loading...
Home / ফিচার / সাটুরিয়ার বালিয়াটি জমিদার বাড়ি দেশি বিদেশি পর্যটকদের ভিড়ে মুখরিত

সাটুরিয়ার বালিয়াটি জমিদার বাড়ি দেশি বিদেশি পর্যটকদের ভিড়ে মুখরিত

সাটুরিয়া (মানিকগঞ্জ) সংবাদদাতা : গোটা দেশে যে কয়েকটি প্রাচীন নিদর্শন রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম মানিকগঞ্জে সাটুরিয়ার বালিয়াটি জমিদার বাড়ি। জমিদার বাড়ি যা ‘বালিয়াটি প্যালেস’ নামে কালের কীর্তিমান সাক্ষী হয়ে মাথা উঁচু করে আজও দাঁড়িয়ে আছে। শত বছরের পুরোনো পরিত্যক্ত বাড়িটি বছর কয়েক আগেও জিন-ভুতের আড্ডা খানা ভাবতো এলাকাবাসি। প্রত্নতত্ব বিভাগের ছোঁয়ায় এখন তা নতুন সাঝে সজ্জিত হয়ে পর্যটকদের দৃষ্টি আকৃষ্ট করছে। রং চুনকাম করারর পর এখন ভবনগুলো যেন প্রাণ ফিরে পেয়ে রৌদ্রোজ্জ্বল হাসি দেখা দিয়েছে। বাডির সামনে গেলেই মনে হয় যেন দীর্ঘদিন পর জমিদার বাহাদুর ফিরে এসছে। দেশ বিদেশের হাজার হাজার পর্যটক এ বড়িতে ঢুকেই কারুকাজ দেখে বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে থাকেন। ভূয়সী প্রশংসা করেন সে আমলের নির্মাণ কারিগরদের।

সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, ১৯৫৭ সালে জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার আগেই বালিয়াটির জমিদাররা এ বিশাল প্রাসাদ ছেড়ে ভারতে চলে গেছে। তাদের জমিদারী ২ ভাগে বিভক্ত ছিল যা দশ’আনি আর ছ’আনি অংশ নামে পরিচিত। দশ’আনি অংশের জমিদার বাড়ি বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ব বিভাগ নিয়ন্ত্রণ করছে। এতে রয়েছে ৪টি বৃহদাকার সুদর্শন অট্টালিকা। প্রত্যেক অট্টালিকায় ঢুকার জন্য রয়েছে ভিন্ন চারটি ভিন্ন প্রবেশ দ্বার। প্রত্যেকটি দ্বারের ওপরে রয়েছে একটি করে সিংহ মূর্তি যা দেখলে জ্যান্ত মনে করে পর্যটকরা বিশেষ করে শিশুরা আতকে উঠে। চারদিকে সিমানা প্রাচীর ঘেরা প্রায় ২০ একর বাড়িটির ভেতরে আরও ৩টি ভবন রয়েছে। প্রত্যেক ভবনের ছাদে উঠার জন্য রয়েছে বিশাল ব্যয়ে সেগুন আর শাল কাঠ দিয়ে নির্মিত সিঁড়ি।

প্রাসাদের অট্রালিকা তিন তলা বিশিষ্ট হলেও উচ্চতায় বর্তমান সময়ের পাঁচ তলা ভবনের সমান। সামনের চারটি ভবনের দ্বিতীয় ভবনে রয়েছে তাদের নির্মিত প্রমোদগার বা রংমহল। জমিদারদের ওই সময়ে ব্যবহৃত আসবাবপত্র দিয়ে এ কক্ষটি এখনো সাজানো রয়েছে। এটি সবসময় বন্ধ থাকে। পর্যটকরা দেখতে চাইলে নির্ভর করে কেয়ারটেকারদের মর্জির উপর। সাতটি ভবনের মধ্যে চারটি ছাড়া বাকী ভবনগুলি বসবাসের অনুপযোগী। বাড়ির ভিতরে রয়েছে মনোরম পরিবেশে আম, কাঁঠাল, বেল, লিচ, জাম্বুরা গাছসহ হরেক রকম ফল আর ফুলের গাছ ।

 সাটুরিয়ার বালিয়াটি জমিদার বাড়ি দেশি বিদেশি পর্যটকদের ভিড়ে মুখরিত
বাড়ির সামনে দু’ঘাটলা বিশিষ্ট বিশাল পুকুর। সদর ঘাটলায় জমিদার বাহাদুর আর বিপরীত ঘাটলায় তার কর্মচারীরা ব্যবহার করত। একই ব্যবস্থা ৩ ঘণ্টা বিশিষ্ট ভেতর বাড়ির পুকুরের বেলায়। সদর ঘাটলায় জমিদার রানী আর উল্টো ঘাটে মহিলা কর্মচারীরা স্নান সারত। বাড়ির ভেতরে পুকুরের উল্টোদিকে রয়েছে সারিবদ্ধ প্রায় ৩০টি টয়লেট। এগুলো দেখলেই বুঝা যায় বর্তমান সময়ের কোনো আবাসিক ভবন নির্মাণের চেয়েও ব্যয়বহুল। সে আমলে কত টাকা ব্যয়ে এ প্রাসাদ নির্মাণ হয়েছে তা ধারণা করে বলা মুসকিল। প্রাসাদ তৈরি করেই ক্ষান্ত ছিল না জমিদাররা। এ প্রাসাদের পাশেই জমিদার বাবুর ভাগ্নে ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের নামে ‘ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর উচ্চ বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা তাদের আর এক নিদর্শন। এখানেই শেষ নয় রাজধানী ঢাকাতে ‘জগন্নাথ বিশ্বদ্যিালয়’ আর জগন্নাথ হল নির্মাণ করেছিল জমিদার পিতা জগন্নাথের নামে।

এ ব্যাপারে সাটুরিয়া প্যালেজে প্রত্নতত্ব বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বাবু সঞ্জয় বডুয়া বলেন, বর্তমান সরকার কোটি টাকা ব্যয়ে বালিয়াটি প্রাসাদের ব্যাপক সংস্কার কাজ করছেন। ফলে এখন তা দর্শনার্থীদের নজর কেড়েছে। টিকিট ব্যবস্থা করায় সরকারের প্রচুর রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে।

কথা হয় স্থানীয় ৮০ বছরের বৃদ্ধ মমিন মিয়ার সঙ্গে, তিনি জানান জমিদারদের আচরণের কথা। তাদের আমলে জুতা পায়ে আর ছাতা মাথায় নিয়ে যে কেউ এ বাড়ির সামনে দিয়ে যেতে পারত না। এতে নাকি বাবুদের অসম্মান হতো। এ নিয়ম অমান্য করলে তাকে প্রচণ্ড শাস্তি পেতে হতো। নারীলোভ আর অত্যাচারের মাত্রা ছিল ইতিহাসের নীলকর ইংরেজদের চেয়েও ভয়ঙ্কর।

দেশের খ্যাতিমান পরিচালকদের চলচ্চিত্র, নাটক, টেলিফিল্ম, প্রামাণ্য চিত্র নির্মাণের শুটিং করতে প্রায়ই দেখা যায় এ বাড়িতে। বাদ যায়নি জনপ্রিয় নির্মাতা হানিফ সংকেত এর ইত্যাদিও। ইতিহাসের নিদর্শন হিসেবে ২০১১ সালে পরিচালক হানিফ সংকেত ‘ইত্যাদি’ পুরু সুটিংটাই এ প্রাসাদের সামনে করেন। তার শুটিংয়ের আলোকসজ্জায় প্রাণ ফিরে পেয়েছিল নিঃসঙ্গ প্রাসাদটি। যেন জমিদার বাহাদুর আবার প্রাসাদে ফিরে এসেছে। কালজয়ী ছবি বেহুলা লক্ষিন্দর, জীবন সীমান্তেসহ অসংখ্য চলচিত্রের শুটিং হয়েছে এ বাড়িতে। শুটিং করতে ঢাকার আগারগাঁও প্রত্নতত্ব বিভাগের অফিসে অনুমতি নেন পরিচালকরা। এতে সরকারের প্রচুর রাজস্ব আয় হয়।

দেশি বিদেশি পর্যটকের ভীড় নিত্য দিনের ব্যাপার। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক, শিল্প কারখানার মালিক কর্মচারী এমনকি গার্মেন্ট কর্মীরাও দলবেধে ভ্রমণ করতে আসেন। জমিদার বাড়ির মূল ফটকের আঙিনা ঘেঁষে গড়ে উঠেছে বেশকিছু হোটেল-রেস্তোরাঁ। বালিয়াটি প্রাসাদে ভ্রমণে এলে দর্শনার্থীরা প্রসংশা করে গাভীর খাঁটি দুধের তৈরি বিখ্যাত ‘ছানা সন্দেস’ খেয়ে।

বালিয়াটি জমিদার বাড়ি মানিকগঞ্জের গর্ব আখ্যায়িত করে বালিয়াটি ইউপি চেয়ারম্যান মো. রুহুল আমীন জানান, সাটুরিয়া আসনের এমপি স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক স্বপনের চেষ্টায় ইতোমধ্যে সরকার বালিয়াটি জমিদার বাড়ি ব্যাপক সংস্কার করে আধুনিকায়নের কাজ করেছে। এমনকি ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের গোলডা থেকে প্যালেজে যাওয়ার রাস্তা ৮টি ব্রিজ নির্মাণসহ ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। বর্তমানে টিকেট ব্যবস্থায় দর্শনার্থীদের প্রবেশের ফলে সরকারের রাজস্ব আদায়ও হচ্ছে প্রচুর।

রাজধানী ঢাকা থেকে আরিচা মহাসড়কের কালামপুর বা গোলড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার ভেতরে গ্রামীণ পরিবেশে এ প্রাসাদদের অবস্থান বলে জানা গেছে।

Loading...
loading...

ভিডিওটি দেখতে নিচে ক্লিক করুন



Loading...

About sylhet24 express

Check Also

রানী মাছ

মৌলভীবাজারের হাকালুকির হাওরের বিলুপ্ত প্রায় সুস্বাদু রানী মাছ

মৌলভীবাজার সংবাদদাতা : মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওরের বিলুপ্ত প্রায় মাছের মধ্যে অন্যতম হলো রানী মাছ। চলতি …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *