Breaking News
loading...
Home / উপ সম্পাদকীয় / বাঙালির নৃতাত্ত্বিক পটভূমি ও বঙ্গবন্ধু

বাঙালির নৃতাত্ত্বিক পটভূমি ও বঙ্গবন্ধু

রেজাউল করিম

রেজাউল করিম : বাঙালি জাতি কোন একক নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী নয়। বাঙালি একটি সংকর জাতি। প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মিশ্রণ-বিরোধ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে বাঙালি জাতি গড়ে উঠেছে। বাঙালি জনগোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক পরিচয় তার ভাষা, সংস্কৃতি, দৈহিক গঠন, সম্মিলন জাতি হিসেবে তার অবস্থানের মধ্যে নিহিত।
পণ্ডিতদের মতামত : ভারতীয় উপমহাদেশের জাতিগত পরিচয় নির্ধারণে যারা নিরলসভাবে কাজ করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন স্যার হার্বাট রিজলি, পণ্ডিত বিরাজসংকর, রমাপ্রসাদ চন্দ, নীহার রঞ্জন রায় প্রমুখ। পণ্ডিতদের সংখ্যাগরিষ্ঠের মত হলো- বাঙালি একটি মিশ্র জাতি। তারা ধারণা করেন যে, বাংলায় প্রথম যে জনগোষ্ঠী বসবার শুরু করে তারা নিগ্রোয়েড বা অস্ট্রালয়েড শ্রেণির অন্তর্গত। ধীরে ধীরে এদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দ্রাবিড়, আলপিয়ান, মঙ্গোলয়েড প্রভৃতি জাতিগোষ্ঠী। আর্যরা বাংলায় আসতে শুরু করে খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের আগেই। এরপরও মিশ্রণ অব্যাহত থাকে। বাংলায় আগত জনগোষ্ঠীর মধ্যে দুটি ভাগ দেখা যায়। একটি আর্য, অন্যটি অনার্য।

আর্য জনগোষ্ঠী : খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০ অব্দের দিকে আর্যরা ভারত উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। এ উপমহাদেশে আগত আর্যরা আবার দুটি নৃগোষ্ঠীতে বিভক্ত ছিল। যথা- আলপিয় (অষঢ়রহব) ও নর্ডিক (ঘড়ৎফরপ)। আলপিয়রা মধ্য এশিয়ার পার্বত্য অঞ্চল বা মালভ‚মি থেকে আসে। আর নর্ডিকরা আসে উত্তর এশিয়ার তৃণভ‚মি অঞ্চল থেকে। আর্যরা বৈদিক সভ্যতার জš§দাতা। লম্বা মাথা, নাক সরু থেকে মাঝারি, রং ফর্সা, পুরুষের মুখে দাড়ি, গোফের প্রাধান্য এবং বলিষ্ঠ গড়ন এদের মূল বৈশিষ্ট্য। উত্তর ভারতের গিরিপথ দিয়ে প্রবেশ করে আর্যরা ক্রমে সমগ্র উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

অনার্য জনগোষ্ঠী : আর্যদের আগমনের পূর্ব থেকে যারা এ অঞ্চলে বসবাস করত তারাই অনার্য নামে পরিচিত। অনার্যদের মধ্যে আবার চার নৃগোষ্ঠীর লোকের প্রাধান্য রয়েছে। যেমন ক. অস্ট্রিক বা অস্ট্রালয়েড, খ. নেগ্রিটো বা নিগ্রোয়েড, গ. দ্রাবিড় এবং ঘ. মঙ্গোলীয় বা মঙ্গোলয়েড।
ক. অস্ট্রিক : মাথার গড়ন লম্বা, নাক চওড়া, গায়ের রং মিশমিশে কালো, উচ্চতা বেঁটে কিংবা মধ্যমাকার। এরা ভেড্ডি বা নিষাদ নামেও পরিচিত। বাঙালির মধ্যে এ জনগোষ্ঠীর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। ধারণা করা হয় পাঁচ বা ছয় হাজার বছর পূর্বে এরা এ অঞ্চলে আসে। সাঁওতাল, কোর, ভীল, মুন্ডা, ভ‚মিজ, মালপাহাড়ি, বাউড়ি, চন্ডাল প্রভৃতি এরা সবাই আদি অস্ট্রিকদের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কুড়ি, পন, গন্ডা, চোঙ্গা, ঠেঙ্গা, পেট, করাত, দা, লাউ, লেবু, কলা, বেগুন, কামরাঙ্গা, লাঙ্গল, ডোম প্রভৃতি অস্ট্রিক ভাষার শব্দ।

খ. নিগ্রোয়েড : খর্বাকৃতি, কৃষ্ণবর্ণ, কেশ, উর্ণাবৎ, বেঁটে, ঠোঁট পুরু ও উল্টোনো এবং নাক অতি চেপ্টা। এরা বাংলার জনগোষ্ঠীর প্রথম স্তর। সুন্দরবন, যশোরের বাঁশফোড়, ময়মনসিংহ ও নিম্নবঙ্গের জনগোষ্ঠীর মধ্যে এর প্রভাব বেশি লক্ষ্য করা যায়।

গ. দ্রাবিড় : মাথা লম্বা, নাক চওড়া উন্নত, চুল কালো-বাদামি, গায়ের রং কালো থেকে বাদামি, উচ্চতা খর্বাকৃতি, ঠোঁট পুরু, মুখ গহবর বড়, মুখাবয়ব তী² ও স্পষ্ট। সিন্ধু সভ্যতার স্রষ্টা দ্রাবিড় ভাষাভাষি আলপাইন গোত্রের এ নরগোষ্ঠী মূলত ভ‚মধ্যসাগরীয়।

ঘ. মঙ্গোলয়েড : গায়ের রং পীতাভ থেকে বাদামি, চুল কালো ও ঋজু, মাথার আকৃতি গোল, নাক চেপ্টা, চোখের পাতা সামনের দিকে ঝোলানো। এরা দক্ষিণ পশ্চিম চীন থেকে আগত। পার্বত্য চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, রংপুর ও সিলেট অঞ্চলে এদের বসবাস।

ঙ. বিদেশি রক্তধারা : ত্রয়োদশ শতকের শুরুতে মুসলমানদের বাংলা বিজয়ের পর থেকে মধ্য এশিয়া, আরব, ইরাক, পারস্য, তুরস্ক আফগানিস্তান থেকে আসতে শুরু করে আরব, শক, তুর্কি, সৈয়দ, মীর, ইরানি, আবিসিনীয়, পাঠান, মুঘল প্রভৃতি জনগোষ্ঠী। এরপর আসতে থাকে পর্তুগিজ, ডাচ, ডেনিশ, ইংরেজ, ফরাসি প্রভৃতি ইউরোপীয় জনগোষ্ঠী। কেউ এসেছে বাণিজ্য করতে, কেউ এসেছে শাসন করতে। যে যেভাবেই আসুক, তারা কেউ এদেশে থেকেছে, এদেশের নারীকে বিয়ে করেছে, তাদের রক্তধারা এদেশের জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রবেশ করেছে। বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর রক্তধারায় গঠিত হয়েছে বাঙালি জাতি বা বাঙালি জনগোষ্ঠী।

অতএব নানা মিশ্রণ-মিলন-বিরোধে বাঙালি জাতির সৃষ্টি হয়েছে। তাই বাঙালি জাতিকে বলা হয় সংকর জাতি। বিভিন্ন নরগোষ্ঠীর রক্তধারা বাঙালিদের মধ্যে এমনভাবে মিশেছে যে, বাঙালির নিজস্ব দেহ বৈশিষ্ট্য বলতে তেমন স্বতন্ত্র কিছু নেই। তাই কেউ সাদা, কেউ কালো, কেউ বেঁটে, কেউ লম্বা। আবার অনেকের চুল, মাথা, চোখ, চোয়াল, নাক, দেহের গড়ন ও রং পৃথক পৃথক নরগোষ্ঠীকে নির্দেশ করে। আর এ ধারা প্রবাহ প্রভাবিত করেছে বাঙালির চিন্তা-চেতনা, ধর্ম, দর্শন, আচার-আচরণ, পোকাশ-পরিচ্ছদ, খাদ্য, কৃষি, শিল্প ও কলায়। তাই বাঙালি একটি বিভক্ত জাতি। চেহারা-চিন্তা-চেতনা সবকিছুতেই বিভক্ত। এজন্যই বাঙালি জাতিকে বাইরের জাতি-গোষ্ঠী এসে শাসন করেছে, শোষণ করেছে। এরা কোনদিন ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি। এরা পরের দেশতো দূরের কথা, নিজের দেশকেই শাসন করতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুর কৃতিত্ব হলো যে, তিনি এ বিভক্ত ও সংকর জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছেন, এক প্লাটফরমে দাঁড় করাতে পেরেছেন, নিজে যেমন স্বপ্ন দেখেছেন তেমনি মানুষকে স্বপ্ন দেখাতে পেরেছেন। বাংলায় বহু নেতার নাম আমরা শুনতে পাই, কিন্তু কোন নেতাই বাংলার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারেননি, কোন স্বপ্নও দেখাতে পারেননি। বঙ্গবন্ধুর সাথে অন্য নেতাদের পার্থক্য এখানেই। আর তা হলো বঙ্গবন্ধু বাঙালির মতো একটা বিভক্ত, সংকর জাতিকে নেতৃত্ব দিয়ে ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছেন, স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করতে পেরেছেন এবং স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। অন্য নেতারা সেটা পারেননি।

বাংলাদেশের নামকরণ ও বঙ্গবন্ধু : প্রাচীনকালে বাংলা ভিন্ন ভিন্ন নামে বিভিন্ন খণ্ডে বিভক্ত ছিল। সেন আমল পর্যন্ত অর্থাৎ মুসলিম আমলের পূর্ব পর্যন্ত বাংলা নামের বিভিন্নতা বজায় ছিল। মুসলিম আমলে বাংলার এমন খণ্ড নামের অবসান ঘটে এবং বাংলা ভাষাভাষী-পুরো অঞ্চল এক বাঙালা বা বাংলা নামে অভিহিত হয়। ইলিয়াস শাহী বংশের প্রতিষ্ঠাতা বাংলার স্বাধীন সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ লক্ষণাবতী, গৌড়, রাঢ়, বঙ্গ প্রভৃতি অঞ্চলগুলোর রাজনৈতিক ঐক্য স্থাপন করেন এবং নিজে ‘শাহ-ই-বাঙালা’ ও ‘সুলতান-ই-বাঙালা’ উপাধি ধারণ করেন। তখন থেকেই সমগ্র অঞ্চল এক বাঙালা বা বাংলা নামে পরিচিতি লাভ করে।
ইতিপূর্বে বাঙালা বলতে শুধু পূর্ব ও দক্ষিণ পূর্ব বঙ্গকে এবং বাঙালি বলতে এ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকেই বুঝানো হতো। কিন্তু ইলিয়াস শাহী আমল থেকে লখনৌতি এবং রাঢ় অঞ্চলের অধিবাসীরাও বাঙালি নাম পরিচিত হয়। সুলতানী আমলের ‘বাঙালা’ নাম আর মুঘল যুগের ‘সুবা-ই-বাঙলা’ এবং ব্রিটিশ আমলের ‘বেঙ্গল’ একই নাম। আর বঙ্গ নামকরণটি হয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার পূর্বে হিন্দের পুত্র বঙ-এর নামানুসারে। ভাগিরথী অঞ্চলকে কেন্দ্র করে যখন বসতি শুরু হয়। পণ্ডিতেরা অনুমান করেন যে, ‘বঙ্গ’ থেকে ‘বাংলা’ নামের উৎপত্তি হয়েছে। এ সম্পর্কে মুঘল সম্রাট আকবরের দরবারের প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক আবুল ফজল বলেন যে, বাংলার প্রাচীন নাম ছিল বঙ্গ। প্রাচীনকালে এদেশের রাজারা দশ গজ উঁচু, বিশ গজ চওড়া প্রকাণ্ড আল বা বাঁধ তৈরি করতেন। এজন্য ‘বঙ্গ’-এর সাথে ‘আল’ শব্দ যুক্ত হয়ে এর নাম হয়েছে বঙাল, বাঙাল বা বাঙালা। একথা অবশ্য ঠিক যে, মুসলিম আমলের পূর্বে ‘বঙ্গ’ ও ‘বাঙাল’ বাংলার অংশ বিশেষরই নাম ছিল। এমনকি, মুসলিম যুগের প্রারম্ভেও ঐতিহাসিকেরা ‘বঙ্গ’ বা ‘বাং’ বলতে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাকেই বুঝাতেন। তবে বঙ্গ ও বাঙালা থেকেই যে ‘বাংলা’ নামটি এসেছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান সৃষ্টি হলে বাংলা বিভক্ত হয়ে পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়ে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নাম ধারণ করে। ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর তারিখে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্র্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন, ‘আজ থেকে পূর্ব পাকিস্তানের নাম হবে বাংলাদেশ’। তিনি বলেন, ‘একসময় এই দেশের বুক হইতে, মানচিত্রের পৃষ্ঠা হইতে ‘বাংলা’ কথাটির সর্বশেষ চিহ্নটুকুও চিরতরে মুছিয়া ফেলার চেষ্টা করা হইয়াছে।…একমাত্র ‘বঙ্গোপসাগর’ ছাড়া আর কোনো কিছুর নামের সঙ্গে ‘বাংলা’ কথাটির অস্তিত্ব খুঁজিয়া পাওয়া যায় না।…জনগণের পক্ষ হইতে আমি ঘোষণা করিতেছি আজ হইতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম ‘পূর্ব পাকিস্তান’-এর পরিবর্তে শুধুমাত্র ‘বাংলাদেশ’।” এরপর ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাঙালিদের বিজয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ নামকরণটি বাস্তবে রূপ নেয়। যিনি শিশুর পিতা তিনিই শিশুর নাম রেখে গিয়েছেন। অর্থাৎ ভৌগোলিক ও রাজনৈতিকভাবে আজকের যে বাংলাদেশ, এই দেশ অভ্যুদয়ের পূর্বেই বঙ্গবন্ধু এর নামকরণ করে গিয়েছেন।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, ফরিদপুর

loading...

About sylhet24 express

Check Also

নদী, প্রকৃতি আর ঐতিহ্যে 

নদী, প্রকৃতি আর ঐতিহ্যে 

মোহাম্মদ আলম : নগর জীবনের কোলাহল আর কর্মক্ষেত্রের টানাপড়েনে হাঁসফাঁস অনুভ‚তি সবারই কমবেশি উপলব্দি হয়! সকাল-সন্ধ্যা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *