loading...
Home / উপ সম্পাদকীয় / পাখি জীবন এবং মফস্বল সাংবাদিক

পাখি জীবন এবং মফস্বল সাংবাদিক

পাখি জীবন এবং মফস্বল সাংবাদিক

শতাব্দী আলম : মফস্বল সাংবাদিক হিসাবে আমি গর্বিত। কিন্তু জীবনধারণের জন্য পেশা হিসাবে মফস্বল সাংবদিকতার অভিজ্ঞতা অস্বস্তিকর। অনেক মফস্বল সাংবাদিকই ব্যবসা বা অন্য পেশার সাথে জড়িত। পাশাপাশি সাংবাদিকতা করেন। আমি নিজেও ব্যবসার মাধ্যমে আর্থিক প্রয়োজন মেটাই। দেশের মফস্বল সাংবাদিকগণের কথা কেউ শুনে না। মিডিয়াকর্তা, সরকার বা প্রশাসন কেউই আমাদের খোঁজ রাখে না। অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। পাখি ভোরে যখন নীড় থেকে বের হয় সে তার আহারের সন্ধান জানে না। একজন মফস্বল সাংবাদিক প্রতিদিন ভোরে বেরিয়ে পড়েন সংবাদ সংগ্রহের সন্ধানে। প্রকৃতপক্ষে তিনিও পাখির মতো খাবারের সন্ধানে বের হন।

পাখি এবং সাংবাদিকের মধ্যে কোনো তফাৎ নেই। পাখিও দিন শেষে তার বাচ্চার জন্য মুখে করে খাবার নিয়ে আসে। মফস্বল সাংবাদিক তার এবং পরিবারের সদস্যদের খাবার সংগ্রহ করেন (খাবার কেনার প্রয়োজনীয় অর্থ)। তবে প্রতি উপজেলা বা জেলাতেই গুটিকয়েক মফস্বল সাংবাদিক শিক্ষকতা বা ব্যবসার মাধ্যমে নিজেদের আর্থিক প্রয়োজন মিটিয়ে থাকেন। দেশের প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক মিডিয়া যাই বলুন না কেন! শীর্ষ থেকে নাম সর্বস্ব কোনো মফস্বল সাংবাদিকই পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকার মতো প্রয়োজনীয় অর্থ প্রতিষ্ঠান থেকে পান না। সারাদিন ছোটাছুটি করে উদরপূর্তি শেষে আবার নীড়ে ফিরে পাখি। ঝড়-ঝঞ্জা-খরা যত প্রতিক‚ল পরিস্থিতিই হোক না কেন পাখি ঠিকই তার ও বাচ্চার খাদ্য জোগাড় করে। মফস্বল সাংবাদিকও তাই।

পত্রিকা বা টেলিভিশন অফিসগুলো মফস্বল সাংবাদিকদের নামমাত্র যা দেয় জনসমাজে প্রকাশিতব্য নয়। শীর্ষস্থানীয় পত্রিকার মফস্বল প্রতিনিধিদের যৎসামান্য সম্মানী প্রদান করা হয়। তা দিয়ে বড়জোড় এক বস্তা চাল আর দুই কেজি ডাল কেনা চলে। বাকিরা পুরোপুরিই ওই পাখি জীবনের মতো জীবন ধারণে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। পাখিকে পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু সাংবাদিকের তো এমন পাখি জীবন থাকার কথা না। সাংবাদিক একটি সমাজের প্রতিষ্ঠিত কাঠামোতে নিজের শ্রম এবং মেধা ব্যয় করেন। এই সমাজের অন্যান্য পেশাজীবী, পরিবেশ, প্রতিবেশের জন্য করেন। ভালো-মন্দ, সুখ-দুঃখের তথ্য একে অন্যের মধ্যে আদান প্রদানের সংগ্রাহক হিসাবে। তবু কেন মফস্বল সাংবাদিকও পাখির মতো খাপ খাইয়ে চলছে?

প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, যুগান্তর, আমাদের সময়, কালের কণ্ঠ, সমকাল; যমুনা, এটিএন, একুশে, মাছরাঙা টিভিসহ শতাধিক জাতীয় গণমাধ্যম আছে। এসব প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিক হিসাবে কাজ করতে নূ্যূনতম যোগ্যতাসম্পন্ন হতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতাও লাগে। গাজীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ময়মনসিংহ, ঈশ্বরদী, ঢাকার (সাভার-দোহার-নবাবগঞ্জ-কেরানীগঞ্জ), নারায়ণগঞ্জ প্রভৃতি জেলার সাংবাদিকদের সাথে ব্যক্তিগত পরিচয় আছে। জাতীয় গণমাধ্যমে কর্মরত অধিকাংশ মফস্বল সাংবাদিক উচ্চ শিক্ষিত, তরুণ, উদ্যোমী এবং প্রতিশ্র“তিশীল। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে পেশা হিসাবে সাংবাদিকতাকে বেছে নেওয়া তরুণরাও আছে। কিন্তু বাস্তবে কাজ করতে এসে এদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা কাজ করে। পেশা হিসাবে যতই আদর্শ হোক, দিন শেষে জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের কোনো বিকল্প নেই। মুষ্টিমেয় কিছু মফস্বল সাংবাদিক আছে যারা ব্যাবসা, শিক্ষকতা বা অন্য পেশার মাধ্যমে জীবনধারণ করেন। তবে অধিকাংশ মফস্বল সাংবাদিক প্রয়োজনীয় বেতন-ভাতা না পেয়ে পাখি জীবনের পথ বেছে নেন।

সালমান খুরশিদ (ছদ্মনাম) বেসরকারি একটি টেলিভিশনের গাজীপুর প্রতিনিধি। সালমান বিবাহিত। মা, প্রতিবন্ধী এক বোন, দুই মেয়ে (১৩ ও ১০ বছর), স্ত্রী এবং নিজেকেসহ পরিবারের সদস্য সংখ্যা দাঁড়াল ৬ জন। জীবন ধারণের খরচের তালিকা দীর্ঘ। দুই মেয়ের লেখাপড়া, বৃদ্ধ মায়ের ও প্রতিবন্ধী বোনের চিকিৎসা, বাড়ি ভাড়া, যাতায়াত খরচ, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং খাদ্য। প্রিয় পাঠক তার প্রাপ্ত বেতন-ভাতা দিয়ে এর কোনো একটি প্রয়োজনও মিটে না। পাখি জীবনের ন্যায় তার আয়-রোজগার। সংবাদ প্রকাশ বা গোপন করা দুইভাবেই তার আয় হয়। স্থানীয় প্রশাসন এবং রাজনীতিকগণ উন্নয়নমূলক কাজের উদ্বোধন বা ভিত্তি স্থাপন অনুষ্ঠান করেন। প্রচারের উদ্দেশ্যে সংবাদ প্রকাশের প্রয়োজনে কেহ কেহ অর্থ (৫শ বা ১ হাজার টাকা) দিচ্ছে। কোনো শিল্প কারখানায় সংঘটিত ঘটনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান মালিক চায় যেন গণমাধ্যমে প্রকাশ না হয়। কিন্তু সোর্সের মাধ্যমে ঠিকই সাংবাদিকের কাছে তথ্য চলে আসে। তখন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সাংবাদিককে উৎকোচ দেওয়া হয়। নৈতিকতার প্রশ্নে এর কোনটিই গ্রহণযোগ্য না। তবু হলফ করে বলছি এটিই বাস্তবতা।

মফস্বল সাংবাদিক যাদের অন্য কোনো রোজগারের পথ নেই প্রত্যেকেই এমন ঘটনায় সুবিধা নিচ্ছে। এসব ঘটনায় দেশ বা জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না। এমন অনেক বিষয় আছে যা সমাজ এবং রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। মাদক ব্যবসায়ী, পরিবহন চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী বা আবাসিক হোটেল থেকে পুলিশের সাথে সাথে সাংবাদিকও নিয়মিত বখরা নিচ্ছে। অন্য অনেকের মতো সালমানও বখরা নেয়। অতিষ্ঠ দুটি প্রতিষ্ঠান সালমানের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ করে। এক নারী গাজীপুর পুলিশ সুপার বরাবর অভিযোগ দিয়েছিল সালমানের বিরুদ্ধে। ইতিপূর্বে অনৈতিক কাজে লিপ্ত আরও এক নারী তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ করে। প্রতিদিনই বিভিন্ন অভিযোগে দোষী সাংবাদিকের সংখ্যা বাড়ছে। গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা প্রশাসন এর দায় এড়াতে পারে না। শ্রমিকের ন্যূনতম মুজরি আছে। অন্য যে কোনো পেশাজীবীর সুনির্দিষ্ট বেতন কাঠামো আছে। মফস্বল সাংবাদিকদের সেরকম কিছু নেই। শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম দুর্নীতি এবং অধিকার নিয়ে গলাবাজি করে। কিন্তু এদের ঘরে লালিত-পালিত মফস্বল সাংবাদিকদের কোনো দেখভাল করে না।

রাজনীতি এবং সমাজ ব্যবস্থার মতো মফস্বল সাংবাদিকতাও পুঁজিপতিদের জাঁতাকলে পড়েছে। প্রতিটি জেলা উপজেলায় কতিপয় রাজনীতিক ও বিত্তশালী ব্যক্তি অর্থের জোরে সাংবাদিক সেজে বসে। তাদের মূল উদ্দেশ্য রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল। অর্থ বা প্রতিপত্তির জোরে পত্রিকা-টেলিভিশনের পরিচয় পত্র সংগ্রহ করে। নিজেরা সংবাদ সংগ্রহ বা লেখালেখি করে না। একজন বেতনভোগী ডামি সাংবাদিক দিয়ে কাজ চালায়। তাদের লক্ষ্যই হচ্ছে সাংবাদিক নেতা সেজে সমাজে প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়ানো। এসব পুঁজিপতি মফস্বল সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ রাজনৈতিক কোন্দলের মতো সাংবাদিকদের মধ্যে অন্তর্কলহ সৃষ্টি করে। যে কারণে প্রকৃত সাংবাদিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

প্রতিটি ক্ষেতেই দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষা, রাজনীতি, অর্থনীতি, গণমাধ্যম সবকিছুতেই পরিবর্তনের হাওয়া। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন ন্যূনতম ডিগ্রি পাস ছাড়া সাংবাদিক হতে পারবে না। এমন আইন হবে। প্রধানমন্ত্রী আপনাকে অনুরোধ জানাই, সাথে এই আইনও করুন যে, মফস্বল সাংবাদিকও নগর সাংবাদিকের মতো মজুরি পাবে। সাংবাদিকতা পেশার কাঠামোতে (ওয়েজবোর্ড) প্রতি উপজেলার মফস্বল সাংবাদিককে সংযোজিত করতে হবে। পাখি জীবন থেকে মফস্বল সাংবাদিক মুক্ত হোক।

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক

loading...

About admin

Check Also

রেজাউল করিম

বাঙালির নৃতাত্ত্বিক পটভূমি ও বঙ্গবন্ধু

রেজাউল করিম : বাঙালি জাতি কোন একক নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী নয়। বাঙালি একটি সংকর জাতি। প্রাচীনকাল …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *