loading...
Home / আইন আদালত / চার শিশু হত্যায় ৩ তিনজনের মৃত্যুদণ্ড

চার শিশু হত্যায় ৩ তিনজনের মৃত্যুদণ্ড

হবিগঞ্জের বাহুবলে চার শিশুকে হত্যার ঘটনায় তিনজনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছেন আদালত। বুধবার রায়ের পর আদালত থেকে দণ্ডপ্রাপ্তদের কারাগারে নেওয়া হয়।
হবিগঞ্জের বাহুবলে চার শিশুকে হত্যার ঘটনায় তিনজনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছেন আদালত। বুধবার রায়ের পর আদালত থেকে দণ্ডপ্রাপ্তদের কারাগারে নেওয়া হচ্ছে ।

সুলতান সুমন, সিলেট : হবিগঞ্জের বাহুবলে চার শিশু হত্যা মামলায় তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন সিলেট বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল। এ ছাড়া দু’জনকে সাত বছরের কারাদণ্ড ও ৩ জনকে খালাস প্রদান করা হয়েছে। গতকাল বুধবার সিলেট দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মকবুল আহসান এ রায় দেন। তার ঘোষিত রায়ে চার শিশু হত্যার মূল নকশাকারককে খালাস প্রদান করা হয়েছে। আলোচিত এ মামলার রায় নিয়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্র পক্ষ। রাষ্ট্র পক্ষ এ রায়ের নথি হাতে পাওয়া মাত্রই উচ্চ আদালতে আপিল করবেন বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্র পক্ষের পাবলিক প্রসিকিউটর(পিপি) কিশোর কুমার কর। অপরদিকে এ রায় নিয়ে নিহত নিহত শিশু তাজেলের মা আমেনা খাতুন ও মনিরের মা ছুলেমা খাতুন প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের দাবি, যে সবকিছুর পরিকল্পনা করলো, যার নির্দেশে আমাদের ছেলেকে খুন করা হলো সে কীভাবে খালাস পেয়ে যায়- কাঁদতে কাঁদতেই এমনই প্রশ্ন আসে তাদের কাছ থেকে। তারা আরও বলেন আব্দুল আলী বাগাল এর পূর্বেও একটি হত্যা মামলা থেকে খালাস পেয়েছিল। এ নিয়ে সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ লালা বলেন, হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী যদি রক্ষা পেয়ে যায়, তাহলে অন্য অপরাধীরাও অপরাধ করতে দ্বিধাবোধ করবে না। তাই এ রকম অপরাধীদের শাস্তি হওয়া উচিত ছিল।

আদালতের ঘোষিত রায়ে, মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামিরা হলেন রুবেল মিয়া, আরজু মিয়া ও উস্তার আলী। এর মধ্যে উস্তার আলী পলাতক রয়েছেন। এই মামলার প্রধান আসামি বাচ্চু মিয়া র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে আগেই নিহত হয়েছেন। আসামিদের মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি দশ হাজার টাকা করে জরিমানাও করা হয়েছে। জুয়েল মিয়া ও শাহেদকে সাত বছরের কারাদন্ডের পাশাপাশি পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন বিচারক। আর হত্যাকান্ডে সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত না হওয়ায় দন্ড পাওয়া জুয়েল-রুবেলের বাবা আব্দুল আলী বাগাল এবং পলাতক আসামি বাবুল মিয়া ও বিল­াল খালাস পেয়েছেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) কিশোর কুমার কর এসব তথ্য জানিয়েছেন।

আদালত সূত্রে জানা যায়, হবিগঞ্জের বাহুবলে চার শিশু হত্যা মামলাটি বিচারের জন্য প্রস্তুত হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে সিলেট বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাব্যুনালে প্রেরণ করা হয়। ট্রাব্যুনালে মামলা স্থানান্তরের পর ৫৭ জন মধ্যে ৫২ জনের সাক্ষ্য প্রমাণ শেষে মামলার রায় ঘোষণার জন্য গতকাল বুধবার তারিখ নির্ধারণ করা হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল সকালে পুলিশ স্কটের মাধ্যমে হত্যা মামলায় আটক থাকা আসামিদের সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আদালতে নিয়ে আসা হয়। দুপুরে জরাজীর্ণ আদালতে আলোচিত চার শিশু হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হয়।

নিহত শিশুদের মায়ের দাবি
যে সবকিছুর পরিকল্পনা করল, যা নির্দেশে আমার ছেলেকে খুন করা হলো; সে কিভাবে খালাস পেয়ে যায়- কাঁদতে কাঁদতেই প্রশ্ন করেন শিশু তাজেলের মা আমেনা খাতুন। একই প্রশ্ন শিশু মনিরের মা ছুলেমা খাতুনেরও। বাড়ির উঠানে গড়াগড়ি করে কাঁদতে কাঁদতে তিনিও প্রশ্ন তুলেন, আবদুল আলী বাগাল কীভাবে খালাস পায়। বাগালের পরিকল্পনায়ই তাদের শিশুদের হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ এ নারীর। বুধবার দুপুরে বাহুবলের সুন্দ্রাটিকি গ্রামে গিয়ে কথা হয় এই নারীদের সাথে। গত বছরের ফেব্র“য়ারিতে তাজেল-মনিরসহ এই গ্রামের ৪ শিশুকে হত্যা করা হয়। বুধবার এ মামলার রায়ে তিনজনকে ফাঁসি ও দুইজনকে সাত বছরের কারাদন্ড দেন সিলেট দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মকবুল আহসান। রায়ে প্রধান অভিযুক্ত আবদুল আলী বাগালসহ তিনজনকে খালাস প্রদান করা হয়। তিনজনকে খালাস প্রদান করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন নিহত শিশুদের স্বজনরা।

দুপুরে ওই শিশুদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, রায় শোনার পর বাড়ির উঠানো লুটোপুটি খেয়ঢে কান্না করছেন নিহত শিশুদের মা-দাদীসহ স্বজনরা। প্রতিবেশীরা এসে তাদের স্বান্তনা প্রদানের চেষ্টা করছেন। কাঁদতে কাঁদতেই অসুস্থ হয়ে পড়েন চার শিশুর মা আমেনা খাতুন, ছুলেমা খাতুন, পারুল বেগম ও মিনারা খাতুন এবং তাদের দাদি মরম চান। ৪ জনকেই একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপে¬ক্সে নেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় ভাদেশ্বর ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডে সদস্য মো. নাসিম রায় ঘোষণার খবর শোনে হাজির হন ওই শিশুদের বাড়িতে। তিনিও ক্ষুব্দ স্বজনদের স্বন্তনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

মো. নাসিম বলেন, আব্দুল আলী বাগাল এ মামলার প্রধান অভিযুক্ত। তিনি কিভাবে খালাস পেয়ে গেলেন তা আমাদের বোধগম্য নয়। তবু আদালতের ওপর আমার কিছু বলার নেই।
অসন্তুষ্ট দুই পক্ষের আইনজীবীরা :

৪ শিশু হত্যার রায়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন দুই পক্ষেরই আইনজীবীরা। রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাওয়ার কথাও জানিয়েছেন তারা। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, সকল আসামির বিরুদ্ধেই অপরাধ প্রমাণ করতে পেরেছেন তারা। ফলে সকলের সর্বোচ্চ শান্তি পাওয়া উচিত ছিল। আর আসামিপক্ষের দাবি, বেআইনিভাবে এ রায় প্রদান করা হয়েছে। সাক্ষীদের সাক্ষ্যমতে, কাউকে মৃত্যুদণ্ড ও কাউকে খালাস প্রদানের সুযোগ ছিল না। খালাস প্রদান করলে সকলকে খালাস আর মৃত্যুদণ্ড প্রদান করলে সবাইকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করাই আইনসম্মত ছিল। প্রায় দেড় বছর আগের চাঞ্চল্যকর এই হত্যার মামলার রায় বুধবার ঘোষণা করেন সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মকবুল আহসান। ৯ আসামির মধ্যে রায়ে রুবেল মিয়া, আরজু মিয়া ও পলাতক উস্তার মিয়াকে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি দশ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। আর রুবেলের ভাই জুয়েল মিয়া ও শাহেদকে সাত বছরের কারাদণ্ডের পাশাপাশি পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন বিচারক।

রায়ের প্রতিক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী কিশোর কুমার কর বলেন, আমরা সকল আসামীদের অপরাধ সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করতে পেরেছি। ফলে এই রায়ে আমরা পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারিনি। আশা করেছিলাম সকল আসামীর মৃত্যুদণ্ড হবে। রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি পেলে পর্যালোচনা করে আমরা পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

আর আসামিপক্ষের আইনজীবী শফিউল আলম বলেন, এই রায় আইনের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণভাবে পরিপন্থি। সাক্ষীদের সাক্ষ্য অনুযায়ী দণ্ড দিলে সব আসামিকে দিতে হবে আর খালাস দিলেও সবাইকে দিতে হবে। তিনি বলেন, তিন আসামি ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিলেও তা স্বপ্রণোদিত ছিলো না। এছাড়া ৫২ সাক্ষীর কেউই নিরপেক্ষ সাক্ষী নন। রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ কিছুতেই প্রমাণ করতে পারেনি। এই রায়ে আমরা খুবই মর্মাহত, সংক্ষুব্ধ, হতাশ। আমরা মনে করি, উচ্চ আদালতে গেলে আসামিরা অবশ্যই খালাস পাবে। আমরা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।

উলে­খ্য, গত বছরে ১২ ফেব্রæয়ারি বিকালে বাড়ির পাশের মাঠে খেলতে গিয়ে নিখোঁজ হয় হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার সুন্দ্রাটিকি গ্রামের আবদাল মিয়া তালুকদারের ছেলে মনির মিয়া (৭), ওয়াহিদ মিয়ার ছেলে জাকারিয়া আহমেদ শুভ (৮), আবদুল আজিজের ছেলে তাজেল মিয়া (১০) ও আবদুল কাদিরের ছেলে ইসমাইল হোসেন (১০)।

মনির সুন্দ্রাটিকি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে, তার দুই চাচাত ভাই শুভ ও তাজেল একই স্কুলে দ্বিতীয় ও চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ত। আর তাদের প্রতিবেশী ইসমাইল ছিল সুন্দ্রাটিকি মাদ্রাসার ছাত্র।

নিখোঁজর পাঁচদিন পর ইছাবিল থেকে তাদের বালিচাপা লাশ উদ্ধার হলে দেশজুড়ে আলোচনা সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় বাহুবল থানায় নয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন মনির মিয়ার বাবা আবদাল মিয়া।

২০১৬ বছরের ২৯ এপ্রিল মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির তৎকালীন ওসি মোক্তাদির হোসেন নয়জনের বিরুদ্ধেই আদালতে অভিযোগপত্র দেন।

সেখানে বলা হয়, সুন্দ্রাটিকি গ্রামের দুই পঞ্চায়েত আবদাল মিয়া তালুকদার ও আবদুল আলী বাগালের মধ্যে পারিবারিক বিরোধের জেরে ওই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়।

হবিগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে গত বছর ৭ সেপ্টেম্বর মামলার বিচারকাজ শুরুর পর ৫৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ৪৫ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়। এরপর গত ১৫ মার্চ মামলাটি সিলেট বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হলে আরও সাতজনের সাক্ষ্য শেষে রায় দেওয়া হলো।

Loading...
loading...

ভিডিওটি দেখতে নিচে ক্লিক করুন



Loading...

About sylhet24 express

Check Also

আপন জুয়েলার্সের ৩ মালিককে দুদকে তলব

আপন জুয়েলার্সের ৩ মালিককে দুদকে তলব

নিজস্ব প্রতিবেদক : অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদ সেলিম, গুলজার আহমেদ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *