে বিবেচনা করে সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি একটি অন্যতম মাইলফলক বলে আমার মনে হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর সেদিনের সেই ভাষণের বক্তব্যগুলো ছিল এরকম : ‘এত চোরের চোর। চোর কোথা থেকে যে পয়দা হয়েছে আমি জানি না।

পাকিস্তানিরা সব নিয়ে গেছে; কিন্তু এ চোরগুলো রেখে গেছে আমার কাছে। এ চোরগুলো নিয়ে গেলে আমি বাঁচতাম। শতকরা বিশজন লোক শিক্ষিত। তার মধ্যে শতকরা পাঁচজন আমরা বলতে পারি উচ্চশিক্ষিত।

আজকে একটা প্রশ্ন আমার, এই যে দুর্নীতির কথা বললাম, আমার কৃষক দুর্নীতিবাজ? নাহ্। আমার শ্রমিক? নাহ্। তাহলে কে? ঘুষ খায় কারা? স্মাগলিং করে কারা? বিদেশি এজেন্ট হয় কারা? বিদেশে টাকা চালান করে কারা? এই আমরা যারা শতকরা পাঁচজন শিক্ষিত লোক, এই আমাদের মধ্যে ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ এবং এই আমাদের চরিত্রের সংশোধন করতে হবে, আত্মসমালোচনা করতে হবে। এসব দুর্নীতিবাজ এই শতকরা পাঁচজনের মধ্যেই, এর বাইরে নেই।

কেন নেই? কারণ আমার কৃষক দিনভর পরিশ্রম করে। শিক্ষিত সমাজকে আজ একটি কথা বলব, আমাদের চরিত্রের পরিবর্তন হয়নি।’

বঙ্গবন্ধুর বক্তব্যটি দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে কতখানি যে প্রাসঙ্গিক, পাঠকমাত্রই তা উপলব্ধি করতে পারছেন। আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি, আমার বন্ধুর সেই পোস্টে যতগুলো লাইক চিহ্ন পড়েছে তার শতকরা নব্বইজনই হল একই দলের কর্মী ও সমর্থক। এর মধ্যে অনেকেই পোস্টটি শেয়ারও করেছেন।

বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি মনোযোগ দিয়ে শোনার পর আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়েছে, ‘আমাদের চরিত্রের পরিবর্তন হয়নি,’ এ অংশটুকু। আমার বিশ্বাস পাঠকের কাছে বঙ্গবন্ধুর বক্তব্যের এ অংশটুকুর বিশদ ব্যাখ্যা দেয়ার প্রয়োজন নেই। দেশের বর্তমান সচেতন নাগরিক সমাজ বঙ্গবন্ধুর এ দুঃখবোধ, কষ্ট এবং ক্ষোভ খুব ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পারবেন। নিজেদের কর্মকাণ্ডের আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির জন্য বঙ্গবন্ধুর এ ভাষণটি পোস্ট করেছেন বলে আমার বন্ধু জানিয়েছেন।

‘নিজেদের কর্মকাণ্ড’ বলতে তিনি শুধু রাজনীতির সঙ্গে জড়িত মানুষের কথা বোঝাননি, বর্তমান দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি আমলা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা, অর্থ লুটপাটকারী, বিদেশে অর্থ পাচারকারী সিন্ডিকেট এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ পজিশনে ঘাপটি মেড়ে বসে থাকা বিদেশি এজেন্টদেরও বুঝিয়েছেন। এটি তার একান্ত নিজস্ব উপলব্ধি মাত্র।

বাংলাদেশে ‘দুর্নীতি’ এমন একটি বিষয় যা নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে এবং হচ্ছে, প্রচুর গবেষণা-আত্মসমালোচনাও হয়েছে। দুর্নীতির পথ থেকে বেরিয়ে আসার অনেক সমাধানের কথাও বলা হয়েছে। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে থেকে এ ব্যাপারে কঠিন ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হলেও কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। বরং দিন দিন আমরা যেন দুর্নীতির ঘেরাটোপে আটকে যাচ্ছি। আমাদের দেশে একশ্রেণীর অদ্ভুত মানুষ আছেন যারা বছরের পর বছর দুর্নীতির মাধ্যমে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন।

প্রতি বছর এসব অদ্ভুত মানুষই ধনী থেকে আরও বেশি ধনী হচ্ছেন। এসব ব্যক্তিকে আমি অদ্ভুত মানুষ বলছি এই কারণে যে, তাদের অর্থ উপার্জনের উৎস দিবালোকের মতোই পরিষ্কার। অথচ তাদের দুর্নীতির কর্মকাণ্ড, যেমন- ব্যাংক লুট, শেয়ার মার্কেট লুট কিংবা প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের ঘটনা জনসম্মুখে প্রকাশ পেলেও এসব দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষের বিরুদ্ধে দেশের কোনো আইনেই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাচ্ছে না। ওরা অস্পৃশ্য। ঘুরেফিরে এ পরিচিত মহলটি সবসময়ই ক্ষমতার বলয়ের আশপাশেই অবস্থান করে থাকে।

প্রকৃত ধনী এবং দুর্নীতির আশ্রয়ে জন্ম নেয়া এসব নব্য ধনীর সংখ্যা হাতে গুনে শতকরা পাঁচজনও নয়। অথচ এ শতকরা পাঁচজন দেশের মোট সম্পদের প্রায় ২৮ শতাংশ অর্থাৎ এক-তৃতীয়াংশ সম্পদের মালিক। আমাদের দেশে দিন দিন এই শ্রেণীর সংখ্যা বেড়ে চলেছে। একটি পরিসংখ্যান দিলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে দেশে কোটিপতি ছিলেন মাত্র ৫ জন। এরশাদের ক্ষমতাচ্যুতকালে অর্থাৎ ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে কোটিপতির সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৯৪৩ জন।

১৯৯১-২০০১ সালের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে কোটিপতির এ সংখ্যা গিয়ে পৌঁছে ৫ হাজার ১৬২ জনে। ২০০১-২০০৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কোটিপতি হন ১৪ হাজার একজন। তবে বিগত একদশকে কোটিপতি বৃদ্ধির হার অতীতের সব রেকর্ডকে ভেঙে প্রায় আট গুণ বেড়েছে। এ সময়ে প্রতি বছর গড়ে ১০ হাজারেরও বেশি কোটিপতি হয়েছেন। অর্থাৎ দেশ স্বাধীনের পর ২০০১ সাল পর্যন্ত মোট কোটিপতির যে সংখ্যা ছিল, গত একদশকে প্রতি বছরই তার চেয়ে দ্বিগুণ বেশি হারে কোটিপতির সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে কোটিপতির সংখ্যা এক লাখেরও বেশি। অনেকে একথা বলার চেষ্টা করেন, মানুষ অর্থ-সম্পদের মালিক হচ্ছে মানে দেশ সঠিক পথেই এগিয়ে যাচ্ছে। দেশের উন্নয়ন হচ্ছে, মাথাপিছু আয় বাড়ছে, জিডিপির প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর সবই সত্য! কিন্তু এ সম্পদ বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষ যে হারে সম্পদ ভোগ করার কথা ছিল, সে হারে মানুষ কি সেই সম্পদ ভোগ করতে পারছে? দেশের উন্নয়নের ফসল কেবল একশ্রেণির মানুষের গোলাঘরই ভরপুর করছে।

এ হারে কোটিপতি সংখ্যা বৃদ্ধির অর্থ হল দেশের সম্পদ ক্রমেই কিছুসংখ্যক ব্যক্তির হাতে পুঞ্জীভূত হচ্ছে। ফলে ধনী ও সাধারণ সম্পদশালী মানুষের মধ্যে বৈষম্য দিন দিন বেড়ে চলেছে। স্মরণ করা যেতে পারে, ১৯৭২ সালে ২৫ মার্চ স্বাধীনতার প্রথম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে মানুষে মানুষে, ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে বৈষম্য থাকবে না। সম্পদ বণ্টনব্যবস্থায় সমতা আনতে হবে।’ আমাদের স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রেও স্বাধীন বাংলাদেশে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করা হয়েছিল।

অর্থাৎ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্যই ছিল বৈষম্যমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা। অথচ বিশ্ব পরিসংখ্যানে দেখা যায়, অতিধনী ব্যক্তির সংখ্যা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ সারা বিশ্বে প্রথম। অথচ সবচেয়ে দরিদ্র মানুষের দেশ হিসেবে পৃথিবীতে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুসারে, বাংলাদেশের মাত্র ৫ শতাংশ মানুষ দেশের মোট সম্পদের এক-তৃতীয়াংশের মালিক হলেও সবচেয়ে গরিব ৫ শতাংশ মানুষ মোট সম্পদের মাত্র ০.২৩ শতাংশের মালিক।

জনসংখ্যার ৯০ শতাংশের আয় হয় কমেছে কিংবা এক জায়গাতেই থমকে আছে। এ প্রসঙ্গে দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহানের একটি বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। ইতিপূর্বে তিনি ঢাকার একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন কৌশলগুলো অন্যায্যতা ও তীব্র বৈষম্যের জন্ম দিয়েছে, যা বাংলাদেশে দুটি সমাজ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের সমসাময়িক এ চরিত্রের সঙ্গে স্বাধীনতাপূর্ব তৎকালীন পাকিস্তানের দুই অর্থনীতির মিল খুঁজে পাওয়া যায়।’

বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে যে চোরদের কথা উল্লেখ করেছিলেন, সেসব চোরের সংখ্যাও বেড়েছে বহুগুণে। ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ, চোরাকারবারি, বিদেশে অর্থ পাচারকারী এবং বিদেশিদের স্বার্থরক্ষাকারী এজেন্টদের সংখ্যাও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। ঘুষখোর আর দুর্নীতির বিষবাষ্প এখন শুধু উঁচু মহলেই সীমাবদ্ধ নেই। এর বিস্তার ঘটেছে দেশের প্রতিটি অঞ্চলে।

আমাদের দেশে এখন খুব কম সংখ্যক সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, সংগঠন এবং প্রতিষ্ঠান পাওয়া যাবে যেখানে বিষফোঁড়ার মতো ঘুষ বাণিজ্যের প্রাদুর্ভাব ঘটেনি। এসব প্রতিষ্ঠানের এমন অনেক সদস্য পাওয়া যাবে যারা দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিচ্ছেন। দু-একটি ঘটনা উল্লেখ করলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। বাংলাদেশ পুলিশের সদ্য সাবেক ডিআইজি মিজানুর রহমানের আয়বহির্ভূত অর্থ উপার্জনের তদন্ত করতে গিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির নিজেই দুর্নীতিতে জড়িয়ে গেছেন।

মিজানুর রহমানকে দায়মুক্তি দিতে একটি গ্যাসচালিত কার ও নগদ ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নেয়ার জন্য ‘চুক্তি’ করেন তিনি এবং অগ্রিম বাবদ ২৫ লাখ টাকা ঘুষও গ্রহণ করেন বলে খবর বেরিয়েছে। এ কৃতকর্মের ফলে বর্তমানে উভয়েই জেলহাজতে আটক আছেন। ৮০ লাখ টাকাসহ গ্রেফতার সিলেট কারা কর্তৃপক্ষের ডিআইজি পার্থ গোপাল বণিকের কাহিনী নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। আরও দুটো ঘটনার উল্লেখ করতে চাই এখানে। ঘটনা দুটো কম গুরুত্বপূর্ণ মনে হলেও এর তাৎপর্য অনেক।

গাইবান্ধা জেলার ৮২টি ইউনিয়নে অতিদরিদ্রের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির কাজের জন্য ২৮ হাজার ৮৪৫ শ্রমিক নিয়োগের মজুরি বাবদ ২৪ কোটি ৪৯ লাখ ২১ হাজার টাকা বরাদ্দ হয়। জানা গেছে, কাগজে-কলমে মাটির কাজ সম্পন্ন দেখানো হলেও রাস্তার কাজের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

দৈনিক ২০০ টাকা মজুরি বাবদ ৪০ দিনে একজন শ্রমিক ৮ হাজার টাকা পাওয়ার কথা। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রতিটি শ্রমিক থেকে ৪ হাজার টাকা ঘুষ নিয়ে বাকি ৪ হাজার টাকা শ্রমিকদের ধরিয়ে দিয়ে কাজ না করিয়েই প্রকল্প সম্পূর্ণ হয়েছে বলে দেখানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। অপর ঘটনাটি ঘটেছে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায়। ঘটনাটি খুবই পীড়াদায়ক ও দুঃখজনক।

একটি বেসরকারি সাহায্য সংগঠন হাতিভাঙ্গা ইউনিয়নের ৬৪৮টি বন্যার্ত পরিবারকে ৪ হাজার করে এবং ৭২ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে সাড়ে ৫ হাজার টাকা করে নগদ অর্থ সাহায্য প্রদান করতে চাইলে ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যরা সাহায্যের অর্ধেক টাকা ঘুষের বিনিময়ে রিলিফের তালিকায় মানুষের নাম অন্তর্ভুক্ত করে।

যেসব পরিবার অর্ধেক টাকা দিতে রাজি হয়েছে, তাদের নাম তালিকায় উঠেছে আর যারা রাজি হয়নি, অতি অসচ্ছল হওয়ার পরও তারা কোনো আর্থিক সাহায্য পায়নি। চাল-চুলাহীন বানভাসি মানুষের সঙ্গে জনপ্রতিনিধিদের এই নিষ্ঠুর আচরণ মানবতার চূড়ান্ত স্খলন বললে অত্যুক্তি হবে না।

বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে বলেছেন, ‘চোর কোথা থেকে যে পয়দা হয়েছে আমি জানি না। পাকিস্তানিরা সব নিয়ে গেছে; কিন্তু এ চোরগুলো রেখে গেছে আমার কাছে। এই চোরগুলো নিয়ে গেলে আমি বাঁচতাম।’ চোর কোথা থেকে পয়দা হয়েছে, তখন বঙ্গবন্ধু জানতে না পারলেও বর্তমানে আমাদের দুর্ভাগ্য, চোর কীভাবে যে তৈরি হচ্ছে তা বুঝতে পারলেও আমরা বলতে পারি না। পাকিস্তানিরা সবকিছু নিয়ে গেলেও চোরদের রেখে গেছে, ওই চোরদের নিয়ে গেলে বেঁচে যেতেন বলে বঙ্গবন্ধু আক্ষেপ করেছিলেন।

এখন কথা হল, সেই চোরদের বর্তমান প্রজন্ম তো আমাদের চোখের সামনে এ মাটিতেই গড়ে উঠেছে। ওদের অন্য কোথাও চলে যাওয়ার সম্ভাবনাও নেই। সুতরাং বঙ্গবন্ধুর মতো আমাদেরও বলতে ইচ্ছে হয়, ‘ওরা কোথাও চলে গেলে আমরাও বেঁচে যেতাম।’ কিন্তু উপায় নেই। বঙ্গবন্ধু শোষণমুক্ত-দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন।

কিন্তু আজ যখন দেখি তারই সোনার বাংলায় দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষদের পৃষ্ঠপোষকতা করা হচ্ছে, দেশের মানুষের জামানতের টাকা মেরে দিয়ে ঋণখেলাপি হওয়ার পরও যখন দেখি তাদেরই আবার বিশেষ সুবিধা দেয়া হচ্ছে, তখন কষ্ট হয়। যখন শুনি, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবিত বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘কালো টাকা’কে কালো টাকা বলা ঠিক না, কালো টাকা কথাটা শুনতে ভালো লাগে না (প্রথম আলো- ২৭ জুন ২০১৯), তখন দুঃখবোধ হয় বৈকি।

সরকারি সফর তালিকায় যখন ব্যাংক ও শেয়ার মার্কেট লুটেরাদের নাম দেখা যায়, তখন অনেকের মনেই অনেক প্রশ্ন আসে। হয়তো মনে মনে তারা ভাবেন, ‘বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে তিনি আজ কী ভাবতেন।’ আমার বন্ধু রেজাউল খেদ প্রকাশ করে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শে দুর্নীতিমুক্ত সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয় নিয়ে আমরা প্রতি বছর তার শাহাদতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস পালন করি। প্রতি বছরই আমরা তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের শপথ গ্রহণ করি। দেশ গড়ায় অনেক প্রতিবন্ধকতা আছে। সে প্রতিবন্ধকতা হয়তো দূর করাও সম্ভব। তবে, এসব কুপ্রবৃত্তির মানুষকে দমন না করলে ভবিষ্যতে আর যাই হোক জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়া সম্ভব নয়।

একেএম শামসুদ্দিন : অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা

জাতির পিতার স্বপ্নের বাংলাদেশ

তোফায়েল আহমেদ : প্রতি বছর যখন বাঙালি জাতির জীবনে ১৫ আগস্ট ফিরে আসে, স্মৃতির পাতায় তখন অনেক কথা ভেসে ওঠে। যে নেতা জীবনের যৌবন কাটিয়েছেন পাকিস্তানের কারাগারে, ফাঁসির মঞ্চে গিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেছেন, ‘এই পাকিস্তান বাঙালিদের জন্য হয়নি, একদিন বাংলার ভাগ্যনিয়ন্তা বাঙালিদেরই হতে হবে’; যে নেতা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য-আদর্শ সামনে নিয়ে ১৯৪৮-এর ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগ, ’৪৯-এর ২৩ জুন আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করেন, মহান ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মহত্তর স্বাধীনতার বীজ রোপণ করেন, সর্বোপরি যে নেতার জন্ম না হলে এই দেশ স্বাধীন হতো না, গভীর পরিতাপের বিষয় সেই নেতাকেই ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট তারই প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলাদেশে বুলেটের নির্মম আঘাতে সপরিবারে হত্যা করা হয়।

বাঙালি জাতির জীবনে ১৫ আগস্ট একটি কালো দিন-‘জাতীয় শোক দিবস’। যে নেতার হৃদয়জুড়ে ছিল বাংলাদেশের মানুষ। তাঁর হৃদয়ের মণিকোঠায় সব সময় বাংলাদেশের গরিব-দুঃখী মানুষের অবস্থান। যাদের মুক্তির জন্য তিনি জীবনের প্রায় ১৩টি বছর পাকিস্তানের কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটিয়েছেন। আমার দুর্লভ সৌভাগ্য সেই মহান নেতার সান্নিধ্যে থেকে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। বারবার মনের কোণে ভেসে ওঠে সেই দিনগুলোর কথা, যখন বঙ্গবন্ধুকে ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য’ মামলায় ফাঁসি দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। আমরা জাগ্রত ছাত্রসমাজ শত শহীদের রক্তের বিনিময়ে প্রবল গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি করে সেই মামলার আসামিদের নিঃশর্ত মুক্তিদানে স্বৈরশাসককে বাধ্য করেছিলাম। সেদিনের তুমুল গণআন্দোলনের একপর্যায়ে বঙ্গবন্ধুর প্যারোলে মুক্তির কথা উঠেছিল। প্যারোলে মুক্তিদান প্রসঙ্গে সেদিন শ্রদ্ধেয় বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি প্যারোলে মুক্তি নিতে নিষেধ করেছিলেন এবং বঙ্গবন্ধু প্যারোলে মুক্তিদানে স্বৈরশাসকের প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। সংগ্রামী ছাত্রজনতার গণবিস্ফোরণেই তিনি ‘মুক্তমানব’ হিসেবে কারাগার থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। আমরা সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ ’৬৯-এর ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ১০ লক্ষাধিক লোকের জনসমুদ্রে গণনায়ক শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলাম। মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধু লাহোরে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকে যোগদান করেন এবং বাংলার মানুষের প্রাণের দাবি-‘সার্বভৌম পার্লামেন্ট নির্বাচন’, ‘এক মাথা এক ভোট’ এবং ‘জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন বণ্টন’-আদায় করেন। বঙ্গবন্ধুর আদায়কৃত দাবি অনুযায়ী তথাকথিত ‘সংখ্যাসাম্য’ বাতিল হয় এবং জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন বণ্টনে সংখ্যাগুরু হিসেবে আমরা জাতীয় পরিষদে ১৬৯টি আসন লাভ করি। বঙ্গবন্ধু ছয় দফা ও ১১ দফাকে সামনে রেখে আসন্ন নির্বাচনকে গণভোট তথা রেফারেন্ডামে পরিণত করেন। ঐতিহাসিক ’৭০-এর এই নির্বাচনে আমার মতো পাড়াগাঁয়ের এক অখ্যাত ছেলে, সবেমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া শেষ করেছি, আমাকে তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য হিসেবে মনোনয়ন দেন এবং মাত্র ২৭ বছর বয়সে আমি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হই।

’৭০-এর ১২ নভেম্বর আমাদের উপকূলীয় অঞ্চলে ভয়াল ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছ্বাসে ১০ লক্ষাধিক লোক মৃত্যুবরণ করেন। উপকূলীয় দুর্গত এলাকা সফর শেষে হোটেল শাহবাগে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘দুর্গত এলাকা আমি সফর করে এসেছি। আমরা যে কত অসহায় এই একটা সাইক্লোন তা প্রমাণ করেছে। আমরা এভাবে আর জীবন দিতে চাই না। আমরা স্বাধিকারের জন্য, আমাদের মুক্তির জন্য আত্মত্যাগ করতে চাই।’ আসন্ন নির্বাচন সম্পর্কে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, ‘এই নির্বাচনে আমি অংশগ্রহণ করব। এই নির্বাচন হবে আমার জন্য একটা গণভোট। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হবে-কে বাংলাদেশের নেতা এবং কীভাবে এই অঞ্চল পরিচালিত হবে।’ আমার আসনসহ ঘূর্ণিঝড় উপদ্রুত উপকূলীয় এলাকার জাতীয় পরিষদের ১৭টি আসনে পূর্বঘোষিত ৭ ডিসেম্বরের নির্বাচন স্থগিত করা হয়। পরবর্তীকালে আমার নির্বাচন হয়েছিল ১৭ জানুয়ারি। তার আগে বঙ্গবন্ধু আমাকে ডেকে নিয়ে আসেন। তিনি সারা বাংলাদেশ সফর করেন। আমি বঙ্গবন্ধুর সফরসঙ্গী ছিলাম। একই ট্রেনে গিয়েছি। তার পাশে থেকেছি। একই জনসভায় বঙ্গবন্ধুর আগে বক্তৃতা করেছি। আবার তিনি বক্তৃতা করার সময় চলে গিয়েছি আরেক জনসভায়। বঙ্গবন্ধু যখন এক জনসভা শেষ করে আরেকটিতে আসছেন তখন আমি চলে গেছি আরেকটি জনসভায়। নির্বাচনী জনসভাগুলোতে বঙ্গবন্ধু ছোট্ট করে বক্তৃতা করতেন। বলতেন, ‘আমি যদি আমার জীবনের যৌবন পাকিস্তানের কারাগারে কাটাতে পারি, আমি যদি বারবার ফাঁসির মঞ্চে গিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে পারি, আমি কি আপনাদের কাছে একটা ভোট চাইতে পারি না।’ তখন লাখ লাখ লোক হাত উত্তোলন করে বঙ্গবন্ধুকে সমর্থন জানাত। ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে সভা শেষ করে তিনি আরেক সভায় যেতেন। মনে পড়ে, কুড়িগ্রামে মিটিং শেষ করে আমরা রংপুর দিয়ে যাচ্ছি। তখন গভীর রাত। দেখি, পথের ধারে লণ্ঠন হাতে দাঁড়িয়ে এক বয়স্ক লোক। বঙ্গবন্ধু গাড়ি থামালেন, লোকটিকে কাছে ডেকে নিলেন। আদর করলেন। লোকটি বললেন, ‘আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেছি শুধু আপনাকে একটু দেখার জন্য। আজ আমার জীবন ধন্য হয়েছে।’ পরের জনসভায় বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘একজন মানুষের জীবনে আর কী চাওয়ার থাকে, যখন আমাকে একনজর দেখার জন্য গভীর রাত পর্যন্ত মানুষ লণ্ঠন হাতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে।’ এভাবে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর পাশে ছিলাম। বিদেশি সাংবাদিকরা যখন জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘আপনি কতটি আসনে জয়ী হওয়ার আশা করেন?’ বঙ্গবন্ধু উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আমি অবাক হব যদি আমি দুটি আসনে হারি।’ অবাক ব্যাপার দুটি আসনেই আমরা হেরেছিলাম। জাতীয় পরিষদে ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনে আমরা বিজয়ী হয়েছিলাম। বাংলার মানুষের অনুভূতি তথা নার্ভ বঙ্গবন্ধু ভালো জানতেন। এই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছিল এবং বঙ্গবন্ধুর ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে মিলে গিয়েছিল।

নির্বাচনের পর ’৭১-এর ৩ জানুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে শপথ অনুষ্ঠান হয়। যদিও তখনো আমি নির্বাচিত হইনি। তবুও বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে জনপ্রতিনিধিদের ব্যতিক্রমধর্মী সেই শপথ অনুষ্ঠানে আমিও শপথ গ্রহণ করি। শপথ গ্রহণ করান স্বয়ং বঙ্গবন্ধু। সেদিন শপথনামা পাঠের পর বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক বক্তৃতায় বলেন, ‘আজ থেকে ছয় দফা ও ১১ দফা আমার বা আমার দলের না। এটা এখন জনগণের সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। যদি কেউ ছয় দফা ও ১১ দফার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে, তাহলে বাংলার মানুষ তাকে জ্যান্ত কবর দেবে।’ সত্যিকার অর্থেই ছয় দফাকে বঙ্গবন্ধু জনগণের সম্পত্তিতে রূপান্তরিত করেছিলেন। ছয় দফার ভিত্তিতে সংবিধান প্রণয়নে বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় অঙ্গীকারে সন্ত্রস্ত হয়ে পাকিস্তানের কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী ছল-চাতুরী ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছিল। বিশ্বাসঘাতকতা করে পূর্বঘোষিত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ১ মার্চ একতরফাভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করে। যার ফলে পুরো বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে ওঠে এবং বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ তার ভুবনবিখ্যাত ঐতিহাসিক ভাষণটি প্রদান করেন। এই ভাষণ প্রদানের আগের রাতেও বঙ্গবন্ধু বিচলিত ও চিন্তিত ছিলেন। সেদিনও বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বঙ্গমাতা ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে বলেছিলেন, ‘যে জনগণের জন্য তোমার সারা জীবনের সংগ্রাম, সেই জনগণের সার্বিক মুক্তির জন্য তোমার মনে যে কথা আছে সেগুলোই তুমি বলবে।’ বঙ্গবন্ধু বিচক্ষণতার সঙ্গে বক্তব্য রেখে শাসকগোষ্ঠীর উদ্দেশে চারটি শর্ত আরোপ করেন এবং স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। শুরু হয় পরিপূর্ণ স্বাধীনতার জন্য সর্বব্যাপী অসহযোগ আন্দোলন। অসহযোগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে প্রতিদিন সশস্ত্র প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। শুরু হয় আলোচনার নামে টালবাহানা, কালক্ষেপণ ও বাঙালি নিধনে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক প্রণীত নীলনকশা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ অনুযায়ী গণহত্যার প্রস্তুতি। ২৫ মার্চ রাতে জিরো আওয়ারে পাকবাহিনী ঢাকার চারটি স্থান-বঙ্গবন্ধুর বাসভবন, রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স, তৎকালীন ইপিআর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস টার্গেট করে গোলাবর্ষণ শুরু করার পরপরই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে বলেন, ‘আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন…’। পাকবাহিনী বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে। শুরু হয় সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুজিব বাহিনীর অন্যতম অধিনায়ক হিসেবে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং সমাপ্ত করে শপথ করাতাম এই বলে যে, ‘বঙ্গবন্ধু মুজিব, তুমি কোথায় আছ, কেমন আছ, আমরা জানি না। কিন্তু যতক্ষণ তোমার স্বপ্নের বাংলাদেশকে আমরা হানাদার মুক্ত করতে না পারব, ততক্ষণ আমরা মায়ের কোলে ফিরে যাব না।’

দীর্ঘ নয় মাস ১৪ দিন বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালি কারাগারে বন্দী ছিলেন। বন্দী অবস্থায়ও বঙ্গবন্ধু ছিলেন দৃঢ়। যেই সেলে বন্দী ছিলেন সেই সেলের সামনে কবর খুঁড়ে দাঁড় করিয়ে বঙ্গবন্ধুকে বলা হয়েছিল, ‘কবরে যেতে চান, না পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চান।’ তিনি বলেছিলেন, ‘কবরের ভয় আমাকে দেখিও না। আমি তো জানি তোমরা আমাকে ফাঁসি দেবে। কিন্তু আমি এও জানি, যে বাংলার দামাল ছেলেরা হাসিমুখে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে পারে, সেই বাঙালি জাতিকে কেউ দাবিয়ে রাখতে পারবে না।’ শুধু বলেছিলেন, ‘আমাকে হত্যা করে এখানে না, আমার বাংলার মানুষের কাছে আমার লাশটি পৌঁছে দিও। যে বাংলার মাটিতে আমি লালিত-পালিত হয়েছি, যে বাংলার আকাশে-বাতাসে বর্ধিত হয়েছি, মৃত্যুর পরে সেই বাংলার মাটিতে আমি চিরনিদ্রায় শায়িত থাকতে চাই।’ যেদিন ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হয় সেদিন আমরা বিজয়ের পরিপূর্ণ স্বাদ পাইনি। কেননা জাতির পিতা তখনো পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী। ’৭২-এর ৮ জানুয়ারি যেদিন তিনি মুক্তিলাভ করেন এবং ১০ জানুয়ারি যেদিন তিনি ফিরে এলেন সেদিন আমরা স্বাধীনতার পরিপূর্ণতা লাভ করেছি। কত কথা মনে পড়ে। ১২ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী হলেন। ১৪ জানুয়ারি আমার মতো একজন সবেমাত্র ২৮ পেরিয়ে ২৯ বছরে পদার্পণ করেছি, নবীন কর্মীকে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় রাজনৈতিক সচিব করে তার পাশে রেখেছেন। পাশে থেকে দেখেছি বিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে তাঁর নিরলস পরিশ্রম। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল এই বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে একদিন তিনি ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্যমুক্ত, শস্য-শামলা, সোনার বাংলায় রূপান্তরিত করবেন। সেই লক্ষ্য নিয়েই তিনি কাজ করেছেন।

দেশ স্বাধীন করেই বঙ্গবন্ধু দায়িত্ব শেষ করেননি। দেশ স্বাধীনের পর শূন্য হাতে যাত্রা শুরু করেন। গোলাঘরে চাল নেই, ব্যাংকে টাকা নেই, বৈদেশিক মুদ্রা নেই, রাস্তা-ঘাট, পুল-কালভার্ট সব ধ্বংসপ্রাপ্ত। যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংসপ্রাপ্ত। প্লেন, স্টিমার, কিছুই নেই। কিন্তু অতি তাড়াতাড়ি তিনি যোগাযোগ ব্যবস্থা বিশেষ করে ভৈরব ব্রিজ, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ যেগুলো শত্রুবাহিনী ধ্বংস করেছিল সেগুলো পুনঃস্থাপন করেন। বঙ্গবন্ধু সরকারের দায়িত্বভার গ্রহণের সময় বাংলাদেশ ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত এক জনপদ। বিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে তিনি সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। তাঁরই একক প্রচেষ্টায় ভারতীয় সেনাবাহিনী ’৭২-এর ১২ মার্চ বাংলাদেশ ত্যাগ করে। ’৭২-এর ৪ নভেম্বর মাত্র সাত মাসে বিশে^র অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংবিধান প্রণয়ন করেন। সংবিধান বলবৎ হওয়ার পর গণপরিষদ ভেঙে জাতীয় সংসদের সফল নির্বাচন অনুষ্ঠান করে সরকার গঠন করেন। আন্তর্জাতিক বিশ্বে তিনি ছিলেন মর্যাদাশালী নেতা। যে কারণে তাঁর দক্ষ ও দূরদর্শিতায় স্বল্প সময়েই বাংলাদেশ বিশে^র ১১৬টি দেশের স্বীকৃতি পায়। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে বাংলাদেশ ‘কমনওয়েলথ অব নেশন্স’, ‘জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন’, ‘ইসলামিক সম্মেলন সংস্থা’ ও ‘জাতিসংঘ’সহ অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্যপদ লাভ করে। আজ বিশেষভাবে মনে পড়ছে বঙ্গবন্ধুর সফরসঙ্গী হয়ে বিদেশ সফরের দিনগুলোর কথা। সফরসঙ্গী হিসেবে কাছে থেকে দেখেছি প্রতিটি সম্মেলন ও অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু ছিলেন আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। ’৭২-এর ৬ ফেব্রুয়ারি ছিল বঙ্গবন্ধুর প্রথম বিদেশ সফর। প্রতিবেশী ভারতের কলকাতা মহানগরীর ব্রিগেড ময়দানে ২০ লক্ষাধিক মানুষের গণমহাসমুদ্রে অসাধারণ বক্তৃতা করেছিলেন। সেদিন শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে রাজভবনে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পর শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে ’৭২-এর ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমি চাই ১৭ মার্চ আমার জন্মদিনে আপনি বাংলাদেশ সফর করুন। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি যাওয়ার আগে আমার অনুরোধ আপনি আপনার সেনাবাহিনী বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাহার করবেন।’ ’৭২-এর ১৭ মার্চ শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশে এসেছিলেন এবং ১২ মার্চ বিদায়ী কুচকাওয়াজের মধ্য দিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রত্যাহৃত হয়েছিল। তারপর ১ মার্চ ছিল মুক্তিযুদ্ধের আরেক মিত্রদেশ সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর। মহান মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুগোসøাভিয়া আমাদের সার্বিক সমর্থন জুগিয়েছিল। সেদিন সোভিয়েত ইউনিয়নের শীর্ষ নেতৃত্ব সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক লিওনিদ ইলিচ ব্রেজনেভ, সোভিয়েত রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পোদগর্নি, সরকারের প্রধানমন্ত্রী আলেক্সেই কোসিগিন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রে গ্রোমিকো-ক্রেমলিনে বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন। এরপর বঙ্গবন্ধু যুগোস্লাভিয়া সফরে গিয়েছিলেন। সফরসঙ্গী হিসেবে বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকে দেখেছি যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটো প্রটোকল ভঙ্গ করে বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। কারণ, সেদিন বঙ্গবন্ধু ছিলেন প্রধানমন্ত্রী আর মার্শাল টিটো প্রেসিডেন্ট। সেখান থেকে বঙ্গবন্ধু গিয়েছিলেন ’৭৩-এর ৩ আগস্ট কানাডার রাজধানী অটোয়াতে। সেখানে ৩২টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়েছিল কমনওয়েলথ সম্মেলন। কিন্তু সব নেতার মধ্যে আকর্ষণের কেন্দ্র্রবিন্দু ছিলেন সদ্য স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ’৭৩-এর ৯ সেপ্টেম্বর আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে সর্বমোট ছয়জন নেতার নামে তোরণ নির্মিত হয়েছিল। তন্মধ্যে জীবিত দুই নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অন্যজন মার্শাল জোসেফ ব্রোজ টিটো। আর প্রয়াত চারজন নেতা ছিলেন মিসরের জামাল আবদুল নাসের, ইন্দোনেশিয়ার ড. সুকর্ন, ঘানার প্রেসিডেন্ট কাউমি নক্রুমা এবং ভারতের প-িত জওহরলাল নেহরু। আলজেরিয়ার মঞ্চে দাঁড়িয়েই বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেছিলেন, ‘বিশ্ব আজ দুই ভাগে বিভক্ত। শোষক আর শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।’ ’৭৩-এর ৯ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু জাপান সফরে যান। ওই সফরে আমাদের সঙ্গে ছিলেন শেখ রেহানা ও শেখ রাসেল। জাপান সফরের মধ্য দিয়ে যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের সূচনা হয়, তা আজো অটুট রয়েছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন খাতে বিশেষ অবদান রেখে চলেছে জাপান। ’৭৪-এর ২২ ফেব্রুয়ারি যেদিন তিনি ইসলামিক সম্মেলনে যান সেদিন লাহোর বিমানবন্দরে দেখেছি মানুষ রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে সেøাগান তুলেছে-‘জিয়ে মুজিব জিয়ে মুজিব’, অর্থাৎ মুজিব জিন্দাবাদ মুজিব জিন্দাবাদ। লাহোরে এই সম্মেলনের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। এমনকি যতক্ষণ তিনি লাহোরে না পৌঁছেছেন, ততক্ষণ সম্মেলন শুরুই হয়নি। বঙ্গবন্ধুর জন্য একদিন সম্মেলন স্থগিত ছিল। বিশেষভাবে মনে পড়ে ’৭৪-এর ২৫ সেপ্টেম্বরের কথা। যেদিন জাতির পিতা জাতিসংঘে মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। বঙ্গবন্ধুকে প্রথমেই অনুরোধ করা হয়েছিল ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি ইংরেজিতে বক্তৃতা করবেন।’ বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা করতে চাই।’ জাতিসংঘে ভাষণ প্রদানের পর বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘের মহাসচিব কুর্ট ওয়াল্ডহেইমের সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপর ১ অক্টোবর ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু সাক্ষাৎ করেন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরার পথে ছয় দিনের সফরে ’৭৪-এর ৩ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু ইরাকের রাজধানী বাগদাদে পৌঁছান। সেখানেও রাষ্ট্রপ্রধানসহ সবাই বঙ্গবন্ধুর বিশাল ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হন। আমরা বড়পীর আবদুল কাদের জিলানি (রহ.)-এর মাজার জিয়ারতকালে মাজারের খাদেম বঙ্গবন্ধুকে মাজারের গিলাফ উপহার দেন। ’৭৫-এর ২৯ এপ্রিল থেকে ৬ মে পর্যন্ত জ্যামাইকার কিংস্টনে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু রেখেছিলেন তাঁর সরব উপস্থিতির উজ্জ্বল স্বাক্ষর ও প্রশংসনীয় নেতৃত্ব।

পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি লাভের পর লন্ডনে বিদেশি সাংবাদিকরা জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘আপনি যে বাংলাদেশে যাবেন, আপনার বাংলাদেশ তো যুদ্ধবিধ্বস্ত ধ্বংসস্তূপ। কিছুই নেই।’ তখন বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমার বাংলার মাটি ও মানুষ যদি থাকে, তবে এই ধ্বংসস্তূপ থেকেই একদিন আমি আমার বাংলাদেশকে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা সোনার বাংলায় পরিণত করব।’ আজ বাংলাদেশের যে উন্নয়ন কর্মকা- তার ভিত্তি বঙ্গবন্ধুর হাতেই হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে শক্তিশালী পরিকল্পনা কমিশন গঠন এবং তাঁর নির্দেশেই প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছিল। আজ যে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে, তারও ভিত্তি স্থাপন করেছেন বঙ্গবন্ধু ’৭৫-এ বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে। সেদিন আমি বঙ্গবন্ধুর সফরসঙ্গী ছিলাম। বাংলাদেশ গড়ার জন্য বঙ্গবন্ধু মাত্র সাড়ে তিন বছর সময় পেয়েছেন। এ সময়ে ১১৬টি দেশের স্বীকৃতি আদায় করে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন সরকার। বঙ্গবন্ধু সরকারের অর্থনৈতিক কর্মকা- পরিচালিত হয়েছে দুটি ভাগে। প্রথমভাগে পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন এবং দ্বিতীয়ভাগে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন। ১৯৭৪-’৭৫-এ বোরো মৌসুমে ২২ লাখ ৪৯ হাজার টন চাল উৎপাদিত হয়, যা ’৭৩-’৭৪-এর চেয়ে ২৯ হাজার টন বেশি। বঙ্গবন্ধু সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ডিসেম্বরে ঘোষণা দেবেন দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। জাতির পিতা বিধ্বস্ত দেশ পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করে দেশটাকে যখন স্বাভাবিক করেছিলেন এবং সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক মুক্তির লক্ষ্যে যখন দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি দিয়েছিলেন, ঠিক তখনই ঘাতকের নির্মম বুলেটে একাত্তরের পরাজিত শক্তি, বাংলার মিরজাফর বেইমান বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি জানত পুরো পরিবারটি ছিল বাঙালির জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের অংশ। ওই সময় বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা প্রবাসে থাকায় ঘাতকদের হাত থেকে রেহাই পান। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে খুনিচক্র মনে করেছিল বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করে দেবে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে দীর্ঘ নির্বাসন শেষে ’৮১-এর ১৭ মে বাংলাদেশের মাটি স্পর্শ করেন। আমরা সেদিন আওয়ামী লীগের রক্তে ভেজা পতাকা তার হাতে তুলে দিয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজ তথা অর্থনৈতিক মুক্তির, যে অর্থনৈতিক মুক্তি বঙ্গবন্ধু সমাপ্ত করতে পারেননি তার দায়িত্বভার গ্রহণ করে নিষ্ঠার সঙ্গে, সততার সঙ্গে উদয়াস্ত পরিশ্রম করে বাংলাদেশকে আজ তিনি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে, অনন্য উচ্চতায় আসীন করেছেন। সে দিন বেশি দূরে নয়, যেদিন বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় স্বপ্ন ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্যমুক্ত, সমৃদ্ধশালী সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠিত হবে।

   লেখক : আওয়ামী লীগ নেতা; সংসদ     সদস্য; সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয়     স্থায়ী কমিটি।

স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি সক্রিয় ও সংগঠিত হচ্ছে

অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান : ঐক্যফ্রন্ট ছিল তাৎক্ষণিকভাবে গঠিত নির্বাচনী জোট। বিএনপির সমর্থকগোষ্ঠী আছে, কিন্তু তাদের নেতৃত্ব ছিল না। তাদের চেয়ারপার্সন জেলে, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন বিদেশে। নির্বাচনে জেতার জন্য তাদের একজন নেতার দরকার ছিল। কয়েকজন সাবেক নেতা, সাবেক নেতা এজন্য বলছি, তারা একসময় নেতা ছিলেন, কিন্তু এখন যাদের কোনো অনুসারী নাই। ঐক্য ফ্রন্টের নেতারা এই সুযোগ নিতে চেয়েছিল। ‘পলিটিক্স ইজ দ্যা ওয়ে অব উইনিং পাওয়ার’ অর্থাৎ ক্ষমতা পাওয়ার জন্যই পলিটিক্স এর বাইরে কেউ যদি বলে আমি একদম আল্লাহর রাস্তায় পলিটিক্স করি, ক্ষমতা চাই না, সেটা ভিন্ন ইস্যু।

বিএনপি রাষ্ট্র ক্ষমতায় যেতে চায়। তাদের নেতৃত্ব শূন্যতা ছিল। এই দলছুট এবং সাবেকরা কিভাবে আবার ক্ষমতার স¦াদ পেতে পারে, এটার একটা সম্মেলন করছিল জোট গঠনের মাধ্যমে। যেহেতু তারা কোনো আদর্শ মেনে চলে না। তাদের আদর্শে একেবারে চরম বৈপরীত্য। একদিকে কামাল হোসেন সংবাদ সম্মেলন শুরু করেন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে, আবার এর সাথে সাথে সেখানে জোটের আরেক নেতা সুলতান মনসুর সে মুজিব কোট পরেন। আবার কাদের সিদ্দিকী তার স্ট্যান্ডগুলোকে রেখে জামাত-বিএনপিকে এক করলেন। এইযে টোটাল একটা হযবরল অবস্থা, এইটা না টেকারই কথা এবং এর পরিণতি এখন যা হওয়ার তাই হয়েছে। নির্বাচনে জিতলে আমরা কী কী করবো, আবার নির্বাচনে হারার বিষয়টিও রয়েছে- তখন ঐক্যফ্রন্ট কি করবে, এটার কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না। একদিকে স্বাধীনতার ঘোষক জিয়া আবার আরেকদিকে বঙ্গবন্ধুকে তুলে ধরবার চেষ্টা, এই দুইটা তো একসাথে হতে পারে না।

কারণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধু বিরোধী বিপরীত ধারার লোকরাই তো জামায়াত-বিএনপিতে ছিল। সেখানে যদি কয়েকটা লোক আবার মুক্তিযুদ্ধ কিংবা মুক্তিযুদ্ধের কথা সামনে নিয়ে আসে- সেটা হতে পারে না। নির্বাচন পার হলে কি করবে এই জোটটি, এই চিন্তা ভাবনা তখনো তাদের ছিল না। অতএব এটা যা হওয়ার তাই হচ্ছে। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ স্বৈরশাসক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং সৈ¦রশাসক তকমা নিয়েই চলে গেলেন। আমি বলছি এই চলে যাওয়াটা হয়তো বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিভিন্নভাবে বিশ্লেষিত হবে। কিন্তু এর রেশ কিন্তু বহুদিন থেকে যাবে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সম্পূর্ণ বিপরীতে গিয়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট আমি বলবো পূর্ব পাকিস্তান কায়েম করা হলো।

পরবর্তীকালে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বকালে একেবারে পাকিস্তানি করণের জন্য যা কিছু দরকার তাই করা হল। আমাদের ধর্ম নিরপেক্ষতার চেতনা, যেইটার উপর ভিত্তি করে সাম্যের চেতনা- সবকিছুকে মিলিয়ে ধর্মীয় একটা লেবাস নিয়ে আসা হলো। এইটাকেই ধারাবাহিকভাবে আবার বিভিন্ন ভাবে পীর, মসজিদ এই যে বিভিন্ন ধরনের ধর্মীয় অনুষঙ্গকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রধর্ম হঠকারীতা- এগুলোর জন্য ইতিহাস তাকে একটা প্লাট ফর্মে নিয়ে যাবে। জিয়াউর রহমান যে কাজটা আংশিক করেছেন, সেটা পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন কিন্তু এরশাদ করেছেন। এরশাদ এভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। আর এই যে প্লাটফর্মটা এইটা কিন্তু একই প্লাটফর্ম। এখন কি হালচাল হবে? জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী যতো রকমের অপশক্তি ছিল, এটা বাম-ডান, মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক, চাঁদাভিত্তিক সবগুলো মিলিয়ে এই প্লাটফর্মটা তৈরি করেছিল। আর এই প্লাটফর্মেই কাজী জাফর, মওদুদ-এর মতো লোকগুলোর আসা যাওয়া।

একই ঘটনা এখন ঘটবে। জাতীয় পার্টি যে দলটা, এইটাও কোনো না কোনো ভাবে অবস্থান গ্রহণ করবে। আমার ধারণা আরো অনেক ঘটনা ঘটবে এর মধ্যে। তাদের নর্থ বেঙ্গল বা রংপুর কেন্দ্রীক যে সাপোর্টা আছে, সেটা কোনদিকে যাবে- তা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। আর মনোজাগতিকভাবে এখনো কিছু লোক সেখানে রয়ে গেছে, যারা আসলে পাকিস্তানি ভাবধারার লোক। তবে এরশাদকে একটা বিষয়ের জন্য বাহবা দিতে হয়।

আসলে বাহবা না ঠিক, ক্রেডিট দেওয়া যেতে পারে। জেল থেকে বেরিয়ে আসার পরে ওই গাষ্ঠীর (মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী) সাথে ঐক্যবদ্ধভাবে থাকার যে প্রচেষ্টাটা ছিল, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে আলাদা অবস্থান নেওয়াতে কিছুটা হলেও স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির দিকে অবস্থান তাকে এতো দিন ধরে ক্ষমতায় টিকে থাকা কিংবা রাজনীতিতে থাকার সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছে বলে আমি অন্তত বিশ^াস করি। এরশাদ সাহেব যদি আগের প্লাটফর্মটা সমর্থন করে একই অবস্থানে থাকতো, আমরা মুক্তিযুদ্ধের যে অর্জনগুলা ফিরিয়ে আনছি, তা অনেক কঠিন হতো। কারণ এরশাদ সাহেব সংসদে দাঁড়িয়ে বলতে বাধ্য হয়েছিলেন, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এরশাদ সাহেব অতীতে যে অপকর্ম করছেন, তা ঢাকা না দেওয়া গেলেও এই বক্তব্যের মাধ্যমে কিছু বেনিফিট, রাজনৈতিক ফায়দা যাকে বলা হয়- সেটা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির দিকে কিছুটা হলেও আসছে বলে আমার মনে হয়। আমাদের বাংলাদেশের বয়স ৪৮ বছর। আমাদের বাংলাদেশের যে লক্ষ্য উদ্দেশ্যটা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে, সেই হিসেবে ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত কিন্তু এটা বাংলাদেশ ছিল না। পুরো সময়টা পূর্বপাকিস্তানের যে সেটআপটা ছিল, সেই মেন্টালিটির ছিল। এরশাদ যখন শাসনে ছিলেন, ৬৪ জেলার মাঝে ৫৪ জেলার এসপি সামরিক বাহিনীর লোক ছিল।

আমি শুধু একটা উদাহরণ দিলাম। আমরা কিন্তু পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে টানা ২০-২২ বছর হ্যাঁ-না এই সব ভোট দিয়ে আমাদের গণতন্ত্র চালিয়ে আসছি। আমাদের রাষ্ট্রপতি ক্যান্টনমেন্টে থাকতেন, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেত্রী ক্যান্টনমেন্টে থাকতেন। পাকিস্তান যেভাবে চলছে, আমরা কিন্তু ক্যান্টনমেন্টভিত্তিক সেই ব্যবস্থার মধ্যে ছিলাম। সে হিসেবে আমাদের গণতন্ত্রের বয়স কিন্তু ৫০ বছর না। ওয়ান ইলাভেনের পরের ঘটনা হচ্ছে, সেখানে যে লোকগুলা সক্রিয় তাদের মুখগুলা দেখলেই বোঝা যায়। জাতি যখন একেবারে বিপন্ন, পেছন থেকে সামরিক শাসকরাই চালাচ্ছিল দুই বছর। তখন দেখা গেছে এই লোকগুলো বিভিন্ন নামে যেমন, সৎ প্রার্থী খুঁজবে, যোগ্য প্রার্থী আন্দোলন, ট্রুথ কমিশন গঠন করে। এই লোকগুলা যখন গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা থাকে, তখন এক ধরনের অস্বস্তি অনুভব করে। আর ওই সময় তারা (সামরিক শাসক) মুক্ত ফিল্ড পেয়ে যায়। যতবারই বাংলাদেশে সামরিক শাসন বা কিছু একটা আসছে, ততবারই কিন্তু কিছু লোক স্বস্তিবোধ করছে। এই লোকগুলার তালিকা করে দেখানো যাবে। আমি যদি শব্দটা বলি, এই লোকগুলা প্রাণ ফিরে পায় সামরিক শাসন বা ওই ধরনের কিছু আসলে।

আমাদের গণতন্ত্র চর্চার যে বয়স, সেখান থেকে মাঝখানের এই ২২-২৩ বছর বাদ দিতে হবে। যদি বাদ না দিয়ে বলেন আমাদের গণতন্ত্র ৪০ বছর ৫০ বছরের মধ্যে আসছে, ম্যাচিউরিটি আসছে- আসলে এটা কখনো হয়নি। সেজন্য আমাদের আরো সময় অপেক্ষা করতে হবে। আরেকটা কথা হলো ঞযব ঃৎধফরঃরড়হ ভড়ৎস ড়ভ ফবসড়পৎধপু অর্থাৎ গণতন্ত্র ও গণতন্ত্র চর্চার যে রাজনীতি এর সাথে যেসকল বিষয়গুলো জড়িত ছিল। যেমন- জনসমাবেশ, জনগণকে একত্রিত করা, মিছিল করা, হরতাল-অবরোধ এগুলোর প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি একেবারে নেতিবাচক হয়ে গেছে। বিশেষ করে ২০১৫ সালের ১০ জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত হরতাল-অবরোধ রাজনীতির নামে এই অঞ্চলের মানুষ যা দেখছে, তাতে কোনোভাবেই এইসব হরতাল-অবরোধে মানুষের সাড়া আর পাওয়া যাবে না। অর্থাৎ নতুন কোনো পন্থা বের করতে হবে, পুরোনো পন্থা দিয়ে রাজনীতি আর চলবে না। সম্পূর্ণ বিরোধী চিন্তা-চেতনার লোকদের ঐক্য ইতিহাসে নতুন কিছু না। ইতিহাসে এরকম বহু ঘটনা আছে, চরম বৈরী বা পরস্পর একেবারে মুখোমুখি অবস্থানে থাকে।

বৈপরীত্য অবস্থানে থেকে পরবর্তীতে একসাথে রাজনীতিতে কাজ করার ঘটনা কিন্তু পৃথিবীতে বিরল না। যদি কেউ মনে করে যে, বিএনপি একটা দল যারা চরম অসংগঠিত হয়ে গেছে বা তাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই-এমন ভাবনা ভুল। কারণ বিএনপি একটি প্লাটফর্ম। ১৯৪৭ বা তারও আগ থেকে একটা প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী আমাদের রাজনীতিতে ছিল। যারা আমাদের ভাষা আন্দোলন, রবীন্দ্র সংগীত, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে ছিল। ৭০ এর নির্বাচনে ২৩.৭৪ শতাংশ লোক ৬ দফার বিরোধিতা করেছিল। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাও করেছিল। এই সমস্ত শক্তির লোকের একটা প্লাটফর্ম এই বিএনপি। এখন জেনেটিক্যালি তাদের আওয়ামী লীগের বিপক্ষে থাকতে হবে। অর্থাৎ বিএনপি ইচ্ছা করুক বা না করুক তবুও তারা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে থাকবেই। বিএনপি অন্য যে কোনো নাম ধারণ করুক, অন্য কেউ নেতৃত্বে আসুক, তারপরও কোনো না কোনোভাবে বিরুদ্ধ শক্তির লোক সেখানে থেকে যাবে।

এটাই বাস্তবতা। অর্থাৎ বাঙালির বাঙালিত্বে যত অনুষঙ্গ আছে সবকিছুর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর একটি শক্তি বাংলাদেশে ছিল। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে বিরোধিতাকারীরা ছিল এই বাংলা ভাষা-ভাষীদের মধ্যেই। আমি মনে করি এই বিরুদ্ধ শক্তি মাঝে মধ্যে দুর্বল হয়, কিন্তু হয়তো লুকিয়ে থাকে। তারা আবার শক্তি সঞ্চয় করবে এবং সময়মতো এরা সংগঠিত হবে। এজন্য যারা প্রগতিশীল, বাঙালিত্ব, মুক্তিযুদ্ধ, সাম্য, অসাম্প্রদায়িক চেতনার রাজনীতি করে, তাদের খুব বেশি স্বস্তিতে থাকার কারণ নেই। কেন না তারা যদি মনে করে, বিরুদ্ধ শক্তি ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে, জোট ভেঙে যাচ্ছে, দল ভেঙে যাচ্ছে বা তাদের নেত্রী তো জেলে আছে, এসব কারণে তারা যদি রিল্যাক্স মুডে চলে, এটা বিরাট ভুল হবে।

কারণ এই শক্তিটা হচ্ছে চেতনাগত। আমরা যতোই বলি যে এদের কোনো আদর্শ নাই। আদর্শ অবশ্যই আছে। মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী আদর্শ তাদের আছে। যার জন্য লাখো শহীদ রক্ত দিয়েছেন, যেটা বাঙালী জাতীয়তাবাদ, ধর্ম নিরপেক্ষ চেতনা, আমাদের যে সাম্যের রাজনীতি এই সবকিছুর বিরুদ্ধাচারণ করে যারা আছে, আমি মনে করি তাদের সংখ্যা কমেনি। আরো বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুধু রেমিট্যান্স আসেনি, মরু কালচারও আসছে। আমি মনে করি আমাদের বাংলাদেশ সরকারের যতো রকমের অর্থনৈতিক কমকাÐ পরিচালনা করার আছে, এর মধ্যে এমনটা হওয়া উচিত যাতে করে আমাদের লোককে কাজ করতে পশ্চাদপদ কোন দেশে যেতে না হয়। আমরা মনে করি কিছু টাকা হয়তো পেয়ে গেলাম। কিন্তু ওই যে পাকিস্তান, ইসলাম, মুসলমান, সৌদি আরব, সাতচল্লিশের পর থেকে এই যে ঘটনা, তা এখনো সক্রিয়। তাদের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড, অর্থনৈতিক ফ্লো, টাকা পয়সা ইত্যাদিতে তারা শক্তি সঞ্চয় করছে। এরা কখনো দমবে না। তাদের অস্তিত্বের কারণেই তারা এই বিরোধিতা করবে এবং সংগঠিত হবে। এই ব্যাপারে আমাদের সকলকে সতর্ক থাকতে হবে।
উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

ছয় দফা: শহীদের রক্তে লেখা | তোফায়েল আহমেদ

তোফায়েল আহমেদ : বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ছয় দফা ও ৭ জুন অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে। যে কারণে প্রতিবছর ৭ জুন আমরা ‘ছয় দফা দিবস’ হিসেবে পালন করি। আমাদের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে ছয় দফা ও ৭ জুনের গুরুত্ব অপরিসীম। ১৯৬৬-এর এই দিনে মনু মিয়া, মুজিবুল্লাহসহ অসংখ্য শহীদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলন।

পরবর্তীতে ’৬৯-এর গণআন্দোলনের সূচনালগ্নে এই ছয় দফা দাড়ি-কমা-সেমিকোলনসমেত এগারো দফায় ধারিত হয়ে, ’৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচনে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে আমরা এক দফা তথা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিচক্ষণ ও দূরদর্শী নেতা ছিলেন। তাঁর হৃদয়ের গভীরে সততই প্রবহমান ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা। প্রিয় মাতৃভূমির স্বাধীনতার বাইরে অন্য কোনো চিন্তা তাঁর ছিল না। জেল-জুলম-অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করে পরাধীনতার নাগপাশ থেকে বাংলাদেশকে তিনি স্বাধীন করেছেন। বঙ্গবন্ধু ছিলেন গণতান্ত্রিক-অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রবক্তা। আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে সর্বধর্মের, সর্ববর্ণের মানুষের জন্য তিনি আওয়ামী লীগের দরোজা উন্মুক্ত করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন বাংলাদেশ হবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। যার যার ধর্ম সেই সেই পালন করবে। কারো ধর্ম পালনে কেউ হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের অভিপ্রায় থেকেই তিনি জাতির উদ্দেশে ছয় দফা কর্মসূচি প্রদান করেছিলেন।

বাংলার গণমানুষ ’৬৬-এর ৭ জুন স্বাধিকার ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবসহ সকল রাজবন্দীর মুক্তির দাবিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সর্বব্যাপী হরতাল পালন করেছিল। স্বৈরশাসক আইয়ুব খান এদেশের গণতান্ত্রিক শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করে সংখ্যাগুরু বাঙালি জাতিকে গোলামীর শৃঙ্খলে চিরস্থায়ীভাবে শৃঙ্খলিত করার জন্য ষড়যন্ত্র করেছিল। এর বিপরীতে, বাংলার প্রাণপ্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ’৬৬-এর ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে সম্মিলিত বিরোধী দলসমূহের এক কনভেনশনে বাংলার গণমানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের দাবি সম্বলিত বাঙালির ‘ম্যাগনাকার্টা’ খ্যাত ঐতিহাসিক ‘ছয় দফা দাবি’ উত্থাপন করে তা বিষয়সূচিতে অন্তর্ভূক্ত করার প্রস্তাব করেন। কিন্তু সভার সভাপতি চৌধুরী মোহাম্মদ আলী ‘ছয় দফা দাবি’ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলে ফেব্রুয়ারির ১১ তারিখ বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে ঢাকা বিমানবন্দরে সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন এবং ২০ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে ‘ছয় দফা’ দলীয় কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। বাংলার মানুষের মুক্তিসনদ ‘ছয় দফা’ ঘোষণার পর জনমত সংগঠিত করতে বঙ্গবন্ধু তাঁর সফর সঙ্গীসহ ’৬৬-এর ২৫ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানের জনসভায় ‘ছয় দফা’কে ‘নূতন দিগন্তের নূতন মুক্তিসনদ’ হিসেবে উল্লেখ করে চট্টগ্রামবাসীর উদ্দেশে বলেন, ‘একদিন সমগ্র পাক-ভারতের মধ্যে ব্রিটিশ সরকারের জবরদস্ত শাসনব্যবস্থাকে উপেক্ষা করে এই চট্টগ্রামের জালালাবাদ পাহাড়েই বীর চট্টলের বীর সন্তানেরা স্বাধীনতার পতাকা উড্ডীন করেছিলেন। আমি চাই যে, পূর্ব পাকিস্তানের বঞ্চিত মানুষের জন্য দাবি আদায়ে সংগ্রামী পতাকাও চট্টগ্রামবাসীরা চট্টগ্রামেই প্রথম উড্ডীন করুন।’ চট্টগ্রামের জনসভার পর দলের আসন্ন কাউন্সিল সামনে রেখে ‘ছয় দফা’র যৌক্তিকতা তুলে ধরতে তিনি একের পর এক জনসভা করেন। এরই অংশ হিসেবে ২৭ ফেব্রুয়ারি নোয়াখালীর মাইজদি, ওইদিনই বেগমগঞ্জ, ১০ মার্চ ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা, ১১ মার্চ ময়মনসিংহ সদর ও ১৪ মার্চ সিলেটে অনুষ্ঠিত জনসভায় জনতার দরবারে তার বক্তব্য পেশ করেন।

‘ছয় দফা’ প্রচার ও প্রকাশের জন্য বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ছয় সদস্য বিশিষ্ট ‘উপ-কমিটি’ গঠন এবং তাঁরই নামে ‘আমাদের বাঁচার দাবি: ছয় দফা কর্মসূচি’ শীর্ষক একটি পুস্তিকা মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়। একই বছরের মার্চের ১৮, ১৯ ও ২০ তারিখ ছিল আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন। এদিন কাউন্সিল সভায় পুস্তিকাটি বিলি করা হয়। দলের সিনিয়র সহ-সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গীত হয়। বাঙালির বাঁচার দাবি ‘ছয় দফা’কে উপলক্ষ করে ’৬৬-এর মার্চে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের তিন দিনব্যাপী কাউন্সিল অধিবেশনটি ছিল সবিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সেদিনের সেই কাউন্সিল সভায় আগত ১৪৪৩ জন কাউন্সিলর বঙ্গবন্ধুকে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি, তাজউদ্দীন আহমদকে সাধারণ সম্পাদক ও মিজানুর রহমান চৌধুরীকে সাংগঠনিক সম্পাদক পদে নির্বাচিত করে। ‘ছয় দফা’র ভিত্তিতে সংশোধিত দলীয় গঠনতন্ত্রের একটি খসড়াও অনুমোদন করা হয়। ‘ছয় দফা’ কর্মসূচি প্রদানের সঙ্গে সঙ্গে ‘ছয় দফা’র ভিত্তিতে দলীয় গঠনতন্ত্র এবং নেতৃত্ব নির্বাচনে যে পরিবর্তন সাধিত হয় তা পরবর্তীকালে ‘ছয় দফা’র চূড়ান্ত পরিণতি এক দফা তথা স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠনের ইঙ্গিতবাহী ছিল। ‘ছয় দফা কর্মসূচি’ দলীয় কর্মীদের মধ্যে বিশেষ করে আমাদের মতো অপেক্ষাকৃত তরুণ ছাত্রলীগ নেতৃত্বের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।

পরবর্তীতে ‘ছয় দফা’ এতোই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল যে, বাংলার প্রায় প্রতি ঘরে ঘরে এই পুস্তিকা সযত্নে রক্ষিত হয়েছিল। ‘ছয় দফা’ সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু বলতেন, ‘সাঁকো দিলাম, স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতায় উন্নীত হওয়ার জন্য।’ বস্তুত, ‘ছয় দফা’ ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের বীজমন্ত্র তথা অঙ্কুর। কাউন্সিল অধিবেশনের শেষদিন অর্থাৎ ২০ মার্চ চরম প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে ঢাকার পল্টন ময়দানের জনসভায় দলীয় নেতা-কর্মী ও দেশবাসীর উদ্দেশে উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘চরম ত্যাগ স্বীকারের এই বাণী লয়ে আপনারা দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ুন। পূর্ব পাকিস্তানের প্রত্যন্ত প্রদেশের প্রতিটি মানুষকে জানিয়ে দিন, দেশের জন্য, দশের জন্য, অনাগতকালের ভাবী বংশধরদের জন্য সবকিছু জেনে-শুনেই আওয়ামী লীগের নেতা ও কর্মীরা এবার সর্বস্ব পণ করে নিয়মতান্ত্রিক পথে ছয় দফার ভিত্তিতে দেশব্যাপী আন্দোলনের জন্য এগিয়ে আসছে।’

আওয়ামী লীগের এই কাউন্সিল অধিবেশনটি ছিল বাঙালির ইতিহাসে বাঁক পরিবর্তন। যা ’৬৯-এর মহান গণঅভ্যুত্থান, ৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচন ও ’৭১-এর মহত্তর মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি তৈরি করেছিল। কাউন্সিল সভার সমাপনী জনসভায় বঙ্গবন্ধু মুজিব বলেছিলেন, ‘ছয় দফার প্রশ্নে কোনো আপস নাই। রাজনীতিতেও কোনো সংক্ষিপ্ত পথ নাই। নেতৃবৃন্দের ঐক্যের মধ্যেও আওয়ামী লীগ আর আস্থাশীল নয়। নির্দিষ্ট আদর্শ ও সেই আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য নিবেদিত প্রাণ কর্মীদের ঐক্যেই আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করে। আওয়ামী লীগ নেতার দল নয়-এ প্রতিষ্ঠান কর্মীদের প্রতিষ্ঠান। শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে এই ছয় দফা আদায় করতে হবে। কোনো হুমকিই ছয় দফা আন্দোলনকে প্রতিরোধ করতে পারবে না। ছয় দফা হচ্ছে বাঙালির মুক্তি সনদ।’ স্বভাবসুলভ কণ্ঠে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের, ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে’ উদ্ধৃত করে বলেছিলেন, ‘এই আন্দোলনে রাজপথে যদি আমাদের একলা চলতে হয় চলবো। ভবিষ্যৎ ইতিহাস প্রমাণ করবে বাঙালির মুক্তির জন্য এটাই সঠিক পথ।’ বঙ্গবন্ধু জানতেন ‘ছয় দফা’ই কেবল বাঙালির স্বাধিকার তথা পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করে অখণ্ড পাকিস্তানের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে। পক্ষান্তরে, পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর একটি অতি ক্ষুদ্র অংশ পাঞ্জাবীরা ‘ছয় দফা’ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে সংখ্যাগুরু বাঙালির রাষ্ট্র ক্ষমতায় আরোহন ঠেকাতে সর্বশক্তি নিয়োগ করে- যা পরিণামে স্বাধীন বাংলাদেশের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে।

সফলভাবে সমাপ্ত আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনের পর বঙ্গবন্ধু সারাদেশ চষে বেড়ান। ২৬ মার্চ সন্দ্বীপ এবং ২৭ মার্চ সাতকানিয়া বিশাল জনসভায় ‘ছয় দফা কর্মসূচি’ ব্যাখ্যা করে বক্তৃতা করেন। এরপর উত্তরাঞ্চল সফরে যান ’৬৬-এর ৭ এপ্রিল। ঐদিন পাবনা ও নগরবাড়ির  জনসমাবেশে তিনি বক্তৃতা করেন। একই মাসের ৮ তারিখ বগুড়া, ৯ তারিখ রংপুর, ১০ তারিখ দিনাজপুর, ১১ তারিখ রাজশাহী, ১৪ তারিখ ফরিদপুর, ১৫ তারিখ কুষ্টিয়া, ১৬ তারিখ যশোর এবং ১৭ তারিখ খুলনায় বিশাল সব জনসভায় ছয় দফার বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণসহ বক্তৃতা করেন। এভাবে সারাদেশে ৩৫ দিনে মোট ৩২টি জনসভায় তিনি বক্তৃতা করেন। বিপুল সংখ্যক জনতার অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত লাগাতার জনসভায় প্রদত্ত বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতায় ‘ছয় দফা’র সপক্ষে জনমত প্রবল হয়ে ওঠে। ফলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের ওপর নেমে আসে স্বৈরশাসক আইয়ুবের নির্মম গ্রেফতার-নির্যাতন। প্রত্যেক জেলায় অনুষ্ঠিত সভায় প্রদত্ত বক্তৃতার প্রতিপাদ্য বিষয়বস্তুর ওপর ভিত্তি করে বঙ্গবন্ধুকে প্রত্যেক জেলা থেকে জারিকৃত ওয়ারেন্ট বলে লাগাতার গ্রেফতার প্রক্রিয়া চলতে থাকে। এপ্রিলের ১৭ তারিখ রাত ৪টায় খুলনায় এক জনসভায় ভাষণদান শেষে ঢাকা ফেরার পথে রমনা থানার জারিকৃত ওয়ারেন্ট অনুযায়ী পাকিস্তান দেশরক্ষা আইনের ৪৭ (৫) ধারা বলে পুলিশ বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে। যশোর মহকুমা হাকিমের এজলাস হতে তিনি জামিন পান। সেদিনই রাত ৯টায় সিলেটে গ্রেফতার, পুনরায় জামিনের আবেদন এবং ২৩ তারিখ জামিন লাভ, ২৪ এপ্রিল ময়মনসিংহে গ্রেফতার এবং ২৫ এপ্রিল জামিন লাভ করেন বঙ্গবন্ধু। ‘ছয় দফা’ প্রচারকালে তিন মাসে বঙ্গবন্ধুকে সর্বমোট ৮ বার গ্রেফতার করা হয়। এভাবেই আইয়ুবের দমন নীতি অব্যাহত থাকে। একই বছরের ৮ মে নারায়ণগঞ্জের চাষাড়ায় ঐতিহাসিক ‘মে দিবস’ স্মরণে শ্রমিক জনতার এক বিরাট সমাবেশে শ্রমিকরা বঙ্গবন্ধুকে বিপুল সংবর্ধনা দেয় এবং পাটের মালায় ভূষিত করে। ভাষণদান শেষে রাত ১টায় তিনি যখন বাসায় ফেরেন তখন পাকিস্তান দেশরক্ষা আইনের ৩২ (১) ‘ক’ ধারা বলে তাঁকেসহ তাঁর ঘনিষ্ট রাজনৈতিক সহকর্মীদের গ্রেফতার করা হয়। ‘ছয় দফা’ দেওয়াকে অপরাধ গণ্য করে স্বৈরশাসক আইয়ুব বঙ্গবন্ধুকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ হিসেবে অভিহিত করে দেশরক্ষা আইনের আওতায় আওয়ামী লীগের ওপর অব্যাহত গ্রেফতার-নির্যাতন চালায়।

সামরিক সরকারের এহেন কার্যকলাপের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের আহ্বানে ১৩ মে সমগ্র প্রদেশে ‘প্রতিবাদ দিবস’ পালিত হয়। প্রতিবাদ দিবসের জনসভায় ‘ছয় দফা’র প্রতি গণমানুষের বিপুল সমর্থন প্রকাশ পায়। হাজার হাজার শ্রমিক এদিন স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল পালন করে এবং পল্টনে অনুষ্ঠিত জনসভায় উপস্থিত হয়ে সরকারের দমননীতির তীব্র প্রতিবাদ করে। দলের নব-নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদকে গ্রেফতার করা হলে সাংগঠনিক সম্পাদক মিজান চৌধুরী অস্থায়ী সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। নেতৃবৃন্দের গ্রেফতার-নির্যাতনের বিরুদ্ধে ২০ মে আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে ‘৭ জুন’ সর্বব্যাপী হরতাল আহ্বান করা হয়। ৭ জুনের হরতালে সমগ্র পূর্ব বাংলা যেন অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। বিক্ষুব্ধ মানুষ স্বাধিকার ও বঙ্গবন্ধুসহ সকল রাজবন্দীর মুক্তির দাবিতে সেদিন সোচ্চার হয়।

আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, ছাত্রলীগের সার্বক্ষণিক কর্মী, ইকবাল হল (বর্তমানে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ছাত্র সংসদের নির্বাচিত ভিপি। শেখ ফজলুল হক মণি, আমাদের প্রিয় মণি ভাইসহ, সর্বজনাব সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক, আমীর হোসেন আমু, সৈয়দ মাজহারুল হক বাকী, আব্দুর রউফ, খালেদ মোহাম্মদ আলী, নূরে আলম সিদ্দিকীসহ আরো অনেকে-আমরা সেদিন হরতাল কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। আমার স্মৃতিপটে এখনো ভাস্বর হয়ে আছে দিনটি। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মণি ভাই এসেছেন হরতালের পক্ষে প্রচার কাজ চালানোর জন্য। তিনি তখন ছাত্র নন। ড. ওদুদুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ছিলেন। তিনি মণি ভাইকে বললেন, ‘মণি, তুমি এখন ছাত্র নও। তুমি ক্যাম্পাসে অবস্থান কোরো না, চলে যাও। তুমি যদি না যাও তবে আমার চাকরি যাবে।’ মণি ভাই স্যারের কথায় সবিনয়ে সম্মতি জানিয়ে আমাদের হরতাল কর্মসূচি যথাযথভাবে পালনের নির্দেশ দিয়ে ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন। সেদিনের হরতাল কর্মসূচিতে ধর্মঘটী ছাত্র-জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার জন্য সরকারের নির্দেশে পুলিশ বাহিনী নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে। ফলে তেজগাঁয় শ্রমিক মনু মিয়া, মুজিবুল্লাহসহ এগারো জন শহীদ হন এবং প্রায় আটশ’ লোককে গ্রেফতার করা হয়। তেজগাঁ শিল্পাঞ্চলে হরতাল সফল করার দায়িত্বে ছিলেন ছাত্রনেতা খালেদ মোহাম্মদ আলী ও নূরে আলম সিদ্দিকী। তাঁরা সেখানে বক্তৃতা করেন। প্রকৃতপক্ষে ৭ জুন ছিল স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতার পথের আরম্ভস্থল তথা যাত্রাবিন্দু। আর আমরা যারা ছাত্রলীগের কর্মী ছিলাম, আমাদের রাজনৈতিক চেতনার ভিত্তিও স্থাপিত হয়েছিল এদিনটিতেই।

১৯৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারির মহান ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ’৬২-এর ১৭ সেপ্টেম্বরের ‘শিক্ষা আন্দোলন’; ‘৬৬-এর ৭ জুন ‘ছয় দফা আন্দোলন’; ’৬৯-এর ১৭ থেকে ২৪ জানুয়রির ‘গণআন্দোলন-গণঅভ্যুত্থান’; ৯ ফেব্রুয়ারি ১১-দফা বাস্তবায়ন ও বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে শপথ দিবস পালন; স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের পদত্যাগ; আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও বঙ্গবন্ধুসহ সব রাজবন্দীর নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে ১৫, ১৬, ১৭, ১৮, ১৯, ২০ ও ২১ ফেব্রুয়ারি লাগাতার সংগ্রাম শেষে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম প্রদান; অতঃপর ২২ ফেব্রুয়ারি সব রাজবন্দীর মুক্তির পর বঙ্গবন্ধুর মুক্তি লাভ এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ১০ লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতিতে ‘মুক্ত মানব শেখ মুজিব’কে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি প্রদান– পঞ্চাশের দশক থেকে বাঙালির জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের লক্ষ্যে গড়ে তোলা এসব আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে ছাত্রলীগ। এসব মহিমান্বিত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ছাত্রলীগ অর্জন করেছিল গণতান্ত্রিক তথা নিয়মতান্ত্রিক আচরণ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং জয় করে নিয়েছিল বাংলার মানুষের হৃদয় আর সৃষ্টি করেছিল ইতিহাস। অতীতে আমাদের সময়ে ছাত্রলীগের সম্মেলন গঠনতন্ত্র মোতাবেক প্রতিবছর ২১ মার্চের মধ্যে সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা ছিল। তা না হলে তিন সদস্য বিশিষ্ট কমিটির কাছে নেতৃত্ব তুলে দিতে হতো। এটাই ছিল বিধান এবং গঠনতান্ত্রিক বিধি-বিধানের অন্যথা হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। বিধান মোতাবেক ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের পরে আমি ছাত্রলীগের সভাপতি এবং আসম আব্দুর রব সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে একবছর পরে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ২১ মার্চের মধ্যে সম্মেলন করে নূরে আলম সিদ্দিকী এবং শাজাহান সিরাজের কাছে নেতৃত্বের দায়িত্বভার অর্পণ করি এবং কমিটি থেকে আমরা বিদায় নেই। ২২ মার্চ হল ত্যাগ করে গ্রিন রোডে ‘চন্দ্রশীলা’ নামে একটি বাসা ভাড়া করে আমি এবং রাজ্জাক ভাই বসবাস শুরু করি।

আজ অতীতের সেই সোনালী দিনগুলোর দিকে যখন ফিরে তাকাই স্মৃতির পাতায় দেখি, সেদিনের ছাত্রলীগ ছিল বাংলার গণমানুষের অধিকার আদায় তথা ‘মুজিবাদর্শ’ প্রতিষ্ঠার ভ্যানগার্ড। মূলত বঙ্গবন্ধু মুজিবের নির্দেশে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের নেতৃত্বই সেদিন সারাদেশে ৭ জুনের কর্মসূচি সফলভাবে পালন করে স্বাধিকারের পথে এক অনন্য নজির স্থাপন করে। আর বাংলার মেহনতি মানুষ আত্মত্যাগের অপার মহিমার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীসহ সমগ্র বিশ্বকে জানিয়ে দেয় যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব প্রদত্ত ‘ছয় দফা’ই হচ্ছে বাঙালির জাতীয় মুক্তির একমাত্র পথ।

‘ছয় দফা’কে প্রতিহত করার জন্য পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী বহু ষড়যন্ত্র করেছে। কিন্তু ‘ছয় দফা’র প্রতি বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় স্থির-প্রতিজ্ঞাবোধ তাঁকে জনমনে অধিনায়কের আসনে অধিষ্ঠিত করে। ’৬৬-এর ৮ মে বঙ্গবন্ধুকে কারাগারে নিক্ষেপ করে তাঁর বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দিয়েও ‘ছয় দফা’ আন্দোলনকে যখন রোধ করা যাচ্ছিল না, তখন বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে চিরতরে তাঁর কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য স্বৈরশাসক আইয়ুব খান ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য’ মামলা দেন। ‘ছয় দফা’ দাবি আদায়ে এবং বঙ্গবন্ধুকে কারামুক্ত করতে বাংলার সর্বস্তরের মানুষসহ আমরা যারা ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম তারা ’৬৯-এর জানুয়ারির ৪ তারিখে ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনটিতে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে ছয়-দফাকে এগারো দফায় অন্তর্ভুক্ত করে সারাবাংলার গ্রামে-গঞ্জে-শহরে-বন্দরে-কলে-কারখানায় ছড়িয়ে দিয়েছিলাম। ফলশ্রুতিতে এগারো দফা আন্দোলনের পক্ষে সারাদেশে যে গণজোয়ার তৈরি হয় তাতে দেশে বৈপ্লবিক পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে। এমতাবস্থায় শাসকশ্রেণী গণআন্দোলনকে নস্যাৎ করতে আমাদের ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ হিসেবে চিত্রিত করে। তাদের এই অপপ্রয়াসের সমুচিত জবাব দিতে ’৬৯-এর ৯ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের শপথ দিবসের জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধু মুজিবের নির্দেশে বলেছিলাম, ‘পূর্ব বাংলার মানুষ কোনোদিন বিচ্ছিন্নতাকে প্রশ্রয় দেয়নি এবং বিচ্ছিন্নতায় বিশ্বাসীও নয়। কারণ তারা সংখ্যায় শতকরা ৫৬ জন। যদি কারো পূর্ব বাংলার সঙ্গে থাকতে আপত্তি থাকে তবে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে।’ নেতার এই নির্দেশ আমরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মেনে চলেছি। পাকিস্তান সেনাবাহিনী গণহত্যা চালানোর আগ পর্যন্ত কোনোরকম উগ্রতাকে অতি বিপ্লবীপনাকে আমরা প্রশ্রয় দেইনি। নিয়মতন্ত্রের মধ্যেই বঙ্গবন্ধু সংগ্রাম পরিচালনা করেছেন। বিচ্ছিন্নতাবাদের অভিযোগে আমাদের কখনোই অভিযুক্ত করা যায়নি। আমরা আমাদের মুক্তি সংগ্রামের ন্যায্যতা প্রমাণ করে মুক্তিসংগ্রামী হিসেবেই এগিয়ে গেছি। আর এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে ৭ জুনের কর্মসূচি পালনকালে শহীদদের বীরত্বপূর্ণ আত্মদান।

ছয় দফার পক্ষে ৭ জুনের হরতাল এতোটাই সর্বব্যাপী ছিল যে, এসম্পর্কে কোনো রকম প্রতিবেদন মুদ্রণ ও প্রকাশের ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা বলবৎ ছিল। বিধি-নিষেধ সত্ত্বেও মানিক মিয়া তাঁর কলামে লেখেন ‘ছয় দফা আন্দোলনকে নস্যাৎ করার জন্য গৃহীত নিষ্ঠুর ব্যবস্থাদির কারণে মর্মান্তিক পরিস্থিতিতে একমাত্র সান্ত্বনার বিষয় হলো এই যে, জনসাধারণ ছয় দফা আন্দোলন তথা আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনকে তাদের নিজেদের আন্দোলন হিসেবে গ্রহণ করেছে।’ ৭ জুনের সর্বাত্মক হরতাল কর্মসূচি ও ‘ছয় দফা’র পক্ষে জনমত তৈরিতে ইত্তেফাকের ভূমিকায় ক্ষুব্ধ হয়ে ৬৬-এর ১৬ জুন পাকিস্তান প্রতিরক্ষা বিধির ৩২(১) ধারার আওতায় তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে গ্রেফতার এবং দ্য নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেস বাজেয়াপ্ত করে। পরবর্তীতে ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের ফলে দৈনিক ইত্তেফাক এবং বাজেয়াপ্তকৃত নিউ নেশন প্রিন্টিং প্রেসটি ফেরৎ প্রদানে স্বৈরশাসক বাধ্য হয়েছিল। মূলত ‘ছয় দফা’ দাবি আদায় ও পাকিস্তানের স্বৈরতান্ত্রিক শাসন থেকে মুক্তির জন্যই ৭ জুন আমরা হরতাল পালন করেছিলাম, সংগ্রাম করেছিলাম। ৭ জুন যে সার্বভৌম পার্লামেন্টের দাবিতে আমরা ছয় দফার পক্ষে সংগ্রাম করেছিলাম সেই কর্মসূচির ফলশ্রুতিই হচ্ছে আজকের এই স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ। ৭ জুন ছিল এর সূচনা বিন্দু। আজ ভাবতে কতো ভালো লাগে, আমাদের জাতীয় জীবনে শত শহীদের রক্তে লেখা এদিনটি চেতনায় জাতীয় মুক্তির যে অগ্নিশিখার জন্ম দিয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতায় ’৭০-এর ঐতিহাসিক এই ৭ জুনে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে এবং তাঁরই নির্দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগদান করি। আমি হই আওয়ামী লীগের একজন সাধারণ কর্মী। আওয়ামী লীগে যোগদানের পর বঙ্গবন্ধু আমাকে আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে জাতীয় পরিষদে মনোনয়ন দেন এবং মাত্র সাতাশ বছর এক মাস পনেরো দিন বয়সে আমি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হই। এরপর ’৭১-এ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ও নির্দেশে মুজিব বাহিনীর চার প্রধানের অন্যতম হয়ে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করি। স্বাধীনতার পর ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে ১২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হয়ে ১৪ জানুয়ারি প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় আমাকে তাঁর রাজনৈতিক সচিব নিয়োগ করেন।

আজ ৭ জুন অতীতের অনেক স্মৃতি আমার মানসপটে ভেসে ওঠে। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। বঙ্গবন্ধুর স্নেহে আমার জীবন ধন্য। ৭ জুনের চেতনাবহ এই দিনটি আমার জীবনে অম্লান হয়ে আছে। ৭ জুন যেসব শহীদ ভাইয়েরা তাঁদের বুকের তাজা রক্ত দিয়ে, জীবন দিয়ে, বাংলার মানুষের মুক্তির পথকে প্রশস্ত করে গিয়েছেন, আজ তাঁদের পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করি। তাঁদের অমর প্রাণের বিনিময়ে সংগ্রাম পরম্পরায় এক সাগর রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ কায়েম হয়েছে। শহীদের রক্তের সিঁড়ি বেয়ে জাতির পিতার সংগ্রামী চেতনার ভিত্তিতে, বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আজ আমরা উন্নয়নের নবদিগন্তের সূচনা করেছি। প্রকৃতপক্ষে ঐতিহাসিক ৭ জুন ছিল আমাদের স্বাধিকার ও স্বাধীনতার চেতনার প্রারম্ভ বিন্দু। এই দিনটিতে ৭ জুনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন কর্তব্য বলে মনে করি।

..

লেখক
আওয়ামী লীগ নেতা
সংসদ সদস্য ও সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি
ইমেইল: tofailahmed69@gmail.com