Breaking News
loading...
Home / উপ সম্পাদকীয় / জঙ্গিবাদের শেকড়ের সন্ধান ও উৎপাটনে করণীয় 

জঙ্গিবাদের শেকড়ের সন্ধান ও উৎপাটনে করণীয় 

বাহালুল মজনুন চুন্নূ

বাহালুল মজনুন চুন্নূ : জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ এমন সব ক্রিয়াকলাপ, যার মাধ্যেমে একশ্রেণির বিপথগামী গোষ্ঠী বলপ্রয়োগের মাধ্যমে তাদের উগ্র-সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বৈধ সরকারকে উৎখাত করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যেতে চায় এবং তাদের কট্টর নীতিকে জনগণের ওপর চাপানোর চেষ্টা করে থাকে। এ জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদ আজকে বিশ্বব্যাপী প্লেগের থেকেও মহামারী আকার ধারণ করেছে। বিপথগামী উগ্রবাদী গোষ্ঠী যখন থেকে ধর্মকে আশ্রয় করে ধর্মীয় অপব্যাখ্যার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে উগ্রবাদী কর্মকাণ্ড পরিচালনা শুরু করে, তখন থেকেই তা জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ ইত্যাদি নাম ধারণের মাধ্যমে ভয়াবহ রূপ পরিগ্রহ করে নিজেদের হিংস্রতার জানান দিতে থাকে। এটি বিশ্বের বিভিন্ন সমাজে এখন রাজনৈতিক বাস্তবতা, যা শান্তি, নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও সভ্যতার জন্য বড় আকারের হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। মূলত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন ইউরোপে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটে। ওই সময়টায় জার্মানির নাৎসি বাহিনী ইহুদি নিধনযজ্ঞে মেতে ওঠে। এরপর ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে পশ্চিমা বিশ্ব মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদকে কুক্ষিগত রাখতে সুকৌশলে মুসলমানদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টির মাধ্যমে একশ্রেণির সরকারবিরোধী জঙ্গিগোষ্ঠী লালন শুরু করে, যা ক্রমান্বয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিস্তৃত হতে হতে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। কেড়ে নিয়েছে রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের চোখের ঘুম। নৃশংস হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠেছে জঙ্গিগোষ্ঠী। আইএস নামক দানবীয় জঙ্গিগোষ্ঠী সারা বিশ্বের সুজলা-সুফলা সবুজ ভ‚মিকে রক্তে রঞ্জিত করে তুলেছে।

বিশ্বের কোনো দেশে যে এই দানবের ছোঁয়া লাগেনি, তা কেউ বলতে পারবে না। আবার আইএসের নাম ব্যবহার করে কোনো কোনো দেশের অভ্যন্তরে লুক্কায়িত জঙ্গিগোষ্ঠী হামলা চালিয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে। তারা তা পারছে যে কোনো সাম্প্রদায়িক হামলায় আইএসের দায় স্বীকারের ট্রেন্ডের তথা প্রবণতার কারণে। আইএস মিডিয়ায় নিজেদের প্রচারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে থাকে। সামরিক ফ্রন্টের বাইরে তাদের অন্যতম কৌশলই হচ্ছে প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে নিজের অবস্থানকে সুদৃঢ় করা। তাই কোথাও কোনো হামলা হলেই তারা দায় স্বীকার করে নেয়। কিন্তু তাদের এ দায় স্বীকার সংস্কৃতির কারণে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর ওপর ছড়ি ঘোরানোর সুযোগ পেয়ে যায় সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠীগুলো। উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশের কথা বলা যেতে পারে। সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং তাদের তাঁবেদার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা দাবি করছে বাংলাদেশে আইএস আছে। কিন্তু এদেশের ভৌগোলিক বিন্যাস, জনসংখ্যার ঘনত্ব, সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন বাহিনীর মনোভাব, রাজনৈতিক পরিবেশ আইএসের জন্য কোনভাবেই উপযুক্ত নয়। তবে মৌলবাদী গোষ্ঠী যে এদেশে আছে, তা অস্বীকার করার জো নেই। এরা বিভিন্ন সময়ে জঙ্গি তৎপরতা চালিয়ে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিলেও বাঙালির মধ্যে বিরাজমান জাতীয়তাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার কারণে তারা সংগঠিত হয়ে আইএসের মতো খেলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবে, তা তাদের ইউটোপিয়ার জগতেও সম্ভবপর নয়।

জঙ্গি

আত্মপরিচয়ের ঐতিহ্যগত দিক দিয়ে বাঙালি অসাম্প্রদায়িক জাতি। যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী বাঙালি আবেগ-অনুভ‚তির মিথস্ক্রিয়ায় সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে নির্বিঘেœ শান্তিময় পরিবেশে বসবাস করে আসছে। ব্রিটিশ কর্তৃক সুকৌশলে বিভাজিত হিন্দু-মুসলিম এ ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে বিভক্ত ভারতবর্ষকে ভিত্তিমূল ধরলে আসলে এটা মনে হওয়াই যৌক্তিক হবে, বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র নয় কিন্তু যদি আরো পেছনের দিকে তাকানো যায় অর্থাৎ প্রাচীন, মধ্যযুগে কিংবা ব্রিটিশ আমলের গোড়ার দিকে তবে বাংলাকে ধর্মনিরপেক্ষতার অনন্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করাই হবে সমীচীন; কেননা ওই সময়গুলোতে ছিল জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সহাবস্থানের অপূর্ব এক দ্যোতনা। তাছাড়া পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের অভ্যন্তরে ক্ষুদ্র হলেও ধর্মনিরপেক্ষ যে ধারার আত্মপ্রকাশ ঘটে এবং পরবর্তী সময়ে সেই ধারার সৃষ্ট রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে ভিত্তিমূল ধরলে ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক বৈশিষ্ট্যই সমুজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান অনন্য, অনবদ্য। সংবিধানেও তিনি ধর্মনিরপেক্ষতাকে বাংলাদেশের চার ভিত্তির একটি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। অসাম্প্রদায়িক এ দেশে প্রায় নব্বই শতাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মাবলম্বী হলেও অন্যান্য ধর্মালম্বীরাও রাষ্ট্র কর্তৃক সমান সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্ত। সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ সবাই। কিন্তু এ সম্প্রীতি মৌলবাদীদের পছন্দ নয়। তাই তারা সর্বদাই রাষ্ট্রের অসাম্প্রদায়িক বৈশিষ্ট্যর ওপর কালিমা লেপনের চেষ্টায় থাকে, যা আমরা মাঝেমধ্যেই দেখতে পাই। সাম্প্রতিক যে জঙ্গি হামলাগুলো বাংলার মাটিতে হয়েছে, সেগুলো এসব মৌলবাদীরাই করেছে। আর তা করেছে আন্তর্জাতিক দানব আইএসের নাম ভাঙিয়ে। এরা আসলে পাকিস্তানপন্থি, যারা এদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করে না। এরা পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশকেও বিকলাঙ্গ রাষ্ট্রে পরিণত করে পাকিস্তানিদের খুশি করতে চায়। এদের সৃষ্টি ও প্রতিপালন যে বিএনপি-জামায়াত নামের পাকিস্তান-দরদী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে হয়েছে, তা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তে উঠে এসেছে।
অধ্যাপক ড. আবুল বারকাতের গবেষণা গ্রন্থ ‘বাংলাদেশে মৌলবাদের রাজনৈতিক অর্থনীতি ও জঙ্গিবাদ : মর্মার্থ ও করণীয়’ বইতে উলে­খ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশ জঙ্গি ও মৌলবাদী গ্র“পের সংখ্যা ১৩২টি, যা বাংলাদেশের স্থিতিশীলতার জন্য ভয়াবহ রকমের হুমকিস্বরূপ। বাংলাদেশের জঙ্গিবাদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই এদের উত্থান পর্ব ছিল সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের আমল। জিয়াউর রহমানের আমলে পাকিস্তানে পলায়নরত জামায়াতি নেতাদের প্রত্যাবর্তনের সুযোগ করে দেওয়ার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক দেশে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করা হয়েছিল। কেননা এরা শুধু প্রত্যাবর্তনই নয়, রাজনৈতিক সব ক্রিয়াকলাপ করার সুযোগ লাভ করেছিল। সেই সুযোগে এরা এদের ভাবাদর্শে বিশ্বাসী কিছু মানুষকে গোপনে জঙ্গি প্রশিক্ষণ দিতে থাকে, যা বিভিন্ন সময়ে নানা পত্রপত্রিকায় উঠে এসেছে। তারা এবং তাদের উত্তরসূরিরাই নানা নামে নানা ডালপালা, শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করে আসছে ত্রিশ দশক ধরে। এরা সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী সংগঠন যারা ভয়ংকর হামলা চালিয়ে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ করেছে এবং যারা আন্তর্জাতিকভাবে মদদপুষ্ট। এরা বাংলাদেশের স্থিতিশীল পরিবেশের জন্য, বাংলাদেশের মানুষের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত হুমকিস্বরূপ। কিন্তু ড. আবুল বারকাতের তথ্য মোতাবেক ১৩২টির মধ্যে আরো যে ১২৭টি জঙ্গি ও মৌলবাদী সংগঠন রয়েছে তারাও কিন্তু ফেলনা নয় কোনো দিক দিয়েই। এদের অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। এরা ওই জঙ্গি সংগঠনগুলোকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদ দিয়ে তাদের শক্তিকে বাড়িয়ে তুলছে। আবার নিজেরাও ফণা তোলার জন্য মুখিয়ে অপেক্ষা করছে কাক্সিক্ষত সুযোগের অপেক্ষায়। আরেকটি বিষয় হলো, সব জঙ্গিকে একই প্লাটফর্মে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে জেএমবি, নব্য জেএমবি ও আনসারুল­াহ বাংলা টিমের নেতারা। কারণ তারা চাচ্ছে সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যেমে নৃশংসতর প্রক্রিয়া অবলম্বনের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক আওয়ামী লীগ সরকারকে হটাতে এবং ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক খেলাফতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশের উন্নয়নের গতিকে রোধ করে দেশকে মান্ধাতার আমলে নিয়ে গিয়ে তাদের পেয়ারে পাকিস্তানের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে। কিন্তু আজ বাংলার প্রতিটি আনাচ-কানাচে বেজে ওঠে, অনুরণিত হয় মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর মাহাত্ম্যের সুর। মানুষের মধ্যে সৃষ্ট হয়েছে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার দৃপ্ত শপথ। তাই মৌলবাদী জঙ্গিরা যতই চেষ্টা করুক না কেন তাদের চেষ্টা যে বৃথা যাবে, তা বলা যায় নির্দ্বিধায়।

জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ড কেন সংঘটিত হয়? মানুষ কেন জঙ্গি হয়ে ওঠে? জঙ্গিবাদের ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটকে তথা বৈশ্বিক চালককে দায়ী করে থাকেন বিশ্লেষকরা। নোয়াম চমেস্কি, মাইকেল প্যারেন্টি, এরিক হবসবমের মতো তাত্তি¡করা জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের পেছনে সাম্রাজ্যবাদকে দায়ী করে থাকেন। জঙ্গিবাদ সৃষ্টি ও মানুষের জঙ্গি হয়ে ওঠার পেছনে ধর্ম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। মৌলবাদী গোষ্ঠী কর্তৃক প্রচারিত ইসলামের অপব্যাখ্যায় বিশ্বাস স্থাপন করে অনেকেই জঙ্গিবাদের দিকে ধাবিত হচ্ছে। জঙ্গিবাদের অন্যতম কারণ হিসেবে দারিদ্র্যকে দায়ী করেন অনেকেই। অ্যারিস্টটল বলেছিলেন, দারিদ্র্য অপরাধ ও বিদ্রোহকে ত্বরান্বিত করে। এটা অবশ্যই একটা কারণ। গরিব ও সুযোগবঞ্চিত মানুষ বাঁচার অবলম্বন খোঁজে। বঞ্চনা, বৈষম্য ও অসহায়ত্ব তাদের ধর্মাশ্রয়ী করে তোলে, যেটাকে পুঁজি করে মৌলবাদী গোষ্ঠী। জঙ্গিবাদের ক্ষেত্রে মগজ ধোলাই তথা মস্তিষ্ক প্রাক্ষালন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। সুইডিশ সাংবাদিক বারটিল লিন্টনারের প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারতবিরোধী বলয়ের বিরোধী শক্তি আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের জন্য মুজাহিদীনদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছিলেন, যা ছিল জঙ্গিবাদ সৃষ্টির ভিত্তি। পঁচাত্তর থেকে ছিয়ানব্বই সাল পর্যন্ত সময়কাল ছিল জঙ্গিবাদের ইনকিউবেশন পিরিয়ড আর পূর্ণ বিস্তারের সময়কাল বিএনপির দ্বিতীয় মেয়াদের শাসনামল। ওই সময় এ দলটি জঙ্গি গোষ্ঠীগুলিকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে।

জঙ্গি সংগঠন জেএমবির নেতা শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলাভাইয়ের সঙ্গে বিএনপির একাংশের এবং জামায়াতে ইসলামীর সম্পর্ক ছিল নিবিড়। বিভিন্ন এনজিও, দাতব্য সংস্থা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ইসলামপন্থী প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী সংগঠন ও ব্যাংক প্রত্যক্ষভাবে জঙ্গিবাদ বিস্তারের সঙ্গে জড়িত। ড. আবুল বারকাত তার মৌলবাদের অর্থনীতিসংক্রান্ত গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, মূল স্রোতের অর্থনীতিতে বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার যেখানে গড়ে ছয় থেকে সাত শতাংশ, সেখানে মৌলবাদের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হার আট থেকে সাড়ে দশ শতাংশ। এদেশে মৌলবাদী আদর্শে পরিচালিত বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক মুনাফা আড়াই হাজার কোটি টাকা। এ বিপুল পরিমাণ টাকা তারা জঙ্গি সৃষ্টি, প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও বোমা ক্রয়সহ জঙ্গিবাদ বিস্তারের কাজে ব্যয় করে থাকে। জঙ্গিবাদের বিস্তারে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাও কম দায়ী নয়। আমাদের দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মানবিক ও সামাজিক মূল্যবোধের শিক্ষা তেমনভাবে দেওয়া হয় না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে গণতন্ত্রের চর্চা করা হয় না, তেমনভাবে হয় না সংস্কৃতির চর্চা। শুধু দেখানো হয় অর্থ উপার্জনের পথ। শিক্ষার্থীরা মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষ না হয়ে, গড়ে ওঠে অর্থ উপার্জনের যান্ত্রিক মানব হিসেবে। এ পরিস্থিতিকেই কাজে লাগাচ্ছে মৌলবাদী গোষ্ঠী। তরুণ-তরুণীদের জঙ্গিবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ার ক্ষেত্রে পরিবারও অনেক সময় দায়ী। পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনের শিথিলতার কারণে উচ্চ শিক্ষিত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরা জঙ্গিবাদের দিকে ঝুঁঁকে পড়ছে। পরিবার অনেক সময় ছেলেমেয়েদের সামাজিক মূল্যবোধ শেখায় না, নৈতিক শিক্ষাও দেয় না। বরং নেতিবাচক ভিনদেশি সংস্কৃতি পালনে উৎসাহিত করে। ভিনদেশি সংস্কৃতি লালনকে আভিজাত্য ধরে নিয়ে বলগাহীন জীবন কাটাতে কাটাতে একটা সময় ছেলেমেয়ের মধ্যে ক্লান্তি দানা বাঁধে। হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ব্যতিক্রমধর্মী কিছু করার প্রতি ঝোঁক সৃষ্টি হয় তাদের মাঝে; এ সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে তাদের জঙ্গিতে রূপান্তরের প্রচেষ্টা চালায় মৌলবাদী গোষ্ঠী। জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়া তথা জঙ্গি হওয়ার পেছনে বর্তমানে ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখছে, যা ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। তরুণ প্রজšে§র যারা জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ছে তাদের বেশিরভাগই উগ্রবাদী প্রচারণার শিকার। এখন তো ছেলেমেয়েরা দশ-এগারো বছর বয়স হতেই ফেসবুক, টুইটার, ব্লগসহ নানা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছে। ফলে মৌলবাদী গোষ্ঠী সহজেই তাদের কাছে পৌঁছাতে পারছে আর বিভিন্ন প্রপাগান্ডা, প্রচারণা চালিয়ে তাদের জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করছে; যার ভয়াবহ রূপ আমরা চাক্ষুষ করেছি গুলশানের হলি আর্টিজানের হামলার মধ্য দিয়ে।

চির কাক্সিক্ষত শান্তিময় বিশ্বের জন্য, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার জন্য জঙ্গিবাদকে সমূলে উৎপাটন করা সময়ের প্রয়োজনেই অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জঙ্গিবাদের প্রতিরোধ করতে পারে, নিয়ন্ত্রণ করতে পারে কিন্তু প্রতিকারের জন্য, সমূলে বিনাশের জন্য সরকারের সুচিন্তিত কৌশল অবলম্বন করে আরো ম্যাসিভ আকারে পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। সামষ্টিকভাবে সরকারকে যেমন জঙ্গিবাদ নির্মূলে কাজ করে যেতে হবে তেমনি ব্যষ্টিকভাবেও জঙ্গিবাদ নির্মূলে সবাইকে সচেতন করে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে, জঙ্গিদের যদি সমূলে ধ্বংস করা না যায়, তবে যে কোনো সময়েই জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। আর তা হলে স্যামুয়েল হান্টিংটনের ‘ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন’-এর ভবিষ্যদ্বাণীর প্রতিচ্ছবি এ দেশে দেখা দিতে পারে। তাই জঙ্গিবাদ নির্মূলের জন্য সরকারকে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নিতে হবে।

জঙ্গিবাদী প্রচারণা দ্বারা যেসব তরুণ-তরুণী বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে, তাদের চিহ্নিত করা জরুরি। এ চিহ্নিকরণের ক্ষেত্রে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বন্ধুবান্ধবসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। অবশ্য এক্ষেত্রে সরকারকে জনসচেতনতা, গণজাগরণের ব্যাপকভিত্তিক উদ্যোগ নিতে হবে। কোনো তরুণ-তরুণী বিভ্রান্তির শিকার কিনা, তা তাদের কথাবার্তার মাঝেই স্পষ্ট বোঝা যায়। তাছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ আরো বিভিন্ন ব্লগে লেখালেখি বিশ্লেষণ করলেও বিভ্রান্তের শিকার হওয়াদের খুঁজে বের করা যায়। এরপর এদের বলপ্রয়োগের পরিবর্তে সংশোধনের যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। আরেকটি বিষয় হলো, এদেশে জঙ্গিবাদ নির্মূলের ক্ষেত্রে আরো বেশি গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি করতে হবে। গোয়েন্দাদের আরো বেশি করে দক্ষ করে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। কেবল জঙ্গি নির্মূলের উদ্দেশ্যে নিয়েই বিশেষ গোয়েন্দা সেল গঠন করা জরুরি। গ্রামাঞ্চল থেকে শুরু করে অনলাইনসহ এ দেশের প্রতিটি স্থানই যেন গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

ধর্মের অপব্যাখ্যাকারীদের চিহ্নিত করে যেমন আইনের মাধ্যমে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, তেমনি আবার ধর্মের সঠিক ব্যাখ্যা প্রচারের ব্যবস্থা করাও জরুরি। আমেরিকার মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্কট অ্যাট্রান বিভিন্ন জঙ্গির সাক্ষাৎকার নিয়ে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, জঙ্গিদের বেশিরভাগই নিজেরা কোরআন পড়েনি, কেবল তারা অন্যের মুখে ব্যাখ্যা শুনে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়েছে। জঙ্গিবাদের পুরো বিষয়টিই এমন। ইসলাম যে জঙ্গিবাদকে সমর্থন করে না এবং জিহাদের অর্থ যে মানুষ হত্যা নয়, তা সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা দিয়ে প্রচার-প্রচারণার ব্যবস্থা করতে হবে। মাহফিলে বা খুতবায় কোনো প্রকার জিহাদি ও সাম্প্রদায়িক বক্তৃতা দিলে তাকে জঙ্গিবাদ হিসেবে বিবেচনা করে বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য মসজিদে খুতবা ও বিভিন্ন মাহফিলে গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি করতে হবে। তাছাড়া জিহাদবিষয়ক যে কোনো রকম শিক্ষা, পাঠদান, প্রচার, বক্তৃতা ইত্যাদি নিষিদ্ধ ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

জঙ্গিবাদ নির্মূলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করতে হবে পরিবার ও সমাজকে। একজন ব্যক্তির সামাজিকীকরণের যাত্রা শুরু হয় পরিবার থেকে। পারিবারিকভাবে শিশুকে মূল্যবোধ শিক্ষা দিতে এবং অসাম্প্রদায়িকতার চর্চা করাতে বাবা-মা, ভাইবোনসহ আত্মীয়স্বজনকে ভ‚মিকা রাখতে হবে। শিশু-কিশোররা যেন নিঃসঙ্গতায় না ভোগে, নিজেদের সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন না মনে করে সেদিকেও পরিবারের অন্য সদস্যদের নজর দিতে হবে। বিশৃঙ্খল জীবনযাপন যেন তারা না করে, সেদিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। অবশ্য তার আগে নিজেদের মূল্যবোধকেও শানিয়ে নিতে হবে। পরিবারকে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলাসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। তাদের আচার-আচরণে সন্দেহজনক কিছু ধরা পড়লে মনঃকষ্টের মধ্যেও সংশ্লিষ্ট থানায় জানাতে হবে এবং প্রয়োজনে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

জঙ্গিবাদ দূরীকরণে শিক্ষাব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করতে সক্ষম। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত বহুমুখী শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের মাঝে বিভাজন, বৈষম্য সৃষ্টি করে, যা বঞ্চনার অনুভ‚তি সৃষ্টি করতে এবং জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করতে পরোক্ষ হলেও কিছুটা ভ‚মিকা যে রাখে না, তা বলা যাবে না। উন্নত দেশগুলোর মতো আমাদেরও একমুখী শিক্ষাব্যবস্থার দিকে যেতে হবে, যদিও তা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তবে এখন থেকেই এর জন্য প্রয়াস চালাতে হবে। আর যত দিন তা না হচ্ছে, তত দিন পর্যন্ত কওমি মাদ্রাসাগুলোকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসে এদের পাঠ্যসূচিতে আরবি, উর্দুর সঙ্গে বাংলা ভাষায় চর্চা চালু করতে হবে; সমাজ, বিজ্ঞান, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসসহ মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টিকারী পাঠ্যপুস্তক শিক্ষাক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এগুলোর অর্থায়নের বিষয়টিও সরকারের নজরদারিতে নিয়ে আসতে হবে। ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল-কলেজগুলোর শিক্ষা কার্যক্রম ও পাঠ্যসূচির দিকেও সরকারের নজর দেওয়া প্রয়োজন। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি করতে হবে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টিতে উপযোগী বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্তকরণ বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নিতে হবে। তাছাড়া একাডেমিক লেখাপড়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বেশি করে সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে গণিত অলিম্পিয়াড, বিতর্ক, পাঠচক্র, খেলাধুলা ইত্যাদির আয়োজন নিশ্চিত করতে হবে।

এদেশে জঙ্গিবাদ দমনে ব্যাংকগুলোর প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নজরদারি বৃদ্ধি পেলেও কুরিয়ার সার্ভিস বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অনিয়ন্ত্রিতভাবেই অর্থনৈতিক লেনদেন হচ্ছে। এগুলোকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। জঙ্গিবাদের বিস্তারের ক্ষেত্রে যে ইন্টারনেট প্রযুক্তি বিশেষ করে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওয়েবসাইট, ব্লগ যে বিশেষ ভ‚মিকা রেখেছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এসবের মাধ্যমে খুব সূ² কৌশলে স্বার্থানেষী গোষ্ঠী তরুণ-তরুণীদের মাঝে জঙ্গিবাদের বীজ রোপণ করে দেয়। ইন্টারনেট বর্তমান যুগের জন্য অনিবার্য। কিন্তু একে নিয়ন্ত্রণ করাও জরুরি। যদিও দুঃসাধ্য তবুও সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে। যেসব ওয়েবসাইট ও ব্লগ জঙ্গিবাদ প্রচার করে থাকে সেগুলো এদেশে বন্ধ করে দিতে হবে। আর ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যারা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ ও নির্মূলে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করতে পারে। বিটিভিতে জঙ্গিবাদবিরোধী বিজ্ঞাপন প্রচারিত হচ্ছে। এ রকম আরো অনেক বিজ্ঞাপন, সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে হবে। এ দায়িত্ব কেবল বিটিভির নয়, অন্য সব টিভি চ্যানেলে এ ধরনের অনুষ্ঠান, বিজ্ঞাপন প্রচার বাধ্যতামূলক করে দিতে হবে। পত্রিকা, অনলাইন পোর্টালসহ সব গণমাধ্যমে জঙ্গিবাদবিরোধী প্রচারণা এবং বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগ্রতকরণসংক্রান্ত প্রচারণা বৃদ্ধি করা জরুরি। একটা বিষয় নিশ্চিত যে, যদি প্রত্যেক বাঙালির মধ্যে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ-চেতনা এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের মহিমা বপন ও আত্মস্থ করানো যায়, তবেই এ দেশ থেকে জঙ্গিবাদ সমূলে উৎপাটিত হবে।

লেখক : সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ

Loading...
loading...

ভিডিওটি দেখতে নিচে ক্লিক করুন



Loading...

About sylhet24 express

Check Also

জননেত্রী থেকে বিশ্বনেতা

জননেত্রী থেকে বিশ্বনেতা

মো: আব্দুল কাইয়ুম তুলা মিয়া : আমি তখন টগবগে যুবক। ১৯৬৮ সালের কথা। বঙ্গবন্ধুর মুক্তির …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *