loading...
Home / উপ সম্পাদকীয় / শব্দ দূষণ শারীরিক ও মানসিক নানা সমস্যার কারণ

শব্দ দূষণ শারীরিক ও মানসিক নানা সমস্যার কারণ

মোহামমদ শাহাবুদ্দিন : শব্দ দূষণ। অতি পরিচিত একটি শব্দ। শহরের মানুষতো শব্দটির জ্বালায় অতিষ্ট। শব্দ দুষণের কারণে শহরের মানুষ বিশেষ করে ঢাকাসহ বাংলাদেশের ম্যাগাসিটিগুলোর মানুষ নানা রকম শারীরিক ও মানসিক সমস্যার শিকার হচ্ছে। প্রতি দিন প্রতি নিয়ত নানাভাবে শব্দ দূষণ হচ্ছে। গাড়ির হর্নের শব্দ, মাইকের আওয়াজ, হকারদের ভ্যান থেকে আসা শব্দ, গান বাজনার শব্দসহ আরও হাজার রকম শব্দ শহরের মানুষের কান ঝালাপালা করছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে জেনারেটরের বিকট শব্দ তাদের ধৈর্য্যরে মাত্রা অতিক্রম করে যাচ্ছে। সহ্য করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই বলে মানুষ বাধ্য হয়ে সহ্য করছে। অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করার চর্চাটা শহরবাসীর অনুশীলনের অন্যতম অনুসঙ্গে (!) পরিণত হয়েছে।

আসলে সহ্য না করে আর যে কোনো উপায় নেই। ঝামেলাটা উটকো কিন্তু যন্ত্রণাটা বড়। শহরবাসীর এ যন্ত্রণা দেখার বা সমস্যাটির সমাধানের যেন কোনো কর্তৃপক্ষ নেই। থাকলেও তাদের কোনো কার্যক্রম নেই। সে কারণেই যে যার মতো করে শব্দ দূষণ করছে। সাধারণ মানুষ কিছু বললে কোনো পাত্তা না দিয়ে শব্দটা আরও বাড়িয়ে দেয়। যেন থামাতে বলাটাই একটা অপরাধ।

রাজধানী ঢাকা শহরে নানা রকমভাবে শব্দ দূষণ হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি দূষণ করছে গাড়ির হর্ন।
বড় ছোট মাঝারি বিভিন্ন রকম গাড়িতে লাগানো আছে বিভিন্ন ধরনের হর্ন। কারণে অকারণে বাজানো হচ্ছে এসব অবস্থা। কানের পর্দা ফেঁটে যাবার উপক্রম। কিন্তু গাড়ির হর্ন থামে না।

বিশাল লম্বা যানজট কিংবা ট্রাফিক সিগনালে দাঁড়িয়ে আছে শত শত গাড়ি। তারপরও হর্ন বাজাচ্ছে। কখনো একটা দু’টা গাড়ি আবার কখনো শত গাড়ি একসঙ্গে বাজাচ্ছে। চালকদের ভাবখানা এমন যে হর্ন বাজালে যানজট কিংবা ট্রাফিক সিগনাল ক্লিয়ার হয়ে যাবে। আসলে কিন্তু তা নয়। সময়ের কাজটা সময় মতই হয়। শুধু শুধু পথচারীদের কানের বারটা বাজানো হয়। বাড়ানো হয় তাদের হার্ট বিট। তিরিক্কি করে দেয়া হয় মেজাজটা। যার প্রভাব পড়ে তাদের কাজে কর্মে।

মূল সড়কের পাশাপাশি আবাসিক এলাকার অলি গলিতেও শব্দ দূষণ ছড়িয়ে পড়ে মহামারির মতো। ট্রাক কিংবা বাসের হর্ন এতটাই অসহ্য যে কানের অবস্থা নাজুক হয়ে যায় তারপরও রেহাই মেলে না।

আবাসিক এলাকার চিপা গলিতে ঢুকেছে একটা মালবাহী ট্রাক। একটা রিকশা দাঁড়িয়ে যাত্রীর কাছ থেকে ভাড়া নিচ্ছে। ট্রাক ড্রাইভারের সহ্য হচ্ছে না। অনবরত হর্ন বাজাচ্ছে। এমন দৃশ্য প্রায়ই দেখা যায়।

আবাসিক এলাকায় হর্ন বাজানো যে একটি আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ এই বোধটুকুই হয়তো ট্রাক ড্রাইভারের নেই। তাকে বিষয়টা বুঝিয়ে দেয়ার মতো কর্তৃপক্ষও নেই। থাকলেও তাদের দেখামেলা ভার।

স্কুল কলেজ মসজিদ মাদ্রাসা হাসপাতাল কিংবা এমন আরো অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যার সামনে হর্ন বাজানো নিষেধ। তাই এসব প্রতিষ্ঠানের একশ’ কী দুশ’ গজ দূরে লেখা থাকে ‘হর্ন বাজানো নিষেধ’। অধিকাংশ অক্ষরজ্ঞানহীন চালক লেখাটি পড়তে পারে না বলে মানে না। যারা পড়তে পারে তারাও বদভ্যাসের কারণে মানেনা। চালকের হাতের আঙ্গুলগুলো সব সময় হর্নের বাটনে থাকে। তাই তারা কারণে অকারণে হর্ন বাজায়। হাসপাতালের সামনে হর্ন বাজানো দণ্ডনীয় অপরাধ জেনেও হর্ন বাজায়। হর্নের বিকট শব্দে কত শত রোগী যে মারাত্নক ক্ষতির শিকার হয় তার কোন গুরুত্বই যেন নেই ড্রাইভারদের কাছে। তাদের ভাবখানা এমন যে তারা তাদের কাজ করছে এতে কার লাভ হচ্ছে আর কার ক্ষতি হচ্ছে এসব দেখার দায়িত্ব তাদের না। স্বাধীনতার মানে যে অন্যের অধিকার হরণ করা বা অন্যের কাজে ব্যাঘাত ঘটানো নয় এ বোধটাই নেই কোনো কোনো ড্রাইভারের। তাইতো মনের আনন্দে সে করে চলে তার কাজ। সে কাজের ক্ষতিকর দিকটার কথা চিন্তা করার কোনো অবকাশ নেই তার।

মসজিদে নামাজ পড়ছেন একজন মুসুলি­। গাড়ির হর্নের শব্দে নামাজে ভুল হয়ে গেছে। আবার নতুন করে নামাজ শুরু করেছেন। এমন নজিরও আছে।

রাস্তার পাশের স্কুলে কোমলমতি শিশুদের পড়াচ্ছেন শিক্ষক। গাড়ির হর্নের কানফাঁটা শব্দে শিশুরা আঁতকে ওঠেছে এমন নজিরেরও অভাব নেই। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা রোগী গাড়ির হর্নের শব্দে ঘুমুতে পারছে না এর চেয়ে অমানবিক আর কী হতে পারে? যতই অমানবিক আর অসহনীয় হোক সহ্য যে করতেই হয়। সহ্য করতে হচ্ছে।

এম্বুলেন্সের হর্নের শব্দতো আরও ভয়ংকর। হাসপাতাল স্কুল কলেজ মসজিদ মাদ্রাসা কোনো কিছুই মানে না এম্বুলেন্স চালক। যত যানজট কিংবা ট্রাফিক সিগনাল থাকুক তার গাড়ির হর্ন যে লাগামহীন বেজেই চলেছে। একজন অসুস্থ্য মানুষকে বাঁচাতে যেয়ে হাজার জন সুস্থ্য মানুষকে অসুস্থ্য করে ফেলছে তারপরও থামছেনা এম্বুলেন্সের হর্ন। এম্বুলেন্স চালকের ভাবখানা এমন যে হর্ন বাজাতে বাজাতে আকাশে উড়ে চলে যাবে গন্তব্যে। আসলে কিন্তু তা নয়। বাস্তবতা সবার জন্যই সমান-তা এম্বুলেন্স চালকই হোক আর ভিআইপি বহনকারী গাড়িই হোক।

চালকরা আইন না জানা এবং না মানার কারণে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। আসলে তাদের কপালটাই এমন। সাধারণ মানুষ সব সময়ই সাধারণ। কষ্ট যন্ত্রণা সহ্য করার ক্ষেত্রেও তারা সাধারণ।

শব্দ দূষণের সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার এই সাধারণ মানুষগুলোই। কোথাও কোনো জনসভা হচ্ছে, নেতা নেতৃদের চিৎকার চেঁচামেচিতে শুতে বসতে ঘুমুতে পারছে না সাধারণ মানুষ। ওয়াজ মাহফিল কিংবা কোনো ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান হচ্ছে তাতেও শব্দ দূষণের কারণে রাতের আরামের ঘুম হারাম হচ্ছে সাধারণ মানুষের।

রাস্তায় অবিরাম রেকর্ড করা বয়ান বাজিয়ে পণ্য বিক্রি করছে হকার তাতেও শব্দ দূষণের শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। শব্দ দূষণের কারণে তাদের কানের সমস্যা হচ্ছে, মাথার সমস্যা হচ্ছে, হার্টের সমস্যা হচ্ছে। বাড়ছে তাদের নানা রকম শারীরিক মানসিক যন্ত্রণা। তারপরও এতটুকু টনক নড়ছে না যথাযথ কর্তৃপক্ষের। ফেরিওয়ালা বিকট শব্দে মাইক বাজিয়ে পণ্য বিক্রি করছে। এটা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। বিষয়টি দেখার দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের। কোথায় সিটি কর্পোরেশনের লোক? তাদের নাকের ডগায় একজন হকার শত শত মানুষের অশান্তি করছে আর তারা নাকে তেল দিয়ে ঘুমুচ্ছে। সত্যিই পারে (!)

রাস্তায় অহেতুক হর্ন বাজিয়ে ট্রাফিক আইন অমান্য করছে চালক। ট্রাফিক সার্জেন্টের কোনো বিকার নেই। কেন? দণ্ডনীয় এই অপরাধের দণ্ড প্রাপ্তির ব্যবস্থা করাতো তার কর্তব্যের অংশ। ট্রাফিক সার্জেন্ট কেন যথাযথ পালন করছে না তার দায়িত্ব?

অতসব কেন’র জবাব না পাবার কারণে মানুষ ভোগান্তিতে পরবে কেন? আসলে সারা বাংলাদেশে ‘কেন’র’ যেন শেষ নেই। যে দিন সব কেন শেষ হবে সে দিনই শান্তি।

শব্দ দূষণের কারণে ঢাকাসহ সারাদেশের সিটি ম্যাগাসিটিগুলোর সাধারণ মানুষ আছে বড় বিপাকে। কারো ছেলের পরীক্ষা তো কারোর মেয়ের বিয়ে। বিয়ে বাড়ির গান বাজনার শব্দে পরীক্ষার্থীটি পড়ায় মনোযোগ দিতে পারছে না। কোনো একজন মুরুব্বি ভয়ানক অসুস্থ্য, এতটুকু শব্দ সহ্য করতে পারছে না। কিন্তু চার পাশে দশ বার কি পনেরটা মাইকে ভেসে আসছে ওয়াজ মাহফিলের শব্দ কিংবা রথযাত্রার ঢোলের আওয়াজ। কী করবেন এই মুরুব্বি?

একজন মানুষ সারা দিন অফিস আদালত ব্যাংক বীমা কিংবা স্কুল কলেজ হাসপাতালের ঝাক্কি ঝামেলা সেরে বাসায় এসেছেন। একটু বিশ্রাম করবেন। চারপাশের মাইকের শব্দে এতটুকু বিশ্রাম করতে পারছেন না। তার ন্যূনতম নাগরিক অধিকারটুকুও কেড়ে নিচ্ছে অন্য একজন নাগরিক কিংবা সুনাগরিক (!) কী করবেন ক্লান্ত পরিশ্রান্ত ঐ মানুষটি?

কিছু দিন আগে আইসিসি ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট খেলা গেলো। ঐ খেলা দেখার সময় যে পরিমাণ চিৎকার চেঁচামেচি হয়েছে তাতে যে কারও বিরক্তি লাগাটা স্বাভাবিক।

তারচেয়েও বড় কথা যুবক ছেলেরা যেভাবে মধ্যরাতে ছাদে নাচানাচি করেছে, ঢোল বাদ্য বাজিয়ে আনন্দ উল­াস করেছে তা কোনোভাবেই একজন সুস্থ্য স্বাভাবিক মানুষের কাজ নয়।

মধ্যরাতে, রমজান মাসে সবাইতো খেলা দেখায় মত্ত ছিল না। সারাদিন রোজার শেষে তারাবির নামাজ পড়ে বেশিরভাগ মানুষই ঘুমুচ্ছিল। তাদের আরামের ঘুম বিনষ্ট করার অধিকার কে দিয়েছে ঐ যুবকদের? তারা আনন্দ উলাসের নামে যে পরিমাণ শব্দ দূষণ করেছে তা আর যাই হোক কোনো সভ্য সমাজের সামাজিক মানুষের কাজ নয়।

সব রকম আদব কায়দা ভুলে তারা যে বেয়াদবীটা করেছে তা শুধু শব্দ দূষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর সাথে নীতি নৈতিকতার প্রশ্নও জড়ানো আছে। আনন্দ উল­াসের নামে নৈতিকতা বিবর্জিত কাজ কর্ম স্কুল কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া ছাত্রদের মানায় না। তারপরও তারা চোখের মাথা খেয়ে লাজ-লজ্জা নীতি নৈতিকতা ভুলে করেছে এমন অপকর্ম। তাদের কারণে মধ্যরাতে শব্দ দূষণের শিকার হতে হয়েছে অসংখ্য ধর্মপ্রাণ মানুষসহ হাজারো মানুষকে।

বাংলাদেশের জন্য এটা কোনো ব্যাপারই না। পৃথিবীর যে কোনো সভ্য দেশ হলে মধ্যরাতে সাধারণ নাগরিকদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটানোর জন্য জেল জরিমানা হতো।

পৃথিবীর অন্যতম সভ্যদেশ ইতালি। সে দেশে থাকেন আমার একজন কাছের মানুষ। ঈদ উপলক্ষ্যে তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন। চা পান করতে করতে নানা কথা হচ্ছিল। আমরা রাস্তার পাশে যে কফি শপটাতে বসেছিলাম তাতে বার বার গাড়ির হর্নের প্রচণ্ড শব্দ ঢুকে আমাদের কথায় বাধা দিচ্ছিল।

প্রসঙ্গক্রমে তিনি বললেন, ‘আমি ইতালিতে নিজের গাড়ি নিজে চালাই, দশ বছরে আমি মাত্র দু’বার হর্ন বাজিয়েছি’। তার কথা শোনে আমি হতভম্ব। তিনি জানালেন, সিস্টেমের কারণে ঐ দেশে হর্ন বাজানোর প্রয়োজন হয় না। তাছাড়া যত্রতত্র যখন তখন হর্ন বাজালে জেল জরিমানাতো আছেই। যেহেতু ঐ দেশে হর্ন বাজানো প্রায় নিষিদ্ধ সেহেতু শব্দ দূষণের কোনো প্রশ্নই আসে না।

মনে মনে ভাবলাম আমাদের বাংলাদেশ, আমাদের মাতৃভ‚মি কবে যে ইতালির মতো হবে? কবে যে আমরা মুক্তি পাবো শব্দ দূষণ হতে? প্রত্যাশা রাখতেতো কোনো ক্ষতি নেই। তাই শব্দ দূষণ মুক্ত বাংলাদেশের প্রত্যাশা রইল।

লেখক :সাংবাদিক, কলামিস্ট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক

loading...

About admin

Check Also

রেজাউল করিম

বাঙালির নৃতাত্ত্বিক পটভূমি ও বঙ্গবন্ধু

রেজাউল করিম : বাঙালি জাতি কোন একক নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী নয়। বাঙালি একটি সংকর জাতি। প্রাচীনকাল …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *