Breaking News
loading...
Home / উপ সম্পাদকীয় / বন্যার উদ্বেগে উদাসীনতা!

বন্যার উদ্বেগে উদাসীনতা!

বন্যার উদ্বেগে উদাসীনতা!

শুভা দত্ত : ‘কেন্দ্রের বিমাতৃসুলভ আচরণ’ বলে একটা কথা একসময় খুব শোনা যেত। ইন্দিরা গান্ধীর আমলে তো বটেই, তার পরে তার পুত্র রাজীব গান্ধী বা তার পরের প্রধানমন্ত্রীদের আমলেও এ রাজ্যে ওই ‘বিমাতৃসুলভ আচরণ’ নিয়ে রাজনৈতিক হইচই যথেষ্ট হয়েছে। মনে আছে, সে সময় জ্যোতি বসু কথায় কথায় কেন্দ্রের বিমাতৃসুলভ আচরণের অভিযোগ তুলে দিলি­কে তুলোধোনা করতেন। ব্রিগেড সভা থেকে নির্বাচনী সমাবেশ- কেন্দ্রের বিরুদ্ধে তোপ দাগতে সর্বত্রই জ্যোতিবাবুদের অন্যতম প্রধান অস্ত্র ছিল ওই বিমাতৃসুলভ আচরণ। একমাত্র বিশ্বনাথপ্রতাপ সিংয়ের প্রধানমন্ত্রিত্বকালেই যার একটু ব্যতিক্রম হয়েছিল। হয়েছিল কারণ, বিশ্বনাথপ্রতাপ ছিলেন সিপিএম নেতৃত্বাধীন বামদের বন্ধু প্রধানমন্ত্রী। জ্যোতিবাবুর সঙ্গেও তার সম্পর্ক ছিল একটু বেশি রকমের মধুর। তাই তখন এই রাজ্যের ব্যাপারে কেন্দ্রের দৃষ্টিভঙ্গির বিশেষ রদবদল না হলেও বিমাতৃসুলভ ব্যাপারটা নিয়ে জ্যোতিবাবু এবং তার দলীয় নেতানেত্রীরা বিশেষ হলাগুলা করতে পারেননি। বাদবাকি সকলের রাজত্বেই জ্যোতিবাবুদের ‘বিমাতৃসুলভ আচরণে’র রাজনৈতিক অভিযোগে সরগরম থেকেছে বাংলা থেকে দিলি­।

সে অভিযোগ যে পুরোপুরি অমূলক ছিল তা বোধকরি কেউই বলবেন না। বরং, অভিযোগের অনেকটাই ছিল রূঢ় বাস্তব- এমনই বলেন তথ্যভিজ্ঞরা। বলতে কী, স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলার প্রতি আর্থিক ও অন্যান্য বিষয়ে দিলি­ সরকারের বৈষম্যমূলক আচরণ ও বঞ্চনা একটা ট্র্যাডিশনের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছিল। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ই হোক, কী শিল্প পুনর্গঠন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি বিষয়ে পরিকল্পনা রূপায়নই হোক- কী গ্রামোন্নয়ন-কেন্দ্রীয় সরকারের পূর্ণ সহযোগিতা কোন ব্যাপারে কবে কতটা মিলেছে তা নিয়ে গবেষণা চলতেই পারে। তখন পত্রপত্রিকায় মাঝেমধ্যে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে কেন্দ্রের নানারকমের অনুদান ও সাহায্যের তুলনামূলক খতিয়ান বের হতো। তাতে পশ্চিমবঙ্গের নাম কবে প্রথমদিকে দেখেছি আমরা- কেউ কি মনে করতে পারেন? অথচ, দেশের স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে শুরু করে শিক্ষা-শিল্প-সংস্কৃতি সবকিছুতে একটা সময় পর্যন্ত পথ দেখিয়েছে এই রাজ্য। অথচ, স্বাধীন ভারতে বাস্তবটা হলো- আর্থিক ও অন্যান্য বিষয়ে বাংলাকে বঞ্চনার সময় সে কথা দিলি­ খুব সামান্যই মনে রেখেছে। ইতিহাস কি তাই বলে না?

রাজ্যের বর্তমান ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতিতে দেখা গেল বাংলাকে বঞ্চনার সেই ট্র্যাডিশনে এতটুকু হেরফের তো হয়ইনি, বরং স্বাধীনতার ৭০ বছর পর নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদির প্রধানমন্ত্রিত্বকালেও পশ্চিমবাংলা সমানভাবে, বলা ভালো আরও নির্দয়ভাবে বঞ্চিত! উত্তরবঙ্গ জলে ডুবে গিয়েছে, দক্ষিণবঙ্গের অবস্থাও তথৈবচ। ঘন ঘন নিম্নচাপ ও ঘূর্ণাবর্তের জেরে আকাশে মুষলধার বৃষ্টির ভ্র“কুটি অব্যাহত। ইতোমধ্যেই জলের তোড়ে ভেসে প্রাণ হারিয়েছেন কত মানুষ। উত্তরবঙ্গেই সংখ্যাটা নাকি সত্তর ছুঁই ছুঁই! হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন, ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু, ত্রাণ কোথায়? মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যুদ্ধকালীন তৎপরতায় বন্যা প্লাবিত এলাকার অসহায় গৃহহীনদের ত্রাণের ব্যবস্থা করছেন। কিন্তু, রাজ্যের ক্ষমতার তো একটা সীমা আছে। সেজন্যই না প্রাকৃতিক দুর্যোগ দুর্বিপাকে আজও কেন্দ্রের দ্বারস্থ হতে হয়। অথচ, আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, এখনও মোদিজির সরকারের কাছ থেকে ত্রাণ ব্যাপারে তেমন উৎসাহব্যঞ্জক সাড়া মিলল না! রাজ্যের উদ্বেগজনক বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে কেন্দ্র কেমন যেন উদাসীন, গয়ংগচ্ছ! এমন তো নয় যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্যা নিয়ে বাড়িয়ে বলছেন। পশ্চিমবঙ্গের বন্যার ভয়াবহ সব চিত্র ও সংবাদ যতদূর জানি সর্বভারতীয় সংবাদ মাধ্যমেও দেখা যাচ্ছে। এ রাজ্যে মোদিজির দল বিজেপি’র নেতানেত্রীরাও সে বন্যার ব্যাপ্তি ও বিপদ বেশ ভালোমতোই বুঝেছেন। তাও, কেন্দ্র ত্রাণের ব্যাপারে তেমন উদ্যোগী হলো কই?

এখনও পর্যন্ত যা করার তা তো করছেন কেবল মমতা। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে প্রশাসনকে সর্বাত্মকভাবে কাজে লাগিয়ে বন্যা দুর্গতদের উদ্ধার ও তাদের জন্য ত্রাণসামগ্রী বিলি করার যথাসম্ভব ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু, রাজ্যের এতবড় এবং ভয়াল বন্যায় আমাদের কেন্দ্রীয় সরকারের ভ‚মিকা কী? কোথায় তারা? গত লোকসভা ভোটের আগে মোদিজি এসে এ রাজ্যের মানুষজনকে যেসব প্রতিশ্র“তি দিয়ে গিয়েছিলেন, যতদূর মনে পড়ে তার মধ্যে বাংলার প্রতি ওই ‘বিমাতৃসুলভ আচরণ’ বঞ্চনার অন্ত ঘটানোর কথাটাও ছিল। ছিল না কি? জানি না, ‘স্বচ্ছ ভারত’ ‘শাইনিং ইন্ডিয়া’র কারিগর মোদিজি সেই কথা ভুলেছেন কিনা? না ভুললে, বাংলার উত্তর-দক্ষিণের এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মধ্যে মানুষের পাশে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ও তার প্রশাসনের পাশাপাশি ত্রাণসামগ্রী সমেত মোদিজির প্রতিনিধিদেরও তো পাওয়ার কথা ছিল। বাংলার বন্যাদুর্গত হাজার লাখ অসহায় মানুষ পাচ্ছেন কি তাদের? তেমন সুখবর তো এখনও কারো মুখে শুনলাম না! রাজ্যবাসী সাধারণ বিশেষত বন্যায় ঘরবাড়ি হারানো মানুষ তো ঠিক উলটো কথাটাই বলছেন, মুখ্যমন্ত্রী মমতা, তার প্রশাসন এবং ভারত সেবাশ্রম সংঘের মতো কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ছাড়া বন্যার জল থেকে উদ্ধার ত্রাণে আর কাউকেই দেখা যাচ্ছে না!

একথা ঠিক, নোট-বদল থেকে জিএসটি-কেন্দ্রের বেশ কিছু সিদ্ধান্তের প্রবল বিরোধিতা করেছেন মমতা। করেছেন সাধারণ গরিব মধ্যবিত্তের স্বার্থের কথা মাথায় রেখেই। সিপিএমের মতো কট্টর মমতা বিরোধীরা পর্যন্ত তার সেই প্রতিবাদের যথার্থ উপেক্ষা করতে পারেননি। বরং, নোট বাতিল নিয়ে মমতার প্রতিবাদে রাজ্যে না হলেও দিলি­তে সিপিএম নেতৃত্বকে তার পাশে গিয়ে দাঁড়াতে হয়েছিল। কংগ্রেসও মমতার সর্বদল প্রতিবাদ থেকে তখন দূরে থাকতে পারেনি। রাজনৈতিক তথ্যভিজ্ঞরা তখন অনেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে আগামী দিনের একজন সর্বভারতীয় নেত্রীকে আবিষ্কার করেছিলেন। প্রথম বাঙালি প্রধানমন্ত্রীর জল্পনাটাও তখন বেশ ছড়িয়েছিল। এসব কাণ্ডকারখানায় মোদিজি বা তার দল মমতার ওপর বিশেষ খুশি হননি তা বলাই বাহুল্য। উত্তরপ্রদেশে প্রত্যাশা ছাপানো জয়ের পর বাংলা বিজয়ের যে জোরালো ডাক গেরুয়া শিবির থেকে উড়ে এসেছিল তাতে এ রাজ্যের বিজেপি ও তার সহযোগীরা নিঃসন্দেহে পুলকিত বোধ করেছিলেন এবং সেই সুবাদে তারা নানান ইস্যু নিয়ে রীতিমতো তেড়েফুঁড়ে নেমেও পড়েছিলেন। কিন্তু, দিন গড়াতেই তারা বুঝে গিয়েছিলেন, পশ্চিমবঙ্গ উত্তরপ্রদেশ নয়। এ বড় কঠিন ঠাঁই এখানে মানুষ এখনও মমতা বই জানেন না, ভাবেন না, বিশ্বাস করেন না কিছু বা কাউকে!
সুতরাং, এ রাজ্যে সোজা আঙুলে ঘি তুলে ভোটের আসরে বাজিমাত করাটা যে বেশ মুশকিল তা বিজেপি নেতৃত্ব বুঝে গিয়েছিলেন। নিন্দুকেরা বলেন, সেজন্যই নাকি খেপে খেপে সারদা-নারদা চলছে, সিবিআই ইডি চলছে! রাজ্যের বিশিষ্ট মন্ত্রী নেতাদের ডেকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ হচ্ছে এবং তা থেকে ফের কাউকে কোনো মহারথীকে ধরপাকড়ের জল্পনা ছড়াচ্ছে! এবং এসব করা হচ্ছে একটা উদ্দেশ্যেই- সংশ্লিষ্ট নেতা-মন্ত্রীদের জনসমক্ষে হেয় করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একচ্ছত্র আধিপত্যে ঘা দিতে। কিন্তু, নিন্দুকদের এই কথার পালটাও আছে- যা হচ্ছে মহামান্য আদালতের নির্দেশে হচ্ছে। ফুরিয়ে গেল। গেরুয়াদল বেকসুর। নারদা-সারদা রাজনীতি ফ্রি। সবটাই স্বচ্ছ ভারতের জন্য। কিন্তু, তাও কোথায় যেন খটকা! একটা ব্যাপার নিয়ে এত বছর ধরে কচলাকচলি, এই জেগে উঠছে এই ঘুমিয়ে পড়ছে সবকিছু, যেন তদন্ত নয় সোনার কাঠি রুপার কাঠির রূপকথা খটকা তো থাকবেই।

তবে ও ব্যাপারে যত দ্বিমতই থাক, বাংলার দুর্ভোগ যন্ত্রণা মেটাবার ব্যাপারে কেন্দ্র যে বিশেষ উৎসাহী নয় তা আর একবার পরিষ্কার হলো। এবারের বন্যায় আর যাই হোক ‘বিমাতৃসুলভ আচরণ’ কাকে বলে- এ রাজ্যের মানুষ তা হাড়ে হাড়ে টের পেলেন। টের পেল মমতা প্রশাসনও। মানুষজন তো বলছেন- ভাগ্যিস আমাদের রাজ্যে মমতার মতো অমন অদম্য প্রাণশক্তি এবং মা-মাটি-মানুষের প্রতি ভালোবাসা দায়বদ্ধতায় নিবিষ্ট একজন মুখ্যমন্ত্রী আছেন। না হলে, এবার বন্যাদুর্গত মানুষের হাল যে কী হতো ভাবলেই ভয় হয়! মমতা যেভাবে রাজ্যবাসীর স্বার্থে মাঝেমধ্যেই মোদি সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে গর্জে ওঠেন তাতে এই দুর্বিপাকে কেন্দ্র যে পুঁটি মাছটির উপকারেও আসবে না সেটা তো জানাই। সমালোচনা, সে যতই গঠনমূলক হোক- রাজনীতিতে কে আর কবে ভালো মনে নিয়েছেন? সুতরাং, রাজ্যের বন্যার ব্যাপারে কেন্দ্রীয় উদাসীনতা বিশেষ অপ্রত্যাশিত নয়। এখন কথা হলো, কেন্দ্রীয় সাহায্য ছাড়া এত বড় বন্যায় দুর্গতদের রক্ষা করা তো চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। কিন্তু, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার সীমিত সামর্থ্য নিয়ে সেটাই করে দেখাচ্ছেন। সাত পুরভোটে মমতার নিরঙ্কুশ জয়জয়কার দেখে যারা ঈর্ষান্বিত তারা বোধহয় এদিকটা দেখছেন না। দুর্যোগে দুর্দিনে মানুষের পাশে আন্তরিকতা নিয়ে দাঁড়ালে তার ফল ভোটবাক্সে অনিবার্যভাবেই মেলে। পুরভোটে মমতা সেটাই পেয়েছেন। অন্তত, বন্যা বিধ্বস্ত বাংলা আজ তাই বলছে। কথাটা কি ভুল? কথাটা কি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায়? আপনারাই বলুন।

(কলকাতার বর্তমান পত্রিকা থেকে সংগৃহীত)

loading...

About sylhet24 express

Check Also

নদী, প্রকৃতি আর ঐতিহ্যে 

নদী, প্রকৃতি আর ঐতিহ্যে 

মোহাম্মদ আলম : নগর জীবনের কোলাহল আর কর্মক্ষেত্রের টানাপড়েনে হাঁসফাঁস অনুভ‚তি সবারই কমবেশি উপলব্দি হয়! সকাল-সন্ধ্যা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *