loading...
Home / উপ সম্পাদকীয় / বৃষ্টির জলে ভাসে উন্নয়ন প্রাকৃতিক চ্যালেঞ্জে আওয়ামী লীগ

বৃষ্টির জলে ভাসে উন্নয়ন প্রাকৃতিক চ্যালেঞ্জে আওয়ামী লীগ

শতাব্দী আলম
শতাব্দী আলম

শতাব্দী আলম : অতিবৃষ্টি এবং পাহাড়ি ঢলে দেশের স্থল যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অবকাঠামো উন্নয়নই সাধারণ ভোটার ও মানুষের চোখে পড়ে। সারাদেশে উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে। এখনো হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকসহ দাতা সংস্থাগুলো শুধু শুধু উন্নয়নের রোল মডেল হিসাবে বাংলাদেশের নাম উচ্চারণ করে না। সবাই তো আর মেট্রোরেল বা পদ্মা সেতু দর্শনে আসবে না। ঘূর্ণিঝড়, পাহাড়ধস, খরতাপ, অতিবৃষ্টি, বন্যা একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত জনজীবন। আগামী নির্বাচনের পূর্বে ক্ষত-বিক্ষত সড়ক মহাসড়ক মেরামত ও অবকাঠামো উন্নয়নের রূপরেখা ঠিক করা আওয়ামী লীগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে পাকা রাস্তা, ব্রিজ, কালভার্ট তৈরি করেছে। সেই পরিসংখ্যান দেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। কারণ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন দৃশ্যমান। গত কয়েকদিনের বৃষ্টির জলে উন্নয়ন ভেসে গেছে বললে ভুল হবে না। পাহাড় ধসের কারণে যে মানুষগুলো অকালে প্রাণ হারিয়েছে তাদের পরিবারের সদস্যরা সারা জীবনই স্বজন হারানোর বেদনা বয়ে বেড়াবে। ওই এলাকার বাসিন্দাদের বেদনার কারণ যোগাযোগ ব্যবস্থার অবনতি। সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ধসে ক্ষত-বিক্ষত সড়ক মেরামতিতে। কিন্তু পাহাড়ি ঢল সাথে কয়েকদিনের বৃষ্টিতে পাহাড়ি রাস্তার উপরিভাগের পিচ ধুয়ে সড়কের পদে পদে খানাখন্দ। শহর, নগর, উপ-শহর, জেলা,উপজেলা, গ্রাম বা পাহাড় সবখানেই বর্ষণজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব পড়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, গাজীপুর প্রতিটি নগরেই জলাবদ্ধতা প্রধান সমস্যা। বৃষ্টির জল ড্রেন, নালা-খালা, সড়ক উপচে মানুষের ঘরে ঘরে। জল নেমে গেলে দেখা দেয় খানাখন্দে ভরা সড়ক ও পথ। শহরের এবড়ো-থেবড়ো গলিতে হাঁটাও কষ্টকর। সংবাদপত্রে চোখ বুলালেই পাওয়া যাচ্ছে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার ভয়াবহ চিত্র। আমরা কতিপয় খণ্ডকালীন শহুরেদের নিয়মিত গ্রামে আসা-যাওয়া, বাসের ঝাকিতে ভয়াবহতার কিছুটা হলেও উপলব্ধি করি। বর্ষা আর বৃষ্টিতে প্রতিবছরই গ্রাম বা শহরের রাস্তার ক্ষতি হয়। এ বছর টানা বৃষ্টিতে ক্ষতির পরিমাণ বেশি। এভাবে আরও কয়েকদিন চললে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে কোনো সন্দেহ নেই। সামনেই জাতীয় ও ৭ সিটিতে নির্বাচন। দৃশ্যমান উন্নয়ন বৃষ্টি-বানের জলে ধুয়েছে। সংসদে বা মাঠে ময়দানে দৃশ্যমান বিরোধী দল নেই। প্রকৃতিই এখন সবচেয়ে বড় বাধা। মাগুরার একজন আওয়ামী লীগ নেতা জানান, মাগুরা থেকে মহম্মদপুর উপজেলা পর্যন্ত রাস্তা খানাখন্দে ভরা বেহাল দশা। তিনি মন্তব্য করেন, ‘ কর্মীরা পোলও মাংস খেয়ে রাস্তা দিয়ে ফেরার সময় বকাবকি করে। ঝাকিতে নাড়িভুঁড়ি হজম হওয়ার যোগার হয়।’ বোধকরি আওয়ামী লীগ সরকার আসু চ্যালেঞ্জ ভালোভাবেই উৎরাবে। জনসাধারণের ভোগান্তি লাঘব করতে পারলে প্রকারান্তে সরকারের লাভ। নির্বাচনে এর সুফল পাওয়া যাবে।

গণমাধ্যমে প্রতিদিনই প্রকাশ হচ্ছে দেশের বেহাল রাস্তার সংবাদ। যদিও মনে হতে পারে কয়েকটি সংবাদ দেশের সার্বিক চিত্র কেন হবে। সাংবাদিক হিসেবে বলতে পারি দেশের জাতীয় গণমাধ্যমে শিরোনাম হওয়ার জন্য ছোটখাটো একটি দুটি সড়ক বা নালা ধর্তব্য হয় না। ওই এলাকার জনগুরুত্বপূর্ণ এবং প্রধান সমস্যা হলেই কেবল প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, কালের কণ্ঠ বা যুগান্তরের মতো পত্রিকায় সংবাদ শিরোনাম হয়। গত ২২ জুলাই সব প্রধান প্রধান পত্রিকার মফস্বল পাতার প্রধান শিরোনাম ছিল ঢাকার নবাবগঞ্জের কাঁশিয়াখালি বাঁধ রক্ষার দাবিতে মানববন্ধনের খবর। প্রথম আলো শিরোনাম করেছে ‘বেড়িবাধ রক্ষার দাবি’ সাথে একটি মানববন্ধনের ছবিও ছেপেছে। বাঁধটি আওয়ামী লীগ সরকার নির্মাণ করেছে। বেড়িবাঁধ নির্মাণের ফলে দোহার, নবাবগঞ্জ সম্পূর্ণ ও হরিরামপুর উপজেলার কিছু এলাকার জনসাধারণ বন্যার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। পূর্বে সাধারণ বর্ষায় পদ্মা অববাহিকার এসব জনপদ বন্যাকবলিত হতো। বন্যায় ব্যপাক ক্ষতি হতো ফসলের। বেড়িবাঁধ দোহার নবাবগঞ্জে আওয়ামী লীগের অন্যতম উন্নয়ন কাজ। বর্ষার পানির চাপে বেড়িবাঁধে ফাটল ধরেছে। আবার অতিবৃষ্টির কারণে বেড়িবাঁধ রাস্তা খানাখন্দে ভরা। এখন যথাসময়ে এই বেড়িবাঁধ মেরামত না হলে জনসাধারণ ভোগান্তিতে পরবে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী। উন্নয়ন কাজ করেও দল ভুক্তভোগী হবে। ‘সামান্য বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় বেশিরভাগ সড়ক’ ২৩ জুলাই যুগান্তরের ১৮ পাতায় এই শিরোনামে একটি সংবাদ ছাপা হয়েছে। এতে ঢাকা উত্তরের ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহাল চিত্র তুলে ধরা হয়। সাথে পল­বীর বাইগারটেক হাজী মার্কেটের সামনের ভাঙা রাস্তার ছবিও ছাপা হয়েছে। ২১ জুলাই প্রথম আলোর ৫ পাতায় ছাপা হয়েছে ‘১৪ কিলোমিটার অংশে বাস চলছে না চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কে পাহাড় ধ্বংসের ক্ষত’ শিরোনাম দিয়ে সংবাদ। আলোকচিত্রি সৌরভ দাশ কাপ্তাই সড়কের ব্যাঙছড়ি এলাকার একটি ছবিতে খুব সুন্দর করে ক্ষতের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। বাংলাদেশ প্রতিদিনও পালা করে নিয়মিত সড়কের বেহাল দশার সংবাদ প্রকাশ করে। ২২ জুলাই ৯ পাতায় এমনি একটি সংবাদের শিরোনাম ছিল ‘কলারোয়ায় সড়কের বেহাল দশা, ভোগান্তি’। কার্পেটিং ওঠা খানাখন্দের একটি ছবিও ছাপা হয়েছে। ২২ জুলাই যুগান্তরের ১৮ পাতার একটি সংবাদ হচ্ছে ‘ভাঙাচোরা সড়কে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল’। এতে বলা হয়েছে মৌচাক থেকে নদ্দা সড়কের কথা। সংবাদপত্রে প্রতিদিনই যোগাযোগ ব্যবস্থা বেহাল হওয়ার খবর আসে। আমি গাজীপুরের টঙ্গীর বাসিন্দ। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে টঙ্গী ব্রিজ থেকে জয়দেবপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত নিয়মিত যাতায়াত করি। এই দশ কিলোমিটারে চেরাগআলী, হোসেন মার্কেট, স্টেশনরোড, বড়বাড়ি, গাজীপুরা বাসস্ট্যান্ড, বোর্ডবাজার, বাইপাস এলাকায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বড়বাড়িতে মহাসড়কের পাশে পানি জমেছে। টঙ্গী-কালিগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের দশাও খানাখন্দ ভরা। ঈদুল ফিতরের সময়ও রাস্তার অবস্থা ভালো ছিল। বৃষ্টির জলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

আওয়ামী লীগ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করেছে এসব সংবাদই তার প্রমাণ। এখন সরকারের মেয়াদের শেষ সময়ে অতিবৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে যোগযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলো। নির্বাচনের পূর্বে যোগযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করাই আওয়ামী লীগের জন্য চ্যালেঞ্জ। বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টেকসই উন্নয়নের কথা প্রায়ই বলেন। যদি যোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর কথামতো টেকসই উন্নয়ন হতো তাহলে এমন বেহাল সড়কে জনভোগান্তি হতো না। রাজধানীর সাথে জেলা, জেলার সাথে উপজেলা-থানা, থানা সদরের সাথে ইউনিয়নগুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থার চিত্র অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এমন বেহাল। এসব সংযোগ সড়কগুলোর ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছিল। সড়ক প্রশস্ত করা, কার্পেটিং। কিন্তু বৃষ্টির জলে ভেসে গেছে কার্পেটিংয়ের পিচ। গাড়ির চাকায় সৃষ্টি হয়েছে খানাখন্দ। গাজীপুর সিটি করপোরেশনে ভারপ্রাপ্ত মেয়র হিসাবে আসাদুর রহমান কিরন টঙ্গী ও গাজীপুরে টেকসই উন্নয়নের নজির স্থাপন করেছেন। রড সিমেন্টের আরসিসি ঢালাই দিয়ে সড়কগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। ঢালাই রাস্তার ময়লা আবর্জনা বৃষ্টির জলে ধুয়ে মুছে ঝকঝকে তকতকে রাস্তা দেখা যায়। রাস্তায় কোনো খানাখন্দও হয়নি। এটাই টেকসই উন্নয়নের দৃশ্যমান সুফল।

আমরা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে বসবাস করেছি। প্রকৃতির ওপর মানবের নির্বিচার অত্যাচারের ফল এসব। অল্পদিনের ব্যবধানে প্রকৃতি সব রকম প্রতিহিংসামূলক ধ্বংসলীলা দেখিয়েছে। সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড় উপক‚লে তছনচ করেছে, পাহাড়ি ঢলের বন্যায় ভেসে গেছে হাওর-বাঁওড়। পাহাড় ধ্বসে প্রাণ হারিয়েছে মানুষ আর যোগযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন। রোদের প্রখরতা ছিল ঘাম ঝড়ানো। বর্তমানে চলছে অতিবৃষ্টি। প্রকৃতিই আমাদের সবচেয়ে বড় বন্ধু। প্রকৃতিই আমাদের বেঁচে থাকার খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান এবং জলের জোগান দেয়। মানুষ হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের কর্তব্য প্রকৃতি বিষয়ে সচেতন হওয়া। প্রকৃতির জন্য একভাগ দরদ দেখালে মানব সমাজের জন্য সে দশভাগ উপকারী হয়। বেহাল যোগাযোগ ব্যবস্থা সংস্কার হয়তো হবে। ধারাবাহিক উন্নয়নও হয়তো দৃশ্যমান হবে। প্রকৃতিক দুর্যোগের কারণ এবং প্রতিকার বিষয়ে জনসচেতনতা না হলে ভবিষ্যতে আরও বৃহৎ ধ্বংসলীলা অপেক্ষা করছে। প্রকৃতির সাথে সহমর্মিতার বসবাসই আওয়ামী লীগের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রকৃতিবান্ধব সমাজ গঠনে সরকারকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

লেখক :সাংবাদিক ও কলাম লেখক

loading...

About sylhet24 express

Check Also

রেজাউল করিম

বাঙালির নৃতাত্ত্বিক পটভূমি ও বঙ্গবন্ধু

রেজাউল করিম : বাঙালি জাতি কোন একক নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী নয়। বাঙালি একটি সংকর জাতি। প্রাচীনকাল …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *