loading...
Home / উপ সম্পাদকীয় / ঈদুল ফিতর ও সড়ক দুর্ঘটনা

ঈদুল ফিতর ও সড়ক দুর্ঘটনা

সাহেদ মন্তাজ : সড়ক দুর্ঘটনা ইদানীং এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, মানুষ এটিকে দৈনন্দিন জীবনের নৈমিত্তিক ঘটনা হিসেবে গ্রহণ করতে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। এমন একটি দিন অতিবাহিত হয় না-দেশের কোথাও সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে না। এ মৃত্যুফাঁদে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষ।

আর কোনো পার্বণে, ধর্মীয় উৎসবে বিশেষ করে মুসলমান ধর্মের দুই ঈদে সড়ক দুর্ঘটনা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। এ সময় দুর্ঘটনা রোধে সরকার আন্তরিক। নানান পদক্ষেপও গ্রহণ করা হয় সরকার পক্ষ থেকে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না, দুর্ঘটনা আর কমে না। গাড়িচালকদের বল্গাহীন মানসিক প্রবণতাই এজন্য অনেকাংশে দায়ী। এরপর কিছুদিন হৈচৈ, সভা, সেমিনার, র‌্যালি; তারপর আবার যা তাই। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ শেষ অবধি কোনো কাজে আসে না।

বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশে যত সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে এবং এজন্য যত প্রাণহানি ঘটে, পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে এমনটি হয় না। সড়ক দুর্ঘটনায় কেবল সাধারণ মানুষই মারা যাচ্ছেন তা নয়, এমন অনেক প্রতিভা অকালে ঝরে যাচ্ছেন যারা কালেভদ্রে জন্মগ্রহণ করেন। জীবনানন্দ দাশ সড়ক দুঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন। সাহিত্য অনুরাগীদের আজও তা মেনে নিতে কষ্ট হয়।

১৪ অক্টোবর ১৯৫৪ তারিখে কলকাতার বালিগঞ্জে এক ট্রাম দুর্ঘটনায় তিনি আহত হন। ট্রামের ক্যাচারে আটকে তার শরীর দলিত হয়ে যায়। ভেঙে যায় কণ্ঠা, ঊরু এবং পাঁজরের হাড়। গুরুতরভাবে আহত জীবনানন্দের চিৎকার শুনে ছুটে এসে নিকটস্থ চায়ের দোকানের মালিক চূণীলাল এবং অন্যান্যরা তাঁকে উদ্ধার করে ভর্তি করে শম্ভ‚নাথ পণ্ডিত হাসপাতালে। এ সময় ডা. ভূমেন্দ্র গুহ-সহ অনেক তরুণ কবি জীবনানন্দের সুচিকিৎসার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেন। কবি-সাহিত্যিক সজনীকান্ত দাস এ ব্যাপারে বিশেষ উদ্যোগ নেন। তাঁর অনুরোধেই পশ্চিমবঙ্গের তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধানচন্দ্র রায় কবিকে দেখতে আসেন এবং আহত কবির সুচিকিৎসার নির্দেশ দেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। চিকিৎসক ও সেবিকাদের সকল প্রচেষ্টা বিফলে দিয়ে ২২শে অক্টোবর ১৯৫৪ তারিখ রাত্রি সাড়ে ১১টায় মৃত্যুবরণ করেন কবি। আবদুল মান্নান সৈয়দ সহ অনেকের ধারণা, আত্মহত্যা স্পৃহা ছিল দুর্ঘটনার মূল কারণ।

 যাই হোক এরপরও প্রতিভাবানদের বেঘোরে মৃত্যুর ছড়াছড়ি। সৈয়দ আবুল মকসুদ ‘যে অপমৃত্যুর দায় নেই কারো’ (প্রথম আলো, ১১ জুলাই ২০১৭) উপসম্পাদকীয়তে দেখিয়েছেন, সড়ক দুর্ঘটনা পৃথিবীর সব দেশেই হয়। কিন্তু বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনার চরিত্র আলাদা। এই দুর্ঘটনা আমাদের দেশের জাতীয় অর্থনীতির বিপুল আর্থিক ক্ষতিরও কারণ।

এদেশের অসাধারণ মেধাবী, পণ্ডিত, সৃষ্টিশীল ও মানবকল্যাণে নিবেদিত অনেক মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। এসব অনন্য সাধারণ গুণীব্যক্তিদের কয়েকজনের নাম তিনি বর্ণনায় উলে­খ করেছেন। তা থেকে জানা যায়, সড়ক দুর্ঘটনায় অধ্যাপক ড. আগা মেহেদী হোসেন, নৃত্যশিল্পী গওহর জামিল, ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মফিজুল­াহ কবির, চিত্রনির্মাতা আলমগীর কবির, অভিনেত্রী টিনা খান, চিত্রপরিচালক তারেক মাসুদ ও সংবাদমাধ্যম ব্যক্তিত্ব মিশুক মুনীরের মতো বিরল প্রতিভাধররা মৃত্যুবরণ করেছেন।

কেবল যাত্রী-পথচারীরা নন, চালক-হেলপার-শ্রমিকদেরও মৃত্যু ঘটে। গত দুই বছরে অন্তত ৪০ জন চালক ও হেলপার দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। এ বিষয়ে তার মন্তব্য ‘কিন্তু সড়কে ছোটাছুটি করে আমার এই ধারণা জন্মচ্ছে যে অনেক চালক বেপরোয়া চালিয়ে নিজে মরতে এবং অন্যকে মারতে কোন দুঃখ পান না।’ এটা একটা নিদারুণ বাস্তবতা।

সাধারণ পরিবহনের যাত্রী হলে বোঝা যায়, পরিবহন শ্রমিকরা রাস্তাঘাটে কিরূপ বেপরোয়া থাকে। কার বুকের ধন খোয়া যাবে তাতে কিছুই যায় আসে না তাদের। সেজন্য ‘নিরাপদ সড়ক চাই’য়ের মতো আন্দোলন সত্তে¡ও সড়ক দুর্ঘটনা না কমে বরং বেড়েই চলেছে।

এবার ঈদুল ফিতরে ১৯ জুন থেকে ১ জুলাই পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক, রেল ও নৌপথে সম্মিলিতভাবে ২৪০টি দুর্ঘটনায় ৩১১ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৮৬২ জন। ঈদে ২০৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৭৪ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৮৪৮ জন। গত বছরের চেয়ে এবার সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা বেড়ে গেছে। গত বছর একই সময়ে ১২১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১৮৬ জন নিহত হয়েছিলেন, আহত হয়েছিলেন ৭৪৬ জন। সেই হিসাবে এবার সড়কে গতবারের চেয়ে ৮৮ জন বেশি মারা গেছেন। আহতের সংখ্যা বেশি ১০২ জন। যদিও এবারের ঈদযাত্রা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে স্বস্তিদায়ক ছিল বলে সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের দাবি করেছেন। গত ৪ জুলাই ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলনে সড়ক দুর্ঘটনার এই পরিসংখ্যান তুলে ধরেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী। সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবেদন তৈরিতে দেশের ২২টি জাতীয় এবং ৬টি আঞ্চলিক দৈনিক, ১০টি অনলাইন সংবাদ মাধ্যমের সহায়তা নেওয়া হয়েছে।

সংগঠনটি বিগত চার বছর যাবৎ সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। এ সম্পর্কে উক্ত সংবাদ সম্মেলনে মহাসচিব বলেন, প্রতি বছর ঈদকেন্দ্রিক সড়ক দুর্ঘটনায় আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় গত চার বছর ধরে আমরা এই প্রতিবেদন তৈরি করছি। এবারও সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে, বেড়েছে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি।

গত ১৯ জুন থেকে ১ জুলাই পর্যন্ত রেলপথে ট্রেনে কাটা পড়ে পূর্বাঞ্চলে ২৫ জন ও পশ্চিমাঞ্চলে ৯ জনসহ মোট ৩৪ জন নিহত হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইউনিট গঠনসহ ১২টি সুপারিশমালা দেওয়া হয় বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি পক্ষ থেকে।

সুপারিশগুলো হলো : এক. সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইউনিট গঠন, দুই. যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণে যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া, তিন. যানবাহনের ফিটনেস পদ্ধতি ডিজিটাল করা, চার. রোড সেফটি অডিট করা, পাঁচ. অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য বন্ধ করা, ছয়. প্রশিক্ষিত চালক গড়ে তোলা, সাত. ওভারলোড নিয়ন্ত্রণে মানসম্মত গণপরিবহনের ব্যবস্থা করা, আট. মহাসড়কে ধীরগতির যান ও দ্রুতগতির যানের জন্য পৃথক লেনের ব্যবস্থা করা, নয়. ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস–্য পদ্ধতি আধুনিকায়ন করা, দশ. মহাসড়কে নছিমন-করিমন, ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা বন্ধে সরকারের সিদ্ধান্ত শতভাগ বাস্তবায়ন করা, এগার. ভাঙা রাস্তাঘাট মেরামত করা ও বারো. মহাসড়কে ফিটনেসবিহীন লক্কড়-ঝক্কড় ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন চলাচল বন্ধে উদ্যোগ নেওয়া।

সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, ঢাকা-ময়মনসিং-রংপুর রুটে সর্বাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণহানিও বেশি হয়েছে।

সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, বিভিন্ন সড়ক দুর্ঘটনায় যেসব ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দেওয়া হয়, শেষ পর্যন্ত নিহতদের পরিবার সে ক্ষতিপূরণ পায় না। যেমন রংপুরের তারাগঞ্জে যে দুর্ঘটনাটি ঘটে, ওই দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবার প্রতি ২০ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণে দেখা যায় এই ক্ষতিপূরণ তারা পায়নি।

দেশের নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে সড়ক আইন সংশোধনের দাবি বহু দিনের। কিন্তু পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের অসহযোগিতার জন্য সরকার সফল হতে পারে না। তাদের দৌরাত্ম্যের কাছে দেশের কোটি কোটি মানুষের জীবন নিতান্ত অসহায়। কিন্তু এ অসহায়ত্বের জিম্মি দশা থেকে দেশের মানুষকে উদ্ধার করে নিরাপদ যাত্রার নিশ্চয়তা দিতে হবে। তাই আইন ও নীতিমালা সংশোধন ও কার্যকর করতে সরকার দৃঢ় অবস্থান দেশবাসীর দাবি। এ দাবি পূরণে সফল না হতে পারলে ফি বছর মৃত্যু বেড়েই চলবে। এ ভয়ঙ্কর দুর্দশা থেকে পরিত্রাণও মিলবে না। কিন্তু এভাবে চলতে দেওয়া যায় না।

লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক ও কবি

loading...

About admin

Check Also

রেজাউল করিম

বাঙালির নৃতাত্ত্বিক পটভূমি ও বঙ্গবন্ধু

রেজাউল করিম : বাঙালি জাতি কোন একক নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী নয়। বাঙালি একটি সংকর জাতি। প্রাচীনকাল …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *