Breaking News
loading...
Home / উপ সম্পাদকীয় / বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ সমার্থ – ড. আতিউর রহমান

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ সমার্থ – ড. আতিউর রহমান

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ সমার্থ - ড. আতিউর রহমান

ড. আতিউর রহমান : ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মানব ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডে সপরিবারে প্রাণ হারান সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলাদেশের স্বাধীনতার রূপকার, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান- যার বিশাল অস্তিত্ব পড়ে আছে বাংলাদেশের ৫৬ হাজার বর্গমাইলজুড়ে, যার জন্ম না হলে স্বাধীন-সার্বভৌম ভূখণ্ড হিসেবে বাংলাদেশের জন্ম হতো না। এ কারণেই এ কথা বললে ভুল হবে না যে, বাংলাদেশের আরেক নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আরও জোর দিয়ে বলা চলে তিনিই বাংলাদেশ। বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত এই নেতার সংগ্রামী জীবন ও নান্দনিক কিছু ভাবনা আমি পাঠকদের সঙ্গে শেয়ার করতে চাই।

বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে কবি রফিক আজাদের (এই সিঁড়ি) একটি উদ্ধৃতি দিয়ে শুরু করছি, ‘এ দেশের যা-কিছু তা হোক না নগণ্য, ক্ষুদ্র তার চোখে মূল্যবান ছিল- নিজের জীবনই শুধু তার কাছে খুব তুচ্ছ ছিল; স্বদেশের মানচিত্রজুড়ে পড়ে আছে বিশাল শরীর….।’ বাল্যকাল ও কৈশোর থেকে সংগ্রাম শুরু করা বঙ্গবন্ধু সারাজীবন একটিই সাধনা করেছেন- আর তা হচ্ছে বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য নিজেকে উৎসর্গ করা। নিজের মধ্যে লুকায়িত রাজনীতির বীজ সোহরাওয়ার্দীর সংস্পর্শে দ্রুত অঙ্কুরোদগম হয়। তার অসমাপ্ত আত্মজীবনী পাঠ করলেই বুঝতে পারি কি অসীম সাহসী, গভীর স্বদেশ প্রেমিক, সুনিশ্চিত লক্ষ্যভেদী এবং জনদরদী এক ভূমিপত্রের জন্ম হয়েছিল এই অভাগা দেশে। ‘তোমাদের এখানে মুসলিম লীগ করা হয় নাই?’ সোহরাওয়ার্দীর এমন প্রশ্নের জবাবে অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া শেখ মুজিব সেদিন বলেছিলেন, ‘কোনো প্রতিষ্ঠান নাই, মুসলিম ছাত্রলীগও নাই।’ (‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, শেখ মুজিবুর রহমান, পৃ. ১১)

এভাবেই শেখ মুজিব পারিবারিক ও একাডেমিক গণ্ডি ছাপিয়ে স্কুলজীবনেই দেশ ও দশের কাজে জড়িয়ে পড়ে একজন সচেতন রাজনৈতিক কর্মী হয়ে ওঠেন। সেই থেকে সংগ্রামের শুরু- বাকি জীবন জেল-জুলুম আর ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে তার সংগ্রামের ইতিহাস। ১৯৪৭ সালে জিন্নাহর দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে সাম্প্রদায়িক ও অস্বাভাবিক রাষ্ট্র পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন, এই রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে বাঙালিরা নির্যাতিত-নিষ্পেষিত হবে। তাই ১৯৪৮ সালে গঠন করেন ছাত্রলীগ এবং ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগ। দলটিতে শুরুতে মুসলিম শব্দ যুক্ত থাকলেও পরবর্তী সময়ে তা ধর্মনিরপেক্ষ রূপ গ্রহণ করে। অনেক ত্যাগ, শ্রম, আন্তরিকতা, সততা দিয়ে সংগঠন দুটি তৈরি করেছিলেন বলেই তিনি দ্রুত মানুষের আস্থা অর্জন করে জননন্দিত হন, মানুষের মাঝে আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের চেতনা সৃষ্টি করতে সক্ষম হন এবং ভুলে গেলে চলবে না ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্বে নেতৃত্ব দেন শেখ মুজিব এবং তার সহযোগীরা। ওই বছর ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন এবং ১১ মার্চকে ‘বাংলা ভাষা দাবি’ দিবস ঘোষণা করা হয়। সভায় শেখ মুজিব, শামসুল হক, অলি আহাদ, মহম্মদ তোয়াহা উপস্থিত ছিলেন। বাংলা ভাষার দাবিতে সংগ্রাম পরিষদের ডাকে ১১ মার্চ ধর্মঘট পালনকালে শেখ মুজিবসহ আরও কয়েকজন গ্রেফতার ও কারাবন্দী হন- যা ছিল মাতৃভাষার আন্দোলনে প্রথম কারাবরণ। এ জন্য বায়ান্নর আগে ১১ মার্চই ছিল ‘ভাষা দিবস’। ১৯ মার্চ জিন্নাহ ঢাকা ত্যাগ করার কয়েক দিন পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় একজন ছাত্র বলে, জিন্নাহ যা বলবেন, তাই আমাদের মানতে হবে। তিনি যখন উর্দুই রাষ্ট্রভাষা বলেছেন তখন উর্দুই হবে। তখন শেখ মুজিব তার প্রতিবাদ করে বলেছিলেন, ‘কোনো নেতা যদি অন্যায় কাজ করতে বলেন, তার প্রতিবাদ করা এবং তাকে বুঝিয়ে বলার অধিকার জনগণের আছে। বাংলা পাকিস্তানের ছাপ্পান্ন শতাংশ লোকের মাতৃভাষা, সংখ্যাগুরুদের দাবি মানতেই হবে। রাষ্ট্রভাষা বাংলা না হওয়া পর্যন্ত আমরা সংগ্রাম চালিয়ে যাব।’ (‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, শেখ মুজিবুর রহমান, পৃ. ১০০)

১৯৫৩ সালের কাউন্সিলে আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে বঙ্গবন্ধু দল গোছাতে আত্মনিয়োগ করেন। চুয়ান্নর নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বিপুল বিজয় লাভ করে সরকার গঠনের সময় সোহরাওয়ার্দী বঙ্গবন্ধুকে ডেকে নিয়ে বলেন, ‘তুমি মন্ত্রিত্ব নেবা কিনা?’ সেদিন বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমি মন্ত্রিত্ব চাই না। পার্টির অনেক কাজ আছে, বহু প্রার্থী আছে দেখেশুনে তাদের করে দেন।’ (‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, শেখ মুজিবুর রহমান, পৃ. ২৫৯)

পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী অল্প দিনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়ে বঙ্গবন্ধুসহ আরও অনেককে গ্রেফতার করে। সাতানব্বই শতাংশ জনসাধারণ যেখানে যুক্তফ্রন্টকে ভোট দিল, শত প্রলোভন ও অত্যাচারকে তারা ভ্রূক্ষেপ করল না- সেই জনগণ নীরব দর্শকের মতো তাকিয়ে রইল! সোহরাওয়ার্দী সাহেব তখন অসুস্থ হয়ে জুরিখ হাসপাতালে। বঙ্গবন্ধু এ ঘটনাটিকে এভাবে উল্লেখ করেন, ‘এই দিন থেকেই বাঙালিদের দুঃখের দিন শুরু হলো।’ (‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, শেখ মুজিবুর রহমান, পৃ. ২৭৩)

পাকিস্তান সৃষ্টির গোড়া থেকেই শাসক গোষ্ঠীর কোনো অন্যায়কে তিনি বিনা চ্যালেঞ্জে যেতে দেননি। মূলত অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ-প্রতিবাদ করাই ছিল তার স্বভাব। রাজনীতিতে সোহরাওয়ার্দীকে আজীবন গুরু মানলেও তা অন্ধ অনুকরণ পর্যায়ে ছিল না। ন্যায়-অন্যায় ও জাতীয় ইস্যুতে তার বিরোধিতা করতেও বঙ্গবন্ধু দ্বিধা করেননি। যুক্তফ্রন্ট ভেঙে দেওয়ার পর পাকিস্তান সরকারের অনুরোধে সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিত্ব নিলে জেলে বসে তিনি এর বিরোধিতা করেন। এসব ক্ষেত্রে বাঙালির স্বার্থ চিন্তাই তাকে এমন সাহসী ও অনমনীয় করতে সাহায্য করেছিল। এভাবে ধাপে ধাপে প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে হয়ে ওঠেন ইতিহাসের মহানায়ক। কালক্রমে মুক্তি-সংগ্রামের এক মহৎ প্রচ্ছদপট এঁকে বাঙালি জাতির জন্য এনে দেন স্বপ্নের স্বাধীনতা। সে কারণেই ষাট-সত্তর দশকের তরুণদের কাছে বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেন ‘রোল মডেল’। নিজে পরিশ্রমী কর্মী ছিলেন। কর্মী থেকে হয়েছেন বিচক্ষণ সংগঠক। সংগঠক থেকে হয়েছেন অতুলনীয় নেতা। নেতা থেকে জাতীয় নেতা এবং সবশেষে হয়েছেন জাতির পিতা। মানুষের দুঃখে সর্বদাই তার মন কাঁদত। তার জীবনে মানুষ ছিল অন্তঃপ্রাণ। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির মর্মকথাই ছিল, দেশকে ভালোবাসা, মানুষের দুঃখ-কষ্টে পাশে দাঁড়ানো আর নিবেদিত সততা নিয়ে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া। তার রাজনীতির সঙ্গে বর্তমান রাজনীতির তাই অনেক দূরত্ব লক্ষণীয়। বর্তমানে শর্টকাটে নেতা হওয়ার মানসিকতা ও বিত্তশালী হওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতায় রাজনীতি প্রায়ই প্রশ্নবিদ্ধ হতে দেখা যায়। দেশপ্রেম, ত্যাগ ও সততার অভাবে রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে। সত্যিকার রাজনীতিকদের জন্য সুস্থ রাজনীতি করাই এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনপাঠ তাই অত্যন্ত জরুরি।

‘বঙ্গবন্ধু’ ও ‘বাংলাদেশ’- দুটি নাম, একটি ইতিহাস। এক এবং অভিন্ন সত্তা। যেন মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পথিকৃৎ। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস রচনায় রাখেন অগ্রণী ভূমিকা। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট গঠন, আটান্নর সামরিক শাসন-বিরোধী আন্দোলন, ছেষট্টির ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধসহ এ দেশের সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে সামনে থেকে জাতিকে নেতৃত্ব দেন। পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর নানা অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রাণপ্রিয় এ নেতা ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি পেশ করলে তার ওপর নেমে আসে দুঃসহ কারাজীবন, অমানুষিক নির্যাতন। নিঃসঙ্গ কারা নির্যাতনের সেই কথা এখানে বলে শেষ করা যাবে না। বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের আন্দোলনে ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়েও তিনি কখনো পাকিস্তানি শাসকদের সঙ্গে, অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি। ফাঁসির দড়িকেও ভয় পাননি। দু’দুবার মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তিনি বলেছেন, ‘ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় আমি বলব, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা।’ যে বাংলার স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, যে বাংলার জন্য তিনি যৌবনের অধিকাংশ সময় কারাগারে কাটিয়েছেন, ফাঁসির মঞ্চেও যে বাঙালির জয়গান গেয়েছেন, সেই বাংলা ও বাঙালির জন্য তার ভালোবাসা ও হৃদয়ের দরদ ছিল অপরিমেয়।

পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মলগ্ন থেকেই শুরু হয় পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণমূলক আচরণ। সব ক্ষেত্রেই বাঙালিরা উপেক্ষিত হতে থাকে। সত্তরের নির্বাচনের সময় ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন?’ শীর্ষক এক পোস্টারে অর্থনৈতিক বৈষম্যের কিছু চিত্র এ দেশের মানুষকে পীড়া দেয়। জনসংখ্যার দিক দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান বৃহত্তর অংশ হওয়া সত্ত্বেও বাজেটের প্রায় পুরোটাই খরচ হতো পশ্চিম পাকিস্তানিদের জন্য। পশ্চিম পাকিস্তানে বছরে রাজস্ব ব্যয় ছিল ৫০০০ কোটি টাকা, পূর্ব পাকিস্তানে ছিল ১৫০০ কোটি টাকা। বৈদেশিক সাহায্যের ৮০ শতাংশই ব্যয় হতো পশ্চিম পাকিস্তানে। চাল, আটা ও তেলের দাম পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় পূর্ব পাকিস্তানে ছিল দ্বিগুণ। কেন্দ্রীয় সরকার ও সামরিক বিভাগের চাকরির প্রায় ৯০ শতাংশই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের দখলে। এসব বৈষম্য প্রতিরোধ করার লক্ষ্যেই বঙ্গবন্ধু ছয় দফা দাবি উপস্থাপন করেন। এরপর তার এবং তার দলের নেতা-কর্মীদের ওপর নেমে আসে নজিরবিহীন নির্যাতন। ঊনসত্তরে ছাত্র-জনতা সংগ্রাম করে তাকে কারামুক্ত করেন এবং ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এরপর সত্তরের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ছেড়ে দিতে রাজি হয়নি। ফলে বঙ্গবন্ধুর ডাকে একাত্তরের ৪ মার্চ থেকে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন- যা ছিল বিশ্বের ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন ঘটনা। সেদিনই তিনি ঘোষণা করেন, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ হবে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। উত্তাল মার্চে বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেন বাঙালি জাতির মুক্তির মহানায়ক। তার নেতৃত্বে ১ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত অসহযোগ আন্দোলনসহ নানা কর্মসূচি শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। এ আন্দোলন শুধু একটি সফল মুক্তিযুদ্ধের সূচনা ও পটভূমিই তৈরি করেনি, এ আন্দোলনকালেই কার্যত বাঙালি কয়েক দিনের জন্য হলেও পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতা চালায়। (‘অসহযোগের দিনগুলি, আতিউর রহমান, ১৯৯৮, সাহিত্য প্রকাশ)

অসহযোগ আন্দোলনের টানটান উত্তেজনায় যখন বাঙালি জনমানুষ আন্দোলিত হচ্ছিল, তখন ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের শেষ পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু বজ্র কণ্ঠে উচ্চারণ করেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। তিনি প্রথমে মুক্তি ও পরে স্বাধীনতার কথা বলেন। সুচিন্তিতভাবেই তিনি ওই বক্তব্য দিয়েছিলেন। মুক্তির জন্য যে স্বাধীনতার প্রয়োজন বঙ্গবন্ধু তা স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন। মুক্তি মানে সব ধরনের শোষণ থেকে মুক্তি। অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সব ক্ষেত্রে মুক্তি। একটা স্বাধীন জাতিই কেবল পারে ওই ধরনের মুক্তির প্রত্যাশা করতে। তাই তার ভাষণ গোটা জাতিকে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় উন্মাতাল করে তোলে। বাংলার প্রতিটি মানুষের রক্তে জাগিয়ে তোলে দুর্বার শক্তি- যে শক্তির সামনে দাঁড়াতে পারেনি পাকিস্তানের প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী এবং এ দেশের স্বাধীনতা বিরোধী চক্র। এটি ছিল তার অসামান্য নেতৃত্বের উত্থান-পর্বের শীর্ষবিন্দু। ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো’ এবং ‘যার যা কিছু আছে তা নিয়ে শত্রুকে মোকাবিলা করো’ – এসব কথার মাধ্যমে তিনি বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধভাবে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান। এমনকি ‘আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি’ উচ্চারণের মধ্যে ছিল জাতির মুক্তি আন্দোলনে নিবেদিত অন্যান্য নেতা-কর্মী ও আপামর জনতার বুদ্ধিমত্তার ওপর নির্ভর করার আত্মবিশ্বাস।

সব আলাপ-আলোচনার অবসান ঘটিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে ২৫ মার্চ রাত সাড়ে ১১টার দিকে ঘুমন্ত বাঙালিদের ওপর হত্যাযজ্ঞ শুরু করলে ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। স্বাধীনতা ঘোষণা করার পরপরই পাকবাহিনী তাকে গ্রেফতার করে। নিয়ে যায় পাকিস্তানে। সেদিন থেকেই তার শারীরিক অনুপস্থিতিতে তার নামেই শুরু হয়ে যায় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে দেশের আপামর মানুষ। এ দেশের বীর জনতা নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে, এক সাগর রক্তের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর ছিনিয়ে আনে- স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য। একটি মানচিত্র। একটি জাতীয় পতাকা। এটি বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্জন- সম্ভব হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী, সাহসী এবং ঐন্দ্রজালিক নেতৃত্বের কারণে।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ শুধু বাংলাদেশের ইতিহাসে নয়, বিশ্বেও ছিল সাড়া জাগানো একটি ঘটনা। শুধু মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়নি। এ জন্য দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রাম করতে হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের দীর্ঘ এ পথপরিক্রমায় বঙ্গবন্ধু দুঃসাহসিক ভূমিকা পালন করেন। মৃত্যুকে তুচ্ছ ভেবে তিনি এগিয়ে গেছেন অবিচল চিত্তে। এ জন্যই তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রাণপুরুষ। মহত্তম বীর। আর তিনিই সত্যিকারের বীর যিনি মৃত্যুকে ভয় পান না। ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’, ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’, ‘বাঙালির স্বাধিকার’, ‘জয় বাংলা’, ‘মুক্তিযুদ্ধ’, স্বাধীন বাংলাদেশ’- যাই বলি না কেন এগুলোর অপর নাম ‘বঙ্গবন্ধু’। লাল-সবুজের পতাকায় তিনি হয়ে আছেন চিরস্মরণীয়। বরণীয়। আজ বিশ্বব্যাপী যেখানেই মুক্তির সংগ্রাম, সেখানেই অনুপ্রেরণা বঙ্গবন্ধু। তার নির্ভেজাল স্বদেশী চিন্তা-চেতনা থেকে তারা শিক্ষা নেন।

বঙ্গবন্ধু তার জীবনের প্রতিটি ধাপেই বাঙালির সার্বিক মুক্তির জয়গান গেয়েছেন। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ৫২তম জন্মদিনে এক সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করেন, ‘আপনার ৫২তম জন্মদিনে আপনার সবচেয়ে বড় ও পবিত্র কামনা কী? উত্তরে বঞ্চিত বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা স্বভাবসিদ্ধ কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘জনগণের সার্বিক মুক্তি।’ এরপর তিনি বেদনার্থ স্বরে বলেছিলেন, ‘আমি জন্মদিন পালন করি না, আমার জন্মদিনে মোমের বাতি জ্বালি না, কেকও কাটি না। এ দেশে মানুষের নিরাপত্তা নেই। অন্যের খেয়ালে যে কোনো মুহূর্তে তাদের মৃত্যু হতে পারে। আমি জনগণেরই একজন। আমার জন্মদিনই কী, আর মৃত্যুদিনই কী? আমার জনগণের জন্যই আমার জীবন ও মৃত্যু।’ (‘স্মৃতির পাতায় জাতির জনক’, তোফায়েল আহমেদ, ১৭.০৩.১৩)

এ কথার মাধ্যমেই প্রমাণিত হয় বঙ্গবন্ধু কত বিশাল হৃদয় ও মহৎ মনের অধিকারী ছিলেন! ৫৪তম জন্মদিনে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কমিউনিস্ট পার্টি নেতা কমরেড মণি সিংহ বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধু ১৯৫১ সালে কারাগারে বসেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরিকল্পনা করেছিলেন।’ চিঠিপত্রের মাধ্যমে এই পরিকল্পনার কথা অবহিত হয়ে তিনি আরও বলেন, ‘যদিও আমাদের মতপার্থক্য ছিল তথাপি বঙ্গবন্ধু আমাদের কাছে এটা জানতে চেয়ে প্রতিনিধি পাঠিয়েছিলেন যে, স্বাধীনতা সংগ্রামকে আমরা সমর্থন করব কি না।’ সেদিন মণি সিংহ অকপটে স্বীকার করেছিলেন, ‘জনতা তাদের নেতা নির্বাচনে ভুল করে না। বাংলাদেশের জনগণও তার পশ্চাতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে এবং তাকে মুক্তিদাতা হিসেবে গ্রহণ করেছে।’ (তোফায়েল আহমেদ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৭.০৩.১৫)

বঙ্গবন্ধু সারা জীবন বাঙালি জাতির অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক মুক্তির জন্য কাজ করে গেছেন। বাংলার মানুষের প্রতি ভালোবাসার মর্যাদা তিনি রক্ত দিয়ে পরিশোধ করে গেছেন। তিনি শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। নির্যাতিত-শোষিত-হতদরিদ্র-মেহনতি মানুষের মুক্তির কথা ভাবতেন- যা প্রতিফলিত হয়েছে তার প্রতিটি কর্মে ও চিন্তায়। ১৯৭৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বলেন, ‘বিশ্ব দুই শিবিরে বিভক্ত – শোষক আর শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।’ বাংলার গরিব-দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটাবেন, সোনার বাংলা গড়বেন- এটাই ছিল তার জীবনের ব্রত। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য- এই মৌলিক অধিকারগুলো পূরণের মাধ্যমে বাংলার মানুষ উন্নত জীবন পাবে, দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে, বেকারত্ব দূর হবে- সেই ভাবনাই ছিল প্রতিনিয়ত তার মনে। তিনি বলতেন, ‘এ স্বাধীনতা আমার ব্যর্থ হয়ে যাবে যদি আমার বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত না খায়। এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি বাংলার মা-বোনেরা কাপড় না পায়। এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি এদেশের মানুষ যারা আমার যুবক শ্রেণি আছে তারা চাকরি না পায় বা কাজ না পায়।’ (‘শেখ মুজিব বাংলাদেশের আরেক নাম’, আতিউর রহমান, ২০০৯, দীপ্তি প্রকাশনী)

বঙ্গবন্ধুর কথা এবং বক্তৃতায় প্রায়ই উদ্ধৃত হতো বাঙালি কবিদের কবিতার চরণ। রবীন্দ্রনাথ-নজরুল ছিলেন তার অভয়মন্ত্র। দীর্ঘ নয় মাস চৌদ্দ দিন কারাবাসের পর পাকিস্তান থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করে ১৯৭২-এর ১০ জানুয়ারি রেসকোর্সের ঐতিহাসিক গণসমুদ্রে তিনি বলেন, ‘সাত কোটি বাঙালিরে হে মুগ্ধ জননী, রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করোনি।’ অশ্রুসিক্ত নয়নে উচ্চকিত হন এই বলে, ‘কবিগুরু, তুমি এসে দেখে যাও, তোমার বাঙালি আজ মানুষ হয়েছে, তুমি ভুল প্রমাণিত হয়েছো, তোমার কথা আজ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে…।’

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে সোনার বাংলা গড়ার সংগ্রামে নিয়োজিত হন বঙ্গবন্ধু। দেশের অর্থনীতিকে সচল করতে যেসব সৃজনশীল উদ্যোগ গ্রহণ করেন তা শেষ করার মতো যথেষ্ট সময় তিনি পাননি। তবে ওই উদ্যোগগুলো তিনি নিয়েছিলেন বলেই এতদিনে বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি মজবুত পাটাতন তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু অর্থনৈতিক সমতা প্রতিষ্ঠার লড়াই করে গেছেন। তিনি বাঙালি কৃষককুলের কথা সব সময় ভাবতেন, যেমনটি ভাবতেন আরেক শ্রেষ্ঠ বাঙালি রবীন্দ্রনাথ। নগরে জন্মালেও কাজের সুবাদে পূর্ববাংলার কৃষকদের খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের। আর বঙ্গবন্ধু তো ছিলেনই কৃষক সন্তান। তবে তার পড়াশোনা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশই ছিল নগরে। গ্রাম ও নগরের ভাবনার এই মিশেল দুই শ্রেষ্ঠ বাঙালির মনোজগৎকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিল। পূর্ববাংলার কৃষকদের দুঃখ দেখে রবীন্দ্রনাথ তাদের সমবায় গঠনের পরামর্শ দিয়েছিলেন। পল্লীর উন্নতির জন্য তার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবও ছিল। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন, পল্লীবাসী উপেক্ষিত। তিনি মনে করতেন, ‘অন্নের উৎপাদন হয় পল্লীতে, আর অর্থের সংগ্রহ চলে নগরে।’ এ জন্যই তিনি পৃথিবীর আলো পল্লীতে ফেলতে বলেছেন। দেশকে এমন গভীরভাবে ভালোবাসার যে আহ্বান রবীন্দ্রনাথ করেছিলেন তা মনে হয় বৃথা যায়নি। আরেক শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবও তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়িয়েছেন স্বদেশকে।

ঐতিহ্যে স্থির থেকে বাঙালির আধুনিক পরিচয়কে বহুমাত্রিক পূর্ণতা দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। ভাষা আন্দোলন যেভাবে বাঙালির নবলব্ধ আত্মপরিচয়কে গণতান্ত্রিক, বহুরৈখিক, সহিষ্ণু করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথ বেঁধে দেয় তা থেকে একটুও বিচ্যুত হননি। বরং হ্যামিলনের বংশীবাদকের মতো ওই পথেই কোটি বাঙালিকে সঙ্গে নিয়ে বঙ্গবন্ধু হাঁটতে থাকেন মুক্তির মূল লক্ষ্যে পেঁৗছানোর প্রতিজ্ঞা বুকে বেঁধে। সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে স্বাধীনতা-আন্দোলনকে পরিচালনা করেই তিনি তার দায়িত্ব শেষ করেননি। মূলত কৃষক-সন্তানদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েও তিনি ভুলতে পারেননি কৃষকদের কথা। তার শোষণহীন সমাজ গঠনের অভিপ্রায়ের বড় অংশই জুড়ে ছিল কৃষক। তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন, কৃষির উন্নতি ছাড়া এ দেশের মানুষের মুক্তি আসতে পারে না। কৃষকরাই এ দেশের প্রাণ। সোনার বাংলা গড়ার কারিগর।

কৃষকদের অধিকার আদায়ে বঙ্গবন্ধুর বজ্র কণ্ঠ বারবার গর্জে উঠত। ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের প্রথম স্বাধীনতা দিবসে বেতার-টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে ভাষণে বঙ্গবন্ধু কৃষকদের কথা বলেন এভাবে, ‘আমাদের চাষিরা হলো সবচেয়ে দুঃখী ও নির্যাতিত শ্রেণী এবং তাদের অবস্থার উন্নতির জন্য আমাদের উদ্যোগের বিরাট অংশ অবশ্যই তাদের পিছনে নিয়োজিত করতে হবে।’ (‘শেখ মুজিব বাংলাদেশের আরেক নাম’, আতিউর রহমান, ২০০৯, দীপ্তি প্রকাশনী)

বরীন্দ্রনাথও বলতেন, ‘আজ শুধু একলা চাষির চাষ করিবার দিন নাই, আজ তাহার সঙ্গে বিদ্বানকে, বৈজ্ঞানিককে যোগ দিতে হইবে।’ বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কৃষক-শ্রমিকসহ মেহনতি মানুষের স্বার্থরক্ষার বিষয়টিই সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি যেমন তাদের ভালোবেসেছেন তেমনি তাদের ভালোবাসাও পেয়েছেন সর্বক্ষণ। মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশমাতৃকার মান অক্ষুণ্ন রাখতে কৃষকরাও লাঙল ছেড়ে স্টেনগান ধরেছে। কৃষক-সন্তানেরাই শক্ত হাতে যুদ্ধ করেছে দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে। আমার নিজের এক গবেষণায় পেয়েছি, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের ৭৮ শতাংশই এসেছিল গ্রাম থেকে। তাদের একটা সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ (৬০ শতাংশ) ছিল ছাত্র- যারা কৃষক পরিবারের সন্তান। আর ১২ শতাংশ ছিল সাধারণ কৃষক। (‘মুক্তিযুদ্ধ জনযুদ্ধ’, আতিউর রহমান, ২০০৩, সাহিত্য প্রকাশ)

কৃষক-বধূরাও সাহস জুগিয়েছে, সাহায্য করেছে মুক্তিযোদ্ধাদের। বঙ্গবন্ধু সে কথা কখনো ভুলে যাননি। কৃষকদের প্রতি ভালোবাসার টান ছিল বলেই তিনি তাদের মঙ্গলের জন্য কাজ করে গেছেন নিবিড়ভাবে। রাজনৈতিক কারণে তিনি দেশের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়িয়েছেন নিরন্তর। তার যাত্রাপথে এগিয়ে এসেছেন কৃষককুলসহ সর্বস্তরের জনগণ। একবার এক জনসভায় তিনি বলেন, ‘একজন মানুষ আর কী চাইতে পারে – আমি যখন ভাবি দূরে এক জনশূন্য পথের ধারে আধো আলো-ছায়ায় এক লোক লণ্ঠন হাতে দাঁড়িয়ে আছে শুধু আমাকে এক নজর দেখবে বলে, তখন মনে হয়, একজন মানুষের পক্ষে আর কী চাওয়া-পাওয়ার থাকতে পারে।’ মানুষের প্রতি এত ভালোবাসা ছিল বলেই বঙ্গবন্ধু হারিয়ে যাওয়ার নন। সময়ের পরিক্রমায় তিনি আরও বেশি জীবন্ত, আরও বেশি প্রাণবন্ত।

পঞ্চাশের দশকে পাকিস্তানের পার্লামেন্টে কৃষকের পক্ষে, ষাটের দশকে ছয় দফা আন্দোলনে কৃষকদের স্বার্থ সংরক্ষণে কথা বলেছেন। স্বাধীন দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও সর্বক্ষণ কৃষক-অন্তঃপ্রাণ ছিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭০ সালের ২৮ অক্টোবর বেতার ও টেলিভিশনে প্রাক-নির্বাচনী ভাষণেও কৃষক-সমাজের অধিকার সংরক্ষণের কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে উল্লেখ করেন, ‘একটা স্বল্প সম্পদের দেশে কৃষি পর্যায়ে অনবরত উৎপাদন-হ্রাসের পরিস্থিতি অব্যাহত রাখা যেতে পারে না। দ্রুত উৎপাদন বৃদ্ধির সকল প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে। চাষিদের ন্যায্য ও স্থিতিশীল মূল্য প্রদানের নিশ্চয়তা দিতে হবে। প্রকৃত প্রস্তাবে আমাদের গোটা কৃষি-ব্যবস্থাতে বিপ্লবের সূচনা অত্যাবশ্যক। পশ্চিম পাকিস্তানে জমিদারি, জায়গীরদারি, সরদারি প্রথার অবশ্যই বিলুপ্তি সাধন করতে হবে। ভূমি দখলের সর্বোচ্চ সীমা অবশ্যই নির্ধারণ করে দিতে হবে। নির্ধারিত সীমার বাইরের জমি এবং সরকারি খাসজমি ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করতে হবে। কৃষিব্যবস্থাকে অবশ্যই আধুনিকীকরণ করতে হবে।’ (‘শেখ মুজিব বাংলাদেশের আরেক নাম’, আতিউর রহমান, ২০০৯, দীপ্তি প্রকাশনী)

সত্তরের নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পর ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে দলীয় সদস্যগণের শপথবাক্য পাঠ উপলক্ষে এক বিশাল সমাবেশে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমার দল ক্ষমতায় যাওয়ার সাথে সাথেই ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ করে দেবে। আর দশ বছর পর বাংলাদেশের কাউকেই জমির খাজনা দিতে হবে না। পশ্চিম পাকিস্তানের বেলায়ও এই একই ব্যবস্থা অবলম্বন করা হবে।’ (‘শেখ মুজিব বাংলাদেশের আরেক নাম’, আতিউর রহমান, ২০০৯, দীপ্তি প্রকাশনী)

কৃষকদের ভাগ্যোন্নয়নে বঙ্গবন্ধু নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। সদ্য স্বাধীন দেশের ত্রিশ লাখ টন খাদ্য ঘাটতি পূরণে তাৎক্ষণিক আমদানি, স্বল্প মেয়াদে উন্নত পদ্ধতিতে চাষাবাদ, উন্নত বীজ, সেচ ও অন্যান্য কৃষি-উপকরণ সরবরাহ, কৃষি ঋণ মওকুফ, সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহার এবং কৃষকের মাঝে খাসজমি বিতরণ করে কৃষির উৎপাদনশীলতা ও উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে খাদ্যে স্বনির্ভরতা অর্জনের চেষ্টা করেন। কৃষিতে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের জন্য কৃষি ব্যাংক স্থাপন করেন। উচ্চতর কৃষি গবেষণা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ১৯৭৩ সালের মধ্যেই ধ্বংসপ্রাপ্ত কৃষি-অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ করেন। পাকিস্তানি শাসনকালের দশ লাখ সার্টিফিকেট মামলা থেকে কৃষকদের মুক্তি ও তাদের সব ঋণ সুদসহ মাফ করে দেন। ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা চিরদিনের জন্য রহিত করেন। পরিবারপিছু জমির সিলিং ১০০ বিঘায় নির্ধারণ করেন। শক্তিচালিত সেচ পাম্পের সংখ্যা ১১ হাজার থেকে ৩৬ হাজারে উন্নীত করেন। বিশ্ববাজারে সারের ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধির কারণে সারে ভর্তুকি দিয়ে কৃষককে রক্ষা করেন। বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন, কৃষিই এ দেশের জাতীয় আয়ের প্রধান উৎস। কৃষির উন্নতিই দেশের উন্নতি। ১৯৭৫ সালের ২৫ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক জনসভায় তিনি বলেন, ‘আমি চাই বাংলাদেশের প্রত্যেক কৃষক ভাইয়ের কাছে যারা সত্যিকার কাজ করে, যারা প্যান্ট-পরা কাপড়-পরা ভদ্রলোক তাদের কাছেও চাই- জমিতে যেতে হবে, ডবল ফসল করুন। প্রতিজ্ঞা করুন, আজ থেকে ঐ শহিদদের কথা স্মরণ করে ডবল ফসল করতে হবে। যদি ডবল ফসল করতে পারি, আমাদের অভাব ইনশা-আল্লাহ হবে না।’ (‘শেখ মুজিব বাংলাদেশের আরেক নাম’, আতিউর রহমান, ২০০৯, দীপ্তি প্রকাশনী)

কৃষকদের সততা ও দেশপ্রেমের প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুর ধারণা ছিল স্বচ্ছ ও শ্রদ্ধাপূর্ণ। ১৯৭৫-এর ২৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে এক ভাষণে বলেন, ‘করাপশন আমার বাংলার কৃষকরা করে না। করাপশন আমার বাংলার মজদুর করে না। করাপশন করি আমরা শিক্ষিত সমাজ। যারা আজকে ওদের টাকা দিয়ে লেখাপড়া করেছি।’ বঙ্গবন্ধুর সচেতন ও কৃষক দরদী নীতির ফলে কৃষিতে অগ্রগতির যে ধারা সূচিত হয়েছিল তারই ফলে আজ কৃষি খাত শক্তিশালী হয়েছে। তারই সুকন্যার নেতৃত্বে কৃষকবান্ধব কৃষি উৎপাদন ও সহযোগী কৃষি ঋণ, কৃষি সম্প্রসারণ নীতিমালা প্রয়োগের ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বিপ্লব ঘটে গেছে। বর্তমানে চার কোটি টন খাদ্য উৎপাদন হচ্ছে। পাঁচ-ছ’ বছর আগেও বাংলাদেশকে প্রতিবছর এক বিলিয়ন ডলার বা তার বেশি খরচ করে চাল আমদানি করতে হতো। এখন চাল আমদানি করতে হয় না বললেই চলে। বর্তমান সরকার যে কল্যাণধর্মী ও কৃষকবান্ধব উন্নয়ন নীতি-কৌশল গ্রহণ করেছে তা বঙ্গবন্ধুর কৃষি-ভাবনারই প্রতিফলন। এসব নীতি-কৌশলের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে প্রকৃত কৃষক, বর্গাচাষি ও প্রান্তিক কৃষকদের ঋণ সেবাসহ আধুনিক ব্যাংকিং সেবা পৌঁছানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগের ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে কৃষির ওপর। কৃষকদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হয়েছে। তাদের ছেলেমেয়েরা এখন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়াশোনা করতে পারছে। কৃষকরা আজ মোবাইল ফোন ব্যবহার করে কৃষিপণ্য বিক্রির জন্য মূল্য সঠিকভাবে যাচাই করতে পারছে।

বঙ্গবন্ধু একটি দর্শন, একটি চেতনা। যে চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আজও আমরা এগিয়ে চলেছি একটি শোষিত-বঞ্চিত জাতির সার্বিক মুক্তির দিকে। বঙ্গবন্ধু হলেন বিশ্বাস, ধ্যান ও জ্ঞানে মুক্তিকামী জনতার মূলমন্ত্র। অপরের দুঃখ-কষ্ট বঙ্গবন্ধুকে সর্বদাই আবেগাপ্লুত করত। বাঙালি জাতির মুক্তি ও উন্নয়নে নিজেকে উৎসর্গ করেও জেলগেটে সহধর্মিণীর কাছে আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমার জীবনের ঘটনাগুলি জেনে জনসাধারণের কি কোনো কাজে লাগবে? কিছুই তো করতে পারলাম না। শুধু এইটুকু বলতে পারি, নীতি ও আদর্শের জন্য সামান্য একটু ত্যাগ স্বীকার করতে চেষ্টা করেছি।’ (‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, শেখ মুজিবুর রহমান, পৃ. ১)

বঙ্গবন্ধু নিজের কিংবা তার পরিবারের জন্য কখনোই কিছু চাইতেন না। খুবই সাধারণ জীবনযাপন করতেন। রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হয়েও সরকারি বাসভবনে থাকতেন না। নিরাভরণ, ছিমছাম আর আটপৌরে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়িটিতেই আমৃত্যু থেকেছেন। ধানমণ্ডিতে যখন প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয় তখন ভালো একটি প্লট নেওয়ার জন্য সবার অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি বলেছিলেন, ‘আগে সবাইকে দাও, তারপর যদি থাকে তখন দেখা যাবে।’ বঙ্গবন্ধু নানা বক্তৃতায় সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের কথা, মানমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার মৌল আকাঙ্ক্ষা পূরণ ও ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার কথা বারবার বলেছেন। ১৯৭২ সালের ৯ মে রাজশাহীর এক জনসভায় বলেন, ‘আমি কি চাই? আমি চাই বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত খাক। আমি কি চাই? আমার বাংলার বেকার কাজ পাক। আমি কি চাই? আমার বাংলার মানুষ সুখী হোক। আমি কি চাই? আমার বাংলার মানুষ হেসে খেলে বেড়াক। আমি কি চাই? আমার সোনার বাংলার মানুষ আবার প্রাণভরে হাসুক।’ (‘শেখ মুজিব বাংলাদেশের আরেক নাম’, আতিউর রহমান, ২০০৯, দীপ্তি প্রকাশনী) ধীরে হলেও বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার জন্য বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার বর্তমান সরকার কাজ করে চলেছে। আমরা তার সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষা পূরণের পথেই হাঁটছি।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন ব্যাপক অগ্রগতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক পরিকল্পনার প্রবর্তক। তার অর্থনৈতিক আদর্শ ও কৌশল ছিল- নিজস্ব সম্পদের ওপর দেশকে দাঁড় করানো। এ জন্য স্বাধীনতা লাভের পরপরই হাতে নেন নানা উদ্যোগ। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের প্রথম কয়েকটি বছর ছিল চড়াই-উতরাইপূর্ণ। তখন বাংলাদেশের পরিচিতি ছিল প্রাকৃতিক দুর্যোগপূর্ণ, বিধ্বস্ত অর্থনৈতিক কাঠামোর একটি অভাব-অনটনের দেশ হিসেবে। দারিদ্র্যপীড়িত সাব-সাহার কয়েকটি দেশের সঙ্গে উচ্চারিত হতো বাংলাদেশের নাম। ছিল না অর্থ, অবকাঠামো, দক্ষ জনশক্তি, শিল্প-কারখানা, রপ্তানি আয়, রেমিট্যান্স ও বিদেশি মুদ্রার মজুদ। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে টিকে থাকার এক তীব্র লড়াই করতে হয়েছে।

তখন পাশ্চাত্যের অর্থনীতিবিদরা বাংলাদেশকে উন্নয়নের পরীক্ষার মুখে পড়া এক অসহায় দেশ হিসেবে দেখেছেন। অনেকেই হতাশ হয়ে দেশটির স্থায়িত্ব নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তারা বাংলাদেশের পৃথক রাষ্ট্র হওয়াকে হঠকারী সিদ্ধান্ত মনে করেছেন। অনেকে এও আশঙ্কা করেছিলেন কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়া, হেরে যাওয়া অকার্যকর রাষ্ট্রের তালিকায় শামিল হবে। কিন্তু নিন্দুকদের মুখে ছাই দিয়ে বাংলাদেশ এসব মিথ ও ভ্রান্ত পূর্বাভাসকে মিথ্যা প্রমাণ করে অভাবনীয়ভাবে ধ্বংসাবশেষ থেকে স্ফিনিকস পাখির ন্যায় উঠে এসেছে। যারা সে সময়ে হতাশা ছড়িয়ে ছিলেন তারাই এখন বাংলাদেশকে উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছেন। দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ টেকসই প্রবৃদ্ধি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের আদর্শ হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত হয়ে উঠেছে। ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের পরিচয় পেয়ে গেছে। এখন আমরা দ্রুত এগুচ্ছি উচ্চ মধ্য আয়ের দেশ হওয়ার পথে। জাতির পিতা এবং লাখো শহীদের স্বপ্নের প্রতিও দেশ আজ সুবিচার করে চলেছে।

বঙ্গবন্ধুর কৃতজ্ঞতাবোধ, বিনয়, মানুষের প্রতি প্রগাঢ় ছিল ভালোবাসা। আকাশের মতো উদার ছিল তার হৃদয়। জ্যোতির্ময় ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন তিনি। বীরত্ব, সাহস ও তেজস্বিতার স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে তিনি ছিলেন ভাস্বর। তার কাছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ছিল ন্যায়সঙ্গত। বঙ্গবন্ধু কখনোই মানুষের মনে আঘাত দিয়ে কথা বলতেন না। তার রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল মার্জিত। কখনোই রাজনৈতিক বক্তব্যে ব্যক্তিগত বিষয়কে প্রাধান্য দিতেন না। কখনো ব্যক্তিগত আক্রমণ করতেন না। তার সময়ানুবর্তিতা, নিয়মানুবর্তিতা ছিল অসাধারণ। সময়ের এক চুল হেরফের করতেন না। ঘড়ি ধরে অনুষ্ঠানে যেতেন। নীতির প্রশ্নে ছিলেন অটল। এক মুহূর্তে মানুষকে আপন করে নেওয়ার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা ছিল তার। শিশুদের প্রতি ছিল অপার ভালোবাসা। অপূর্ব মমত্ববোধ। তিনি যখন গণভবনে যেতেন, সামনে-পেছনে মাত্র দুটি গাড়ি থাকত। রাস্তায় ট্রাফিক সিগন্যাল পড়লে গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ত। তখন স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল বাতি ছিল না। একবার গাড়ি সিগন্যালে দাঁড়ানো। হঠাৎ একটি সাত-আট বছরের শিশু গাড়ির কাছে এসে বঙ্গবন্ধুকে উদ্দেশ করে বলল, ‘আস-সালামুআলাইকুম, মুজিব সাহেব।’ তৎক্ষণাৎ বঙ্গবন্ধু শিশুটির হাত ধরে আদর করলেন, মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

জাতির পিতা সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য এবং নির্লজ্জ মিথ্যাচার করে নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা আগেও হয়েছে, এখনো হচ্ছে। আমি বিশ্বাস করি, স্বাধীনতার ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করে কিংবা জাতির পিতাকে অস্বীকার করে বাংলাদেশে কেউ টিকে থাকতে পারবে না। ইতিহাসকে পাল্টে দেওয়ার অপপ্রয়াস গায়ের জোরে চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা কখনোই টেকসই হয় না, বরং এই অপপ্রয়াস যারা চালায়, তারাই হারিয়ে যায় বিস্তৃতির অতলে। বঙ্গবন্ধুর মতো হিমালয়সম বীর পুরুষকে যারা অন্যায় আক্রমণ করছে, অসংলগ্ন প্রলাপ বলে যাচ্ছে, তাদের এসব কথার কোনো গুরুত্বই নেই সত্যিকারের বাঙালির কাছে। তাদের এই হীন কর্মকাণ্ডের পেছনে কুউদ্দেশ্য সচেতন মহলের কাছে দিবালোকের মতো পরিষ্কার। বঙ্গবন্ধুকে কখনোই খাটো করা যাবে না। কেননা, তিনি মুক্তিযুদ্ধের মতোই বিরাট, বিশাল। কেউই তার নখাগ্রটিও স্পর্শ করতে পারবে না। এমন একটি অন্ধকার সময় নেমে এসেছিল এই বাংলাদেশ যখন বলা হতো শেখ মুজিব ‘কেউ নন’। তখন এ দেশের কবিরা এই তাচ্ছিল্যেও সদুত্তর দিয়েছিলেন নানা নান্দনিক কবিতার ছন্দে। তার একটি নমুনা মহাদেব সাহার কবিতা (এই নাম স্বতোৎসারিত) থেকে উল্লেখ করতে চাই, “…তুমি কেউ নও, বলে ওরা, কিন্তু বাংলাদেশের আড়াইশত নদী বলে,/তুমি এই বাংলার নদী, বাংলার সবুজ প্রান্তর/তুমি এই চর্যাপদের গান, তুমি এই বাংলা অক্ষর,/বলে ওরা, তুমি কেউ নও, কিন্তু তোমার পায়ের শব্দে/নেচে ওঠে পদ্মার ইলিশ;/তুমি কেউ নও, বলে ওরা, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গান আর নজরুলের/বিদ্রোহী কবিতা বলে,/তুমি বাংলাদেশের হৃদয়ে।”

জাতির পিতা আজ আমাদের মাঝে নেই। তিনি অমর, অবিনশ্বর। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, ভাষা, সমাজ, সংস্কৃতি ও সভ্যতার মধ্যে চিরজাগ্রত। কবি সুফিয়া কামালের কবিতার মতোই বাংলার মানুষের হৃদয়ে তার অবস্থান, ‘এই বাংলার আকাশ-বাতাস, সাগর-গিরি ও নদী/ডাকছি তোমায় বঙ্গবন্ধু ফিরে আসতে যদি/হেরিতে এখনো মানব হৃদয় তোমারই আসন পাতা/এখনো মানুষ স্মরিছে তোমারে ভাইবোন পিতা-মাতা।’ বঙ্গবন্ধু ছিলেন দেশপ্রেমের মূর্ত প্রতীক। আমাদের চেতনার অগি্নমশাল। তার আদর্শ চিরঅম্লান। সেই আদর্শকে বুকে ধারণ করে, তারই স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে দৃঢ় শপথ গ্রহণই হবে বঙ্গবন্ধুর প্রতি সত্যিকার শ্রদ্ধা জানানো। স্লোগান সর্বস্বতা এবং লোক দেখানো স্তুতিবাক্য নয়, তাকে কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে নয়, তার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে দেশের প্রত্যেকটি নাগরিককে প্রকৃত দেশপ্রেমিক, সৎ, নিষ্ঠাবান, সাহসী ও ত্যাগী দেশকর্মী হতে হবে। তার সংগ্রামী জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে গোটা জাতি একযোগে কাজ করতে পারলেই আমাদের অর্থনীতির পালে জোর হাওয়া লাগবে। তখন বাংলাদেশ হয়ে ওঠবে সত্যিকারের ‘ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা’, যেমনটি বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নপূরণে বর্তমান সরকারের ‘ভিশন’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে আমরা সতর্ক, সংযত কিন্তু উৎপাদনবান্ধব মুদ্রা ও আর্থিক নীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিম্নগামী রাখতে পেরেছি। প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের ধারা অক্ষুণ্ন রেখে আমরা অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাংকিং, দরিদ্রের ক্ষমতায়ন ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক নয়াধারা চালু করতে সক্ষম হয়েছি- সমগ্র আর্থিক খাতকে দিয়েছে এক মানবিক চেহারা। অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি দারিদ্র্য নিরসন ও সামাজিক উন্নয়নেও অর্জন এখন লক্ষণীয়। দারিদ্র্য প্রায় ষাট ভাগ থেকে চবি্বশ ভাগে নেমে এসেছে। এই হার আগামী দিনে আরও দ্রুত কমবে বলে আশা করা যায়। টাকার মূল্যমান স্থিতিশীল ও জোরালো রাখা সম্ভব হয়েছে। এ ছয় বছরে আমদানি বেড়েছে ৭৫ শতাংশ, রপ্তানি বেড়েছে দ্বিগুণ, রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তিনগুণের বেশি বেড়ে ২৫ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। বৈদেশিক অর্থনৈতিক খাতের এই শক্তির জোরেই আমরা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করে চলেছি। বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি মন্দার পরিবেশেও গড়ে ৬.২ শতাংশেরও বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চলেছে বাংলাদেশ। মাথাপিছু আয় দ্বিগুণের বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩১৪ ডলার। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ নিম্ন মধ্যআয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে একটি মধ্যআয়ের দেশ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত একটি সমৃদ্ধ জাতি গড়ার পথে বাংলাদেশের তিনবারের সফল প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা জনহিতৈষী পদক্ষেপ, উন্নত রাষ্ট্রচিন্তা, স্থিতিশীল অর্থনীতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা উজ্জীবিত করার মাধ্যমে দেশকে জোরকদমে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার কাজে তিনি তার ধ্যান, মন, প্রাণ পুরোপুরি সঁপে দিয়েছেন। দেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতকে ঐক্যবদ্ধভাবে আরও শক্তিশালী করব এবং সব ষড়যন্ত্রকারীকে প্রতিহত করব- এটাই হোক আমাদের আজকের শপথ। *

লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর

* গত ৩ আগস্ট ২০১৫ তারিখে বঙ্গবন্ধুর চল্লিশতম শাহাদাতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে একক বক্তৃতা অনুষ্ঠানে লেখক কর্তৃক প্রদত্ত ভাষণ থেকে সংকলিত।

বাংলাদেশ প্রতিদিন 

loading...

About sylhet24 express

Check Also

নদী, প্রকৃতি আর ঐতিহ্যে 

নদী, প্রকৃতি আর ঐতিহ্যে 

মোহাম্মদ আলম : নগর জীবনের কোলাহল আর কর্মক্ষেত্রের টানাপড়েনে হাঁসফাঁস অনুভ‚তি সবারই কমবেশি উপলব্দি হয়! সকাল-সন্ধ্যা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *