Breaking News
loading...
Home / উপ সম্পাদকীয় / প্রসঙ্গ :সিএনজি!

প্রসঙ্গ :সিএনজি!

মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন
মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন

মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন : সিএনজি। কমপ্রেসড ন্যাচারাল গ্যাস। এই গ্যাস কেবল বাস-ট্রাক-প্রাইভেটকারসহ অন্যান্য গ্যাসচালিত গাড়িতে ব্যবহৃত হয়। মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় এই গ্যাসের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। প্রতিদিন প্রতিনিয়ত বাড়ছে। কোনোরকম যুক্তি ছাড়া, সাধারণ মানুষের সাথে পরামর্শ ছাড়া বাড়ছে এর দাম। বাড়তে বাড়তে সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে গেছে। তারপরও শুনছি আরো নাকি বাড়বে সিএনজি’র দাম। কোথায় গিয়ে ঠেকবে এ দাম আল্লাহ মালুম!

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বিষয়টি নিয়ে ভাবতে ভাবতে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত। তারা আর ভাবতে চায় না। কপালের হাতে ছেড়ে দিয়েছে। তাই তো তারা ক্ষেপে হোক আর আক্ষেপ করে হোক বলছে- ‘গ্যাসের দাম নিয়ে আর ভাবি না, উপরওয়ালার হাতে ছেড়ে দিয়েছি। তিনিই যা করার করবেন। তার বিরুদ্ধে আমাদের কোনো অভিযোগ নেই। বরং তার কাজের প্রতি বিশ্বাস আছে।’ সাধারণ মানুষের এই কথায় কোনো অভিযোগ নেই- নেই কোনো ক্ষোভ বিক্ষোভ। কিন্তু ভাবনার অবকাশ আছে। সিএনজি’র দাম যেভাবে লাগামহীন বাড়ছে তাতে একদিন বড় ধরনের বিপাকে পড়বে সাধারণ মানুষই।

সিএনজি’র দামের সাথে সাধারণ মানুষের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। তবে তাদের ওপর সবরকম নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এর কারণে। সিএনজি’র দাম বাড়লে পরিবহন ভাড়া বাড়ে। পরিবহন ভাড়া বাড়লে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়ে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়লে সাধারণ মানুষ বিপাকে পড়ে। সিএনজি’র দাম বাড়ার কারণে এই যে একটা দুষ্টুচক্রের সৃষ্টি হয় তার মাশুল গুনতে হয় সাধারণ মানুষকে। তারা না পারে কোনো কিছু বলতে, না পারে সইতে। তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়ার পরও টু শব্দটি করতে পারে না। হয়তো একেই বলে নিয়তি। আর এই নিষ্ঠুর নিয়তির হাতে বন্দী বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ। কেউ জানে না কবে মুক্তি পাবে, আদৌ পাবে কিনা এই দুষ্টুচক্র হতে। যদিওবা বলা হচ্ছে বাংলাদেশে প্রচুর গ্যাস মজুদ আছে তবুও কেন এহেন অবস্থা? নিজের দেশের গ্যাস কেন দেশের মানুষ এত দাম দিয়ে কিনবে? এ প্রশ্নের কোনো উত্তর আসলে আমাদের জানা নেই। জানি না তেল গ্যাস বিশেষজ্ঞরা এর কি উত্তর দেবেন। হয়তো তাদের কাছেও কোনো উত্তর নেই। উত্তর না থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। অনেক সহজ প্রশ্নের উত্তর সহজে দেয়া যায় না। টেকনিক্যাল কারণে দেওয়া সম্ভব হয় না। বাংলাদেশের মানুষ কোনো টেকনিক্যালের খপ্পরে পড়েছে বিধাতা জানেন।

যাক সে কথা। নিজের জীবনে সিএনজি ব্যবহারের অভিজ্ঞতাটুকু ভাগাভাগি করছি। হয়তো আর কারো জীবনের অভিজ্ঞতার সাথে মিলতেও পারে।

২০০৫ সালের কথা। দেশের নামকরা একটি টেলিভিশনে বার্তা প্রযোজক হিসেবে কাজ করি। ওই টেলিভিশনেরই এক সহকর্মীর কাছ থেকে একটি টোয়েটা স্টারলেট গাড়ি ক্রয় করি। কিছুদিনের মধ্যেই নাভানা থেকে গাড়িটি সিএনজিতে রূপান্তর করি। সিএনজি’র দাম মাত্র ৮ টাকা কিউবিক লিটার। ৭০/৭৫ টাকার সিএনজি ধরতো আমার সিএনজি ট্যাংকে। এই ৭০/৭৫ টাকায় চালানো যেত এসিসহ ৭০ কি ৭২ কিলোমিটার। বেশ ক’বছর আরামে চলা-ফেরা করি। প্রায় সারা বাংলা ঘুরে ফেলি ছোট্ট এই স্টারলেট গাড়িটি নিয়ে। এরই মাঝে সিএনজি’র দাম বাড়ানো নিয়ে আলোচনা শুরু হয় সরকারের বিভিন্ন মহলে। এক পর্যায়ে দাম বেড়ে দ্বিগুণ হয়। ৮ টাকার সিএনজি বেড়ে হয় ১৬ টাকা। আমার প্রতি দিনের খরচ ৭০-৭৫ টাকা থেকে বেড়ে এক লাফে হয়ে যায় একশত চলি­শ-দেড়শ টাকা। একটা বড় ধাক্কা খাই। দিন যত যাচ্ছে তত গাড়ির ব্যবহার বাড়ছে। ছেলের স্কুলে যাওয়া-আসা বাধ্যতামূলক হওয়ায় ব্যবহারটা বেড়ে দ্বিগুণ কি তিনগুণ হয়। তার মানে গাড়ির খরচও তিনগুণ বেড়ে যায়। আমার নাভিশ্বাস দ্রুত থেকে দ্রুততর হতে থাকে। কী আর করা! কোনোরকম চালাচ্ছি ছোট্ট স্টারলেটটি। চালাতে চালাতে কখনো ধাক্কা খাচ্ছি। খানিকের জন্য থামাচ্ছি। আবার চালাচ্ছি। এভাবে কোনোরকম দিন যাচ্ছে। আবার শুরু হয় আলোচনা। পর্যালোচনা। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত দ্বিতীয়বারের মতো সিএনজি’র দাম বাড়াবেন। যেই কথা সেই কাজ। ১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে করলেন ২৫ টাকা প্রতি কিউবিক লিটার।

আমার প্রতিদিনের গাড়ির খরচ বেড়ে গেল আরো ৫০ টাকা। প্রতি দিন শুধু সিএনজি বাবদ খরচ দাঁড়ালো ৩৫০ টাকা। এবার আর চলা যাচ্ছে না। সিদ্ধান্ত নিলাম ছেলের স্কুলে আনা-নেয়া ছাড়া আর কোনো কাজে গাড়ি ব্যবহার করবো না। হলোও তাই। এভাবে চলতে থাকে। কয়েক মাস পর আবার অর্থমন্ত্রীর মাথায় যন্ত্রণা শুরু হয়। মাথাব্যথা সারানোর একমাত্র ঔষধ সিএনজি’র দাম বাড়ানো। এবার ২৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে করলেন প্রতি কিউবিক লিটার ৩০ টাকা। আবার প্রতি দিনের গাড়ির খরচ বাড়লো আরো ৫০ টাকা (৩৫০+৫০) = ৪০০ টাকা। অর্থাৎ মাসে ৪০০ টাকাূ৩০দিন = ১২০০০ টাকা শুধুমাত্র সিএনজি বাবদ খরচ। সাথে গ্যারেজ ভাড়া, প্রতি তিন মাস পর তিন হাজার টাকা খরচ করে মবিল, মবিল ফিল্টার পাল্টানো, বছরে ২৩/২৪ হাজার টাকা অর্থাৎ মাসে ২০০০ টাকা ফিটনেস বাবদসহ আনুসাঙ্গিক আরো খরচতো আছেই। নিজে চালাই বলে ড্রাইভারের খরচটা বেঁচে গেছে। রক্ষা এখানেই। শুরু করলাম আরো কীভাবে রক্ষা পাওয়া যায় সে চিন্তা। কিন্তু শেষরক্ষা হলোনা। অর্থমন্ত্রী আবার বাড়ালেন সিএনজি’র দাম। করলেন ৩২ টাকা প্রতি কিউবিক লিটার। ৩২ টাকা করার পরও তার মাথার যন্ত্রনা কমেনি। কোনো রকম শব্দ ছাড়া সিএনজি’র দাম আরেক দফা বাড়িয়ে করলেন ৩৮ টাকা। গত ক’দিন আগে সিএনজি নিতে যেয়ে দেখি প্রতি কিউবিক লিটার সিএনজি’র দাম ৪০ টাকা।

এবার আমার গাড়ির খরচ বাড়ার আর কোনো হিসেব নেই। হিসেবের বাইরে চলে গেছে। তারপরও মনের অজান্তেই কাগজ কলম নিয়ে হিসেব করে দেখি আমার ছোট্র স্টারলেট গাড়িটির পিছনে শুধু প্রতিদিনের সিএনজি বাবদ খরচ হচ্ছে ৪৫০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা। ৪৫০ টাকাূ৩০ দিন = ১৩৫০০ টাকা বা ৫০০ টাকাূ৩০ দিন = ১৫০০০ টাকা।

এবার ভাবছি কি করা যায়। চাকরিজীবী মানুষ। কীভাবে স্কুলে নিয়ে যাবো চতুর্থ শ্রেণিতে পড়া ছেলেকে? টানা দশ বছর গাড়িতে যাওয়া আসার পর হঠাৎ কিভাবে অন্য যানবাহনে চড়বে সেই চিন্তায় অস্থির।

মাথায় একটা বুদ্ধি এলো, তা হলো- অন্য খরচ কমানো যেমন বাসা ভাড়া, খাওয়া দাওয়া, দাওয়াত আত্তি এসব। করছিও তাই। পাশাপাশি ভাবছি এক সিএনজির দাম বাড়ার কারণে জীবনের সব হিসাব গড়মিল হয়ে গেলো। অনেক কিছুতেই কাচি চালাতে হলো।

আমার মতো এমন মানুষের সংখ্যাই বেশি। টানাপড়েনের মাঝ দিয়ে কোন রকম সংসার চালানো এই মানুষগুলোর দিকে তাকানোর কেউ আছে কিনা জানি না। থাকলে এর প্রমাণ অবশ্যই পাওয়া যেতো।

একটা কথা না বললেই নয়। আজকাল একটা ছোট্ট গাড়ি কিন্তু বিলাসিতা নয়। প্রয়োজন। রাস্তায় বের হলে এই প্রয়োজনটা আরো বেশি অনুভূত হয়। অর্থমন্ত্রী অনুভব করেন কিনা জানি না। যদি অনুভব করতেন তাহলে নিনাস মধ্যবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত মানুষগুলোর কথা চিন্তা করতেন। তার সেই চিন্তার প্রতিফলন থাকতো কাজেকর্মে। যে কারণেই হোক সে প্রতিফলনটা দেখা যাচ্ছে না।

সিএনজি’র দাম বাড়ার কারণে যে শুধু গাড়ির মালিকদেরই নাভিশ্বাস উঠছে তা কিন্তু নয়। দুর্ভোগের শিকার হয়েছে, হচ্ছে সারাদেশের সব মানুষ। সাধারণ মানুষের অবস্থা আরো করুণ; কারণ তারা সাধারণ (Common). কথায় বলে Common people are always sufferer. বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জন্য কথাটি শতভাগ প্রযোজ্য। যে দেশের মানুষের মাসের খরচ ত্রিশ টাকা বাড়লেই কষ্ট হয় সে দেশে কোনোরকম শব্দ ছাড়া হাজার টাকা বেড়ে যাচ্ছে। ক্ষেত্র বিশেষে মাসে তিন চার হাজার টাকা বেড়ে যাচ্ছে শুধু নিত্যব্যবহার্য জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধির কারণে।

লেখার শুরুতে একটা দুষ্টুচক্রের কথা বলে ছিলাম। সেই দুষ্টুচক্রের রাহুগ্রাস হতে কেউ রেহাই পাবে না, পাচ্ছে না। আপনি আমি আমরা কেউই না। উপায় একটাই- বিধাতাকে ডাকা। তার সাহায্য কামনা করা।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক

Loading...
loading...

ভিডিওটি দেখতে নিচে ক্লিক করুন



Loading...

About sylhet24 express

Check Also

জননেত্রী থেকে বিশ্বনেতা

জননেত্রী থেকে বিশ্বনেতা

মো: আব্দুল কাইয়ুম তুলা মিয়া : আমি তখন টগবগে যুবক। ১৯৬৮ সালের কথা। বঙ্গবন্ধুর মুক্তির …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *