loading...
Home / উপ সম্পাদকীয় / প্রসঙ্গ জলাবদ্ধতা 

প্রসঙ্গ জলাবদ্ধতা 

মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন
মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন

মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন : জলাবদ্ধতা। শব্দটার সাথে সবাই পরিচিত। বিশেষ করে শহরের মানুষ। ঢাকা শহরের মানুষ তো জলাবদ্ধতার কথা শুনলেই আঁতকে ওঠে। তাদের অভিজ্ঞতা যে ভয়াবহ। জলাবদ্ধতার কারণে অনেকেরই জীবন অতিষ্ঠ। জীবনের সব সুখ শান্তি যেন কেড়ে নিয়েছে জলাবদ্ধতা। সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তাঘাট অলিগলিতে পানি জমে একাকার। মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারে না। ছেলে মেয়েরা স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারে না। অফিসগামী মানুষ পড়ে মহাবিপাকে। রিকশায় চেপে বাসা থেকে বের হবে তারও উপায় নেই। কোনো রিকশাই পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে জুতা খুলে প্যান্ট ফোল্ড করে পানি পার হয়। শহুরে জীবন যে এতটা কঠিন এতটা সংগ্রামী তা বুঝিয়ে দেয় জলাবদ্ধতা।

ঢাকা শহরের এই সমস্যাটা এক দু’দিনের নয়। দীর্ঘদিনের। অনেক বছরের। ঢাকা সিটি কনপোরেশন তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে কিন্তু সমস্যাটির কোনো সমাধান করতে পারছে না। যার মাশুল গুনতে হচ্ছে ঢাকার বাসিন্দাদের।
বৃষ্টি মানে ঢাকাবাসী এক ধরনের গৃহবন্দী। যারা অফিসের ভিতরে কাজ করছে তারা ভিতরেই থাকে। বাইরে বের হওয়ার মতো শক্তি সাহস মনোবল কোনোটাই পায় না। অথচ শ্রাবণের বৃষ্টি দেখার জন্য মানুষ কত কি-ই না করে। কত দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়ায়।

কবি কবিতা লিখে। গীতিকার লিখে গান। কিন্তু বৃষ্টি পরবর্তী জলাবদ্ধতার যন্ত্রণার কথা চিন্তা করে ঢাকার মানুষ এই আনন্দভরা শ্রাবণেও বৃষ্টি কামনা করে না। মানুষের চাওয়া না চাওয়াতে প্রকৃতির কিছুই যায় আসে না। প্রকৃতি তার কাজ ঠিক ঠিক করে চলেছে। অঝর ধারায় বৃষ্টি ঝরছে দিন রাত। সে বৃষ্টির পানি সময় মতো সরতে না পেরে সৃষ্টি করছে জলাবদ্ধতার। দুর্ভোগে পড়ছে নগরবাসী। পানি সরার মানসম্পন্ন বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা থাকলে বৃষ্টির পানি জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করতে পারতো না। বাড়তো না মানুষের অশান্তি আর অস্থিরতা।

আসলে রাজধানী ঢাকার মানুষদের কপালটাই এরকম, যত সমস্যা সবকিছুরই দায়ভার নিতে হয় তাদেরকে। কারণে অকারণে ভোগান্তির শিকার হয় নগরবাসী। জলাবদ্ধতার ভোগান্তিটা তাদের জীবন যাত্রায়, চাল চলনে বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো কোনো মহল­ার মানুষ তো পানিবন্দী হয়ে বসে আছে। না পারছে ঘর থেকে বের হতে, না কাজকর্ম করতে।

এদিকে দুই সিটি করপোরেশন যেন নির্বিকার। শহরের মানুষ পানিবন্দী হয়ে ঘরে বসে থাকবে তাতে তাদের কী(?) এমন একটা ভাব নিয়ে বসে আছে দুই নগরপিতা। অথচ তাদের অনেক কাজ। প্রথম কাজ জলাবদ্ধতার কারণগুলো চিহ্নিত করা। দ্বিতীয় কাজ সমস্যাটির স্থায়ী সমাধান করা।

ঢাকা শহরে জলাবদ্ধতার নানা কারণ গবেষকরা খুঁজে বের করেছেন। গবেষকদের সে গবেষণার দিকে যাচ্ছি না।
ঢাকা শহরের অলি গলি ঘুরে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি শুধু তাই লিখছি। অভিজ্ঞতা বলছে ঢাকা শহরে জলাবদ্ধতার মূল কারণ দ্রুত পানি সরে না যাওয়া। দ্রুত পানি না সরার কারণ ড্রেনেজ ব্যবস্থা আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত নয়। সরু ড্রেনের কারণে পানি ধারন ক্ষমতা কম। তার ওপর আবার পলিথিন, টুকরো কাগজপাতিসহ নানারকম ময়লা আবর্জনায় ড্রেনের মুখ বন্ধ হয়ে থাকার কারণে পানি সরতে না পারায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। কোনো কোনো এলাকায় ড্রেনেজ ব্যবস্থাই নেই। আবার ড্রেনের পানি যেসব জায়গায় যায় সেসব জায়গার ধারণক্ষমতা কম থাকায় উপচেপড়া পানি ফেরত আসে লোকালয়ে। সৃষ্টি করে জলাবদ্ধতা। পানি সরার অনেক স্থানে স্থায়ী স্থাপনা তৈরির কারণেও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। সিটি কর্পোরেশন বিষয়গুলো জানে। এগুলো বহু দিনের পুরনো বিষয়। নতুন করে বলার কিছুই নেই। তারপরও একটু মনে করে দেওয়া।

পৃথিবীর সব শহরেই তিন ধরনের স্থান থাকে- উঁচু-নিচু সমতল। ঢাকা শহরেও এই তিন রকমের স্থান আছে। এই শহরের নিচু এলাকার মধ্যে বাসাবো, গোড়ান, খিলগাঁও, বাড্ডা, শান্তিনগর, মালিবাগ, মানিকনগর, সায়েদাবাদ, কমলাপুরের কিছু অংশ, জুরাইন, পোস্তগোলা, ডেমরার কিছু অংশ, মিরপুর-১০ এর কিছু অংশ, পল­বী, ভাষানটেক, মোহাম্মদপুরের কিছু অংশ, নাখালপাড়া, গাবতলীর কিছু অংশসহ শহরের আরো কিছু এলাকা নিচু স্থানের আওতায়। সামান্য বৃষ্টিতেই এসব স্থানে পানি জমে একাকার। জলাবদ্ধতা যেন এসব এলাকার নিত্য সাথী।

ঢাকা সেনানিবাস, গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাসহ আরো কিছু এলাকা সমতল স্থানের আওতায়। এসব এলাকায় তেমন একটা পানি জমতে দেখা যায় না। কখনো কখনো জমলেও তা স্বল্প সময়ের মধ্যেই সরে যায়। ফলে জলাবদ্ধতার কোনো আশঙ্কা থাকে না। আসলে এসব এলাকা ভিআইপি এলাকা। ভিআইপি এলাকায় জলাবদ্ধতা না হওয়াই স্বাভাবিক। যত যন্ত্রণা সব সাধারণ এলাকার সাধারণ মানুষদের। তারা সব সময় সব সমস্যা, জ্বালাযন্ত্রণার শিকার হয়। ভিআইপি এলাকার মানুষকে এসব উটকো ঝামেলা পোহাতে হয় না।

যতদূর জানি আমাদের দুজন মেয়রই থাকেন ভিআইপি এলাকায়। তাই তারা অনেক অযাচিত ঝামেলা থেকে মুক্ত। তারা যদি জলাবদ্ধতা কিংবা ময়লা আবর্জনার পুতিদুর্গন্ধযুক্ত এলাকায় থাকতেন তাহলে বুঝতেন কত ধানে কত চাল।

মূল ঢাকায় উঁচু এলাকা তেমন একটা নেই। ঢাকার অদূরে সাভারে আছে বেশ কিছু উঁচু এলাকা। এসব এলাকায় জলাবদ্ধতার কোনো সুযোগ নেই।

কথায় বলে ‘যার জ্বালা সেই বুঝে’। কথাটি শত ভাগ সত্যি। ঢাকা শহরের যেসব মানুষ জলাবদ্ধতার জ্বালায় জ্বলছে সেসব মানুষের জ্বালাটা আমরা দূরে থেকে বুঝতে পারছি না। আমাদের বোঝার কথাও না। কিন্তু নগরপিতারা যেহেতু পুরো মহানগরীর অভিভাবক সেহেতু তাদেরকে অবশ্যই বুঝতে হবে জলাবদ্ধ নগরবাসীর জীবনের যন্ত্রণা। সে মোতাবেক কাজও করতে হবে।

ক’দিন ধরে দেশের জাতীয় দৈনিক ও টেলিভিশনগুলোতে জলাবদ্ধতা ও জলবন্দী মানুষের যেসব অমানবিক দৃশ্য দেখছি তা আর যাই হোক না কেন আমাদের মানবিকতার ভীতে আঘাত হানছে। মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষরা সারাক্ষণ চিন্তা করছে, ভাবছে বিপদগ্রস্ত এসব মানুষকে নিয়ে। তারাতো আমাদেরই ভাই বোন বাবা-মা, চাচা-চাচি, নানা-নানি দাদা দাদি কিংবা নিকটাত্নীয় অথবা প্রতিবেশী অথবা মহল­ার মানুষ। তাদের জন্য ভাবা যে আমাদের নৈতিক মানবিক দায়িত্ব। জলাবদ্ধ মানুষগুলো কী খাচ্ছে না খাচ্ছে তার খোঁজখবর রাখা, তাদের পাশে দাঁড়ানো মানবিকতারই অংশ। দুই নগরপিতাও মানবিকতার ঊর্ধ্বে নয়। তারা চাইলে নিমিষেই জলাবদ্ধতার শিকার সাধারণ মানুষগুলোকে জলমুক্ত করতে পারে। ফিরে আনতে পারে স্বাভাবিক জীবনে।

একটা উদাহরণ দিলে ঢাকা শহরে জলাবদ্ধতার ভয়াবহ বিষয়টি পানির মতো পরিষ্কার হবে। মাত্র দু’দিন আগে গিয়েছিলাম ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতায় ডেমরা থানাধীন পাড়াডগার (পশ্চিম পাড়া) এলাকায়। ক’দিন ধরে প্রবল বর্ষণের কারণে এলাকাটি পানিতে নিমজ্জিত। অধিকাংশ বাড়ি ঘরের সামনেই পানি। কোনো কোনো বাড়ির সামনে হাঁটু পরিমাণ পানি। পানির রং আলকাতরার মতো কালো। পুতিদুর্গন্ধযুক্ত এই কালো পানি পাড়িয়ে চলাচল করছে ছেলে বুড়ো শিশু কিশোর যুবক যুবতী সবাই। অবস্থা দৃষ্টে মনে হয়েছে এই বুঝি তারা চর্মরোগ পেটের পীড়াসহ নানা রোগ বালাইয়ে আক্রান্ত হচ্ছে।

মুরুব্বিগোছের একজন জানালেন সাত আটদিন ধরে তারা পানিবন্দি। কালো পানির অসহ্য দুর্গন্ধে তারা অস্থির। আর সহ্য করতে পারছে না। মুরুব্বির কথায় অভিযোগের সুর আছে। থাকাটাই স্বাভাবিক।

মাত্র কিছুদিন আগেও তিনি সকাল বিকাল সন্ধ্যায় রাস্তা-ঘাটে ঘুরেছেন ফিরেছেন। ডায়াবেটিকসের রোগী তাই তাকে প্রতিদিন তিন বার হাঁটা-চলা করতে হয়। সাত দিন পানিবন্দি ঘরে বসে থেকে তার ডায়াবেটিকস-এর কি অবস্থা জানেন না। পরীক্ষা করার পরই বুঝবেন, জানবেন। কিন্তু পরীক্ষা করাবেন কীভাবে? ঘর থেকে বের হয়ে হাসপাতালে যাওয়ার মতো অবস্থা যে নেই।

এলাকাটি এক সময় ছিলো সারুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের আওতায়। এক বছর বা তার চেয়ে বেশি দিন হয়েছে এলাকাটি চলে গেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধীনে। এলাকার নির্বাচিত ইউপি চেয়ারম্যানের মেয়াদ আছে কিন্তু তিনি তেমন কোনো কাজ করছেন না। তার ধারণা সব কাজ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন করবে। আর দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ভাবছে যেহেতু এখনও ইউপি চেয়ারম্যান আছেন তিনিই সব কাজ করবেন।

এই দোটানার মধ্যে পড়ে এলাকাবাসীর অবস্থা বারটা। সেন্ডুইচের মতো চ্যাপ্টা হয়ে যাচ্ছে। এলাকাবাসী জানায় গতবার এমন বর্ষা মৌসুমে পানি জমে ছিলো। জলাবদ্ধতার অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার আগেই পনের বিশটা সেচ মেশিন বসিয়ে পানি অপসারণ করা হয়। এলাকবাসীর কোনো অসুবিধা হয়নি।

এবার কোনো মেশিন বসানো হয়নি। হয়তো দোটানায় পড়ে কেউই মেশিন বসায়নি-না সারুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান না ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।

সুয়ারেজ লাইন না থাকার কারণে স্বাভাবিক নিয়মে এতটুকু পানিও সরে না। যেহেতু দীর্ঘদিন এলাকাটি ইউনিয়ন পরিষদের আওতায় ছিলো সেহেতু সুয়ারেজ লাইনের কথা চিন্তা করা হয়নি। এখন দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব তার আওতাধীন সারুলিয়ার পাড়াডগার এলাকার সুয়ারেজ লাইন স্থাপন, কালভার্ট বসানোসহ সবরকম নাগরিক সুযোগ সুবিধা প্রদান করা। তবে সবার আগে দরকার জরুরি ভিত্তিতে পনের বিশটা মেশিন বসিয়ে নোংরা পুতিদুর্গন্ধযুক্ত পানি অপসারণ করে এলাকাবাসীকে মহাবিপদ থেকে উদ্ধার করা। পরবর্তীকালে এ সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধান করা।

উদাহরণটি দিলাম এ কারণে যে ডিজিটাল বাংলাদেশে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধীনে এমন একটা এলাকা আছে তা সবার জানা দরকার। অজপাড়াগাঁয়ে এমন অবস্থা হলে কোনো প্রশ্ন থাকতো না। বঙ্গভবন কিংবা মতিঝিল বা সচিবালয় হতে মাত্র পনের-বিশ মিনিটের পথ, আট কি নয় কিলোমিটার দূরে এহেন অবস্থা, তাইতো প্রশ্ন। এর সমাধান অবশ্যই করবেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নগরপিতা।

শুধু সারুলিয়ার পাড়াডগারই নয় পুরো ঢাকা শহরের যেখানে যেখানে জলাবদ্ধতা আছে সেখানেই ঝাপিয়ে পড়বেন দুই নগরপিতা-সে প্রত্যাশাই ঢাকা মহানগরবাসী।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক

loading...

About sylhet24 express

Check Also

রেজাউল করিম

বাঙালির নৃতাত্ত্বিক পটভূমি ও বঙ্গবন্ধু

রেজাউল করিম : বাঙালি জাতি কোন একক নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী নয়। বাঙালি একটি সংকর জাতি। প্রাচীনকাল …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *