Home / নারীস্বাস্থ্য

নারীস্বাস্থ্য

ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভধারণ প্রতিরোধের উপায় কী?

ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভধারণ প্রতিরোধের উপায় কী?

সিলেট টুয়েন্টিফোর এক্সপ্রেস ডেস্ক : গর্ভাবস্থা মানেই একটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা। তবে আরো কিছু বিষয় রয়েছে যেগুলো গর্ভাবস্থাকে অনেক ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। গর্ভাবস্থার ঝুঁকিগুলো কী এবং এগুলো কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়, এ বিষয়ে কথা বলেছেন ডা. সংযুক্তা সাহা। বর্তমানে তিনি উত্তরা মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অবস ও গাইনি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কর্মরত। এনটিভির নিয়মিত আয়োজন স্বাস্থ্য প্রতিদিন অনুষ্ঠানের ৩৪৯১তম পর্বে সাক্ষাৎকারটি প্রচারিত হয়।

প্রশ্ন : গর্ভাবস্থা কোন অবস্থায় গেলে একে ঝুঁকিপূর্ণ বলে?

উত্তর : গর্ভাবস্থায় বিভিন্ন জটিলতার কারণে মা ও শিশু মৃত্যু হওয়ার আশঙ্কা থাকলে, সেটি হলো ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভধারণ।

প্রশ্ন : সেগুলো কী?

উত্তর : যেগুলো হলো, প্রি একলামসিয়া, জমজ সন্তান থাকা, রক্তক্ষরণ হওয়া, গর্ভাবস্থায় শিশুর পজিশন ভিন্ন থাকার ক্ষেত্রে গর্ভধারণ কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়।

ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভধারণ মানে এ নয় যে সবসময় মা ও শিশুর জটিলতা হবে। এ বিষয়টি নিয়ে জানলে আমরা সমস্যাগুলো প্রতিরোধ করতে পারি।

প্রশ্ন : মা গর্ভধারণ করলে সেটি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, এমন কিছু আগে থেকে বোঝার কোনো উপায় রয়েছে কি?

উত্তর : হ্যাঁ, অবশ্যই। আমরা জানি, প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম। প্রতিরোধটাই কিন্তু সবচেয়ে বড় হাতিয়ার আমার জন্য। আমরা সবসময় বলি যে যেকোনো গর্ভবতী নারীকে গর্ভকালীন চেকআপে যাওয়া উচিত। ডাক্তারি চেকআপের মাধ্যমেই কিন্তু বলা সম্ভব এটি ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থা কি না।

প্রশ্ন : কোন কোন রোগ গর্ভধারণকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে?

উত্তর : আমরা বলি, কো-মরবিডিটি। মায়ের হয়তো আগে থেকে ডায়াবেটিস রয়েছে বা কিডনির সমস্যা রয়েছে- এগুলো থাকলে অবশ্যই উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভধারণ হবে। এ জন্য আগে থেকেই জানা দরকার, এসএলই , উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদি রয়েছে কি না।

গর্ভকালে খুব কম মায়েরা অ্যান্টিনেটাল চেকআপে থাকে। অনেক মুরুব্বিরা হয়তো বলে, আমাদের বাচ্চা হয়েছে আমরা তো ডাক্তারের কাছে যাইনি। চেকআপের মাধ্যমে নবজাতক ও গর্ভবতীর স্বাস্থ্য যে নিশ্চিত করা যায় এটা অনেকে বোঝেন না।

প্রশ্ন : চেকআপে গেলে সাধারণভাবে আপনারা কী কী দেখে থাকেন?

উত্তর : এর আগে আরেকটি কথা বলতে চাই। যারা ভাবেন গর্ভকালটা একদমই ফিজিওলজিক্যাল, তাদের জানা দরকার বাংলাদেশে মায়ের মৃত্যুর হার এখনো বেশি। এর মধ্যে ২০ ভাগ কিন্তু প্রি-একলামসিয়ায়। এটি প্রতিরোধ করা যায়। এরপর ৩১ শতাংশ কিন্তু গর্ভকালীন রক্তক্ষরণ। সাত ভাগ ক্ষেত্রে হলো সংক্রমণ, ৪০ ভাগ ক্ষেত্রে অন্যান্য। এগুলো তো সবই প্রতিরোধযোগ্য। তাহলে আপনাকে জানতে হবে গর্ভকালীন অবস্থায় আপনাকে চেকআপে যেতে হবে। বের করতে হবে, আপনার গর্ভকালীন অবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ কি না।

প্রশ্ন : চেকআপে কতদিন পর পর যেতে হবে?

উত্তর : আমরা বলি, ২৮ সপ্তাহ পর্যন্ত আপনি প্রতি মাসে মাসে যাবেন। এতবার চেকআপ না করাতে পারলে, ডাব্লিউ এইচও কিন্তু একটি আদর্শ সেট তৈরি করেছে। এই নয় মাসে আপনি চার বার যান অন্তত। তাহলেও জানা যাবে, তারটা ঝুঁকিপূর্ণ বা ঝুঁকিহীন কি না।

এরপর দ্বিতীয় কথা হলো, কোনো পরিকল্পনা নেই যে কোথায় ডেলিভারি করবে। হাসপাতালে না কি বাড়িতে। বাড়িতে যদি করতে চায়, তাহলে দেখতে হবে কোনো প্রশিক্ষিত দাই রয়েছে কি না। প্রশিক্ষিত দাই পেয়ে থাকলে, দেখতে হবে, দাই জানেন কি না যেকোনো সময়টা রোগীকে রেফার করতে হবে। রেফার করতে হলে তার যাতায়াত ব্যবস্থা কী এবং কাছকাছি স্বাস্থ্যকেন্দ্র কোথায় জানতে হবে। অনেকে জানেন না তার ব্লাড গ্রুপ কী, প্রয়োজনে কোথা থেকে তাকে রক্ত নিতে হবে এবং কে কে দিতে পারবে। প্রসব পূর্ববর্তী পরিকল্পনা তো সে অ্যান্টিনেটাল চেকআপের মাধ্যমেই জানতে পারবে। অ্যান্টিনেটাল চেকআপ ছাড়া তো সে জানতে পারবে না। পানি ভাঙ্গা, জ্বর আসা, খিচুনি হওয়া, মাথা ঘুরানো, চোখে ঝাপসা দেখা যে বিপজ্জনক লক্ষণ, সেটাও সে জানতে পারবে, যদি চেকআপের ভেতর থাকে।

অনেক উন্নত দেশে দেখবেন গর্ভাবস্থার আগেই তারা চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছেন। এটি কেন প্রয়োজন আমি বলি, ফলিক এসিড নামে ভিটামিনটি আমাদের দেহে বেশি থাকলে, দেহে নিউরালটিভ ডিফেক্টটা হয় না। নিউরাল টিউব কিন্তু তৈরি হয়ে যায় ২৪ থেকে ২৮ সপ্তাহের মাধ্যমে। এর অর্থ কী? প্রথম যখন মা জানতে পারে সে গর্ভধারণ করেছে, দেড় মাস পরে তার আগেই কিন্তু শিশুর নিউরাল টিউব তৈরি হয়ে যাচ্ছে। তার শরীরে যদি ফলিক এসিডের ঘাটতি থাকে, তাহলে অবশ্যই শিশুর নিউরাল টিউবের ঘাটতি হবে। কিন্তু সে যদি গর্ভধারণের আগে চিকিৎসকের চেকআপে যায়, তাহলে সে জানতে পারে, ফলিক এসিড নামের ভিটামিনটা তাকে খেতে হবে। এরপর রয়েছে রুবেলা ভাইরাস। রুবেলা ভাইরাস দিয়ে গর্ভকালে সংক্রমিত হলে, তাহলে আমরা জানি যে বাচ্চা জন্মগতভাবে বধির হয়। তাহলে তার গর্ভ পূববর্তী অবস্থায় ব্লাড টেস্টের মাধ্যমে সব জানতে হবে রুবেলা পজিটিভ বা নেগেটিভ কি না। যদি নেগেটিভ হয়ে থাকে, তাহলে তাকে ভ্যাকসিন দিতে হবে। হেপাটাইটিস ভাইরাসের অনেক জটিলতা রয়েছে আমরা জানি। এ জন্য হেপাটাইটিস প্রতিরোধী ভ্যাকসিনেশন করা রয়েছে কি না দেখতে হবে। এসব বিষয় সে গর্ভ পূর্ববর্তী চেকআপে জানতে হবে। কেবল তাই নয়, সে গর্ভ ধারণের জন্য ফিট কি না সেটিও জানতে পারবে।

এরপর থেলাসেমিয়ার কথা বলি। হঠাৎ করে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই জানতে পারল যে সে থেলাসেমিয়া মাইনর। এগুলো সে আগে জানতে পারত, যদি সে গর্ভ পূববর্তী স্ক্রিনিংয়ে যেত।

আরেকটি বিষয়। বাচ্চা হয়তো মায়ের বুকের দুধ খাচ্ছে, তবু সে সুস্থ নয়। তাহলে ওই মা জানলই না পুষ্টি একটি বিরাট বিষয় এ ক্ষেত্রে। বাচ্চা যদি আড়াই কেজির নিচে হয়, সেই বাচ্চার মৃত্যুর হার স্বাভাবিক ওজনের বাচ্চার তুলনায় ৪০ শতাংশ বেশি। তাহলে মা-কে পুষ্টিযুক্ত খাবার খেতে হবে। তাকে ফিট থাকতে হবে। দুই বছরের একটি বিরতি দিতে হবে, দুইটি বাচ্চার মাঝখানে। কারণ, একজন সুস্থ মা-ই তো সুস্থ সন্তান জন্ম দিতে পারে।

এখানে আরো কিছু বিষয় রয়েছে, আমরা যদি দেখি যে সে আগে থেকে ডায়াবেটিসে ভুগছে, তার উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে, তাকে কিন্তু জানতে হবে, ডায়াবেটিস অনেক কমিয়ে নিয়ে তাকে গর্ভবতী হতে হবে। তার এসব বিষয় সেট করে নিয়েই কিন্তু গর্ভবতী হওয়া উচিত। তখনই সম্ভব একজন সুস্থ মা ও সুস্থ নবজাতক পাওয়া।