loading...
Home / উপ সম্পাদকীয় / পরীক্ষায় নকল : অতীত থেকে বর্তমান

পরীক্ষায় নকল : অতীত থেকে বর্তমান

আবিদ করিম মুন্না
আবিদ করিম মুন্না

আবিদ করিম মুন্না : বাবার কাছ থেকে শোনা। একবার পরীক্ষার খাতায় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরীক্ষকেরা মার্কস কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। কারণ সে বছর নকলের এতই ছড়াছড়ি হয়েছিল যে খাতা সঠিকভাবে মূল্যায়ন এবং ভালো ফলাফল প্রত্যাশী মেধাবী শিক্ষার্থীদের প্রাপ্য মার্কস প্রদান করেও মেধা যাচাই করা সম্ভব হচ্ছিল না।

বাংলাদেশের স্কুল-কলেজগুলোতে একটা সময় ধুমছে নকল হয়েছে। তবে সব সেন্টারে নয়। অনেক শিক্ষার্থীই নকল করে পাস করেছে। গ্রামের কিছু কিছু সেন্টার ছিল নকলের আদর্শ স্থান।

এমনও ঘটতো সারাবছর পড়াশোনা করলো শহরে আর পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশনের সময় ছুটছে গ্রামের স্কুল বা কলেজগুলোর দিকে। তাদের সিংহভাগেরই টার্গেট থাকতো থার্টি থ্রি অর্থাৎ ৩৩ নাম্বার। সারাবছর পড়াশোনার সাথে আলাপ-আলোচনা নেই কিন্তু পরীক্ষার পূর্বে এদেরকেই দেখা যেত মনোযোগী শিক্ষার্থীর ভূমিকায়।

ছাত্রজীবনে দেখেছি সবচেয়ে উত্তম এবং সংক্ষিপ্ত সাজেশন তৈরি করতে পারতো এসব নকলবাজেরা। দেখা গেছে একটি রচনারই নকল নিয়ে গেছে পরীক্ষার হলে আর সৌভাগ্যক্রমে সেটিই চলে এসেছে। লিখলে ২০ এর মধ্যে ১২ মার্কস পেয়েই যেত। আর বাকি ৮০ মার্কস থেকে মোট ৩৩ পূর্ণ করা খুব একটা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল না।

নকল করারও ছিল নানা পদ্ধতি। শুনে বা দেখে বিস্মিত হওয়া বিচিত্র কিছু নয়। নকল প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধনে এত মাথা না খাটিয়ে সে সময়টা পাঠ্যে মনোযোগ দিলে ভালো ফলাফল এমনিতেই নিশ্চিত করা সম্ভব ছিল।

তারপরও কেন শিক্ষার্থীরা নকল করত? আত্মবিশ্বাসের অভাবই ছিল নকল করার মূল কারণ। সেই সময়ের নকলের কিছু কালচার নিয়ে আলোকপাত করা যাক। সবচেয়ে কমন স্টাইল ছিল পুরিয়া।

পরীক্ষার আগের রাতে না ঘুমিয়ে হোমিওপ্যাথি সাইজের কাগজে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অক্ষরে লিখে ভরিয়ে ফেলা হতো সম্ভাব্য সব প্রশ্নের উত্তরে। আবার কেউ কেউ ফুলহাতা শার্টের বাম হাতের তালু থেকে শুরু করে বা দিক বরাবর যতদূর লেখা যেত সেটুকু নকলে ভরিয়ে ফেলত।

এছাড়াও আরো কিছু উপায় ছিল। বারো ইঞ্চি স্কেল, সেট স্কয়ার, টি স্কয়ার, জ্যামিতি বক্স, পেন্সিল বক্সের প্রতিটি অংশ এমনকি পরীক্ষার হলের ওয়াল বা দেয়াল নকল করার জন্য উপযুক্ত জায়গা ছিল।

এমনকি পরীক্ষার প্রবেশপত্র এবং পুরোনো প্রশ্নপত্রে পেন্সিল দিয়ে নকল লিখেও পরীক্ষা পাস করেছে অনেকে। পরীক্ষার হলে খাতা পরিবর্তন করে লেখাও নকলের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এমনকি পরীক্ষার খাতা কেন্দ্র থেকে বাহিরে পাঠিয়েও কাজ সম্পাদন করা হতো। একশ্রেণির হল পরিদর্শকের সহযোগিতাও নকলবাজদের নকল করতে উৎসাহিত করত।

তবে নকলবাজদের মধ্যে যারা একটু ভীতু টাইপের তাদের অনেকে বাম হাতের নখে পেন্সিল দিয়ে লিখে নকল করত গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। আর ডান হাতের নখে লেখার কাজটি করে দিত আরেক নকলবাজ।

আরেকটি জনপ্রিয় কালচার ছিল বলপয়েন্ট কালচার। সেটা ছিল ইকোনো ডিএক্স কলমের স্বর্ণযুগ। কলমের গায়ে সুই অথবা কাটা কম্পাস দিয়ে লিখে একটার পর একটা কলম নকল লিখে ভরিয়ে ফেলা হতো। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, তিনটি কলমে একটি পূর্ণাঙ্গ ২০ নাম্বারের ইংরেজি রচনার নকল সুন্দরভাবে লিপিবদ্ধ করা সম্ভব ছিল। এক্ষেত্রে সোনামুখি সুইয়ের ব্যবহার অধিক উপযোগী ছিল।

কলমের যদি প্রাণ থাকতো তবে মানুষের চেয়ে কলমের উপলব্ধি হতো বেশিÑ লাইফ ইজ নট এ বেড অফ রোজেস। এ জাতীয় নকলে অভ্যস্ত পরীক্ষার্থীদেরকে ঘন ঘন কলম পরিবর্তন করতে দেখা যেত। হল পরিদর্শক কলমের অবয়বের উপর তীক্ষè নজর রাখলেই নকলবাজকে সহজেই চিহ্নিত করতে পারতেন। এ কালচারে অভ্যস্ত পরীক্ষার্থী পর্যাপ্ত আলো সরবরাহ না পেলে বিরক্তি বোধ করতেন। কারণ আলোর যথার্থ প্রতিফলন না হলে কলম থেকে নকল উদ্ধার করে খাতায় প্রতিস্থাপনে বিঘ্নতা সৃষ্টি হতো।

আরো আশ্চর্য লাগতো কলমের হেড বা খাপ কালচারের কথা শুনে। এখানে একই পদ্ধতি অবলম্বন করা হতো শুধু পরীক্ষার্থীকে ঘন ঘন বলপয়েন্টের হেড বা খাপ পরিবর্তন করতে হতো। তবে এ জাতীয় নকলবাজদের বন্ধু-বান্ধবদের কাছ থেকে কালি নিঃশেষিত হয়ে যাওয়া বলপয়েন্টের হেড সংগ্রহে পরীক্ষার আগে বেশ ব্যস্ত সময় কাটাতে দেখা যেত।

আরেকটা সনাতন পদ্ধতিতে নকল করার কথা আজকাল আর শোনা যায় না বা সুযোগ নেই বললেই চলে সেটি হলো বেঞ্চিং সিস্টেম।

পরীক্ষার আগের দিন কিংবা পরীক্ষা শুরুর এক ঘণ্টা আগে দপ্তরির সাথে আঁতাত করে বেঞ্চের ওপর প্রশ্নের উত্তরগুলো লিখে রাখা হতো। তবে এক্ষেত্রে পরীক্ষার্থীকে পরীক্ষা শেষ করে ব্লেড দিয়ে বেঞ্চ চেঁচে অথবা শিরিশ কাগজ দিয়ে ঘষে পরবর্তী পরীক্ষার উপযোগী করে রেখে যেত।

এ সিস্টেম গ্রামগঞ্জের সেন্টারগুলোতে আজো কমবেশি চোখে পড়লেও শহরের স্কুল-কলেজগুলোতে আধুনিক আসবাবপত্র তথা ডেস্ক ব্যবহারের কারণে অনেকটাই বিলুপ্তির পথে।

বেঞ্চিং সিস্টেম নিয়ে এক শিক্ষকের মুখে শোনা অভিজ্ঞতার কথা বলছি। পরীক্ষার হলে একদিন লক্ষ্য করলেন একটি বেঞ্চের এবং উত্তরপত্রের লেখা পুরোপুরি মিলে গেছে। কালবিলম্ব না করে পরীক্ষার্থীকে শিক্ষক পাঠালেন পরিষ্কার একটি ইট নিয়ে আসতে। ছাত্রটি হয়তো ভেবেছিল শাস্তি হিসেবে ইটটি হাতে করে রোদে আধা ঘণ্টা দাঁড়িয়ে রাখা হবে। কিন্তু ঘটল একেবারে অন্যরকম ঘটনা যা কল্পনাতেই আনতে পারেনি পরীক্ষার্থী।

শিলপাটার সাথে আমাদের সবারই কমবেশি পরিচয় রয়েছে। শিক্ষক তখনই ইটটিকে বানালেন শিল আর বেঞ্চকে বানালেন পাটা। শিলপাটার মতো ইট আর বেঞ্চ ঘষাঘষির মাধ্যমে নকলগুলো উদ্ধারের অনুপযোগী করে দিয়ে বললেন, এবার সুবোধ বালকের মতো পরীক্ষা দাও।

কিছুকাল আগেও যে কালচারটি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল সেটি হলো মাইক্রোসিস্টেম। পরীক্ষার আগে পুরো বই কিংবা সুন্দর হস্তাক্ষরে লেখা নোট ফটোকপি মেশিনে অর্ধেক সাইজে নামিয়ে এনে নকল হিসেবে ব্যবহার করা হতো। তবে পরীক্ষার আগে মার্কেট চলাকালীন বা গভীর রাতে ফটোকপির দোকান যদি বাহির বা ভেতর থেকে বন্ধ দেখা যায় তাহলে সন্দেহের উদ্রেক হতো।

ফটোকপি ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ নকলবাজদের সহযোগী হিসেবে কাজ করতো। অনেক সময় অভিভাবকদের নির্দেশ থাকত নকল করার উপযোগী পরিবেশ না পেলেও খাতা যেন লিখে ভরিয়ে ফেলা হয়। এ রকম একটি ঘটনা না বলে পারছি না। পরীক্ষা শুরু হয়েছে। পরীক্ষার্থী প্রস্তুত। কিন্তু পরীক্ষকের কড়া প্রহরার কারণে নকল বের করাই দুরুহ হয়ে পড়ল।

পরীক্ষক বললেন, কী ব্যাপার তুমি লিখছো না যে? পরীক্ষার্থী তখনই লিখতে শুরু করলো। সেদিন পরিবার সম্পর্কে একটি প্রশ্ন এসেছিল। পরীক্ষার্থী যা লিখেছিল তার কিছু অংশ প্রিয় পাঠকদের জন্য তুলে ধরছি
‘পরিবার বলতে আমার বাড়ির চেয়ারকে বোঝায়। পরিবার বলতে হেড ছাড়া কলমকে বোঝায়। পরিবার বলতে আমার জানালা দিয়ে দেখা ঐ বাড়ির মেয়েটিকে বোঝায় যে মেয়ের দুটি পা আছে, দুটি চোখ আছে, দুটি কান আছে, দুটি…।’

পরীক্ষার হলে নকল করার সুযোগ না পেয়ে অনেকে রাত জেগে টিভি বা ভিসিআর-এ দেখা নাটক বা সিনেমার ঘটনাও লিখে আসতো।

একবার এক পরীক্ষার্থী তিন ঘণ্টার পুরোটা সময় বসে না থেকে আগের রাতে হিন্দি ছবির পুরো ঘটনা লিখে চলল। তিন ঘণ্টা সিনেমার ঘটনা লেখার পরও তার লেখা যেন শেষ হচ্ছিল না।

পরীক্ষক খাতা টেনে ধরে বললেন, স্টপ রাইটিং। ছেলেটি লিখেই চলছে এবং সে অবস্থায় পরিদর্শকের কাছে একটা মিনিট সময় চেয়ে বলে উঠল স্যার, নায়ক-নায়িকার মিল দেওয়া বাকি।

যুগের সাথে তাল মিলিয়ে নকল পারদর্শিতায় মেয়েরাও পিছিয়ে ছিল না কোনোকালে। তাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা ছিল অসাধারণ।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে ছেলেদের চেয়ে তারা বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে থাকত।
বর্ণিত তরিকাগুলো ছাড়াও শাড়ি, সেমিজ, জামার উল্টোপিঠ এবং চুলের খোপা নকলের কাজে ব্যবহার করত।
কিছু কিছু মুহূর্তে নারী পরিদর্শক ছাড়া মেয়েদের কাছ থেকে নকল উদ্ধারের চিন্তা করাটাও ছিল বিপদজনক।
মাদ্রাসা পর্যায়ের অনেকেই ধোয়া তুলসি পাতা নয়। তাদের কেউ কেউ টুপির ভেতরে নকল রেখে কাজটি করে থাকে। এছাড়া রুমাল কালচারের কথাও উল্লেখযোগ্য। পরীক্ষার হলে অনেকেই ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক সেদিক তাকিয়ে অন্যের দেখে লেখার অভ্যাস রয়েছে যা নকলের শামিল।

নকল করে পাস করে মামা-চাচাদের ধরে বাংলাদেশে চাকরি পেয়ে যায় অনেকে। ফলে বঞ্চিত হয় প্রকৃত মেধাবীরা।

যারা নকল করে পাস করে তাদের অনেকেই বাংলা বা ইংরেজিতে ভাব বিনিময় করার কৌশল রপ্ত করতে ব্যর্থ হয়। একটা বাক্যও সঠিকভাবে লিখতে পারে না কেউ কেউ। সৃজনশীল কিছু করে দেখানো তো দূরের কথা এক ধরনের হীনম্মন্যতা বোধ এদের তাড়িত করে ফেরে। পারিবারিক এবং সামাজিক সর্বক্ষেত্রে গুটিয়ে রাখা ভাব দেখা যায়। কারণ নকল করে পাস করার ফলেই মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার ক্ষমতা তারা হারিয়ে ফেলে।

মোটকথা এক ধরনের অন্তর্জ্বালা সবসময় নকলবাজদের তাড়িত করে। আশার কথা বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গন অনেকটাই নকলবাজদের কালো থাবা থেকে মুক্ত।

প্রযুক্তির কল্যাণে নকল পদ্ধতিতেও এসেছে পরিবর্তন। চাক্ষুষ প্রমাণ চাইলে ইউটিউবে এখনই সার্চ দিয়ে ঝটপট দেখে ফেলুন সঞ্জয় দত্ত অভিনীত ‘মুন্নাভাই এমবিবিএস’ হিন্দি মুভিটি।

উচ্চশিক্ষাস্তরেও যেখানে সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে সেখানেও নকলে এসেছে ডিজিটালি হাওয়া। সায়েন্টিফিক ক্যালকুলেটর, ডিজিটাল ঘড়ি এবং লিড ঘড়িতে তথ্য-উপাত্ত ও প্রয়োজনীয় টেক্সট এবং মোবাইল ফোনের মেমোরি কার্ডে সীমিত সংখ্যক শব্দ সেভ করে এনেও নকল করছে অনেকে।

লেখক : কৃষিবিদ, গল্পকার। কর্মকর্তা, বাংলা একাডেমি, ঢাকা

abidkarim0123@gmail.com

Loading...
loading...

ভিডিওটি দেখতে নিচে ক্লিক করুন



Loading...

About sylhet24 express

Check Also

জননেত্রী থেকে বিশ্বনেতা

জননেত্রী থেকে বিশ্বনেতা

মো: আব্দুল কাইয়ুম তুলা মিয়া : আমি তখন টগবগে যুবক। ১৯৬৮ সালের কথা। বঙ্গবন্ধুর মুক্তির …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *