loading...
Home / উপ সম্পাদকীয় / এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম একটি সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম একটি সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

সাহেদ মন্তাজ

সাহেদ মন্তাজ : পূর্ববঙ্গের মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলমানের ঘরে ফেরার পালা শুরুর থেকে নতুন আকাক্সক্ষারও বিজ অঙ্কুরিত হতে থাকে-বাঙালি অজর অমর নিরাময় হবে স্বাধীনতা অর্জনের সমুদ্র মন্থন করে। কিন্তু দেবশ্রেষ্ঠ মহাদেবের মতো সমুদ্র মন্থিত বিষ কে পান করবে? সংগ্রামী জনতা পূর্ববঙ্গ জমিনের মানসপুত্র বাংলার অবিসংবাদিত নেতা সর্বশ্রেষ্ঠ সিপাহসালার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বিষপানের জন্য মনোনীত করলেন। লড়াইউন্মখ জনতার অভিপ্রায়ে সাড়া দিয়ে বঙ্গবন্ধু সেই বিষ নিজ কণ্ঠে ধারণ করে নীল কণ্ঠ হলেন।

দিনটি ঐতিহাসিক ৭ মার্চ ১৯৭১। বাঙালি জাতির জীবনে এক অনন্য ঐতিহাসিক দিন। তেইশ বছর চলমান পশ্চিম পাকিস্তানিদের ‘প্যারিটি’ তত্ত্বের যাতাকলে নির্মম বলি থেকে বাংলার মানুষের পরিত্রাণের উপায়স্বরূপ শেখ মুজিব পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে চ‚ড়ান্ত বিজয় ছিনিয়ে আনতে বিপ্লবের ডাক দিলেন। তিনি সেদিন লক্ষ জনতার সম্মুখে প্রাণ-প্রাচুর্য্যময় বাঁচার এক অনিবার্য বিপ্লবী তত্ত্ব উপস্থাপন করেন-‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম।’ এই প্রসঙ্গে সরদার ফজলুল করিম বলেন, এ ঘোষণা ‘বাংলাদেশের আপামর মানুষের একটি মহৎ ইচ্ছা ও স্বপ্নের দ্যোতক হয়ে সেদিন প্রকাশিত হয়েছিল শেখ মুজিবের কণ্ঠ। সেদিনকার উত্তাল সংগ্রাম বাক্যটিকে অনিবার্যভাবে স্থাপিত করেছিল শেখ মুজিবের কণ্ঠে।’

এটা বাঙালির জাতীয় ইতিহাসে কেবল ভাষণ নয়, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে লব্ধ অভিজ্ঞতা সিঞ্চিত মুক্তিমন্ত্র, বাঙালি জাতির জন্য। তাঁর জীবনব্যাপী নেতৃত্বদানের অসামান্য সাফল্য অর্জনের ‘শেষ শীর্ষবিন্দু’। তিনি পুরাতন সামরিক শাসনব্যবস্থা ভেঙ্গে নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য বিপ্লবের ডাক দিলেন। যেমন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন দেশে বিপ্লবী কার্যক্রমের পরিণতিতে পুরাতন শোষণব্যবস্থা ভেঙে গিয়ে তৎস্থলে জন্ম নিয়েছে নতুন শোষণহীন রাষ্ট্রব্যবস্থা। এই সকল বিপ্লবের দার্শনিক বৈজ্ঞানিক ভিত্তি মার্কসবাদ-লেলিনবাদ। সেই দার্শনিক জায়গা থেকে তাঁর প্রবর্তিত পন্থাকে সংক্ষেপে ‘মুক্তির সংগ্রাম’ তত্ত¡ নামকরণ করে পরবর্তী আলোচনায় প্রবিষ্ট হতে প্রয়াসী।

বঙ্গবন্ধুর এই তত্ত্বেব আহবানে সাড়া দিয়ে এর বাস্তবায়নে পূর্ব পাকিস্তানের আপামর জনগণ এক অভূতপূর্ব মরণপণ সংগ্রামে লিপ্ত হয়। প্রায় ৩০ লক্ষ বঙ্গ সন্তান অকাতরে প্রাণ দান করে, প্রায় ২ লক্ষ নারী সম্ভ্রম বিসর্জন দেয়, উজাড় হয়ে যায় শহর, বন্দর, গ্রাম, জনপদ। এর ইঙ্গিত করে জসিমউদ্দীনের কবিতায় বলা হয়েছে: ‘মুজিবুর রহমান/ওই নাম যেন বিষুভিয়াসের/অগ্নিউগারী বান।/ …বিগত দিনের যত অন্যায় অবিচার ভরা মার, হৃদয়ে হৃদয়ে সঞ্চিত হয়ে সহ্যের অঙ্গার;/…তোমার হুকুম তুচ্ছ করিয়া/শাসন ত্রাসন ভয়/আমরা বাঙালী মৃত্যুর মুখে/চলেছি আনিতে জয়।’ বঙ্গবন্ধু জাতিকে দিয়েছেন বৈপ্লবিক পরিবর্তনের নির্ভুল তত্ত¡, নির্ভুল সাংস্কৃতিক চিন্তা। পৃথিবীর সমস্ত বৈপ্লবিক পরিবর্তনেরই সূত্রপাত ঘটেছে সাংস্কৃতিক চিন্তায়। এক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু নির্ভুল। কেননা সংস্কৃতির ভুল ব্যাখ্যায় কখনও কখনও কি যে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে পারে হিটলারের বিভ্রান্তিকর আর্যামি তার প্রমাণ যা কিনা পৃথিবীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সর্বনাশ ডেকে আনে। অপরদিকে বঙ্গবন্ধুর ‘মুক্তির সংগ্রাম’ একটি জাতির জন্ম দিয়েছে। সংস্কৃতির ভুল ব্যাখ্যার ভয়াবহ পরিণতি এই উপমহাদেশেই বিদ্যমান। আবদুল ওয়াহাব দেখিয়েছেন, স্বাধীনতা চেয়ে পাওয়ার জন্য স্বধীন ভারতের মাটিতে বিশেষ করে পাঞ্জাব সীমান্তে ১৯৪৭ সালে ১৬-১৮ আগস্ট ৩ দিনে ১০ লক্ষ মানুষকে প্রাণবিসর্জন দিতে হয়েছিল ধর্মীয় ক‚পম­ূকতার কারণে। স্বার্থান্বেষীদের উসকানিতে হিন্দু, শিখ, মুসলমান ধর্মাবলম্বী সাধারণ মানুষ হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে। যেজন্য স্বাধীন ভারতের অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা সুভাষ বসু পরিতাপের সাথে বলেন, এত বিপুল প্রাণবিসর্জন যদি ভারতবাসী স্বাধীনতার জন্য দিত পারতো তাহলে ভারতের বিভাজন এভাবে হতো না।

এখন প্রয়োজন এই তত্তে¡র বিশ্লেষণ। এজন্য শুরুতেই পূর্ব পাকিস্তানের জনবিন্যাস ও স্তরায়িত বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আশা-আকাক্সক্ষার সম্যক ধারণা নেওয়া আবশ্যক। কেননা যে-কোন ঐতিহাসিক নেতৃত্বই কোন অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক প্রয়োজনের ফলশ্রুতি। জনগণের প্রত্যয় প্রত্যাশা বিশেষ নেতৃত্বকে অবলম্বন করে সার্থকতা লাভ করতে চায়। সেদিক বিবেচনায় এই তত্তে¡র তাৎপর্য নিহিত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সাড়ে সাত কোটি বঞ্চিত বাঙালির আশা-আকাক্সক্ষার মধ্যে।

সংগত প্রশ্ন- সেই আশা-আকাক্সক্ষা কী ছিল? মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর অবৈজ্ঞানিক ‘দ্বিজাতি তত্ত¡’র সমীকরণে পূর্ব পাকিস্তান ১৯৪৭ সালে ভারতের পূর্ব বাংলা ও আসামের কিছুটা অংশ নিয়ে পূর্ববঙ্গ নামে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয় (১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানে নামকরণ হয় পূর্ব পাকিস্তান)। তখন মুসলিম জাতীয়তাবাদের উন্মত্ততায় চাপা পড়ে যায় মৌলিক কতগুলো প্রশ্ন। যেমন উদ্ভ‚ত পাকিস্তান রাষ্ট্রের কাঠামো, শাসন ব্যবস্থা, শ্রেণি সমস্যা, জাতিগত সমস্যা প্রভৃতির কোনরকম সুরাহা ছাড়াই গঠিত হয় পাকিস্তান। জাতিগত, ভাষাগত, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিগত, ধর্মীয় আচারগত, শ্রেণিগত বাস্তব স্বাতন্ত্র্যতাকে অস্বীকার করা হয়। শিক্ষিত মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণি সামন্ত বুর্জোয়া মুসলিম লীগের পতাকাতলে বিভ্রান্তিকর মুসলিম জাতীয়তাবাদের গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দেয়। তাই দেখা যায় পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ভিত্তিই ছিল দুর্বল ও কৃত্রিম। মুসলমানরা এক জাতি -এই তত্ত্ব অযৌক্তিক। সেজন্য পঞ্চজাতির পাকিস্তান রাষ্ট্রে পাঁচটি ভাষাভাষী জাতি ও গোষ্ঠীর স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্যসমূহ অস্বীকার করে, জাতিসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অস্বীকার করে, প্রকৃত ফেডারেল রাষ্ট্র গঠনকে অগ্রাহ্য করে কেবল শ্রেণিস্বার্থের এককেন্দ্রিক শাসন কায়েম করা হয়। পূর্ববঙ্গ ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের হাত থেকে পশ্চিম পাকিস্তানি উপনিবেশবাদের করালগত হয়। ইংরেজ সা¤্রাজ্যবাদের পরিত্যক্ত মসনদে আসীন গাড়ে ধর্মের দোহাইধারী অধিক নিষ্ঠুর, অধিক কুচক্রী, অধিক ভয়াবহ পাঞ্জাবি কায়েমি স্বার্থের দাস পশ্চিম পাকিস্তানি অপশক্তি। তেইশ বছর তারা চালায় ঔপনিবেশিক শাসন শোষণ-সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির ভাষার উপর আঘাত হেনে যার সূচনা। এই নতুন ঔপনিবেশিক ব্যবস্থাকে কোন কোন তাত্তি¡ক ‘আভ্যন্তরীন উপনিবেশবাদ’, ‘অন্তর্গত উপনিবেশবাদ’, ‘নব্য উপনিবেশবাদ’ প্রভৃতি নামে অভিহিত করেছেন।

দীর্ঘ তেইশ বছরের শোষণ, বঞ্চনা, নির্যাতন, অবিচার, অবহেলা, অপমানে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির দুঃখের ভা­ যখন কানায় কানায় ভরে গিয়ে উপচে পড়তে থাকে তখন জনতার লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় পশ্চিম পাকিস্তানি দাসত্বের বিরুদ্ধে ন্যায়সংগত গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। অতীতের পুঞ্জিভ‚ত ক্ষোভের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র ও স্বায়ত্তশাসনের আকাক্সক্ষা পূরণের জন্য প্রথমবারের মতো সুযোগ এলো ৭০-এর সাধারণ নির্বাচন। জনগণ অধিকার পুনরুদ্ধারের সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগায়। ব্যালটের যুদ্ধে বাঙালি অভ‚তপূর্ব জয়লাভ করে। আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। সামরিক শাসক নির্বাচনী রায় বাস্তবায়নে টালবাহানা শুরু করে। ১ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া জাতীয় পরিষদের ইতিপূর্বে আহূত ৩ মার্চের অধিবেশন বাতিল ঘোষণার পর মুহূর্ত হতে সর্বস্তরের গণসংগ্রাম থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আওয়াজ উত্থিত হয়। এই সংগ্রামে শেখ মুজিবকে নিঃসংকোচে দৃঢ়চিত্তে সর্বশ্রেষ্ঠ সিপাহসালার নির্বাচন করে আপামর জনতা, যারা বাংলার বিস্তৃত প্রান্তর জনপদে, ধূলি-ধুষরিত শহর-বন্দরের অলিতে-গলিতে, রোগ, ব্যাধি, আকাল, বন্যা, খরা আর ঝড়-ঝঞ্জার সঙ্গে অষ্টপ্রহর প্রাণান্তকর সংগ্রাম করে বেঁচে থাকে। বঙ্গবন্ধু এই সংগ্রামের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলেন এবং মুক্তির সংগ্রামে সবাইকে আহবান জানালেন। সেদিন ৭ মার্চের রেসকোর্সের উত্তাল পরিস্থিতি সম্পর্কে পরদিন ‘দৈনিক পাকিস্তান’-এ প্রকাশিত ভাষ্য : ‘মুহুর্মুহু গর্জনে ফেটে পড়ছে জনসমুদ্রের উত্তাল কণ্ঠ। শ্লোগানের ঢেউ একের পর এক আছড়ে পড়ছে। লক্ষ কণ্ঠে এক আওয়াজ। বাঁধ না মানা দামাল হাওয়ায় সওয়ার লক্ষ কণ্ঠের বজ্র শপথ। হাওয়ায় পত্ পত্ করে উড়ছে পূর্ব বাংলার মানচিত্র অঙ্কিত সবুজ জমিনের উপর লাল সূর্যের পতাকা। লক্ষ হস্তে শপথের বজ্রমুষ্ঠি মুহুমর্ুূহু উত্থিত হচ্ছে আকাশে। জাগ্রত বীর বাঙালির সার্বিক সংগ্রামের প্রত্যয়ের প্রতীক, শতকোটি মানুষের সংগ্রামী হাতিয়ারের প্রতীক বাঁশের লাঠি মুহুর্মুহু শ্লোগানের সাথে সাথে উত্থিত হচ্ছে আকাশের দিকে। এই ছিল গতকাল রোববার রমনা রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক সভার দৃশ্য।’ সেদিন ঢাকার আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে জনতার কণ্ঠে উচ্চারিত শ্লোগানের মধ্যেই নিহিত পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা। জনগণের গগনবিদারি আওয়াজ ছিল ‘তোমার দেশ আমার দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ’; ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’; ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’; ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’ প্রভৃতি।

এখন এই তত্তে¡র প্রায়োগিক দিক পর্যালোচনা করা যাক। বঙ্গবন্ধু ‘মুক্তির সংগ্রাম’ তত্তে¡র বাস্তবায়নে স্পষ্ট দিক-নির্দেশনা দিলেন। পাকিস্তানের সামরিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল অগ্রাহ্য করে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাকে উপেক্ষা করেন সংখ্যালঘু দলনেতার কুপরামর্শে যা কিনা প্রচলিত নিয়মের লঙ্ঘন এবং অন্যায্য-অবিচারও বটে। সেজন্য ৭ মার্চে প্রদত্ত তত্তে¡র বাস্তবায়নে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে শেখ মুজিব নির্বাচিত জননেতা হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানের অসামরিক শাসনব্যবস্থা নিজ হাতে তুলে নেন। সরকারি আদেশ বাস্তবায়ন করে সরকারি কর্মচারীরা। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাঁদেরকে নির্দেশ দিলেন অবৈধ সরকারের হুকুম পালন থেকে বিরত থাকতে। কর্মচারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন-‘আমি পরিস্কার অক্ষরে বলে দেবার চাই যে, আজ থেকে বাংলাদেশে কোর্ট, কাচারি, আদালত, ফৌজদারি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে।…২৮ তারিখে কর্মচারীরা যেয়ে বেতন নিয়ে আসবেন।…আমি যা বলি তা মানতে হবে।…যে পর্যন্ত আমার এই দেশের মুক্তি না হয়…।’ এর ফলাফল কী দাঁড়াল?

এই তত্তে¡র প্রতি সাড়া দিয়ে সরকারি অফিস আদালতে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। জনগণের সর্বাত্মক বয়কটের মুখে পড়ে সেনাবাহিনী ক্রমে নৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। তাদের রেশন পেতে সমস্যা মোকাবেলা করতে হয়। এ-অবস্থায় পূর্ব পাকিস্তানে শাসন-প্রশাসন যতটুকু চালু ছিল তত্তে¡র নির্দেশনা মোতাবেক আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের হাতে চলে যায়। দেখা যাচ্ছে, একদিকে যেমন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশসমূহ সরকারি অফিস-আদালতে, ব্যাংক-বিমাসমূহে কার্যকরী হতে থাকে, অপরদিকে তেমনি মার্শাল ল’ সরকারের নির্দেশসমূহ অগ্রাহ্য হতে থাকে। মফস্বল শহর ও গ্রামাঞ্চলে খাজনা ও ট্যাক্স প্রদান বন্ধ হয়ে যায়। পূর্ব পাকিস্তানে একমাত্র কুর্মিটোলার সামরিক প্রশাসনিক কর্তার দফতর ব্যতীত আর কোথাও পাকিস্তানের পতাকা উড্ডীন ছিল না। বরং সরকারি আধা-সরকারি গৃহশীর্ষে সর্বত্র সরকারি পতাকার বদলে কালো পতাকা উড়ানো হয়। এর পাশাপাশি কলকারখানাসমূহে বিপ্লবের প্রতীক লাল পতাকা টাঙানো হয়।

বঙ্গবন্ধু জানিয়ে দিলেন, শৃঙ্খলার জিঞ্জির ভেঙে যতদিন বির্জয় না আসবে এ-সংগ্রাম ততদিন চলবে। এজন্য তিনি বাংলার মানুষকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে প্রস্তুতি নিতে বললেন, ‘প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায়, সংগ্রামী আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল এবং তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক।’ উদ্বুদ্ধ জনগণ একটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের জন্য সংকল্পবদ্ধ হয়ে সাধ্যমতো সংগ্রামের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে। অনেক স্থানে ছাত্ররা মিলিটারি ট্রেনিং নিতে শুরু করে। কলকারখানার শ্রমিকরা লড়াইয়ের লক্ষ্যে মানসিক প্রস্তুতি নিতে থাকে। জায়গায় জায়গায় বোমা পড়তে থাকে। শহর থেকে নারী, শিশু গ্রামে আশ্রয় নিতে থাকে, পাড়ায়- মহল্লায় সংগ্রাম পরিষদ ও গণবাহিনী গঠনের তৎপরতা শুরু হয়ে যায়। মূলত জনগণের আকাক্সক্ষাকে বাস্তবায়িত করতে সংগ্রামকে সংগঠিত রূপদানের নির্দেশনা আসে এই তত্তে¡।

এই তত্তে¡র মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন মতবাদী দল ও সাম্প্রদায়িক চিন্তাপুষ্ট জনগণের মধ্যে সুদৃঢ় ঐক্যের আহবান ছিল। অনৈক্য সৃষ্টির পায়তারার ব্যাপারে জনগণকে হুশিয়ার করা হয়েছে। শেখ মুজিব বলেন, ‘শোনেন–মনে রাখবেন, শত্রুবাহিনী ঢুকেছে, নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটতরাজ করবে। এই বাংলায় হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি-ননবেঙলি যারা আছে তারা আমাদের ভাই। তাদের রক্ষার দায়িত্ব আপনাদের ওপরে, আমাদের ওপরে, আমাদের যেন বদনাম না হয়।’ তাঁর আহবানে সাড়া দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের সেই ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রজাতন্ত্র ও প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে, জনগণের নির্বাচিত সংসদের ওপর রাষ্ট্রক্ষমতা অর্পনের দাবিতে নিজনিজ অবস্থানে থেকে সংগ্রামরত দল ও জনতা একতাবদ্ধ হয়। সাম্প্রদায়িকতার বিষ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। জাতিভেদ দূরীভ‚ত হয় ‘জয় বাংলা’র মন্ত্রে। কেবল পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণের স্বার্থে শাসকগোষ্ঠী কথায় কথায় ধর্মের দোহাই তুলে হিন্দু-মুসলমানের বিভেদ, ভারত-পাকিস্তানের বিরোধের কথা ফেনিয়ে প্রচার করতো। তাদের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলাত কিছু পূর্ব পাকিস্তানি তাবেদার। জনগণ এই ফেনিয়ে ফেনিয়ে প্রচারের মারাত্মক ক্ষত থেকে রক্ষা পায়। তখন ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক পেশাজীবী ও জনতার সম্মিলনে সংগ্রামের অগ্রভাগের প্রধান সংস্থাগুলো ছিল আওয়ামী লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ভাসানী), ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ওয়ালী), পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (বেআইনি ঘোষিত) ও বিভিন্ন পার্টির সহযোগী বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন। উল্লেখ্য, সামন্তবাদী কায়েমি স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো ছিল মুসলিম লীগ ও জামায়াতে ইসলামি। স্বাধীনতাকামী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে চিন্তাগত দিক দিয়ে ভিন্নতা ছিল। সেই বিভেদের চিন্তাকে পিছনে রেখে দল, মত ও জনতার মধ্যে ইস্পাত দৃঢ় ঐক্যের প্রাচীর নিয়ে শক্তিমদমত্ত পশ্চিম পাকিস্তানি অবৈধ কর্তৃত্বকারীদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রয়োজন ছিল। মুজিবের মুক্তির তত্তে¡ আস্থা রেখে সাড়ে সাত কোটি নিরস্ত্র মানুষ অপরাজেয় আত্মিক শক্তিতে বলিয়ান হয়ে ওঠে। সব ব্যবধান দূরে ঠেলে তারা হয়ে ওঠেন মুক্তিফৌজ মুক্তিযোদ্ধা।

এই তত্ত্ব সকল ভেদাভেদ ভুলে সাম্প্রজ্যবাদ, পুঁজিবাদ, উগ্র ধমর্মান্ধতাবাদ তথা উগ্র মুসলিম জাতীয়তাবাদের ধারক-বাহক ‘পাকিস্তানবাদ’র বিরুদ্ধে বাংলার মানুষকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের পূর্ণ বিকাশে উদ্বুদ্ধ করে, যে জাতীয়তাবাদ বিভিন্ন স্তরের মানুষকে মুক্তির আন্দোলনে শত্রুর বিরুদ্ধে মিলিত সংগ্রামে সংঘবদ্ধ হতে প্রেরণা জোগায়। বাংলা ভ‚খ­ে বাংলা ভাষাভাষি মানুষ এক জাতিএই জাতীয়তাবাদে বাঙালি উজ্জীবিত হয়েছিল বলেই তাদের চেকের জনগণের পরিণতি মেনে নিতে হয়নি, অসহায়ভাবে নিজেদের নিঃশেষ করেনি। ১৯৬৮ সালে চেকের জনগণ রুশ সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কেবল অসহযোগিতা করে নিজেদের শেষ করে ফেলে। পক্ষান্তরে, বাঙালি পাকিস্তানি হন্তকদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধে ঝাপিয়ে পড়ে। একদিকে পৃথিবীর নামজাদা লড়নেওয়ালা প্রশিক্ষিত পাকিস্তান ফৌজ, অপরদিকে হাতেবাঁধা বোমা আর ৩০৩ রাইফেলধারী সাধারণ মানুষ। বঙ্গবন্ধু বিপ্লবের সফলতা সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত ছিলেন। সেজন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেন। তিনি জানতেন স্বাধীনতা এমনি এমনি ধরা দেয় না; নিজেদের শক্তিতে, ত্যাগে, দুঃখে নিজেদেরই জয়কে ছিনিয়ে আনতে হবে। স্বাধীনতাবৃক্ষ পুষ্ট হয় শহিদের রক্তসেচনে। মূলত জাতীয়তাবাদের চেতনা বাঙালি গণমানসে উদ্ভ‚ত ছিল। শেখ মুজিব সেই সুপ্ত জাতীয়তাবাদকে পূর্ণ বিকাশের মাহেন্দ্রক্ষণে যথাযথ নেতৃত্ব প্রদান করেন। বিষয়টি বোঝার জন্য খোন্দকার আশরাফ হোসেনের উদ্ধৃতি তুলে ধরছি: ‘যে-কোন জনগোষ্ঠীই স্বয়ংক্রিয় স্বাভাবিকতায় জাতি হিসেবে পরিগণিত হয় না। লক্ষ-লক্ষ কিংবা কোটি-কোটি মানুষের সমাহারই অবলীলায় জাতি গড়ে তোলে না। একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক পরিসীমার মধ্যে পরম্পরাক্রমে যারা বসবাসরত, একই রকম সামাজিক-রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আত্মিক-মানসিক সংহতির প্রেষণায় যারা যূথবদ্ধ এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ একই সূত্রে গ্রন্থিমান দেখার মানসসংগঠন যাদের মধ্যে সঞ্জাত ও ক্রমবিকশিত, তারাই সম্ভবত একসময় জাতি হিসেবে পরিগণিত হয়।’

৭ মার্চের মুক্তির সংগ্রাম তত্তে¡ আসন্ন সশস্ত্র আন্দোলনের প্রাথমিক গতিপথ নির্দেশ করা হয়। ভয়-ভীতি, অত্যাচার- অবিচার, জুলুম-নির্যাতনের মুখে মুক্তির আন্দোলন যেন থেমে না থাকে সেজন্য তিনি সতর্ক করে দেন। তিনি নিশ্চিত ছিলেন এবারের আন্দোলনে বিজয় অর্জিত হবেই। সাড়ে সাত কোট মানুষ যখন ন্যায্য দাবিতে জেগে উঠেছে, আর কোন অপশক্তি তাদের রূখে দিতে পারবে না। সেজন্য আন্দোলন কোনভাবে থামতে দেওয়া যাবে না। এমন কি জনগণ যেন আর কোন নির্দেশের অপেক্ষা না করে কাক্সিক্ষত সংগ্রাম শুরু করে দেয় সেজন্য অগ্রিম অনুমোদন দিয়ে রাখেন। আন্দোলন কখন শুরু হবে, জনগণ কিভাবে আন্দোলন এগিয়ে নিবে সে বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আর যদি একটি গুলি চলে, আর যদি আমার লোকদের ওপর হত্যা করা হয়, তোমাদের ওপর আমার অনুরোধ রইল-প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছু, আমি যদি হুকুম দেবার না পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে।’ এই বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে শেখ মুজিব মুক্তি সংগ্রামের অবশ্যম্ভাবিতা ও আরো নির্দেশের অপেক্ষা না করার জন্য জনগণকে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে রাখলেন।

এই তত্তে¡র প্রায়োগিক সফলতা নিয়ে বঙ্গবন্ধু নিসংশয়। তিনি জানতেন সংগ্রামের সকল ক্ষেত্র যথাযথ প্রস্তুত হয়ে গেছে। এই জনগণ আন্দোলনে আর তার নেতৃত্বের প্রয়োজন হবে না। তিনি না থাকলেও আন্দোলন কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে এগিয়ে যাবে। এই শক্তির ভিত তিনি সৃষ্টি করেছেন দীর্ঘ জীবনব্যাপী। মনস্তাত্তি¡ক যুদ্ধের সকল রসদও মজুদ হয়ে গেছে। লড়াইয়ে জয়ের অমোঘ অস্ত্রটি তিনি দেশবাসীর হাতে তুলে দিয়েছেন। তাই তাঁর অনুপস্থিতি বিজয় ছিনিয়ে আনতে প্রতিবন্ধক হবে না বলে তিনি আত্মপ্রত্যয়ে বলিয়ান ছিলেন। দেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপোষহীন। তিনি হয়তো বা নিয়তি নিষ্ঠুরতায় থাকতে পারবেন না, কিন্তু এখন আর তাতে কিছু আসে-যায় না। বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই। স্বাধীনতার জন্য উদ্বেল উদ্যাম উৎকণ্ঠ জনতাকে কেউ আর রুখে দিতে পারবে না। সে-কথাই তিনি উচ্চারণ করেন, ‘আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, তারা বাঁচতে চায়, তারা অধিকার পেতে চায়।’

এই তত্তে¡ সংগ্রামের প্রধান অস্ত্র হিসেবে প্রাথমিকভাবে বিবেচনা করা হয়েছে বাঙালির অতীত আন্দোলন-সংগ্রামের ঐতিহ্যকে। এই ঐতিহ্যে উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছিলেন বলেই বাংলার কৃষক যুদ্ধকালে আপনমনে কৃষিকর্মে নিয়োজিত না থেকে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে ইংরেজ কবির চিরাচরিত বয়ান ভেঙে ফেলে-রাষ্ট্রবিপ্লব যখন শুরু হয়- জাতি যখন ভাঙে তখনও চাষি হাল নিয়ে মাঠে যায়, একমনে কৃষিকাজ করে চলে। বাঙালির আছে অবিভক্ত ভারতে আন্দোলন সংগ্রামের ঐতিহ্য। পূর্ববর্তী নেতৃত্ব থেকে গ্রহণ করেও বঙ্গবন্ধু নিজেকে স্বতন্ত্র শীর্ষে নিয়ে গেছেন। গান্ধীর অহিংস আন্দোলন, সুভাষচন্দ্র বসুর বৈপ্লবিক চিন্তাধারা, জিন্নাহর একজাতি তত্ত¡ বা পাকিস্তানবাদ সব দর্শনকে অতিক্রম করেছে মুজিবের মুক্তির সংগ্রাম। গান্ধীর আন্দোলনে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক উদারনীতি প্রচার পেয়েছে, সুভাষবসুর চিন্তাকর্মে গণতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদ প্রশ্রয় পেয়েছে, জিন্নাহ উগ্র ধর্মান্ধতাবাদকে লালন করেছেন; কিন্তু বঙ্গবন্ধু অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ, শোষণহীন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উদ্গাতা।

প্রশ্ন হতে পারে যে, মুক্তির সংগ্রাম তত্তে¡র কোন বিশেষত্ব আছে কিনা? জবাব হলো অবশ্যই আছে। কী সেই বিশেষত্ব? এর উত্তরে বলা যায়, এই তত্ত¡ ভারত উপমহাদেশের পূর্ববর্তী তিনটি রাজনৈতিক দর্শন বা মতের সমন্বয় সাধনপূর্বক পূর্ববর্তী মতসমূহকে অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে। এখন সমন্বয়সাধন ও অতিক্রমণের বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যাক।

মহাত্মা গান্ধীর ‘সত্যাগ্রহ’ ছিল অহিংস-অসহযোগ এবং নিরস্ত্র প্রতিরোধ। ব্রিটিশ রাজশক্তির বিরুদ্ধে নিরস্ত্র ভারতবাসীর যুদ্ধে রক্তক্ষয়ের সফলতা নিয়ে তিনি সংশয়মুক্ত ছিলেন না। এই ধারার বিরোধী ছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। তাঁর ‘জয় হিন্দ’র উদ্দেশ্য ব্রিটিশের বিরুদ্ধে আজাদ হিন্দ ফৌজ বা মুক্তিফৌজের সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামে অবিভক্ত ভারতের স্বাধীনতা অর্জন। কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ‘দ্বিজাতি তত্ত¡’ ছিল ধর্মান্ধ ও সাম্প্রদায়িক মদদে ভারতের হিন্দু-মুসলমান ভিত্তিক ভাগ। বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্বোক্ত মতবাদত্রয়ের সমন্বয় সাধন করেন।

ব্যাপারগুলো পরিষ্কার করা য়াক। বঙ্গবন্ধু তাঁর ‘মুক্তির সংগ্রাম’ তত্তে¡ গান্ধীর অহিংস আন্দোলনকে সাময়িক কৌশল হিসেবে গ্রহণ করলেন। তিনি অত্যন্ত বলিষ্ঠ তেজদীপ্ত কণ্ঠে দৃঢ়তার সাথে বললেন ‘আমি পরিষ্কার অক্ষরে বলে দেবার চাই যে, আজ থেকে বাংলাদেশে কোর্ট, কাচারি, আদালত ফৌজদারি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে।’ গরীবের যাতে কষ্ট না হয়, যাতে আমার মানুষ কষ্ট না করে, সেজন্য সমস্ত অন্যান্য যে জিনিসগুলো আছে, সেগুলোর হরতাল কাল থেকে চলবে না।…’ এটা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের প্রতি তাঁর সমর্থনের লক্ষণ। বঙ্গবন্ধু সুভাষের জয়হিন্দকে রাজনৈতিক লক্ষ্য করলেন। তিনি প্রতিক্ষীত লক্ষ জনতাকে স্পষ্ট নির্দেশ দিলেন, ‘আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোকদের উপর হত্যা করা হয়, তোমাদের উপর আমার অনুরোধ রইল-প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে, সব কিছু, আমি যদি হুকুম দেবার না পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে।…প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল এবং তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক।’ বঙ্গবন্ধুর এই সুস্পষ্ট আহবানে অনুপ্রাণিত হয়েছে উপস্থিত জনতা ও অধীর আগ্রহে অপেক্ষমান সমগ্র দেশবাসী। এবং বঙ্গবন্ধু জিন্নাহর সাম্প্রদায়িকতার উর্ধে— অসাম্প্রদায়িকতার মন্ত্রে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করলেন। তিনি হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি-অবাঙালি ভেদাভেদ অবসানের আহবান জানিয়ে বলেন, ‘মনে রাখবেন শত্রু বাহিনী ঢুকেছে, নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটতরাজ করবে। এই বাংলায় হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি-ননবেঙলি যারা আছেন তারা আমাদের ভাই।’ এইভাবে বঙ্গবন্ধুর ‘মুক্তির সংগ্রাম’ অন্য সকল মতবাদকে সাফল্যজনকভাবে অতিক্রান্ত করেছে।

এই তত্তে¡র সফলতা হলো, ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ, জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে সংঘটিত একটি আদর্শ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-সংগ্রামের সফল বিজয়। দীর্ঘ নয়মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নামে একটি নতুন রাষ্ট্র বিশ্ব মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে যার মূল ভিত্তিই ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ। একটি জাতির পুনরুতথান, পুনর্জীবন তথা বাঙালি জাতীয়তাবাদের উজ্জীবন প্রতিষ্ঠার সফল দর্শনই কেবল নয়, বরং বিশ্ব ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের পাঠে সমাজ পরিবর্তনের এক সফলতম তত্ত্ব ‘মুক্তির সংগ্রাম’।
তথ্যসূত্র

ক্স আবদুল ওয়াহাব, ‘বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ফোকলোর ও মানবতার জয়গান’, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ইতিহাস ও তত্ত¡, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, ২০১৪
ক্স খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস, মুজিববাদ, ন্যাশনাল পাবলিকেশান্স, ঢাকা, ১৯৭২
ক্স বোরহান উদ্দীন খান জাহাঙ্গীর, ইতিহাস নির্মাণের ধারা, বাংলাদেশ চর্চা, ঢাকা, ২০০৫
ক্স ভবানী সেন, ‘বাংলাদেশে বিপ্লব ও প্রতিবিপ্লব’, শক্তি চট্টপাধ্যায় (সম্পা.), পূর্বোক্ত
ক্স যতীন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তধারা, ঢাকা, ১৯৮৭
ক্স শক্তি চট্টপাধ্যায় (সম্পা.), সাংবাদিকের চোখে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, বিশ্ববাণী প্রকাশনী, কলকাতা, মে ১৯৭১
ক্স শেখ মুজিবুর রহমান, আমার কিছু কথা, শিখা প্রকাশনী, ঢাকা, ১৯৯৫
ক্স সরদার ফজলুল করিম, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম’, আবদুল ওয়াহাব (সম্পা.), পূর্বোক্ত
ক্স সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চা তত্ত্ব ও পদ্ধতি, অনুপম প্রকাশনী, ঢাকা, ২০০০

সাহেদ মন্তাজ
পিএইচডি গবেষক, প্রাবন্ধিক, কবি ও সহপরিচালক, বাংলা একাডেমি

loading...

About admin

Check Also

রেজাউল করিম

বাঙালির নৃতাত্ত্বিক পটভূমি ও বঙ্গবন্ধু

রেজাউল করিম : বাঙালি জাতি কোন একক নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী নয়। বাঙালি একটি সংকর জাতি। প্রাচীনকাল …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *